পোলিশ প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা কাজিমিয়ের্জ মোচাস্কি ১৯৪৯ সালে ওয়ারশর মোকোতভ কারাগারে দুই নাজির সঙ্গে একই কক্ষে বন্দী ছিলেন। তাদের একজন ছিলেন এসএস জেনারেল ইয়ুর্গেন স্ট্রুপ। ১৯৪৩ সালে ওয়ারশ গেটো ধ্বংসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তার বাহিনীর হাতে ৫৬ হাজারের বেশি ইহুদি নিহত বা বন্দী হন।
মোচাস্কি ও স্ট্রুপ টানা ২৫৫ দিন একই কক্ষে ছিলেন। এই সময় মোচাস্কি স্ট্রুপের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেন, কীভাবে একজন মানুষ গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মোচাস্কি লেখেন ‘কনভারসেশনস উইথ অ্যান এক্সিকিউশনার’। ১৯৭৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। একই বছর এটি আন্দ্রেই ভাইদার পরিচালনায় মঞ্চনাটকেও রূপ পায়। প্রায় ৫০ বছর পর বইটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সেন্সরবিহীন ইংরেজি অনুবাদ যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন শন গ্যাসপার বাই।
প্রকাশক ক্লেয়ার বুলক প্রায় ১০ বছর আগে পোলিশ ভাষা শেখার সময় বইটির কথা জানতে পারেন। পরে ২০২৪ সালে ডাকওয়ার্থ বুকসে যোগ দেওয়ার পর তিনি বইটি প্রকাশের সুযোগ পান।
স্ট্রুপ ছিলেন একজন অনুতাপহীন ফ্যাসিস্ট। দাখাউয়ের মার্কিন সামরিক ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরে তাকে পোল্যান্ডে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ১৯৫২ সালে পোল্যান্ডে তাঁ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
অন্যদিকে মোচাস্কি ছিলেন পোলিশ হোম আর্মির সদস্য। স্ট্রুপকে হত্যার পরিকল্পনাতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু কারাগারে তাকেই স্ট্রুপের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতে হয়। মোচাস্কি জার্মান ভাষা জানতেন। তাই তিনি স্ট্রুপের কাছ থেকে যুদ্ধের নানা ঘটনা জানতে পারেন।
তৃতীয় বন্দী ছিলেন গুস্তাভ শিলকে। তিনি ছিলেন নিম্নপদস্থ এসএস কর্মকর্তা। নাৎসি মতাদর্শের প্রতি তার আনুগত্য ছিল সীমিত। তিনিও মোচাস্কির সঙ্গে মিলে স্ট্রুপকে যুদ্ধের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করতেন।
স্ট্রুপ নিজের অতীত সম্পর্কে প্রায় অবলীলায় কথা বলতেন। তিনি এসএসে তার উত্থান এবং ওয়ারশ গেটো ধ্বংসের ঘটনা বর্ণনা করেন। নিজের অপরাধের বিবরণ দিতেও তাকে খুব একটা দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়নি।
মোচাস্কি কারাগারে কোনো নোট নিতে পারেননি। স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই পরে বইটি লেখেন। তার মেয়ে এলজবিয়েতা মচাস্কির ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব তাকে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। মোচাস্কি বলতেন, তিনি স্ট্রুপের সঙ্গে কথোপকথনগুলো যেন টেপ রেকর্ডিংয়ের মতো মনে মনে আবার শুনতে পারতেন।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মোচাস্কি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন এবং স্ট্রুপের বক্তব্যের তথ্য যাচাই করেন। তার বইটি প্রথমে প্রকাশে বাধার মুখে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে কমিউনিস্ট সরকারের অনুমতিতে সেন্সর করা সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
মোচাস্কির মৃত্যুর পর বইটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশের উদ্যোগ আরও জোরালো হয়। তার মেয়ে এলজবিয়েতা প্রায় ৪০ বছর ধরে বইটির সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেন।
প্রকাশক ক্লেয়ার বুলকের মতে, ইয়ুর্গেন স্ট্রুপের মধ্যে হান্না আরেন্টের আলোচিত ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’-এর একটি বাস্তব রূপ দেখা যায়। নিজের কথার মধ্যেই স্ট্রুপ তার অপরাধ, বিশ্বাস ও মানসিকতার অনেক কিছু প্রকাশ করে ফেলেছিলেন।