বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনার ১৯৬২ সালের ৬ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। নোবেলজয়ী এই লেখকের সাহিত্য, উত্তরাধিকার ও সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক।
উইলিয়াম ফকনারকে কেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ঔপন্যাসিকদের একজন বলা হয়?
ফকনার মূলত দস্তয়েভস্কির মনোজাগতিক বিষয়টি অনুসরণ করেছেন। তিনি দস্তয়েভস্কির মতো ইতিহাসকে ও প্রাণপ্রকৃতিকে আড়ালে না রেখে দুটিকেই তার বর্ণনা করা জীবন ও মানুষের পটভূমি হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। এছাড়াও নিজের পারিবারিক ইতিহাসকে কীভাবে জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়—সেটি উপন্যাসে এনেছেন। তাকে অনুসরণ করেছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও মারিও ভার্গাস ইয়োসা। তারা দুজনেই দুভাবে ফকনারকে ব্যবহার করেছেন। বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে, ফকনার হলেন লাতিন আমেরিকান বুম ঘটানোর পেছনে আরেক বিরাট অনুপ্রেরণা।
নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় ফকনার বলেছিলেন, “I decline to accept the end of man.”—এই বক্তব্যের সাহিত্যিক ও মানবিক তাৎপর্য আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
কারণ তিনি “মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়”—এই বাস্তবতাটি পাঠ করতে পেরেছিলেন। ফকনারকে দারুণ প্রকৃতিবাদী মনে হয়—ন্যাচারালিস্ট অর্থে নয়, বিভূতিভূষণ যেমন; তবে ফকনার নিষ্ঠুর, মায়াময় নন; কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা দিয়েই তিনি মায়া-মমত্বকে প্রকাশক করেন—এটাই ফকনারের অনন্য দিক। এটাই ফকনারের মানবিক দিক।
ফকনারের বর্ণনাভঙ্গি-বিশেষ করে বহুস্বরিক ও ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’—পাঠকের জন্য কী ধরনের নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে?
নিশ্চয়ই। ফকনার পড়া একটুও সহজ নয়, অনেকটাই শ্রমসাধ্য ব্যাপার, কিন্তু তাকে পড়া যায়, তার আধুনিক প্রকাশভঙ্গির জন্য। প্রাচীনপন্থিদের মতো ব্যাপক বিস্তারে অতিকথনে তিনি গিয়েও ফিরে আসেন; আবার, তার গল্প-উপন্যাসে চরিত্র ও জীবনকে পরের প্রজন্মের বুলেটের মতো গতিময় গদ্যও তিনি হাজির করেন না। ঔপন্যাসিক ফকনারই মূলত ফকনার। ছোটোগল্পকার ফকনার তার আসল চেহারা নয়। ফকনারের মহিমা 'ইয়োকনাপাতাওফা' কেন্দ্রিক উপন্যাসগুলিতেই দীপ্যমান। তার আদলে মার্কেসের ‘মাকন্দো’, আর. কে. নারায়ণের ‘মালগুলি’ বা সৈয়দ শামসুল হকের ‘জলেশ্বরী’ তৈরি হয়েছে বলে বোধ করি। যদিও সতীনাথ ভাদুড়ীর প্রবণতার সঙ্গে ফকনারের মেলে। তিনি ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’কে ব্যবহার করেন, যদিও তা জয়েসীয়ান বা প্রুস্তীয়ান নয়, তবু চরিত্রগুলি বর্ণনায় চৈতন্যের দারুণ এক প্রবাহের সৃষ্টি করতে পারেন ফকনার যা পদ্ধতির দিক থেকে অভিনব।
আজকের বাংলা সাহিত্য ও তরুণ লেখকদের জন্য ফকনারের সাহিত্য থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি কী হতে পারে?
নানান দিক থেকে লেখাকে দেখা, চরিত্রগুলিকে দেখার বিষয়টা তার কাছে শেখা যায়। ত্রিভুজ কাচের নল আছে না—যেটাকে বলে কিনা ক্যালিডোস্কোপ (Kaleidoscope) ধরনে দেখা, কিন্তু ফকনারের নিষ্ঠুরতা সেখানে রংদার হতে গিয়েও হন না। ক্রূর বাস্তবতার ভেতর দিয়ে জীবনের গূঢৈ়ষাকে হাজির করার কায়দাকানুন ফকনারের কাছে শেখা যায়। মার্কেস ও ইয়োসার মতো মানুষেরা নোট করে করে ফকনার পড়েছেন, ধরে ধরে তার বাক্যগুলিরা ব্যবচ্ছেদ করেছেন নিজেদের তৈরি করার জন্য। আমাদের তরুণরাও তা করতে পারেন, কিন্তু কেন জানি মনে হয়, বাঙালি মানসের সঙ্গে একদমই যান না ফকনার। ফলে হেমিংওয়েকে বাঙালি যতটা নিয়েছে, অনুবাদ করেছে, ফকনারকে নেয়নি, অনুবাদও করেনি। বাংলা তার অনুবাদও যথেষ্ট কম হয়েছে। মাত্র দুটো উপন্যাস, কিছু ছোট ও বড়ো গল্প, আর কিছু তেমন পাওয়া যায় না বাংলায়। তদুপরি ফকনারকে আসলে ইংরেজিতে না পড়লে তার প্রকৃত মহিমা টের পাওয়া কঠিন। কিন্তু বাংলায় ভালো অনুবাদ হওয়া চাই। আরো অনুবাদ হওয়া দরকার ফকনারের, অন্তত উপন্যাসগুলির। তাহলে তরুণদের জন্য সুবিধা হবে।