সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্বসাহিত্যের কতটুকুই-বা বাঙালির চায়ের কাপের আড্ডায় প্রাসঙ্গিক থাকে? খুব অল্পই, হয়তো। তাই এ বছরের সাহিত্যে নোবেল পাওয়া কবি অ্যান কারসন আমাদের মধ্যে বহুল পঠিত, এ দাবি করার সুযোগ নেই। তবুও, নোবেল পুরস্কারের সূত্র ধরে গতকাল সন্ধ্যা থেকে তিনি বাঙালি সাহিত্যপাড়ার আলোচনা-সমালোচনা গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। স্বল্প সময়ের এই গবেষণায় অ্যান কারসনের যে চেহারা আমাদের সামনে উঠে এসেছে, তাতে আমাদের মনে হয়েছে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তো উনারই পাওয়ার কথা! নোবেল প্রাইজের অফিশিয়াল ফেসবুকে পেইজে সুইডিশ একাডেমির ফোনকল রিসিভ করা অ্যান কারসনের যে ছবি শেয়ার করা হয়েছে, তাতে তার মুখে ছিল এক সংশয়ী, কনফিউজড ভাব। খবরটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। সাফল্য কীভাবে গ্রহণ করেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে যিনি অকপটে জানান, তিনি এখন গ্রিক পুরাণের হাইপারবোরীয়দের মতো দূর উত্তরের বাসিন্দা এবং এভাবেই বেশ আছেন।
অ্যান কারসনের লেখাপত্র আমরা সামনের দিনগুলোতে আরও সবিস্তারে আবিষ্কার করবো, তার নিজের ভাষায়, কিংবা আমাদের মাতৃভাষায়, অনুবাদকের হাতে, এমনকি জেনারেটিভ এআই এর অনুবাদেও। তবে আজ এই লেখায় তার ব্যক্তি ও সৃজনশীলতার জগৎকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করার একটি প্রাথমিক চেষ্টা করা যাক। দ্য গার্ডিয়ান, দ্য প্যারিস রিভিউ, দ্য পেন রিভিউ এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভ রাইটিং ডিপার্টমেন্টের লিটেরারি জার্নালকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তার বিবিধ সাক্ষাৎকারমালা থেকে বাছাই করা কিছু প্রশ্ন ও সেগুলোর উত্তরের সংকলন এই সাক্ষাৎকার।
আপনার লেখা কবিতা, কবিতা সম্পর্কিত আমাদের প্রচলিত ধারণার গণ্ডিকে অতিক্রম করে যায়। কবিতা কী, এ বিষয়ে আপনার নিজস্ব কোনো সংজ্ঞা আছে?
গদ্যকে যদি একটি বাড়ি হিসেবে ধরি, তবে আমার কাছে কবিতা হলো সারা গায়ে আগুন ধরে যাওয়া এক মানুষের মতো, যে কিনা বাড়িটির ভেতর দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে তা অতিক্রম করার চেষ্টা করছে।
একজন কবি নিজেই কি কবি হওয়ার পথ বেছে নেন, নাকি কবিতাই তাকে বেছে নেয়? আপনি প্রথম কীভাবে লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হন?
লেখালেখির কোনো ‘শুরু’র কথা আমার স্মৃতিতে নেই। নিশ্চয়ই এর আগে এমন একটা সময় ছিল, কিন্তু তা আমার মনে নেই। সত্যি বলতে আমার প্রথম ভালোবাসা ছিল চিত্রাঙ্কন, যদিও তাতে খুব একটা দক্ষ ছিলাম না। ছবি আঁকার সময় সেগুলোর নিচে শিরোনাম রচনার অভ্যাস থেকেই আমার লেখালেখির সূত্রপাত। তবে সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, ছবি আঁকার সাথে লেখালেখির সরাসরি তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এদের একটি অন্যটিকে সতেজ করে তোলে। এগুলো হলো মনকে সক্রিয় করার দুটি ভিন্ন মাধ্যম।
শৈশবে আপনার বেড়ে ওঠা, আপনার বাবা-মার ব্যাপারে কিছু বলুন।
আমি অন্টারিও-এর বিভিন্ন ছোট শহরে বেড়ে উঠেছি। বাবা ব্যাংকে কাজ করতেন। মা ছিলেন গৃহিণী।
আপনার একদম শৈশবের এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা এখনো আপনার মনে পড়ে?
আমার একদম শৈশবের সঙ্গে জড়িত স্মৃতিটি একটি স্বপ্ন সংক্রান্ত। স্বপ্নটা আমার শৈশবের বাড়িকে নিয়ে। আমার বয়স তখন তিন বা চার হবে। স্বপ্নে দেখলাম, আমি বাড়ির ওপরতলার একটি ঘরে ঘুমিয়ে আছি। তারপর ঘুম ভেঙে জেগে উঠে নিচতলার ড্রয়িংরুমে হাজির হলাম। নিস্তব্ধ ও জনশূন্য পরিবেশ, কিন্তু কামরায় আলো জ্বলছিল। কামরার দেয়ালের রং ছিল হালকা সবুজ, সেই দেয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল আমার পরিচিত গাঢ় সবুজ রঙের সোফা ও চেয়ারগুলো। আমার চিরচেনা পরিচিত বসার ঘর, যার সমস্ত খুঁটিনাটি আমার জানা, যার কোনোকিছুই স্বাভাবিক অবস্থা থেকে নড়চড় হয়নি, তবুও জায়গাটা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল, এমনভাবে, মনে হচ্ছিল যেন ঘরটা পাগল হয়ে গেছে।
স্বপ্নটা মনে হচ্ছে আস্থাশীলতা বা নির্ভরযোগ্যতার অভাব সংক্রান্ত। যদি বিষয়টি একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করি, একজন কবির জীবনের তুলনায় কি আপনার ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপকের জীবন আশ্বস্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য ছিল?
আমার কবিতা ও কর্মক্ষেত্রের মাঝে আমি কখনোই এ বিষয়টি, অর্থাৎ নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তুলনামূলকভাবে চিন্তা করিনি।
আপনি কি সচেতনভাবে এমন কোনো আবেগীয় বিষয়ের তালাশে থাকেন, যা দিয়ে কবিতা রচনা করা যায়? এমন বিষয় ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা কি আছে?
‘সচেতনভাবে’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। কারণ আমাদের ইনটিউশান, তথা অন্তর্দৃষ্টিই হয়তো জানার গভীরতম রূপ। যেই আশঙ্কার কথা আপনি বললেন, আমার ক্ষেত্রে এমন কিছুর সম্ভাবনা যদি থেকেও থাকে, তবে তা ‘জানা’র ক্ষেত্রে আমিই কি শেষ ব্যক্তিটি হব না?
আপনি একটা কবিতা কীভাবে শুরু করেন?
আমার তো মনে হয়, বিষয়টা আমার নয়, বরং কবিতার দিক থেকেই শুরু হয়। কবিতাটিই আমাকে বেছে নেয় বাঙ্ময় হয়ে ওঠার জন্য।
আপনি আপনার সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেছেন এমন এক সংগ্রাম হিসেবে, যার লক্ষ্য হলো ‘নিজের সত্তাকে, বা ‘আমি’-কে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা’। চিন্তার জগৎ থেকে যখন আপনি সেই ‘আমি’-কে মুছে ফেলেন, তখন কী অবশিষ্ট থাকে?
সম্ভবত অপ্রত্যাশিত কিছু।
আপনার “ইচ ডে আনএক্সপেক্টেড স্যালভেশন (জন কেজ)” কবিতাটিতে ‘শেইড’ (ছায়া) শব্দটি চুয়াল্লিশ বার ব্যবহার করেছেন। এই পুনরাবৃত্তিকে কি আপনি এক ধরনের ‘ডিক্রিয়েইশন’ বা সৃষ্টি-বিমোচন হিসেবে দেখেন?
আমি বিষয়টি সেভাবে ভাবিনি। এই কাজটি সম্ভবত আরও বেশি যান্ত্রিক, মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস দেখার মতো।
আপনার লেখালেখি-বহির্ভূত এমন কোনো দক্ষতা আছে যা লেখালেখির প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন?
ছবি আঁকা ও রং করা। সাঁতারের কথাও বলা যায়। ঘরদোর পরিষ্কার করা। জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে আমি বেশ পটু।
প্রচলিত আছে যে যেভাবে একটি ভাষায় কোনো ভাব বা ধারণা প্রকাশ করা হয়, তা অন্য কোনো ভাষায় হয়তো পুরোপুরি অনুবাদ করা সম্ভব নয়। মূল রচনা এবং অনুবাদের মধ্যবর্তী যে পরিসরটিতে একজন অনুবাদক হিসেবে আপনি অবস্থান করেন, সেখানে আসলে কী ঘটে?
আমি বিষয়টিকে দুটি রাস্তা বা দুটি দেশের মাঝখানে থাকা কোনো খাদ হিসেবে দেখি। অনুবাদক যখন কাজ করেন, তখন তার মনের পর্দায় একই সাথে দুটি ভাষা ভেসে থাকে। মানসিক এই অবস্থাটি আমার কাছে সবসময়ই বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। অনুবাদকের বক্তব্য ঠিক হুবহু এক নয়, দুটি ভাষাই সেখানে পাশাপাশি ভাসমান অবস্থায় থাকে।
কোনো কোনো লেখক, এমিলি ডিকিনসন এক্ষেত্রে এক অনন্য উদাহরণ, তাদের নিজেদের ভাষার ভেতরেই সেই খাদ বা ব্যবধানটিকে কাজে লাগান। অর্থাৎ, তিনি অন্য কোনো ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন না। তিনি নিজেকেই অনুবাদ করছেন। তিনি হয়তো কিছু পঙ্ক্তি বা শব্দ লেখেন, তারপর সেগুলো কেটে দিয়ে অন্য কোনো শব্দ বসান, কিংবা পাশে তৃতীয় কোনো শব্দ লেখেন, অথবা কাগজটি উলটে পুরো বিষয়টিরই আরেকটি সংস্করণ তৈরি করেন। এসব মিলিয়েই কবিতাটি গড়ে ওঠে। মনের এমন এক ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি, যেখানে সবকিছুই ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং সেই অগোছালো, অমীমাংসিত সামগ্রিক রূপটিই শেষ পর্যন্ত কবিতা হয়ে ওঠে।
অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে ধরা দেয়। কারণ আপনার সামনে একটি মূল টেক্সট থাকে, যাতে নিশ্চিতরূপেই কিছু না কিছু ভুলও থাকতে পারে। আবার ফুটনোটে থাকে পাঠান্তরের উল্লেখ, অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পণ্ডিতের প্রস্তাবিত বিকল্প পাঠ, যার লক্ষ্য হলো মূল পাঠের কোনো ত্রুটিপূর্ণ অংশকে আরও নির্ভুল বা অর্থবহ করে তোলা। ফলে একই বিষয়কে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন সব সম্ভাবনা আপনার মনে ভেসে উঠতে থাকে। এই সবকিছু মিলেই মূল কবিতাটি গড়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিকে কীভাবে সামলানো যায়, তা আমি কখনোই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। গ্রিক ভাষায় মূল কবিতাটি এবং তার নিচে ইংরেজিতে বিভিন্ন পাঠান্তর—সব মিলিয়ে এক চমৎকার আবহ তৈরি হয়। সেই সাথে মূল রচয়িতা আসলে ঠিক কী বলেছিলেন, তা নিয়ে নানা সম্ভাবনার বিষয়টিও যেন ভেসে বেড়াতে থাকে।
বইয়ের পাতায় কিংবা তথাকথিত কোনো ‘অনুবাদ’-এর মাধ্যমে সেই সৌন্দর্যের পূর্ণ প্রকাশ ঘটানো আমার পক্ষে প্রায়শই সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর জন্য উপযুক্ত কোনো বিন্যাস বা মাধ্যম নেই। কম্পিউটারে হয়তো লিংক বা পার্শ্ব-পাঠ্য ব্যবহার করে কিছুটা চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে কেউই সেসব লিংক ঘেঁটে দেখার ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তাছাড়া তাতে মূল অভিজ্ঞতার সেই আমেজটাও পাওয়া যায় না। একজন গবেষক হিসেবে যখন আপনি মূল ভাষার পাঠ ও তার বিভিন্ন পাঠান্তরসহ পৃষ্ঠাটির দিকে তাকান এবং সেসব বিষয় আপনার মানসপটে ভেসে ওঠে, তখন তা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, আমার মতে যার সূক্ষ্মতর দিকগুলো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
একেবারে শূন্য থেকে নতুন কিছু সৃষ্টির বিষয়টি কেমন? সেই অভিজ্ঞতাও কি একইভাবে স্থানিক বা স্থান-সম্পর্কিত?
ব্যাপারটা এমন যে—মনে কিছু এলো, তা যদি যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক হয়, তবেই তা নিয়ে আরও কাজ করা হয়। ব্যাপারটা কোনো কিছুর পিছে ধাওয়া করার মতো। যেমন ধরুন, আপনার বাড়ির আঙিনা দিয়ে একটি শিয়াল দৌড়ে গেল আর আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে সেটার পিছু নেবেন। দেখবেন শিয়ালটি কোথায় থাকে। প্রকৃতপক্ষে তা একটি পথের অনুসরণ মাত্র।
দীর্ঘ সময় ধরে আপনি ও আপনার স্বামী রবার্ট কুরি মিলে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ‘আর্টিস্টিক কোলাবরেশন’ বিষয়ক একটি ক্লাস নিতেন, যার নাম ছিল ‘দ্য ইগোসার্কাস’। কোলাবরেশন কি আদৌ শেখানো সম্ভব?
না, এটা শেখানো যায় না, হাতে-কলমে চর্চা করা যায় কেবল। আমরাও শিক্ষার্থীদের ঠিক শেখাই না, এমনভাবে অ্যাসাইনমেন্ট দিই যা তাদের একত্রে করা লাগে।
শিক্ষার্থীদের আপনারা কী ধরনের অনুশীলন দিতেন, বা কাজ করাতেন?
‘কোনো কিছু পুড়িয়ে ফেলো, তারপর সেই ছাই ব্যবহার করো’ এটি ছিল একটি প্রম্পট। ‘একটা হোটেল বানিয়ে দেখাও’ এটাও ছিল একটি প্রম্পট। কখনো হুটহাট তিনটা শব্দ দিয়ে দিতাম। যেমন: জাহাজ, মাখন, মৃত্যু। তারা এসব ক্লু ব্যবহার করে নানা কিছু তৈরি করত। এমন নয় যে আমরা লেখালেখি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিলাম। লেখালেখি সবসময়ই ছিল প্রাসঙ্গিক। তবে আমরা তাদের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগাতে উৎসাহিত করতাম। তারা প্রায়ই এমন সব দক্ষতার সন্ধান পেত, যার ব্যাপারে তারা অজ্ঞ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এফ.এ প্রোগ্রামগুলির ক্রিয়েটিভ রাইটিং পাঠ্যক্রমে—ক্যারেক্টারাইজেশন তথা চরিত্র নির্মাণ, পার্সপেক্টিভ তথা দৃষ্টিভঙ্গি এবং আখ্যানের গঠনশৈলীর দিকসমূহ নিয়ে প্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রেও আপনি কি ‘কারিগরি দিক’ বা ‘শৈলী’ নিয়ে ওরকম একাডেমিক উপায়েই চিন্তাভাবনা করেন?
কখনোই না। আমার মনে হয়, মানুষের উচিত এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দেওয়া। এসব বাদ দিয়ে কোনো একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবা এবং সেটিকে অনুসরণ করে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানো, যে পর্যায়ে পৌঁছে বিষয়টি ‘সত্য’ হয়ে ওঠে।
ছোটোবেলায় আপনি অস্কার ওয়াইল্ডের ভক্ত ছিলেন। এখনো কি তাই?
সম্প্রতি আমি ‘আর্ট এঞ্জেল’-এর হয়ে একটি গ্রুপ প্রজেক্ট শেষ করেছি। এতে ইংল্যান্ডের রিডিং জেলে অস্কার ওয়াইল্ডের কারাগারে বসে লেখা চিঠির অনুষঙ্গ আমি ব্যবহার করেছি।
শেক্সপিয়ার সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
শেক্সপিয়ার এমন একজন ব্যক্তি যিনি অবচেতনের হুবহু ভাষাটি লিপিবদ্ধ করার কাজে নিবেদিত ছিলেন। তার পায়ের গোছা নিশ্চিতভাবেই পেছন দিকে ফেরানো ছিল।
আপনার কবিতায় আপনি এমিলি ব্রন্টির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে কাজ করেছেন। তরুণ বয়সে ব্রন্টির লেখা কি আপনার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল?
না। চল্লিশে পা দেওয়ার পর তা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আপনি লিখেছেন, প্রাচীন গ্রিকদের ভাষা ও রচনাবলি হলো “সবকিছুর মূল, যা বাড়তে বাড়তে সেই বৃক্ষে পরিণত হয়েছে যার ছায়ায় আমরা আজ বাস করছি। সেগুলো এখনো সতেজ, তাদের সেই ভাবনাগুলোর গায়ে এখনো যেন শিশির লেগে আছে।” একবিংশ শতাব্দীতে কবিতার গতিপথ কি আপনি সেদিকেই দেখছেন? সেই শেকড়ের সন্ধানে?
না না, শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় আমাদের আর নেই। আমরা বরং ওপরের ডালপালায় হারিয়ে গেছি, হাওয়ায় দুলছি, প্রায়শই দিশেহারা হয়ে। পুষ্টি ফুরিয়ে আসছে, আমাদের সব পরিকল্পনাও ভেস্তে যাচ্ছে।
স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে কবিতা কতটা উপযুক্ত?
শিল্পকে আমি থেরাপি বা নিরাময়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করি না।
আপনার সৃজনশীলতায় সাঁতারের ভূমিকাটি যদি বিস্তৃত করতেন
সাঁতার কাটা আমাকে বিষণ্নতা ও খিটখিটে মেজাজের হাত থেকে বাঁচায়। সাঁতার কাটতে কাটতে আমি নানা বিষয় নিয়ে ভাবি। তবে এটা খুব ভালো কোনো প্রক্রিয়া নয়। সাঁতারের সময় যে ভাবনাগুলো মাথায় আসে তা অনেকটা স্বপ্নের মতো। হয়তো এমন কোনো একটি বাক্য অথবা কোনো সমস্যার বাস্তবমুখী সমাধানও আপনি পেয়ে গেলেন বলে মনে হলো, আপনি সুইমিং পুল থেকে ঝিম ধরা ভাব নিয়ে উঠে এসে সেটা খাতায় লিখেও রাখলেন, কিন্তু সকালে উঠে দেখলেন লেখাটা আসলে সম্পূর্ণই অর্থহীন বা অপ্রাসঙ্গিক। মোদ্দা কথা হলো আমি জল ভালোবাসি। কিছু মানুষের স্বভাবই হলো জলের কাছাকাছি থাকা।
আপনি তো বক্সিংও পছন্দ করেন, তাই না?
সেটা ছিল একটা ক্ষণস্থায়ী পর্ব, এখন কেটে গেছে।
আগ্নেয়গিরির প্রতিও আপনার বরাবরই এক ধরনের আকর্ষণ ছিল।
ওটা আমার ছবি আঁকার সময়কার কথা। আগ্নেয়গিরির ছবি আঁকা খুবই সহজ।
‘লন্ডন রিভিউ অফ বুকস’-এ স্টিফেন বার্ট আপনার সম্পর্কে লিখেছেন: ‘তাকে কোথাওই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে দেখা যায় না। না নিজের মনের ভেতর, না আমাদের এই সময়ে, এমনকি পুরাণের পৃথিবীতেও না।’ কথাটা কি সত্যি?
জলের নিচে আমি পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
ছাত্রাবস্থায় লেখা কোনো লেখার দিকে কি আপনি কখনো ফিরে তাকান? যদি তাকান, তবে বর্তমানের লেখাগুলোর সাথে সেগুলোর কী ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পান?
আমি কখনো ‘লেখালেখি’র কোনো কোর্সের শিক্ষার্থী ছিলাম না। আপনি কি ‘ক্লাসিকস’ (প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য ও সংস্কৃতি) বিষয়ে আমার পুরোনো প্রবন্ধগুলোর কথা বলছেন? এগুলোর সাথে বর্তমান কাজের খুব একটা সম্পর্ক নেই। তবে হ্যাঁ, আমার গবেষণা ও অনুবাদের কাজে আমি এখনো সেই একই ধ্রুপদী পাঠ্যগুলো নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।
আমরা আশঙ্কা করি, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যামেরিকায় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বা ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। একজন চিন্তাবিদ বা শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি নিয়ে আপনার মতামত কী?
হেজিটেশন বা দ্বিধা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা শুরুর পেছনে একটি কারণ, আপনার এ প্রশ্ন। গত কয়েকবছর যাবৎ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখাই। ছাত্রাবস্থায় প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখার সময় আমি মূল টেক্সট থেকে অজানা শব্দগুলো চিহ্নিত করে এবং অভিধানে সেগুলোর অর্থ খুঁজে বের করে লিখে রাখতাম। অভিধানে শব্দ খোঁজার এই প্রক্রিয়াটিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়ার মাঝে এমন এক বিরতি বা সময়ের ব্যবধান তৈরি হয় যা অনেকটা দিবাস্বপ্ন বা চিন্তার এক ধরনের স্থবির অবস্থার মতো। একে ঠিক 'চিন্তাহীনতা' বলা যায় না, কারণ কোনো একটি শব্দ নিয়ে আপনার মনে একটি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে এবং সঠিক অর্থটি খোঁজার জন্য যখন আপনি অভিধানের পাতা ওলটাতে থাকেন, তখন সেই প্রশ্নের সমাধানের দিকেই আপনি অগ্রসর হতে থাকেন। অথচ তখনও আপনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময় এবং ভিন্ন এক মানসিক অবস্থা। এটি অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ ওই বিরতি বা সময়ের ব্যবধানে শব্দগুলোকে কেন্দ্র করে আপনার চিন্তাজগৎ ও অনুভূতিতে নানা পরিবর্তন বা প্রক্রিয়া ঘটতে থাকে। আমি একেই বলি হেজিটেশন বা দ্বিধা।
আজকাল শিক্ষার্থীদের পুরো টেক্সট কম্পিউটারেই থাকে। কোনো অজানা শব্দ পেলে তারা কেবল একটি বোতাম চাপ দেয় এবং কম্পিউটারে সংরক্ষিত অভিধান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সেই শব্দের অর্থটি তাদের সামনে চলে আসে। সাধারণত কম্পিউটার যে প্যারাগ্রাফ থেকে শব্দটি তুলে আনা হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক অর্থটিই বেছে নিয়ে দেখায়। ফলে শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাস জানার কিংবা এর অন্যান্য সম্ভাব্য অর্থগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ আর থাকে না।
মধ্যবর্তী এই দ্বিধাগ্রস্ত বিরতিটুকু হারিয়ে ফেলার ফলে ভাষার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায়। চিন্তার প্রক্রিয়ায় এটি আপনার মস্তিষ্ককে এক ধরনের বিশ্রাম দেয়, কারণ তখনো আপনি পুরোপুরি চিন্তার জগতে প্রবেশ করেননি। এক অর্থে এটি এক ‘অনুপস্থিত উপস্থিতি’। তবে সাধুসন্তরা ঈশ্বর সম্পর্কে যে ‘অজ্ঞতার মেঘ’-এর ধারণা প্রদান করেন, যেখানে ঈশ্বরকে তারা ‘কিছুই নয়’ বলে অভিহিত করেন এবং একই সঙ্গে তার সম্পর্কে কোনো বক্তব্য প্রদান থেকেও বিরত থাকেন (কেননা কোনো কিছু বললেই তাকে বিশেষ কোনো গণ্ডিতে বা সীমাবদ্ধতায় আটকে ফেলা হয়)—পূর্ব উল্লিখিত সেই দ্বিধাগ্রস্ত বিরতি ঠিক তা নয়। এটি জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলারই একটি ধাপ, যা এক ধরনের আস্থা বা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে স্থির হয়ে আছে। এই প্রক্রিয়াটির ক্রমশ বিলীয়মানতা আমাকে কষ্ট দেয়।
আপনার কি মনে হয়, সময় সংক্রান্ত আমাদের অভিজ্ঞতার সাথে আমাদের মনোযোগ সক্ষমতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে? যিনি প্রচুর বই পড়েন, তার সময় সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা কি সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো ব্যক্তির তুলনায় ভিন্ন হবে?
প্রশ্নটা মূল্যায়নধর্মী। আমি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারব না। তবে এটা ঠিক যে আমরা সময়কে স্তব্ধ করে দেওয়ার উপায় খুঁজি, তা কেবল তখনই সম্ভব যখন আমরা কোনো কিছুর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিই। সে কারণেই আমরা এমন মনোসংযোগের মুহূর্তগুলোর অন্বেষণে থাকি। নেটফ্লিক্সে কোনো সিনেমা দেখার সময় এমনটা ঘটতে পারে। কিংবা ধরুন, নিজের সেরা কবিতাটি লেখার গভীর মগ্নতায় ডুবে থাকার সময়ও। দুটো ক্ষেত্রেই এমন এক গভীর মনোসংযোগ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, যার ভেতরে প্রবেশ করে আপনি নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে পারেন। সময় নিয়ে আমার আগ্রহের একমাত্র জায়গাটি হলো—একে থামিয়ে রাখার উপায় খুঁজে বের করা। কারণ, সময় যখন থামে না, তখন একঘেয়েমিই ভর করে।
আপনি দেখছেন সময়টা বয়ে যাচ্ছে, অথচ এর মধ্যে এমন কিছুই ঘটছে না যা একে পূর্ণ করে তুলতে পারে, অথবা আপনাকে আপনার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারে। একঘেয়েমি ও অমরত্ব বা সময়কে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা—এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোনো অবস্থান আমি খুঁজে পাই না।
সময়ের গণ্ডির বাইরে থাকার অবস্থাটা দারুণ উপভোগ্য। এতটাই উপভোগ্য যে তখন সময় নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কথাও আপনি ভুলে যান।
সাফল্যকে আপনি কীভাবে সামলান?
ইদানীং আমি অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে বা অপ্রচলিত হয়ে পড়েছি। তাই আমি এখন এক ‘হাইপারবোরিয়ান’ (পৌরাণিক সেই জাতি যারা লোকচক্ষুর আড়ালে ‘উত্তরের বাতাসের পেছনে’ বসবাস করে) হিসেবে জীবনযাপন করছি।
আরেকটি জীবন পেলে আপনি কি আবারও কবি হতেন?
এই জীবনে আমি নিজেকে কবি বলে মনে করি না। আমি নানা কিছু সৃষ্টি করেছি। তার মধ্যে কিছু কিছু বিষয় সময়ে সময়ে কবিতার রূপ ধারণ করেছে। কেন এমনটা হয়েছে, তা আমি জানি না।