প্রিয় দশ

তুমি

তোমার তীক্ষ্ণতাও এখন ভোঁতা লাগে খুব।
প্রতিদিন সকালের দিকে তুমি বসে যাও নিজস্ব জাজমেন্ট
সভা কর নিজেকে কেন্দ্রে রেখে। তুমি দেখ পরিপার্শ্ব গলে যাচ্ছে
তুবড়ে যাচ্ছে বড় বড় মেটাল সংসার

তুমি দেখ উড়ে যাচ্ছে খড়ের মতন সব বাড়িঘর... চাকচিক্য দেখে দেখে দেখে
তারপর নতুন বিবর্ণতা জন্ম নিচ্ছে।

তীক্ষ্ণ চোখে এইসব দেখ আর ক্রমশ তীক্ষ্ণতা পুড়ে যায়
চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
ক্রমশ তোমার এই চালাক বোদ্ধা অবয়ব

জলের মতন গলে বোকা হচ্ছে, বোকা হচ্ছে, তুমি
হদ্দবোকার মতো পরিপার্শ্বের মধ্যে আরো একটা ভাঙাবাড়ি হয়ে
ভাঙা ও দুমড়োন খেলনা গাড়ি হয়ে গড়িয়ে পড়েছ


কথার কঙ্কাল

কবি না কি দ্রষ্টা কোনো। এ মুহূর্তে তারই বিনির্মাণ
ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া ছেঁড়া সব পতাকা ও খেলনার ভেতর
ক্রমশ দেখেছ... আর দেখা, সেও ছিঁড়ে গেছে ক্রমে।

তারপর পতপত হাওয়ায় উড়েছে শুধু টুকরো বেঁচে থাকা।

আশ্বিনের রোদের মতন ঘুরে গেছে তার নিজস্ব সে উজ্জ্বলতাখানি
হঠাৎ বিকেল-মুখে মরে যাওয়া সেইসব মেধার ধাঁধালো বাতায়ন

রোজ এত কথা বলো, এত এত কথা বলো, কথা থেকে ঝুরঝুর ঝরে পড়ছে
কবি-অবয়ব।


মন

মনে ছিল বাক্যবন্ধ। প্রায় যেন মোক্ষলাভ, মন্ত্রোপম সত্যের বচনে
পক্ষিবিশারদ ডেকে কবির পালক খুঁটে সত্যাসত্য বিচার করেছ।

তারপর এসেছে সে মিথ্যাসত্য উত্তীর্ণতা। কোথায় কখন
ডেকে নিয়ে গেছে সব সততাসামলানো
কথাগুলি...।

কথায় কথায় গেল দিন।
এখন বাতাস থেকে ধার চলে যায়
এখন কথার থেকে কথা চলে যায়
এখন বুদ্ধির থেকে তীক্ষ্ণতা হারায়
এখন লজ্জার থেকে সরে যায় পাতলা সরখানি...

কী উলঙ্গ কী অসহ্য কী নীরব কথার কঙ্কাল পড়ে আছে


অবাস্তব

বেঁটে বেঁটে ক্রোধ থেকে খুঁটে তুলে নিচ্ছি মনোযোগ
একমাত্র ক্রোধেই আজ কিছুমাত্র জ্যান্ত বোধ করি
আর আছে ভয়, আমি ভয়ের সাবানে কাচছি ভয়ের বসন
মুহূর্তের হ্যাঁচকা টানে সে কাপড় খুলে আসছে …হেসে উঠছে লোক
অসাড়ে পেচ্ছাপ করে যে-রকম শয্যাশায়ী রোগী
মুক্তকচ্ছ, বইয়ে দিচ্ছি সেরকম ইয়ার্কি ফাজলামি

খেটেখুটে মন থেকে তুলে নিচ্ছি মায়া ও মোহকে
তিক্ততা, আমারই শুধু? অবাস্তব তবুও সকলি?
হাস্য ও উল্লাস দেখলে মনে হয় সমস্ত সুন্দর
শান্তিকল্যাণ সব… তারপরেই আচমকা হিংসায়
হঠাৎ হাতে ও পায়ে বয়ে যায় ক্ষণ-প্রতিশোধ
টেনে চড় মারে গালে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর

এভাবে বিচার হবে? এভাবে প্রতিষ্ঠা হবে ন্যায়?
হাসিখেলাহাইতোলা মারাত্মক রেগে ওঠা প্রায়ই
মাঝে মাঝে হাত চলবে, মাঝে মাঝে মুখ চলবে, দ্রুত
পঙ্কিল প্রবাহে নাইব, নরকে বিছানা পাতব, ...যতদূর যাই

আমরাই রচনা করছি আমাদের বীভৎস বাস্তব
আমরাই খুলে নিচ্ছি… হাড়গোড়, কলকবজা, বাস্তবের, সব...


যা তুমি পারছ না

উল্লসিত পৃথিবীর গল্প বলো আজ
বলো সব ঠিকঠাক আছে।
সেইদিন ছিল না। হ্যাঁ ত। সেইদিন পৃথিবী মলিন
হয়েছিল। ক্ষোভে তাপে সেইদিন কেঁপে উঠেছিলে

আমাকেও গল্প বলে কাঁপিয়েছ তুমি
আমাকেও জাগিয়েছ জাগরণে, আহা!
আমাকেও সংগ্রামে নামিয়েছ, আমিও নগরকেন্দ্রে, ভিড়ে
উত্তাল পুঞ্জের মধ্যে ঢেউ হয়ে মিশেছি ত নবকলরোলে

কোলাহল নিয়ে তুমি যত খুশি কথা বলতে পার
ঠিকঠাক নিয়ে, আর শান্তিকল্যাণ নিয়ে বলো
কতটা ব্যাপক সব, আরে ঠারে তাও ত সমঝাও
বোঝাও, বোঝাও বসে, অথবা নীরব থাক খুবই…

যে আমাকে কাব্য দিয়ে একদিন প্রেরিত করেছ
সে আমাকে কাব্য দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে ত পারছ না!


রাগ

ম্যাদামারা আলো উঠছিল। তারপর
স্প্রে পেন্টিং-এর মতো বৃষ্টি আসে, মুখেচোখে পুরু
পাতলা কুয়াশা।
জানালা খোলাই রাখি, বালিশ আর চোখ
জলে ভরে যায়।
এরকম ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গলাব্যথা করে,
মধু জমা হয় মনের ভেতর,
টনটন করে ওঠে গর্তগুলো, ইরর‍্যাশনাল।
তারপর স্থগিত করি সব
বেরোনোর জরুরি ছুতো। আঃ!
চাবি তুলে নিই আর চুন্নি তুলে নিই।
ব্যাগ হাঁকড়ে টেনে নিই পড়পড়। দেওয়ালের হুক
চড়চড় করে ওঠে। কেঁপে ওঠে সুস্থির দেওয়াল।
ভোরবেলা চলে গেলে বৃষ্টি হেরে যাবে। বেলাবেলি ওঠা
রোদের রাগের কাছে। এরকমই যুক্তিবাদী দিনে
ফিকে হয়ে যাবে সকালের মধু।
পরের দিকের স্ক্রিপ্ট শুধু অবশেষ তুলে আনে, টক, তেতো।


সকাল

সকাল আবার তাকে নিভিয়ে দেওয়ার শিল্প শেখাবে।
সকাল আবার তাকে ঢেলে ফেলবে অন্য আকারের কোনো পাত্রে।
আমাকে সকাল তুমি চোরা চাউনি দেখিয়েছ, সারাদিন
কীভাবে কীভাবে কাটবে, চাপা ছন্দে বুঝিয়েছ, হলপ করে বলেছ
এত কাজ তত কাজ, কত কাজ করেছি আমি তো,
তবু কেন নেই আমার নীড়ের বৃন্তে ছোট ছোট আশা আর জাঁহাবাজ স্বপ্ন আর
সে গৌরব

যা আমাকে ছোটাবে, ছোটাবে মুখে বুলি আর গান সব ফোটাবে ফোটাবে, এত
আলোহীন
কেন হয়ে গেল সব, কেন আমি আড়ে চলি লঘুচালে কেন আমি কথা বলি অথচ
ভেতরে

কোনো আশা নেই, মুখ ঢাকা বন্ধতা অন্ধতা দিয়ে, ক্লান্ত পায়ে
হেঁটে চলছি বনভূমি, কেন তুমি কেন তুমি তাকালে না আমার ভেতরদিকে কেন
হায়

যেভাবে সকাল তার সমস্তটা দিয়ে যায়।


ভয় বিষয়ক


তোমাকে ভয়ের ঢোক দিই।
ভয়ের গেলাসে ঢেলে, ভয়ের পানীয়, তুমি নিও।
আমার যে ভয়, তার তরলতা নেই, সে ত স্থির।
শিরদাঁড়া ক্ষয় করে দিয়েছে সে, সশঙ্ক, স্থবির।

তোমাকে তরল ভয় দেব।
এক খাবলা সন্দেহ, এক খাবলা ঘৃণা গুলে, এই সব দেহ
মৃত দেহ... তারও তো নির্যাস

ভয়ের ভেতরে আছে মৃত্যুর পূর্ববর্তী ত্রাস।

গলা চেপে আসে আর শ্বাসরোধী কথা মনে পড়ে।
মনে পড়ে জলতলে মাথা গুঁজে শেষ হওয়া দিন।
মনে পড়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মাথাখোঁড়া, অন্যদিকে স্বপ্নে উড্ডীন।


ভয় এক সবুজ তরল
বুদবুদে উঠে আসে বায়ু
বায়ুতে ফিসফিস লেখা আছে
দীর্ঘ নয় গুজবের আয়ু

ভয় এক বাদামি এঁটেল
নাসারন্ধ্রে ঢুকে করে হিম
ভয় এক জ্যান্ত গোর দেওয়া
ভয় এক কাফন, আদিম

এই তুমি বাক্সবন্দি হলে
এই তুমি হাত পা নাড়ছ না
এই তুমি চুপ করে থাকো
বন্ধ কথা বন্ধ আলোচনা

ভয় এক বধ্যভূমি আজ
ভয় এক নীরব মাদক
ভয় এক শতরঞ্জিময়
পেরেকের অসাধ্যসাধক

শুধু ভয় কেটে যাবে যেই
পালক পোড়ার তোয়াক্কায়
না থেমে না ভ্রূক্ষেপ করে
পাখি যেই আগুনে ঝাঁপায়


ভয়বিনোদন

ভয়বিনোদন রাস্তা জুড়ে
রাক্ষসের গুহা বানালাম
টিকিট কেটে ভেতরে যাবে শিশুরা
অন্ধকারে হাত বাড়াবে কঙ্কাল।
ক্যাঁক করে ক্যাঁকালে পুরে নেবে তোমাকে...
হজম করবে নিজস্ব সবুজ তরলে

ভয়বিনোদন বাজার জুড়ে
সবাইকে ধমকচমকে রাখি
সবাইকে রাখি আমূল বিভ্রমে
না হলে ভয় বিক্রি করি কীভাবে
কীভাবে বা করি এই ভয়ের দোকানদারি!!!

কত ভয় বিক্রি হয় এই ভাবে
কত ভয় আনন্দের উৎসাহে আমরা ভোজন করি
পরিপাক করি।
শিরদাঁড়া পরিপাক করার এই ব্যবসাটা
সবচেয়ে রমরমিয়ে চলে

আমাদের চামড়া টান
ঢাকে কাঠি চড়াম চড়াম
ভয়বিনোদন পার্কে চড়ে বেড়ায় ডাইনোকাকুরা

আপনাকে টিকিটমূল্যের বিনিময়ে স্বাগত!


চাঁদ


প্রতীকী গুরুত্ব নিয়ে উঠে এলো চাঁদ।
প্রতিদিন বেঁধেছিলে বাঁধ।

আলো জ্বাললে ক্যানেস্তারা থেকে ঢেলে
কেরোসিন সরু নলে নিঃস্ব হারিকেনে

ঝড় উঠেছিল বলে পতঙ্গ আগুন ভালো চেনে।


মনোদোষ চিরে চিরে তুমি দেখ আনন্দের ডাক
রক্তে ক্লোরোফিল ঢালবে কোন পথে, খামটি সডাক

নষ্ট কুতূহল ছিঁড়ে খুঁজে নাও অসম্ভব চারিত্র‍্যদোষেরও
ইতিহাস। সমর্পণ। কোনোদিন গরু ও মোষেরও
আধার তৈরি হলে খুঁজে নেবে অঙ্গুঠাছাপ
দীনহীন লোকেদের পক্ষে কিন্তু সত্য বলা পাপ।৩
প্রীত রোদ এসে পড়ে সবুজ রাস্তার বাঁকে বাঁকে
এই খানে সন্ধ্যাকালে চাঁদ ওঠে, ভুল স্বপ্ন ডাকে

তোমাকে সুন্দর বলতে বলা হয়নি, ওহে কবি, কর গুনে গুনে
সত্যের হৃদয়ে ঢোকো, পিন নিয়ে, ফোটাবে বেলুনে

...

যশোধরা রায়চৌধুরীর জন্ম ১৯৬৫ সালে, কলকাতায়। দর্শনে স্নাতকোত্তর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখেন। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, বাংলা অকাদেমির অনিতা-সুনীলকুমার বসু পুরস্কার।
কবিতার বই ১৪টি, গল্পগ্রন্থ ৪টি, নভেলা ১টি। ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’।