নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের বিশেষ সাক্ষাৎকার ।। শেষ পর্ব

১৯৭৮ সালে ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে পালিয়ে যাওয়া এবং এত বছরে কেবল একটি মাত্র চিঠি পাঠানোর তথ্যটি পর পর কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে—কখনো বিরামচিহ্নের সামান্য বদলে, কখনো কাগজের ছাপের পার্থক্যে। চার নম্বর পুনরাবৃত্তিতে এটি নিজেই যেন এক খণ্ডাংশ হয়ে ওঠে। এই পুনরাবৃত্তির কারণ কী?

এই পুনরাবৃত্তিটি কেবল মুদ্রিত বইয়ে আছে। মূল বইয়ে চিঠিটি ভাঁজ করে আঠা দিয়ে লাগানো ছিল। মুদ্রিত বইয়ে সেই ভাঁজটি দৃশ্যমান করার জন্যই তথ্যটি বারবার দিতে হয়েছে। মূল বই না থাকার কারণে এটা ছিল একটা যান্ত্রিক সমাধান।

আমি ভেবেছিলাম পুনরাবৃত্তির সাথে বোধহয় বিষয়টাকে বোঝার কোনো সম্পর্ক আছে। কখনো কখনো কোনো কিছু অনুধাবন করার জন্য আমরা জানা কথাগুলো বারবার বলি।

একাধিকবার বললে নিজের ভাবনা পরিষ্কার হতে সুবিধা হয়, এটা সত্য। কাজটি করার সময় তা আমার মনে এসেছিল। আমার ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির এক আকস্মিক লাভ! তবে আগে থেকে ভেবেচিন্তে করেছি তা বলতে পারব না।

আপনি বলেছেন যে আত্ম-নির্বাসনের সেই দিনগুলোতে আপনার ভাইয়ের সিদ্ধান্তগুলো আপনি বুঝতে পারেননি। তার জীবন কেমন ছিল তা কি কল্পনা করার চেষ্টা করেছিলেন?

কোপেনহেগেনে তার স্ত্রী ও বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু তা ছিল এমন কোনো সিনেমার সারসংক্ষেপ পড়ার মতো যা আপনি কখনো দেখেননি—কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যেত না! কেউ হয়তো বলত, "হ্যাঁ, আপনার ভাই যখন সোনা চোরাচালান করত, তখন তাকে চিনতাম।" ওটা শুনে তো আমার আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা! এরকম ছোট ছোট তথ্যের টুকরো, যার কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না।

বইয়ের মাঝামাঝি একটি লাইন আছে—"যে জিনিস আপনাকে কষ্ট দেয়, তার পেছনে একটা গোপন রহস্য আছে বলে ধরে নেওয়াটা সবসময়ই আরামদায়ক।"

রহস্য—মানে যা একটি অর্থ দাঁড় করাবে। তথ্যের টুকরোগুলোর বদলে একটা উত্তর দেবে। সত্যি বলতে, আমাদের অধিকাংশেরই জীবন হলো অপ্রাসঙ্গিক কিছু টুকরোর সমষ্টি, যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা সুসংগঠিত 'আমি' আছে ও তার একটা গল্প অন্য কেউ বলতে পারে—এই ধারণাটি শুনতে ভালো হলেও আসলে একটা রূপকথা। আমার ভাইয়ের মতো মানুষের ক্ষেত্রে এই ধারণার মুখোমুখি হতে হয়, কারণ সে নিজেকে প্রকাশ করতে চাইত না।

আমার মনে হয় পার্থক্যটা এখানেই। আমরা খণ্ডবিখণ্ড হলেও নিজেদের গল্পগুলোকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি।

আমরা তা করি। কিন্তু জীবনের কোনো একপর্যায়ে এসে সে সেই চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিল।

আপনার মা আপনার ভাইকে তার "জীবনের আলো" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সে মাঝে মাঝে পোস্টকার্ড পাঠাত, একবার একটা চিঠিও পাঠিয়েছিল। কিন্তু জীবনের শেষ বিশ বছর আপনার মা তাকে দেখতে পাননি। তাদের সম্পর্ক এবং তার অনুপস্থিতি কীভাবে আপনার মাকে প্রভাবিত করেছিল?

এটি তার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সে বেঁচে আছে কি না তা না জেনেই তিনি মারা যান। ওই পুরোটা সময় তিনি কেবল বিষাদে কাটিয়েছেন। অন্যদিকে, সে আবার ফিরে আসবে—এই আশা তিনি কখনো ছাড়েননি। আমি ছেড়েছিলাম, কিন্তু তিনি আশা আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। সেটাই তার জীবনকে ভুল জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সঠিক জীবন হতো সেটাই, যেখানে তার ছেলে দরজা দিয়ে ভেতরে হেঁটে আসত। সে ছিল তার প্রিয় সন্তান। ছোটোবেলার চুলের একগোছা চুল মা রেখে দিয়েছিলেন। সেই শোকের পরিমাপ আমি জানি না। তিনি মারা যাওয়ার পর যখন ভাই ফোন করেছিল, আমি এ কথা তুলেছিলাম। সে কেবল বলেছিল, "হ্যাঁ, আমার মনে হয় কথাটা সত্যি।"

তিনি ততদিনে মারা গেছেন।

তিনি তার তিন বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম, "তোমার জন্য মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।" সে বলেছিল, "হ্যাঁ, আমার মনে হয় কথাটা সত্যি।" মানে, সে নিজের অনুভূতি থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

আপনি লিখেছেন যে একসময় আপনি ও আপনার মা ভাইয়ের কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যা এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কেন? সে কথা বলার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

বইয়ে বোধহয় লিখেছিলাম—প্রতিটি কথপোকথনের মাঝে যেন চুল পোড়ার গন্ধ ভেসে আসত। কোথাও যাওয়ার পথ ছিল না। তা দিনটাকে অন্ধকার করে দিত, আমার মনে হতো না এই সমস্যার কোনো সমাধান আছে।

তবুও আপনি লিখেছেন যে প্রতিবার গাড়ি থামার শব্দ হলেই তিনি জানলা দিয়ে তাকাতেন—

রাস্তায় নুড়ি পাথরের শব্দ হলেই তিনি ভাবতেন সে এলো বোধহয়। করুণ।

এক জায়গায় আপনি প্রশ্ন করেছেন, "মৃত্যুর সামনে আমরা লজ্জিত হই কেন?" শব্দটা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত লেগেছে। কোনো উত্তর পেয়েছেন?

না, আমিও অবাক হয়েছিলাম। ক্যাটুলাসেরই অন্য এক কবিতায় এটি পেয়েছিলাম। বন্ধুর শোকগাথায় মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে তিনি 'লজ্জা' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন—খুবই ধোঁয়াশাপূর্ণ এক অংশ। লাতিন বা গ্রিক অনুবাদ করার সময় এমন অংশ প্রায়ই পাই যা কোনো অর্থ তৈরি করে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সত্য মনে হয়। মনে হয় এমন এক মূল সত্য যা আমার স্পর্শ করা উচিত। তাই আমি তা লেখার মধ্যে রেখে দিই এই আশায় যে, আমি না বুঝলেও সত্যটা তার নিজের শক্তিতে প্রকাশ পাবে। সেই 'লজ্জা' নিয়ে আমি এখনো ভাবছি।

পাশেই একটি বেশ গাঢ় লাল রঙের ছবি আছে...

'লজ্জা' শব্দটা মনে হতেই ভেবেছিলাম—বেশ, লাল রং ব্যবহার করা যাক! আমার মধ্যে সূক্ষ্মতার অভাব আছে! প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, বইটি তৈরি করতে আমার খুব ভালো লেগেছিল। প্রতিটা পৃষ্ঠায় আগের পৃষ্ঠাগুলোর চেয়ে মেকানিক্যালি ও শারীরিকভাবে ভিন্ন কিছু করার চ্যালেঞ্জ নিজেকে দিয়েছিলাম—যেটা সত্যি আনন্দের ছিল।

রূপকভাবে না দেখে বললে—এটাই কি আপনাকে পৃষ্ঠা উলটাতে সাহায্য করেছিল?

এক দিক থেকে, হ্যাঁ।

সপ্তম খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ঐতিহাসিক হেরোডোটাসকে উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, ইতিহাস হলো মানুষের করা সবচেয়ে অদ্ভুত কাজ—এত খোঁজাখুঁজি, যা কোনো স্পষ্ট বা সহায়ক হিসাব দেয় না। আপনি কি একমত?

হেরোডোটাসকে প্রথম ঐতিহাসিক বলা হয়, অথচ তিনি যা আবিষ্কার করেছিলেন তা হলো এলোমেলো তথ্যের টুকরো দিয়ে তৈরি ইতিহাসের এক চিত্র, যার কোনো স্পষ্ট অর্থ নেই। তিনি সেগুলো সংগ্রহ করে তুলে দেন।

আপনার নিজের কাজের প্রতিচ্ছবি।

হ্যাঁ, কোনো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সংগৃহীত কিছু সত্য।

তবে হেরোডোটাস এও বলেছিলেন যে ঐতিহাসিক হিসেবে সবার কথা বিশ্বাস করা তাঁর দায়িত্ব নয়— "মিশরীয়রা যা বলেছে তা এটুকুই। যার বিশ্বাস হয় সে তা ব্যবহার করতে পারে।" অথবা "আমাকে বলা কথাগুলো বলতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে এমন নয়।"

হেরোডোটাসের রসবোধ চমৎকার ছিল! কিন্তু তিনি মজা করছিলেন না। তিনি সত্যের পাশাপাশি মতামতও তুলে ধরেছেন। ভালো-মন্দের বিচারে মতামতগুলোকে বেশি আলাদা করার চেষ্টা করেননি। পাঠকের ওপর ভরসা রেখেছেন। এক প্রশংসনীয় সহনশীলতা!

তা কি আপনার নিজের অনুসন্ধানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল?

আমার মনে হয় ওই বইয়ে বা আমার সব লেখাতেই সহনশীলতার একটা চেষ্টা থাকে—যতটা পারি তুলে ধরা, পাঠক তার থেকে যা অর্থ উদ্ধার করার তা করবেন।

কখনো কখনো সেই অর্থটা দুই পৃষ্ঠার ফাঁকে থাকে। কারণ "আমাকে বলা কথাগুলো বলতে হবে..." এর ঠিক পরের পৃষ্ঠাতেই আপনার ভাইয়ের হাতের লেখায় চিঠির টুকরো—"ভালোবাসি, ভালোবাসি, মাইকেল।"

মানুষ যখন কোনো কথা দুবার লেখে, তা কেমন গা ছমছমে, তাই না? সে কেন দুবার লিখবে? আমি জানি না।

আপনি বলেছেন ইতিহাস ও শোকগাথা পরস্পর আত্মীয়। তারা কীভাবে যুক্ত?

দুটোই গল্প বলার উপায়—কোনো মানুষ বা ঘটনার রূপরেখা তৈরি করা। হেরোডোটাসের ভাষায়—পৌঁছাতে না পেরে অনবরত খুঁজে যাওয়া। এই পৌঁছাতে না পারার অক্ষমতা, সংগ্রাম এবং ব্যর্থতাই তাদের আত্মীয় করে তোলে।

'নক্স' শেষ করার পর আপনার কি কোনো পরিবর্তন এসেছে ভাইয়ের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে বা শোকগাথা ও অনুসন্ধানের ধারণায়?

তার সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো বদল আসেনি। গল্প বেড়েছে, কিন্তু তা পূর্ণতা পায়নি। শোকগাথা? কঠিন এক সাহিত্য রূপ। নিজের ব্যক্তিত্বের ছাপ না ফেলে মূল বিষয়ের মর্যাদা ধরে রাখা সেখানে খুব কঠিন।

খুব চমৎকারভাবে বললেন! শোকগাথার এটি একটি উপযুক্ত বর্ণনা। যে শোক প্রকাশ করছে, সবটা জুড়ে তারই প্রভাব থেকে যায়—মৃত ব্যক্তির কথা যেন আড়ালে পড়ে যায়।

শোক বা স্মৃতিচারণে সঠিক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ানো খুব কঠিন। তবে শুধু লেখার বদলে এই পৃষ্ঠাগুলো নিজ হাতে তৈরি করা আমাকে সাহায্য করেছিল। কারণ কিছু তৈরি করার মধ্যে অহংকার কম থাকে।

এক জায়গায় বলেছেন, "ভাইয়ের শেষ নেই। আমি তাকে খুঁজে ফিরি।"

আমার মনে হতো সে একটা ঘর, যেখানে আমি অন্ধকারে হাতড়ে চেয়ার, বই বা সুইচ খুঁজছি—মেঝের মানচিত্র না জেনে প্রতিদিন কেবল সেই ঘরে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। কবিতাটিও তেমনই ছিল। কবিতাকে ব্যবচ্ছেদ করাও এক অন্ধকার প্রক্রিয়া।

ক্যাটুলাসের কবিতাটিকে কি এখন ভিন্নভাবে দেখেন? ভাইয়ের শোকগাথা হিসেবে আপনার নিজের ভাইয়ের মৃত্যু এতে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে নিশ্চয়ই।

হ্যাঁ, এক আলাদা গাম্ভীর্য এসেছে। তবে আমি সবসময় এটিকে বিশ্বের সেরা সাহিত্যকর্মগুলোর একটি মনে করতাম, আজও করি। অনুবাদহীন অবস্থায় এটি তেমনই রয়ে গেছে।

'নক্স'-এ স্পষ্ট করে অনেক কিছুই বলা হয়নি, অথচ এটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও নিবিড় এক সৃষ্টি। একে সর্বসাধারণের সামনে আনার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

কারণ এটি হারিয়ে গিয়েছিল! সাত-আট বছর ধরে আমি একা একা মানুষদের বইটি দেখাতাম। তারপর হঠাৎ এক জার্মান আর্ট ও ফ্যাশন বুক প্রকাশকের সাথে দেখা হয়, যিনি বললেন—"আমি সম্মানজনকভাবে এটা প্রকাশ করতে পারি, চেষ্টা করে দেখব?" আমি রাজি হলাম। তিনি বইটা জার্মানি নিয়ে গিয়ে তিন বছর হারিয়ে ফেললেন! ইমেইলের উত্তর নেই, ফোন নম্বর নেই—আমার মনে হয়েছিল প্রিয় বস্তুটিকে হয়তো আর কখনো দেখতে পাব না। তারপর একদিন ফেডেক্সে পার্সেল এলো! তখন মনে হলো, এটাকে স্থায়ী করা দরকার। তখনই কারি বের করল কীভাবে বইটির হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করা যায়।

বাঁপাশের পৃষ্ঠায় লাতিন শব্দগুলোর ব্যাখ্যার সাথে প্রায় প্রতিটি শব্দেই 'নক্স' যুক্ত বাগ্‌ধারা যোগ করেছেন। কিন্তু বইয়ের মূল বিষয় 'ফ্রাটের' (ভাই) শব্দের সংজ্ঞায় 'নক্স' দিয়ে কোনো বাগধারা যোগ করেননি। এটা নিশ্চয়ই ইচ্ছাকৃত?

ওটাতে আমি বাড়তি কিছু যোগ করতে পারিনি। অন্যায় মনে হয়েছিল। সে মহান ছিল না, হতেও চায়নি। 'ফ্রাটের' শব্দটি তার জন্য একটি নিরপেক্ষ শব্দ।

আপনার বই 'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড' হলো পদ্যাংশের প্রথম উপন্যাস। এটিও প্রাচীন গ্রিক মিথ হেরাক্লিস ও দানব গেরিয়ন-এর গল্পকে ভিত্তি করে রচিত। সেই গল্পটি সম্পর্কে একটু বলবেন?

হেরাক্লিসকে হয়তো শনিবারের কার্টুন থেকে অনেকে চেনেন। যিনি ১২টি অসম্ভব কাজ করেছিলেন। আমেরিকানরা যাকে হারকিউলিস বলে। তার একটি কাজ ছিল গেরিয়ন নামের এক ডানাওয়ালা দানবের দ্বীপে গিয়ে তার লাল রঙের জাদুকরী গবাদিপশু ছিনিয়ে আনা। তিনি গিয়ে গেরিয়নকে হত্যা করে গোরুগুলো নিয়ে আসেন। আমি শুধু গল্পটা সামান্য বদলে দিয়েছি!

সামান্য?

সামান্যই বলা যায়!

পৌরাণিক গেরিয়নের ডানা ছিল, আপনার রূপায়নেও তা আছে। এই গল্পটির কোন দিকটি আপনাকে টেনেছিল?

তার দানবীয় সত্তা। আমরা সবাই কমবেশি নিজেদের দানব মনে করি! তাছাড়া গ্রিক কবি স্টেসিচোরাস-এর এই মিথ নিয়ে কিছু অসাধারণ খণ্ডাংশ আছে, যিনি খুব বেশি পঠিত নন। তিনি স্যাফোর মতো প্রেমের কবিতা লেখেননি, কিন্তু এই খণ্ডাংশগুলো খুব সুন্দর। নিজের আনন্দের জন্যই অনুবাদ করা শুরু করেছিলাম, কিন্তু মূল ভাষার মূল ভাবনা অনুবাদে ফুটিয়ে তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ি।

মানে?

গ্রিক ও ইংরেজি ভাষার পার্থক্যের কারণে প্রকাশের কিছু বাধা থাকে। তাছাড়া মিথটি পাঠকদের কাছে অপরিচিত হওয়ায় পটভূমি স্পষ্ট ছিল না। ডানাওয়ালা লাল দানব বললেই পাঠক চিনতে পারতেন না। ফলে অনেক ব্যাখ্যার দরকার হতো, যা আমি করতে চাইনি। তাই ভাবলাম অন্য কোনো মাধ্যমে চেষ্টা করা যাক। উপন্যাস কখনো লিখিনি, তো চেষ্টা করে দেখা যাক!

প্রথমে কি গদ্য উপন্যাস হিসেবে চেষ্টা করেছিলেন?

হ্যাঁ, নানাভাবে চেষ্টা করেছি। গদ্যের পর একদিন লাইনগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত পঙ্‌ক্তির এই জোড় মেলানো ছন্দটি পেলাম, যা বেশ কাজে দিল। তার আগের গদ্যের অনুচ্ছেদগুলো বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল! আমি সত্যি আর্থার হেলি-র মতো এয়ারপোর্টে বসে পড়ার মতো বিশাল উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম!

আর্থার হেলির উপন্যাস?

পুরুষালি কর্মকাণ্ডে ভরা বিশাল কিছু! বলা বাহুল্য, তা আমি পারিনি। তবে কবিতার রূপটি উদ্ধার হওয়ার পর সবকিছু সহজ হয়ে গেল।

'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড'-এ গেরিয়ন ও হেরাক্লিস আধুনিক যুগের প্রেমিক। প্রাচীন মিথে এমন কী পেয়েছিলেন যা এই ব্যাখ্যার অনুপ্রেরণা দিল?

একেবারেই কিছু না! প্রাচীন মিথে হেরাক্লিস গিয়ে গেরিয়নকে হত্যা করে, গল্প শেষ। তবে 'ইলিয়াড'-এর মতো অন্যান্য প্রাচীন উৎসে সমকামী কোমলতার উল্লেখ আছে। গল্পে এটি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আমি আগ্রহী ছিলাম । গেরিয়নের জীবনে একটু আনন্দের ছোঁয়া দিতে চেয়েছিলাম।

অসাধারণ একটি লাইন আছে: "তারা ছিল অ্যাকোয়ারিয়ামের তলদেশের দুটি সেরা ইল মাছ, যারা একে অপরকে 'ইটালিক্স' (বাঁকা হরফ)-এর মতো চিনতে পেরেছিল।" তাদের আকর্ষণের ধরনটা কেমন ছিল?

পারস্পরিক অদ্ভুততা । তাই হয়তো ইটালিক্স রূপকটি ব্যবহার করেছি। বাকি সবাই সাধারণ হরফ। এই দুজন বাঁকা হরফ হয়ে দেখা দিলে একে অপরকে চিনে ফেলে—মুহূর্তেই যেন বিদ্যুৎ চমকে ওঠে!

'দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড' বইয়ে আপনি ভালোবাসার আরেকটি রূপ দেখিয়েছেন। ২৯টি ট্যাঙ্গোতে লেখা একটি কাল্পনিক প্রবন্ধ। গল্পের স্ত্রী তাদের মিথস্ক্রিয়াকে আদর্শ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কোন অর্থে আদর্শ?

সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে। সৌন্দর্য একপ্রকার রোমান্টিক আদর্শ, যা নানাভাবে প্রকাশিত হয়। আপনি বাস্তব মানুষের চেয়ে আপনার কল্পনার মানুষকে বেশি কামনা করেন।

কারণ বাস্তব স্বামী "স্ত্রীর শরীরের চেয়ে বোরোডিনোর যুদ্ধ (Battle of Borodino) সম্পর্কে বেশি জানে!" লাইনটি চমৎকার!

তার সৌন্দর্য কিছুটা সেটার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল!

জটিল সম্পর্ক। স্বামী মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, কিন্তু লজ্জিত হয় না। সে বলে সে স্ত্রীকে ভালোবাসে, এমনকি তার যোগ্য হতে চায়। এটা তার জন্য কেমন ভালোবাসা?

তার দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো আদর্শ। কারণ সে নিজেকে সুন্দর কাজের কর্তা হিসেবে কল্পনা করে। তবে উপন্যাস বা স্ত্রী কেউই তার আসল মানসিকতা জানে কি না সন্দেহ।

স্ত্রী বহু বছর সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখে। তার জন্য এটা কেমন ভালোবাসা?

ব্যাকুল বা মরিয়া ভালোবাসা। ওই যে প্রথমবার ইটালিক্স হরফে অন্যজনকে চিনে ফেলার মুহূর্ত—যাকে ছাড়া আপনি নিজের বাঁকা সত্তাকে খুঁজে পান না, তাই যতদূর সম্ভব এটাকে টিকিয়ে রাখতে হয়।

যদিও এতে অন্যজনকে নিজের ওপর ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়।

এটাই তো ধাঁধা! কিন্তু যেহেতু এর মধ্যে একটা মরিয়া ভাব আছে, অন্য কোনো উপায়ও থাকে না।

স্ত্রী স্বীকার করছে যে স্বামীর সৌন্দর্যের জন্য তাকে ভালোবাসতে সে লজ্জিত নয়—কথাটা বেশ রিফ্রেশিং। অজানা কারণে আমরা সৌন্দর্যের ক্ষমতা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করি।

অদ্ভুত, তাই না? অথচ পুরো পশ্চিমা সংস্কৃতির একটা বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে এই ধারণা—সৌন্দর্যই ভালোবাসার জন্ম দেয়। মানুষ সুন্দর না হলেও আমরা নিজেদের বোঝাই যে সে সুন্দর!

প্রতিটি ট্যাঙ্গোর আগে আপনি কিটসের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, যিনি লিখেছিলেন—"সৌন্দর্যই সত্য, সত্যই সৌন্দর্য"। সৌন্দর্য কীভাবে সত্যের কথা বলে?

আমার মনে হয় না সৌন্দর্য সত্যের কথা বলে! ওটা একটা বড়ো ভুল ধারণা। তবে এটা বিশ্বাস করার মধ্যে এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। জীবনের অনেক সিদ্ধান্তে—বিশেষ করে কৈশোরের আবেগে—এই দুটোকে এক করে দেখা হয়: যে সুন্দর সে সত্য, সৌন্দর্য থেকে আসা অনুভূতি সত্যের দিকে নিয়ে যায়। তবে বাস্তবে তা কাজ করে বলে মনে হয় না।

অন্তত এই স্বামীর সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে তো নয়ই!

 একদমই না।

আত্মজীবনীমূলক কিছু ধরে নিতে চাই না, তবে 'দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড'-এ কি আপনার নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা আছে?

কিছুটা আছে। তবে সাহিত্যিক রূপ দিতে গিয়ে তা বেশ পরিমার্জিত ও সুন্দর করা হয়েছে।

আপনার প্রথম স্বামী কি আপনার খাতাগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন? ফেরত দিয়েছিলেন? সেটা জানতে ইচ্ছা করছে!

হ্যাঁ, নিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফেরতও দিয়েছিলেন!

কবি বা স্ত্রী মাঝে মাঝে 'আপনি' সম্বোধন করে গল্প বলেন। এই 'আপনি' কি নির্দিষ্ট কেউ?

নির্দিষ্ট কেউ নন। গীতি কবিতার সাধারণ 'আপনি'। ক্যাটুলাস এটি আবিষ্কার করেছিলেন। এই 'আপনি' বেনামি—কবিতা রূপ নেওয়ার সাথে সাথে তৈরি হওয়া এক কাল্পনিক শ্রোতা।

ক্যাটুলাস থেকে শুরু? গীতি কবিতায় তো এটা বেশ প্রচলিত।

তিনি প্রচুর ব্যবহার করেছেন। হয়তো স্যাফোর কাছ থেকে পেয়েছিলেন।

বইয়ের শেষের দিকে স্ত্রী তার সৌন্দর্যের আগের বিশুদ্ধ চিন্তার সাথে পরের অভিজ্ঞতার তুলনা করে। আগে সে না কামনা করে সৌন্দর্যকে চিনতে চাইত, এখন তার পরামর্শ—"ধরে রাখো, সৌন্দর্যকে ধরে রাখো।" তার কী পরিবর্তন হলো?

সৌন্দর্য নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। প্রয়োজন না থাকলে তা ধরে রাখা যায়।

যা 'কামনা না করার' সাথে যুক্ত।

হ্যাঁ, তীব্র মরিয়া ভাবটা বের করে দেওয়া।

যদিও না কামনা করার অর্থ কী, তা নিয়ে স্ত্রী ভাবে। একদিকে একে স্বাধীনতা ভাবা যায়, অন্যদিকে মনে হয় যেন হাল ছেড়ে দেওয়া।

এক ধরনের প্রাণহীনতা।

চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ।

অথবা পুরোপুরি নিজের ভেতরে গুটিয়ে যাওয়া। সে সেখানে পৌঁছাতে চায়নি, তবে শেষ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছাল কি না তা উন্মুক্তই থেকে যায়।

আপনার বই 'ডিক্রিয়েশন'-এ লিখেছেন যে আপনার প্রথম স্মৃতি হলো একটা স্বপ্ন। একটু বলবেন?

স্বপ্নের মধ্যে ঘুমানোর স্বপ্ন! স্বপ্নে দেখলাম আমি ঘুমিয়ে আছি, তারপর নিচে বসার ঘরে গেলাম। ঘরটা দিনের বেলার মতো হলেও কোথায় যেন অদ্ভুত এক পরিবর্তন ঘটে গেছে।

তখন আপনার বয়স কত ছিল?

তিন বছর।

আচ্ছা।

পরিবর্তনটা বোঝাতে পারব না। একটা ঘর একই থেকে কীভাবে বদলে যায়? কিন্তু পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি যেন এক পাগল হয়ে যাওয়া ঘরের কল্পনা করেছিলাম—যে ঘর ভেতরে ভেতরে বদলে গেছে। আমার বাবার ডিমেনশিয়া (ডিমান্সিয়া) হওয়ার পর যখন তিনি একই মানুষ থেকে ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি বদলে যান, তখন সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়েছিল।

ভীতিকর হলেও স্বপ্নে নাকি এক ধরনের সান্ত্বনা ছিল?

তবুও তো ওটা সেই চেনা ঘরই ছিল! বাবা পাগল হয়ে গেলেও তিনি তো বাবাই থাকেন, আপনি তার সাথে কথা বলে যেতে চান। চেনা জিনিসের মধ্যে এমন একটা দিক থাকে যা পরিধি যতই অদ্ভুত হোক না কেন, প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

"ফাদার্স ওল্ড ব্লু কার্ডিগান" কবিতায় লিখেছেন, "তার নিয়মগুলো ছিল রহস্য।" আপনার বাবা কেমন মানুষ ছিলেন?

খুব শান্ত স্বভাবের। নিজেকে নিয়ে বেশি ব্যাখ্যা দিতেন না। আমাদের কথা খুব কম হতো, তবে মানুষ হিসেবে তাকে খুব পছন্দ করতাম। আমাদের পছন্দ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা এক ছিল না, কিন্তু রসবোধ এক ছিল—আমরা একই ধরনের বোকা বোকা কৌতুক পছন্দ করতাম, যা মানুষের সাথে সুন্দর একটা বন্ধন তৈরি করে।

সেই কার্ডিগান (সোয়েটার) কি আপনাকে এখনো সান্ত্বনা দেয়?

হ্যাঁ, এখনো আছে। শীতকালে পরি। বাবাকে অনুকরণ করতে সবসময় ভালো লাগত। বিশেষ করে সোয়েটারটা খুব প্রিয়।

কীভাবে অনুকরণ করতেন?

একই ধরনের বুট জুতো পরা, তার মতো করে হাঁটার চেষ্টা করা, অথবা পুরুষালি ও গম্ভীর থাকা!

তিনি ব্যাংকার ছিলেন?

হ্যাঁ, অন্টারিওর বিভিন্ন শহরের ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন।

তাই পরিবারকে বারবার বাড়ি বদলাতে হতো?

হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার। ছয়-সাত বার হবে।

কষ্ট হতো?

বন্ধুদের ছেড়ে যেতে খারাপ লাগত। তবে আস্তে আস্তে মানুষের সাথে অতিরিক্ত মেলামেশা বা মায়া কাটানোর অভ্যাস হয়ে যায়—যা হয়তো ভালোই।

সত্যিই?

হ্যাঁ। যাইহোক, আমি সেটা শিখেছিলাম। সেটাই আমাকে মিসেস কাউয়ানের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, তাই ওটা ভালোই ছিল!

বাবার সাথে বেশি কথা হতো না বললেন, কিন্তু তিনি সংখ্যা পছন্দ করতেন?

ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন বলে সবসময় টিস্যু বা ন্যাপকিনে হিসাব করতেন। তাছাড়া যুদ্ধে তার বিমান ভূপাতিত হয়েছিল । প্রায় এক বছর বন্দিশিবিরে ছিলেন। খুব ভয়াবহ অভিজ্ঞতা না হলেও তিনি ভীষণ একঘেয়েমিতে ভুগেছিলেন। সাথে একটা হিসাববিজ্ঞানের বই ছিল, যার সব অঙ্ক তিনি বসে বসে কষেছিলেন! সেই থেকে ফাঁকা সময় পেলেই ন্যাপকিনে বীজগণিত কষার অভ্যাস হয়ে যায়। আমাদের ঘরের বা রেস্তোরাঁর সব ন্যাপকিন তার হাতের সংখ্যার লেখায় ভরা থাকত। আমি গণিতে কখনোই ভালো ছিলাম না!

তিনি ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলেন বলেই কি সংখ্যায় এত আগ্রহ ছিল?

তাই মনে হয়। ইঞ্জিনিয়ারদের গণিত লাগে। আর সংখ্যা ছিল তার এক ধরনের দক্ষতার জায়গা।

নীরব, পুরুষালি ভঙ্গিতে তার মতো হতে চাওয়াটা তো অস্কার ওয়াইল্ডের ঠিক বিপরীত!

অস্কার ও আমার বাবা হয়তো একে অপরকে ভিন্ন ভিন্ন দানব হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন! তবে হ্যাঁ, ধরনটা আলাদা। অস্কার ওয়াইল্ডের পর্বটা ছিল হয়তো বাবার মতো হওয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ! কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবসময় বাবার মতোই হতে চেয়েছি।

আপনার মায়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন মনে হয়?

হয়তো। আমরা একই ধরনের মানুষ ছিলাম না, তবে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। বাকিরা যেমন আস্তে আস্তে দূরে সরে গেল, আমরা কাছাকাছি এলাম।

ভাইয়ের উধাও হওয়া ও বাবার মৃত্যুর কথা বলছেন?

হ্যাঁ, মৃত্যুর আগে বাবার মানসিকভাবে হারিয়ে যাওয়া। বাধ্য হয়েই মায়ের সাথে অনেক "কোয়ালিটি টাইম" কাটাতে হয়েছিল।

মা কেমন মানুষ ছিলেন? 'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড'-এর মায়ের মতো নিশ্চয়ই নন?

হতাশ এক মানুষ। প্রচণ্ড বুদ্ধিমান—হাই স্কুলে লাতিনে মেডেল পেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও কাজ শুরু করতে হয়। বাবা মারা যাওয়ায় সংসারে আয়ের দরকার ছিল, তাই এক ইনসিওরেন্স এজেন্সিতে সেক্রেটারির চাকরি নেন। শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াটা তার সারা জীবনের আফসোস ছিল। আমি সেই পথ পেয়েছিলাম বলে আমাদের জীবন আলাদা ছিল। তিনি আমাকে শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু তার মধ্যে একটা একা লাগার ভাব ছিল—অন্যরকম জীবন পেলে তিনি কেমন হতেন, সেই ভাবনায় একা হয়ে যেতেন। আমাদের কথা বলার মতো খুব বেশি বিষয় ছিল না, তবে ধীরে ধীরে আমরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিয়েছিলাম।

তিনি কি আপনার বই পড়তেন?

প্রথম অধ্যায় পড়ে পাতা ভেঙে দরজার পাশের তাকে রেখে দিতেন! মানুষদের দেখাতে গর্ববোধ করতেন, কিন্তু পুরোটা কখনো পড়েছেন কি না সন্দেহ!

'ডিক্রিয়েশন'-এ মাকে 'জীবনের ভালোবাসা' বলা হয়েছে।

যে বছরগুলোতে বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন আর ভাই নিখোঁজ, তখন তিনি সত্যিই তা হয়ে উঠেছিলেন। একসঙ্গে এত সংগ্রাম করেছি যে তিনি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

আপনার মা ক্যাথলিক ছিলেন। আপনি অভ্যাসের বশেই গির্জায় যেতেন। এখনো যান?

না, পোপের বিষয়গুলো সহ্য হয় না!

কিন্তু আগে যেতেন?

যেতাম। মায়ের সাথে যেতে শান্তি পেতাম। ওটা আমাদের অভ্যাস ছিল, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। সান্ত্বনার জন্য বিশ্বাসী কারও পাশে থেকে সেই আচার ভাগ করে নেওয়াটাই কখনো কখনো যথেষ্ট।

তার কোটের গন্ধ নেওয়া!

একদম! কানাডার শীতকালের কারণে কি না জানি না, তবে... কোটটার কথা আজও মনে আছে। কৃত্রিম পশমের কোট ছিল, পুরোহিত একটানা বলে যাওয়ার সময় আমি মায়ের কোটে মুখ গুঁজে রাখতাম।

ছোটোবেলায় 'দ্য লাইভস অব দ্য সেন্টস' বইটি পেয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়াটা বেশ অদ্ভুত ছিল!

আমার ওটা খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করত! পৃষ্ঠাগুলো এত সুন্দর ছিল! বিশেষ কোনো মুদ্রণ ছিল নাকি রঙিন বই কম দেখতাম জানি না, তবে প্রতিটি সাধুর মাথায় মুকুট ও রঙিন পোশাক ছিল—একেবারে লজেন্সের মতো দেখতে! মুখে পুরে দিতে ইচ্ছা করত!

তারা যে 'সাধু' ছিলেন, বলেই কি খেতে ইচ্ছা করেছিল?

আলাদা কিছু নয়, বইটা হাতের কাছে ছিল বলেই ও রকম মনে হয়েছিল!

'মাই রিলিজিয়ন' কবিতায় লিখেছেন, "আমার ধর্মের কোনো অর্থ হয় না এবং তা আমাকে সাহায্যও করে না, তাই আমি একে অনুসরণ করি।" ঈশ্বর ভাবনা আপনার লেখায় বারবার আসে। এখনো কি সেই অনুসন্ধানে আছেন?

আগের মতো অতটা সরাসরি নয়। তখন ও রকম অনুসন্ধান নিয়ে একটা কোর্স পড়াতাম, বিভিন্ন রহস্যবাদীদের লেখায় আগ্রহ ছিল। বহু বছর কেটেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গভীর চিন্তার জায়গা হিসেবে একে খুঁজে পাইনি।

আপনার ঈশ্বর ভাবনা কেমন?

এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ভাবনা নেই। আগে হয়তো না—জানার অসীম এক ঐশ্বরিক পরিবেশের ধারণা ছিল, কিন্তু সেটাও এখন আর দৃঢ় নেই।

'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড'-এ এক চরিত্র নিজেকে সংশয়বাদী বললে গেরিয়ন জিজ্ঞেস করে, "তুমি ঈশ্বরকে সন্দেহ করো?" সে উত্তর দেয়, "বরং আমি ঈশ্বরকে বুদ্ধিমান মনে করি যে তিনি আমাকে সন্দেহ করেন!"

অস্কার ওয়াইল্ড মার্কা উত্তর! আমি ঈশ্বরকে সেই বুদ্ধিটুকু দিই! হালকা চটজলদি রসিকতার চেয়ে বেশি দূর হয়তো এগোতে পারব না, ওটা আমার সাধ্যের বাইরে!

আপনি বলেছিলেন 'মনোযোগ দেওয়া হলো প্রার্থনার এক রূপ'। নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে সীমানা পেরিয়ে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা যায়। এই শৃঙ্খলাটা কীভাবে কাজ করে?

কখন লিখেছিলাম বা কী অর্থে লিখেছিলাম মনে নেই, তবে ইদানীং জন কেজকে নিয়ে পড়ছি। তার একটা দিক খুব ভালো লাগে—তিনি নিজের ভেতরে নিথর নিস্তব্ধতা ও মনোযোগের জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলতেন, "কাজ শুরু করার আগে নিজের 'আমি'কে সরিয়ে রাখতে চাই।" নিজের 'আমি'কে সরিয়ে রাখাটাই আসল সংগ্রাম।

আপনার নিজের ক্ষেত্রেও? 'আমি'কে মুছে ফেলতে চান?

হ্যাঁ, চাই।

অথচ 'আমি' আপনার লেখার মাঝে চমৎকারভাবে উঁকি দেয়!

উঁকি দেওয়ার পর্যায়ে রাখা কঠিন, মাঝপথে তা পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে এবং যুক্তি বিচারের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। আমি অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে চাই, জীবন তো ছোট!

ধ্রুপদি সাহিত্য, বিশেষ করে গ্রিক ও লাতিন অনুবাদ কি আপনাকে সেই সুযোগ দেয় না? কারণ তা তো নিজের বাইরে নিয়ে যায়।

হ্যাঁ, তবে যেকোনো কিছুই দিতে পারে...পেন্সিলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও হতে পারে। মনটাকে ওই বস্তু বা প্রশ্নের ওপর স্থির করার বিষয় এটি। অনুবাদ অবশ্যই আদর্শ মাধ্যম কারণ এটি সারাদিনকে গ্রাস করে নেয়, তবে খুব ছোট ছোট জিনিস দিয়েও তা করা সম্ভব।

কীভাবে?

সাধারণ একটা পাথরের দিকে তাকিয়ে! মনোযোগ হলো আপনার মনকে কোথায় রাখছেন তার এক নির্বাচন।

পাথরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে ভুলে যাওয়া!

একদম তাই! চমৎকার বলেছেন!

'প্লেইনওয়াটার'-এ লিখেছেন, "একঘেয়েমি এড়াতে আমি যেকোনো কিছু করতে পারি। এটা সারাজীবনের কাজ।" জিতেছেন কি?

এখন পর্যন্ত জয়ী!

সহজে একঘেয়েমিতে ভোগেন?

সহজে ভোগী না, তবে একঘেয়েমিকে ভয় পাই।

কেন?

কারণ এটি মৃত্যুর ঠিক আগের অবস্থা!

অথচ অনেকে একে সৃজনশীলতার আগের উর্বর অবস্থা মনে করেন!

জন কেজ তা মনে করতেন। তিনি একঘেয়েমিকে ভালোবাসতেন। কিন্তু আমি অত উন্নত নই! আমি একে ভয় পাই।