জন্মদিনে

কামরুল হাসানের কবিতা

ইতিহাসে নিঃসঙ্গ

ইতিহাসের মোড়ে কখন হয়ে যাব স্ট্যাচু এক
প্রসিদ্ধ পেতল মূর্তির পাশে দাঁড়াব সংশয়হীন
পাথুরে শরীরে।

এখন হাওয়াও তাচ্ছিল্য মেখে যায়
মেঘ উড়ে যায় ফলবান মাথার ছাদে
ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নায় চাঁদের কার্পণ্য পাই টের,
এত যে ডাক দিই, তবু নারী ঘুরিয়ে নেয় মুখ
নিঃসঙ্গতায় শতব্যঙ্গে ঢালে উপেক্ষার কৌতুক।

এ শরীর ছুঁয়ে গেলে জাতচ্যুত হবি রে বাতাস
ও মেঘ আসিস না ছায়াজল নিয়ে
আমাকে ঘেরাও করে বনভূমি হারাবে নোলক
এ চোখে রাখলে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে হে প্রিয়া।

এ লোকালয়, নিসর্গকোল, ছায়া ঠোঁটে না দিয়ে আশ্রয়
ঐ দেখ ইতিহাসের চৌরাস্তায় একাকী স্ট্যাচুর মতো
সবাই আমায় কেমন দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

নিমগ্নে তাঁর বেজেছিল আদিভাতি

হে আয়তবান ধরো নম্রের দ্বিধা
হৃদয়পদ্মে নৈঋতজ্বলা অমা
অনন্ত গ্রাস লাফিয়ে নেমেছে তীর
নির্বিকল্পে গেঁথে ফেল ভোর-গাথা।

আধিভৌতিক পূর্ণিমা জ্বলে দেহে
আত্মিক বাঁশি ভূমিতে তপ্ত দাহ
উত্থানও আজ বজ্রবাহিত কলা
চিরে নেয় নীল রাহু কেতকীর ডানা।

নিমগ্নে তাঁর বেজেছিল আদিভাতি
চারিভিতে ছায়া দ্বৈতাদ্বৈত ভুলে
শস্যের শিরে বিধূর অণিমা শোক
গত নিশীথের চন্দ্রউদিত দিশা।

শিরোনামহীন

মানবহ্রেষায় ক্ষয় ক্ষুর যায় চিরে
বিকীর্ণ রথ নীলাভ্রে তাঁর নিয়ন টাঙানো পথে
মায়াদর্পণে আত্মাকে বাঁধে তীব্রে
মুখের পার্শ্বে ছায়াতরুজল, দেবকী আকাশ উঁকি।

জুঁইভোর ডোরে পরাভূত বিষকলা
চোখের হ্রদে অমলিন বন, হাসি ফেলা তাঁর ছায়া
শূন্যের সাঁকো শূন্যে উড়াল, পথাবকাশে ভীড়।

তমোপ্রবাহের তরল রচিত যানে
বুঝিবা বিদ্যুৎ হেনে গেল তাঁর তীর
উচ্ছ্রিতধারা পুণ্যবাহিত জলে।

অপরূপে কুয়াশা ধূসর, ধুলোর পালঙ্কে রাধা
ঘূর্ণিজলের লুপ্ত পাথরে স্বপ্ন-খচিত ধাঁধা।

পাথরের গ্রাম

যেন যাদুমন্ত্রে ঘুমিয়ে পড়েছে গ্রাম,
কোন স্পর্শে জেগে ওঠ প্রাণ?
পাথরের নিঃশব্দ উড়াল, পাথরের শব ভাবে গানে
ঘূর্ণিপত্র বেজে যায় অহর্নিশ নেয়ে ওঠে ঘাসে,
বাসন ভেঙেছে যেন চতুর্পাশ কাঠামো ঘড়ির।

প্রেক্ষিতে পালাল কেউ, বুঝি তার পায়ের ভূগোল
হাওয়া দীর্ঘ চাদরে বুনে নেয়, শববাহী গান
পাহাড়ের মুখখানি নিচু, জলে ভাসে ধবল সপ্রাণ
প্রতিটি দরজা থির, পর্দায় পাথুরে সংলাপ।

পাহাড়ের মুখখানি নিচু, চতুর্পাশ দাঁড়াল কপাট
প্রেক্ষিতে পালাল কেউ, ঘরদোর নিভন্ত, জমাট।

আলো ও ঈশ্বরের দৌড়

অন্তহীন মহাজাগতিক ব্যাস ঈশ্বরের ছায়া বিস্তারের হাত ধরে যাচ্ছে মানে আলোর দৌড়, পরিব্যপ্ত চতুর্বিস্তার। চতুর্বিস্তার বলা মিতভাষণ, ৩৬০ ডিগ্রির প্রতিটি উলম্ফ বেয়েই একগুচ্ছ তীর মহাজাগতিক পরিধির দিকে সন্তরণমান, বস্তুত পরিধিবিহীন, ওরাই আলোহাঁস তীক্ষ্ণ শিঙঅলা মায়াবী হরিণ, ক্ষীপ্র ঝাঁপে নির্মাণ করেছে পরিধি; আর জলও নেই যে সাঁতার সম্ভব, বিস্তৃতির মধ্যে আপন সাঁতারের জল তৈরি হচ্ছে, দৌড়াবার সবুজ পাতাময় মাঠ; মানে শয়তান ও ঈশ্বরের পারস্পরিক ঈর্ষার জায়গা। ক্রমশুদ্ধশীল ফেরেশতাদের আলখাল্লা শুদ্ধতার অপার অহংকারে স্ফীতমান আর বেহেশতের হুরদের লীলাস্রস্ত পোশাক-আশাক মহাজাগতিক জলে ভাসছে। বিস্ময়কর সে দৌড় এখনো থামেনি, কখন থামবে বলা অসম্ভব, কারণ থামলেই ঘড়ি অচল। বালুকণারও তুচ্ছ এই পৃথিবীর ভেতরে আমরা যে প্রতিশ্রুতিপূর্ণ অথচ অসভ্য সভ্যতা গড়ে তুলেছি তাও অচল। তবে আমাদের আত্মহননের উন্মাদনাও চাপা পড়ে যাবে। তখন কে খাবে ঐ আণবিক নৈশখাদ্য?