তুষার দাশের কবিতা

ভাবা যাক আপাতত

পাখি-পাঠ শেষ হলে মানুষের অম্লান দুপাশ থেকে স্বয়ম্ভূ ডানার ঝিলিক দেখা যায়।

হয়তো মানুষও ছিলো কোনো এক বদ্ধ প্রাকারের পাশে কুণ্ঠিত সে অবগুণ্ঠনের নিচে
উড়ালসমান কোনো অক্ষত গরুড়,

তার হলুদ ডানার নিচে বহু শতাব্দীর যতো স্বপ্নছবি চিত্রিত রয়েছে
তাকেই কি নাম দেয়া হয়েছে সভ্যতা?

সভ্যতার স্বপ্ন দেখে বিপ্রতীপ খননেরই ফলে
আজ তার অলৌকিক অসম্ভব বিচ্ছুরিত স্বপ্নসমান অপ্সরাপ্রায় ডানা ঝরে গেছে?

বড়ো আলবাট্রস্ও তাই ডানার স্খলনে আর অনিত্যের বিস্মরণে
ক্রমাগত স্বপ্নহীন স্বপীড়নে অপমানবোধলুপ্ত ছোট কোনো পাখির চেয়েও আজ ছোট হয়ে গেছে?

বিন্দুর রূপকে তার প্রজাতিকে অনেকটা চেনা যেতে থাকে।

এখন পাখিরা সব ধর্মের কুটোর ভারে গড়ে নিতে চাইছে পৃথিবী—

মানুষের ধর্ম ভুলে অপ্রাপণীয়ের পথে তার যাত্রা বস্তুসম্ভোগের ক্রূর নিদানে থেমেছে।

নিজেকেই ছোট ছোট খুনে প্রতিদিন উল্লাসে রঞ্জিত করে নিজ ব্যূহ রচনা করেছে।

আর নিজের গৌরবগাথা অনপনেয় কালির অযথা সম্ভারে লিপিবদ্ধ করেছে দিনান্তে—

যা আসলে তমিস্রায় বিস্মরণে বোনা তার নিজ হত্যা-গল্প আর আত্মধ্বংস-গাথা।


খোলা হাওয়া

মাঝমাঠ থেকে মারা নিখুঁত শটের এক দক্ষ কারুকাজে গোল।
একদম ভুল-ত্রুটিহীন খুব বেশি স্বাভাবিক, ক্লিনিক্যাল।
আশ্চর্য আলোর মতো যাদের জীবন, অনাহত, ভীষণ নিখুঁত—
(বাবুই বা কাকাতুয়া, কথা-বলা-ময়নার একেবারে নয়)
তারা খুব নত হয়ে, অভ্যাসের কালো দাস হয়ে বাঁচে,
ক্রমাগত হীনতার সবটুকু সবক নিয়ে নিয়ে অভ্যস্ত হয়েছে।

তোমার মতেন তারা মোটেও জুয়াড়ি নয়, তুমি তুচ্ছ,
আরো বড়ো নাম আছে ধরে নাও, যেমন এক ফিওদর—
তাঁকে তুমি বেশ চেনো, মহা মহা বিপজ্জনক এক জুয়াড়ির নাম
যদিও পড়ো না তুমি উপন্যাস, গল্প-কবিতা
কেনোনা বই ও গান—পানাহারে তোমাদের উজ্জ্বল উদ্ধার।

শব্দের ভেতরে বসে আমি তো তোমার জন্যে মনে মনে হাসি—
তোমার প্রজ্ঞার ভারে মূর্ছা যায় রাজার গোলাপ—
জীবনাভিজ্ঞতা, মানুষের নানা সংকটের কথা ভেবে
তোমারও উদ্গার হয় নানা বিভীষিকা—

মৃদু গ্রাম্য লন্ঠনের আবছা আলোয় তোমার যে প্রাইমারি,
এরপর আধপেটা খেয়ে খেয়ে ঘষে যাওয়া জীবন তোমার,
এসব লুকিয়ে তুমি সম্পূর্ণ ভাগ্যের জোরে, নানা কিসিমের বহু বেলুন উড়িয়ে,
ফাই-ফরমাশ খেটে, হাত কচলে, নত-নিচু হয়ে এতটা এসেছ আজ।

বিস্তারিত গাঁদার বাগানে হাঁটো মহাতেজে সূর্যমুখি সর্বসুখি সেজে,
তার সব হকিকত আমি বুঝি, আমার নিজের মতো, সব ঠিক নয়—
গোলপোস্ট আমার গন্তব্য নয়, লাইটপোস্ট আছে, আরও আলো আছে।

কোনো কোনো অকুশলী মানুষের তবু থাকে ঝাঁ চকচকে এক ফুটবল—
হাতের তর্জনী আর সেই তর্জনীর নিপুণ কৌশলে ফুটবলের নানা খেলা চলতেই থাকে,
তাতে বহু কারুকাজ, যেন ভিন্ন নকশিকাঁথা, শিল্পের উত্তুঙ্গ আগুনশিখা এক।


আমরা

প্রতিভাবানের দল যা বলে বলুক, আমরা তো আধেক রবীন্দ্রনাথ,
বাদবাকি তাঁর পোষ্যপুত্রদের খেয়াল ও ইচ্ছের অবাধ ধ্বস্ত উত্তরাধিকার।
আমাদেরও খেয়ালি স্বভাব—বাঁশির উন্মুক্ত সুরে এখনও উদাস হয়ে উঠি...
গত শতাব্দীর প্রেমে বুকের ভেতরটুকু এখনও টনটন করে কিশোরের মতো—
আমরা সাধনাঘন স্তবের ভেতরে বসে অনবদ্য দিব্যকান্তি স্বপ্নমুখ দেখি।

আমরা ব্রজের কানাই হই ব্রজবুলি বিশারদ বিদ্যাপতি কবির ধরনে—
নানা অভিসারে আর প্রতারণাময় হয়ে নির্বিকার রাধা-প্রতিদ্বন্দ্বী কুঞ্জে
চন্দ্রাবলী-সোহাগের মহাপরিতৃপ্ত রাত্রিযাপন করে ফিরে আসি প্রেমিকার কাছে—
বলি, সর্বপ্রাপ্তি দর্শনের আনন্দিত বিশদ বয়ান।
চরিত্র আড়াল করে উচ্চহাস্যে ডুবে যাই এরপর ভিন্নতর কাষ্ঠ আহরণে।

আমরা আকাশনীল আলো দেখে দেখে কাটিয়েছি অজস্র প্রহর,
আমরাও ঘাস-গালিচার প্রেমে শুয়ে নুয়ে গেছি বহু বিকেলের পিঠে স্বপ্ন লিখে লিখে
আমাদের জীবনের প্রতি যত অবহেলা আজ দশগুণ জীবন-বিস্ফার হয়ে
কাকাতুয়া সেজে যেন হাতের তালুতে বসে উড়ালের আগে আগে
আমাকে শিখিয়ে দিচ্ছে ডানার উচ্ছ্বাস, বিভ্রমের প্রতিলিপি যত।


সেই ফ্রকপরা মেয়ে

চড়ুইভাতির থেকে ছুটে-আসা এলোমেলো ফ্রকপরা মেয়ে,
তোমার দুহাতে ঘ্রাণ মসলার, হলুদের চিহ্নলাগা গাল,
কোমল মুখের রোমে গনগনে আগুনের ভাপলাগা মধু ও লবণমেশা ঘাম,
এই ঘাম অতীন্দ্রিয়, মোহাবিষ্ট সৃজনের বিদ্যুৎবাহিত সামগান—
এই ঘর্ম এই এলোমেলো চুল মর্মের ভেতরে পশে আকুল করিয়া তোলে প্রাণ,
বৈষ্ণবের লিখে ওঠা গীতিকবিতার মতো চোরাস্রোতময় প্রেম আর বিরহের দাপুটে মোচড়ে
আজও আমি বালকের পিচ্ছিল মাটিতে পড়ে আহাজারি করার ধরনে অসহায়,
অভিসারে প্রতারিত রাধার বেদনা থেকে ফুল পেড়ে এনে ফ্রকপরা মেয়েটিকে দেই।

এভাবে আমার গল্পে ঢুকে পড়ে বহু শতাব্দীর অকম্পিত চন্দ্রাবলী, যেন সে হোয়াং হো,
চিরদুঃখদাত্রী এক, অথবা সে সুতানলি সাপ, বেহুলা ও লখিন্দর বাসরে ঢুকবে বলে
শতাব্দীর বহুদূরপার থেকে মুখিয়ে রয়েছে, লোলজিহ্বা বিষদন্তসহ ষড়যন্ত্রময়—
বিপন্ন বিষাদগ্রস্ত করবে বলে চির চেষ্টা,
অনন্ত উৎকণ্ঠা আর চিরঅভিমুখ তার!

চড়ুইভাতির থেকে উঠে আসা ফ্রকপরা মেয়েটিকে কোথাও দেখি না!

হয়তো এখন সেই মেয়েটিও জিন্স-শার্ট পরে, সারা দিন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকে বলে
ঘামের সঙ্গে তার আড়ি, বাড়াবাড়ি রকমে সতর্ক থাকে সারাক্ষণ পিতার শাসনে,
খালি পায়ে ঘাসে হাঁটা একদম বারণ, রোদ-পাঠ অসম্ভব!
বর্ষায় ততটা আর কর্দমাক্ত, এখন পিচ্ছিল নয় অভিসারিকার পথঘাট
কৃষ্ণাভিসার বলে কিছু নেই, নিয়ন আলোর ভারে জ্যোৎস্নাভিসার বড়ো ছিন্নভিন্ন,
শব্দটাকে নির্বাসনে দিতে হবে, রাধাপ্রেম তবে কি ফুরালো?

মুখের হলুদ আর রোমে রোমে ঘামমাখা ফ্রকপরা সেদিনের মেয়েটিকে কোথাও দেখি না।

তবে কি রাধার প্রেম, সুকৃষ্ণতমালবৃক্ষ, অভিসারহীন, স্থিরশীর্ণ শুধু নদীনাম হয়ে গেছে?


এই অচঞ্চল মৃত্যু

একদা তরুণ প্রেমিকের হঠাৎ মৃত্যু হলে
বেঁচে থাকা বেশ উঁচু ক্লাসে পড়া, চুলে পাকধরা বয়েসী সে প্রেমিকার মন
আসলে ধূসর হয়ে যায়? সন্ধিবিচ্ছেদের মতো খাতায় হারানো গুরুভার?
কিংবা কোনো অতিরিক্ত ক্লান্তি এক খোঁপাখোলা নির্জন মেঘের মতো
অনিচ্ছায় এলোমেলো মাথার ভেতরে ঢুকে যায়?

এসব জানি না আমি, বৈধতার কোনো সুতো নেই, লক্ষ্মীছাড়া একটি কাগজ,
তাও নেই, শুধু প্রেম, শুধুমাত্র চোরাটান, ক্ষুধার্ত স্রোতের ভিড়ে অবাধ সাঁতার—
সন্তর্পণে খুলে দেয়া শরীরের অফুরন্ত কামনার উদগ্র আহ্বান, যেন দামোদর,
খলবলে তিস্তার প্রেরণা, কর্ণফুলি মুচকি হেসে ডাকে—চোখবন্ধ প্রেমান্ধ রূপান্ধ যুবা
দীর্ঘ সাঁতারের স্বপ্নে তুমুল ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীবুকে, নদী তাকে গ্রাস করে প্রবল ক্ষুধায়।

বহুকাল নরমাংশ ভক্ষণের অনাহূত অধিকার-বঞ্চিত বাঘিনী যেন
রক্তে-দন্তে মাংশের উদগ্র বিস্ফারেই ভূকম্পন শুরু করে দেয়—
অনেক বছর ধরে প্রৌঢ়া বাঘিনীর সঙ্গে তরুণ বাঘের হিংস্রোন্মত্ত লুডুখেলা চলে।

এইসব স্মৃতিদের চিরকালব্যাপ্ত হারানোর এই অসহায় দৃশ্যে বাঘিনীর গাল বেয়ে
উষ্ণ নোনা জল নেমে আসে, সেখানেও লবণ রয়েছে—
রয়েছে রবীন্দ্রগীতি, মধুক্ষরা আরো চার কবি-সাধকের উপাসক বাসনা।

স্মৃতিলাবণ্যের ধারাপাতে একসময় বাঘিনীর শোকাশ্রু শমিত হয়
বয়েস কয়েক দিন আরো বেড়ে যায়!