হারানো দেশ ও মানুষের খোঁজে নীলকণ্ঠ পাখি

মানুষের জীবনে কিছু ক্ষত থাকে, যা সময়ের প্রবাহে মুছে যায় না; বরং স্মৃতির গভীরে আরও স্থায়ী হয়ে ওঠে। দেশভাগ তেমনই একটি ক্ষত। ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক বিভাজন কেবল একটি ভূখণ্ডকে দুই ভাগ করেনি, বিভক্ত করেছে অসংখ্য মানুষের জীবন, সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়ের জগৎ। মানচিত্রে সীমারেখা টানা হয়েছিল রাষ্ট্রের জন্য, কিন্তু সেই রেখার অভিঘাত গিয়ে পড়েছিল মানুষের হৃদয়ের ওপর। ইতিহাসে দেশভাগ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং নিশ্চিত নেতৃত্বের মোহে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়াস। কিন্তু সাহিত্য সেই ইতিহাসের অন্য এক মুখ উন্মোচন করে। সেখানে দেশভাগ মানে শুধু দেশ হারানো নয়; মানে একটি পরিচিত পৃথিবীর ভেঙে যাওয়া। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সেই হারানো পৃথিবীরই এক বেদনাময় আখ্যান।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩০-২০১৯) বাংলা সাহিত্যের একজন তাৎপর্যপূর্ণ কথাসাহিত্যিক। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের রাইনাদি গ্রামে ১৯৩০ সালের ০৬ নভেম্বর। শৈশব-কৈশোর কেটেছে পূর্ববাংলার নদী, খাল-বিল, গাছপালা আর একান্নবর্তী পরিবারের আবহে। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তাঁকে জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে হয় পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু শৈশব-কৈশোরের মোহময় স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যাওয়ার গভীর বেদনা তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। এই অন্তর্গত বেদনার্ত অনুভূতি তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির মর্মমূলে সর্বদাই ক্রিয়াশীল ছিল। দেশত্যাগের পর নতুন দেশে নতুন করে বাঁচার তাগিদে কম বয়সেই তাঁকে গোটা পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। শুধু কলকাতা নগরীতেই তিনি কাজের সন্ধান করেছেন এমনটা নয়, বরং জীবিকার তাগিদে জাহাজে কাজ নিয়ে পৃথিবীর নানা সমুদ্র বন্দরে ঘুরতে হয়েছে তাকে। আর সেই সূত্রে রচনা করেছেন সমুদ্রনির্ভর অসাধারণ উপন্যাস ‘অলৌকিক জলযান’। ব্যক্তিগত এসব সমস্যা-সংকট, বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের নিবিড় সাহচর্য এবং জীবনের বাঁকে বাঁকে অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যে রসদ জুগিয়েছে। ফলে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস হয়ে উঠেছে তাঁর নিজের জীবনযাপনের অভিজ্ঞান। তাঁর জীবনের ছায়াই উপন্যাসের কায়া নির্মাণে সহায়ক হয়েছে।

১৯৬৯ সালে অতীন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ লেখা শুরু করেন, শেষ করেন ১৯৭০ সালে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। লেখকের নিজের শৈশব ও দেশভাগ এখানে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ‘সোনা’ নামক এক শিশুর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং স্মৃতিবিজড়িত শৈশবের গ্রাম ও দেশ থেকে চিরতরে ছিন্নমূল হওয়ার বেদনা উপন্যাসের মূল আখ্যান। সোনার দৃষ্টি দিয়েই অনেকটা উন্মোচিত হয় সেই জগৎ। ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, নদী, তরমুজের খেত আর মাঠঘাটে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার পরিচিত পৃথিবী। কিন্তু সেই পৃথিবীর ওপর ক্রমে নেমে আসে দেশভাগের ছায়া।

উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র ঈশম শেখ। ঠাকুরবাড়ির খেটে খাওয়া মানুষ হলেও আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় সে নিজেকে পরিবারের সদস্যই ভাবে। একসময় গয়নার নৌকা চালাত; বয়স বেড়ে যাওয়ায় এখন ঠাকুরবাড়ির তরমুজখেত দেখাশোনা করে। ঘরে তার পঙ্গু স্ত্রী। ধর্মপ্রাণ, সরল মানুষ ঈশম। দেশভাগের রাজনীতি সে বোঝে না। মানুষে মানুষে ভেদাভেদও তার কাছে সহজে ধরা দেয় না। মহরমের লাঠিখেলায় যেমন তার নামডাক ছিল, তেমনি দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনের নৌকাও সে চালিয়েছে। মানুষের প্রতি এই সহজ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ঈশমকে উপন্যাসের এক স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করেছে। ঈশমের হাত ধরেই উপন্যাসের কাহিনি শুরু। সোনার জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফিরতে গিয়ে ফাওসার বিলে পথ হারিয়ে ফেলে সে। সারারাত একই বিলের চারদিকে ঘুরে বেড়ায়। ঈশম ভাবে, তাকে ‘কানাওয়ালা’ ধরেছে। এই পথ হারানো যেন পরবর্তী সময়েরও এক ইঙ্গিত। দেশভাগের রাজনীতিতে পথ হারাবে অসংখ্য মানুষ। যারা বহুদিন ধরে একই মাটিতে পাশাপাশি বসবাস করেছে, তারা হঠাৎ পরস্পরকে ভিন্ন পরিচয়ে দেখতে শুরু করবে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে শুধু সংঘাত দেখেননি; দীর্ঘদিনের সহমর্মিতার ইতিহাসকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। আবেদালি, সামসুদ্দিন, শশীবালা, মালতী কিংবা ঈশমের মধ্যে এই সম্পর্কের নানা রূপ দেখা যায়। শশীবালা সামসুদ্দিনের মায়ের অসুখের কথা শুনে ব্যথিত হয়, ঘর থেকে তেল বের করে তার হাতে দেয়। এই অনুভূতির মধ্যে ধর্মাধর্ম তুচ্ছ হয়ে যায়। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের জন্য কাতর হয়ে ওঠে। অথচ সেই সমাজেই ধর্মীয় আচার, জাতপাতের সংস্কার ও রাজনৈতিক উসকানিতে মানুষে মানুষে ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে যায়। মালতী ও সামসুদ্দিন একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। শৈশবের সেই সম্পর্কের মধ্যে ধর্মপরিচয় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রূপ নেয়, তখনই সামনে চলে আসে তাদের পৃথক ধর্মপরিচয়। আবেদালির ছেলে জব্বরও একসময় মুসলিম লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ঘৃণা ও হিংসার আবর্তে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে। তবে লেখক এক সম্প্রদায়কে দোষী আর অন্য সম্প্রদায়কে নির্দোষ করে দেখাননি। হিন্দুসমাজের কট্টর ছুঁৎমার্গ যেমন তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি, তেমনি মুসলমান সমাজে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিস্তারও তিনি এড়িয়ে যাননি। ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতাকেই মুসলিম লীগ ধর্ম ও সম্প্রদায়গত বঞ্চনা হিসেবে প্রচার করে। মুসলমান সমাজে আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়গুলো রাজনীতিবিদদের ঠোঁটের ডগায় চলে আসে। স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতিবিদরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের জন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে। আর এই বিদ্বেষকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। উপন্যাসে তাই উঠে আসে—

‘—বলল, দু চার বিঘা জমি বাদে সব জমি কার?

—হিন্দুর।

—ভূমিহীন কারা?

—আমরা।

—উকিল বলুন ডাক্তার বলুন কারা?

—হিন্দুরা।

—শিক্ষা-দীক্ষা কাদের জন্য?

—হিন্দুর জন্য।

—ওদের জমিতে খাটলে আপনার আপনি খান, আপনার নাম মুসলমান।’

উপন্যাসের আরও এক বেদনাময় চরিত্র মণীন্দ্রনাথ, সোনার পাগল জ্যাঠামশাই। খ্রিষ্টান নারী পলিনকে ভালোবেসেও তিনি তাকে পাননি। পরিবারের অমতে ভালোবাসার পরিণতি ঘটেনি; শেষ পর্যন্ত মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মাঠঘাটে ঘুরে বেড়ান তিনি। এখানেও ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশভাগের মতো দুজন মানুষও ভাগ হয়ে গিয়েছে দুই প্রান্তে। এই মণীন্দ্রনাথের চরিত্র নির্মাণেও রয়েছে অতীনের ব্যক্তিজীবনের ছায়া। তাঁর নিজের বড়ো জ্যাঠামশাইয়ের জীবন থেকেই চরিত্রটির অনেকখানি রসদ এসেছে। মণীন্দ্রনাথের বেদনা ব্যক্তিগত হলেও তার পেছনে রয়েছে সমাজের জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদের কঠিন বাস্তবতা। তিনি যেন নিজের হারানো ভালোবাসার নীলকণ্ঠ পাখিকে খুঁজে বেড়ান। আবেদালি যখন তার ছেলে জব্বরকে ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে মণীন্দ্রনাথের খোঁজ দিয়ে আসতে বলে তখন সে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবিক অনুষঙ্গের সংঘর্ষটি লেখক নির্মাণ করেছেন নিখুঁত বর্ণনায়—

‘—কি যাবি না!

—না। আমারে অন্য কামের কথা কন।

—তা হইলে আমার কথা থাকব না!

—না।

—ক্যান, কী হইছে! আবেদালি এবার স্বর নামাল।

—আমি লীগে নাম লেখাইছি।

—ত হইছে ডা কি! হইছে ডা কী ক? নাম লেখাইয়া বাজানের কোরান-শরিফ শুদ্ধ কইরা দিছ!

—কী হইব আবার! হিন্দুরা আমাগ দ্যাখলে ছ্যাাপ ফালায়, আমরা-অ ছ্যাপ ফ্যালামু।

—জলসাতে বুঝি এডাই হইতাছে!

—কিন্তু কি ভেবে সে বলল, আল্লা, দ্যাশে এটা কী শুরু হইল!’

অতীনের গল্প বলার ভঙ্গিতে রয়েছে পূর্ববাংলার পরিচিত জীবন। নদীর জল, তরমুজের খেত, ভিটেবাড়ি, গাছপালা শুধু কাহিনির পটভূমি নয়, যেন চরিত্রদের জীবনেরই অংশ। পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের মুখে তিনি তাদের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। চরিত্রের ধর্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বদলে গেছে শব্দ ও বাক্য। আবার প্রকৃতির বর্ণনায় এসেছে কাব্যময়তা। ফলে দেশভাগের বেদনা এখানে নিছক কোনো ঘটনার বিবরণ হয়ে থাকে না, অনুভব করা যায় একটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া জীবনকে। দেশভাগের আঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সোনাদের দেশত্যাগের মুহূর্তে। যে অর্জুন গাছটার তলায় সে শৈশবের আনন্দে বিহ্বল হয়েছিল, যে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে তরমুজখেতে ঘুরে বেড়িয়েছে, সেই গাছ, সেই জ্যাঠামশাই, সেই পরিচিত মানুষদের ছেড়ে তাকে চিরতরে চলে যেতে হচ্ছে। নিরুদ্দেশ জ্যাঠামশাই ফিরে এলে যেন জানতে পারেন তারা কোথায় গেছে, সেজন্য অর্জুন গাছে বড়ো বড়ো অক্ষরে সোনা লিখে রেখে যায়,

‘জ্যাঠামশাই উঠে এলে যখন দেখতে পাবেন বাড়ি বলতে কিছু নেই, সব খালি, শূন্য খাঁ খাঁ করছে উঠান, যেন কোনও প্লাবন এসে সব ধুয়ে-মুছে নিয়েছে তখন তিনি নিশ্চয় একবার এই অর্জুন গাছের নিচে এসে দাঁড়াবেন। দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন—বড়-বড় হস্তাক্ষরে লেখা। সোনা লিখে রেখে গেছে জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা।’

‘আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা’—এই ছোট্ট বাক্যটির মধ্যেই যেন দেশত্যাগের সমস্ত হাহাকার জমা হয়ে আছে। দেশ বলতে আসলে বোঝায় মানুষ। সোনা এই পরিচিত মানুষদের ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। সোনাদের নৌকা ছেড়ে যায়। ঈশম পাড় ধরে ধরে মেঘনা নদী পর্যন্ত আসে। সে চায় না সোনারা চলে যাক। ঠাকুরবাড়ির মানুষই ছিল তার জীবিকার অবলম্বন, আবার তার আপনজনও। কিন্তু দেশত্যাগের তাড়াহুড়োয় ঈশমের ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবে না। যে তরমুজখেত সে এতদিন দেখাশোনা করেছে, সেখানে তার জন্য একটু জায়গাও রাখা হয় না। সবার চলে যাওয়ার পর সে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই তরমুজখেতেই মৃত্যু হয় ঈশমের। সামসুদ্দিন তার কবরের ব্যবস্থা করে, আর কবরে রেখে দেয় একটি নতুন ইশতেহার, যার নাম ‘বাংলাদেশ’। ঈশমের পরিণতিতে ব্যক্তি মানুষের দুঃখের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের দুঃখ একাকার হয়ে যায়—

‘ঈশম বসে বসে কেবল শুনছে। সে ঠিক যেন বুঝতে পারছে না। সে এইটুকু বোঝে, দেশভাগ হলে, এ দেশটার নাম পাল্টে যাবে। পাকিস্তান হবে। বাংলাদেশের নাম পাকিস্তান—ঈশমের কষ্ট হয় ভাবতে। আর একটা অংশ হিন্দুস্থানে চলে যাবে। এটাও ওর মনে কেমন একটা দুঃখের ছাপ বহন করছে। এত বড় বাংলাদেশের নিজস্ব বলতে কিছুই থাকবে না।’

দেশভাগের পরও উপন্যাসের মানুষের সংকট শেষ হয় না। নতুন রাষ্ট্রে ভাষার প্রশ্নে আবার অস্থিরতা দেখা দেয়। যে সামসুদ্দিন একসময় মুসলমানদের রাজনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল, সেই সামসুদ্দিনই পরে বাংলা ভাষার অধিকারের প্রশ্নে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের নাম বদলে গেলেও মানুষের দুঃখের অবসান হয় না—এ কথা ঈশমের জীবন ও মৃত্যুর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট। যে মানুষটি কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা চায়নি, বরং পাশাপাশি বসবাস করা মানুষের ভালোবাসাটুকু চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারই জন্য দেশটিতে জায়গা থাকে না।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রতীক ‘নীলকণ্ঠ পাখি’। এই পাখি কোনো দৃশ্যমান বাস্তবতার সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ঈশম তার নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে পায়নি। মণীন্দ্রনাথ তাঁর প্রেমিকা নামক নীলকণ্ঠ পাখিকে ঘরে আনতে পারেননি। সামসুদ্দিন চেয়েছিল মানুষের মুক্তি ও মর্যাদা; সেই স্বপ্নও পূর্ণতা পায়নি। আর সোনা ফিরে পায়নি শৈশবের স্বদেশ। প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে হারানো পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত। তাদের জীবনের সংগ্রাম আসলে একটি বৃহত্তর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পের বিশেষত্ব হলো, তিনি বড়ো ইতিহাসকে ছোটো মানুষের জীবনের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর কাছে ইতিহাস কেবল রাজা-রাজনীতির বিষয় নয়; ইতিহাস বাস করে সাধারণ মানুষের কান্নায়, ভালোবাসায়, ক্ষুধায়, বিচ্ছেদে এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামে। পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষা, প্রকৃতির নিবিড় বর্ণনা এবং ছোটো ছোটো ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি সেই জীবনকে তুলে ধরেছেন। ফলে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ শুধু একটি সময়ের ইতিহাস হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া ঘর ও মানুষের জন্য দীর্ঘ হাহাকারের গল্প। দেশ হারানো মানে শুধু একটি ভূখণ্ড হারানো নয়, বরং হারানো একটি পরিচিত জীবনব্যবস্থা, একটি সামাজিক সম্পর্কের জগৎ এবং একটি মানসিক আশ্রয়। ঘর এখানে শুধু একটি বসবাসের স্থান নয়; ঘর হয়ে ওঠে স্মৃতি, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের একটি মানসিক নির্মাণ। তাই ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ শুধু দেশভাগের উপন্যাস নয়; এটি মানুষের অন্তহীন অনুসন্ধানের উপন্যাস। মানুষ কী খোঁজে? সে কি শুধু হারানো দেশ খোঁজে? নাকি হারানো শৈশব, হারানো নিরাপত্তা, হারানো ভালোবাসা? হয়তো নীলকণ্ঠ পাখির সন্ধান আসলে নিজের কাছেই ফিরে যাওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা।