প্রিয় দশ

সৈনিকের ডায়েরি

যুদ্ধ আমাদের কী শেখালো? প্রতিদিন জীবন থেকে পিছিয়ে আসা? যেভাবে মার্চপাস্ট আর ব্যারাকের জীবনে সমকাম আসে? যেভাবে সীমান্ত নামের শূন্যতায় কেউ ঈশ্বরের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে থাকে আর উন্মাদগ্রস্ত গুলি ছুটিয়ে দেয় যে কারো দিকে?

একটু একটু করে বরফের নিচে রাত নেমে আসে, এমন আঁধারে পরস্পরকে চেনা যায় না, চিনতে চায়ও না, মর্ষকাম আর রুটি যেখানে সমার্থক সেখানে কি কেউ কারো বন্ধু হতে পারে?

মুছে দেওয়া যেতে পারে কাল্পনিক রেখা, ভিজে শ্লেটে যেমন হালকা চক লেগে থাকে কিছুতেই আমরা ভুলতে পারি না সীমান্ত নামে অশ্লীল শব্দটিকে, কে জানে ওপারেও কেউ শ্লেট মুছছে কি না!

মেয়েরা এখানে টাটকা রুটির মতো, সিনেমায় যেমন দেখি প্রেম আর বারুদ যেন পাশাপাশি—এখানে অপর্যাপ্ত রেশন, গ্রীষ্মের কঠিন বরফে হস্তমৈথুনেও সুখ নেই। হাতের তালুতে দাঁড়িয়ে পিঁপড়ে যেমন আদিগন্ত মাঠ দেখে আমরা বরফের মধ্যে দেশ খুঁজি, বদলে ইয়েতির মতো ভূতেরা আসে, শহরে ফেরার পর আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়


হাতিয়ার

চীনারা অনেক আগেই বারুদের ব্যবহার জানতো, অথচ ইউরোপিয়রা বন্দুক আবিষ্কার করল তেরো শতকে, ব্যক্তিকে বিদ্ধ করার আগেই সমষ্টি উড়ে গেছে কামান মুখে, রাইফেল মেশিনগান পিস্তল বা সিভিলিয়নের শর্টগান আসলে কোনো কাজেই লাগেনি মানুষের! দারু ব্রহ্মের মতো শূন্য যাত্রাপথে যে খেলায় মেতেছে আদিম, ধ্বংস রুখবে বলে তুমি হয়ে ওঠো ম্যাচলক, বড় ম্যাচের শেষে শ্রান্ত আর ধ্বস্ত ঘোড়া যেভাবে জকির পিঠে ঝিমোয়, বেয়াদব অশ্বীর গা ঘেঁষে চেটে নেয় যৌনাঙ্গ, ফাটা দেওয়ালের মাঝে সমাধি ফলকের চোর তুলে নেয় স্মৃতি, তাকে রুখবে কি করে কালাশনিকভ, তোমার জন্মেই তো হত্যার পাপ লেগে আছে!


চৌরপঞ্চাশিকা

এই বেগবান অশ্ব পথ রুদ্ধ করেছে, বদ্ধ প্রাকারের শীর্ষে তাতার প্রহরিনী, আর কাটা জীব আবিসিনিয়ান তার ব্যর্থ কামনার যে কপাট তোলে, তুমি সে খিল অগ্রাহ্য করা চন্দ্রলেখা, গুপ্ত সিঁড়ির কোণে খঞ্জরের খাপে ভেসে যাচ্ছে নিম ফুলের মৌতাত, বিরাম কক্ষের রূপটানের নিচে গলে যাচ্ছে যে অশ্রু, নিখাদ বলে তাকে নমনীয় ভেবো না। তীব্র প্রণয়ে শুধু অপেক্ষা নেই, প্রত্যাখ্যানও আছে।

চোরের চোখ এত সুন্দর! পাকা গম খেতে ঢেউ তোলা শিষ যেন! চোরের পশম বোনা তামাটে বুকে বঙ্গ সাগরের ঘ্রাণ। তাঁর ফেটে পড়া জামের কোয়ায় যে উষ্ণ দশন ক্ষত তুমি কী তার ক্ষতিপূরণ দেবে? এ কী হেঁশেল ঠেলা অম্লমধুর ভ্রাতা ভগিনীর ন্যায় পাশ ফিরে ঘুম! এই বালিশে তার সাপের গা পিছলানো চুলরাশি, ওই শুভ্র চাদরে তার তাম্বুলের রক্তছাপ, এই কদলী জঙ্ঘায় তার অজাগর পেষণ চিহ্ন।

যতোই তুমি কলঙ্ক বল, আমি একেই বলি সুন্দর!


রবিঠাকুর

আহা, দেখো শান্ত পথ বৃক্ষসারী তপন কিরণ মাধুরী সম নিজেকে উজাড় করে ক্লান্ত, যেন বহু প্রসবিনীর নিরক্ত-পত্রগুচ্ছে লাল পুচ্ছ বুলবুল তার ডিমের মায়ায় ঠুকরে খেয়েছে জীবন্ত শরীর, যেন তুমি ভুলে গেছিলে চিতায় ওঠা উপদ্রুত স্কুল বাড়ি, যেন সেখানে পুলিশ ব্যারাক বসেনি কখনো, যেন গ্রাম মানে পরিষেবাহীন শান্তি

জঙ্গল মানে গেরিলা আখড়া, যেন অধিকারের অরণ্যে পশুর কোন স্থান নেই—শুধু রক্ত-পলাশের মতো উছলে ওঠা নলির ফাঁকে বিরুদ্ধের দিকে তুলেছ অন্তিম নির্দেশ, অবহেলায় পড়ে থেকেছে মৃৎ-পুতুলের মতো লাশ আর তুমি ধৃতরাষ্ট্র, নির্বিকার তারই পাশে পাশে সাইকেল চালিয়ে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছো! পেঁয়াজের রসে লেখা প্রেমপত্র এসব দৃশ্য তোমার চোখে পড়েনি! এই রাষ্ট্র নামে যুক্তির অতীত ভাবাবেগে আমি তোমাকে চিনেছি, পুরুষ-সঙ্গহীন আমার লুব্ধ মুখের উপর নেমে এসেছে তোমার আশা ও হাহাকার, জলপাই রঙের ত্বক যেন উছলে উঠে বলে গেছে এসব এই সভ্যতার সংকটে প্রতিরোধ ছাড়া পন্থা নেই, নিন্দা ছাড়া অস্ত্র নেই, প্রাণ বিসর্জনে মহত্ত্ব নেই তেমন! স্বাধীন দেশ হলেও প্রকৃত স্বাধীনতা থাকে না কখনো কখনো

এই জল স্থল উচ্চারিত শ্রাবণ ধারা জলে তুমি ডেকেছিলে, আর ঘুমন্ত শিশুর মুখে জাগরণ চিহ্ন না দেখে যেন থমকে ছিলে, নির্বাণ শঙ্কায় কাঁকর বীথিতলে শাল রেণুসহ তোমারই পদচিহ্ন ঝরে গেছে, যেন কুড়িয়ে নেওয়ার আগে তোমায় ছায়া শরীর গাঢ় আলখাল্লায় মিশে গেছে আমের বনে বনে, ওই মুকুলিত কদম্ব কানন কুঞ্জে


ধর্ম

ওই আজান মিশে যাচ্ছে দুর্গা মন্দিরের চূড়ায়,
গোবরে চোনায় রক্তজবার থেঁতলানো স্রোতে
ভেসে যাচ্ছে সমস্ত মঙ্গল আরতি ঘণ্টা,
মিশে যাচ্ছে চাঁদোয়া, মাজার, সন্ধ্যার আগরবাতি,
চেরাগ জ্বালিয়ে তুমি ভুলে যাচ্ছ তুলসির মূলে,
তুমি মঠ, না মণ্ডপ, না গোরস্তান, না সিন্নির শনি পূজায়?
তোমার হিজাব সরে গিয়ে উঁকি মারছে ঘোমটার ভয়,
সুরমার আয়ত হরিণী বিঁধে গেছে কলাপাতার কাজলে,
গায়ে হলুদের প্রজাপতি উড়ে বসছে বাঁশবনে,
খুঁজছে বধূ মাতা, যে কি না বেনারসি পরে বিয়ে বসে,
খুঁজছে ভর্তা গোস্ত আর পানি, যাকে জল বলেও ডাকা হয়!
আমি ফুল না হয়ে, ভক্ত না হয়ে কিছুতেই ফিরব না ঘরে,
আমি জপের মালার নিচে লুকিয়ে রাখবো আমার সমস্ত ধর্মভয়।


ডুয়ার্স সীমান্তে

অরণ্যের আছে ছবি
দেখে যাহা লেখে কবি
সবুজে সবুজ দিশাহারা
বহিরঙ্গে পোড়া ছাই
উড়াইয়া দেখো তাই
অন্তরে পড়ে আছে যারা
কাহাকে শোনাবে গান?
বুলেটে রঙিল প্রাণ
হৃদি জোড়া বসন্তের শব
মিডিয়া তরঙ্গ ধূপ
ধাঁধা লাগে এত রূপ
বেশরম কেন কলরব?
তোমাকে বধিবে যারা
সীমান্তে বাড়ে তারা
ফেরেশতা বাঁচালে বাঁচে জান
তুমি তার ওষ্ঠতলে
ছলে-বলে-কৌশলে
কেন চাও রুহের জবান?
জলেতে কুম্ভীর খায়
ডাঙ্গা তলে বাঘা রায়
বেওকুফ তুমি কোন দল?
যাহাদের রং আছে
বাঁচে বাঁচে তারা বাঁচে
বাকি যারা কপাল সম্বল


বসন্ত

বসন্তের কথা থাক
বরং আলু পটলের কথা হোক
সেনন্সেক্সের ওঠানামায়
শীঘ্রপতনের কথা হোক
ব্যক্তিগত বসন্ত দিনে
যে সব বাদাম পড়েছে রণে বনে
দেখো তার খোসা অব্দি ছড়াচ্ছে না কেউ
দেখো কালিং আর
সোয়াইন ফ্লুময় ঝরা পাতায়
জমে উঠছে বিগত যৌথ খামার
কেমন লিফলেট চিবুচ্ছে ছাগলের পাল!
এমন চমৎকার মিঠে দিনে
বসন্তের কথা থাক
বরং অনলাইনে থাকা যাক
বরং মেসেজে মেসেজ ভেসে যাক


গণতন্ত্র

সরল কবিতা আমি লিখেছি দু-একখান
এত তরল যেন বয়ে গেছে জলে
ভোরের আলো অনাবিল শুদ্ধ এক
সহজ ছবির মতো ঝুলে থাকে
এ এমন দৃশ্য, যেখানে মারপ্যাঁচ নেই
হিংসা হিংসার মতো
কুকুরের কামড় অবিকল কুকুরের মতো
এইসব সরল কবিতায় যথাসম্ভব
আলো হাসি গান মৃত্যুর কথা টুকে রাখি
তাদের কথাও, গতরাতে যারা সঙ্গে ছিল
আর আজ শবদেহে কপাল ঠেকাই
এমন তরল জলে চোনা মেশাইনি কোনো
শেষ পর্যন্ত তোমার অনুগত থেকে গেছি
হে গণতন্ত্র, গণ-জন-মনও


দুষ্টা

যখন যেখানে আছি, আছি
অতীতের কথা মনে নাই!
বেহেশত-দোজখ দুইজনে
কান মলে আয় গান গাই
তোমার নাজুক মুঠোখানি
বেদনায় ঝুঁকে শরবনে
আমাকে চেনায় যেন জল
আন কথা কয় কানে কানে
প্রেম ও প্রেমিক জড়োসড়ো,
ভাসাও হৃদয় ফুল ডাল
শুশুক লবণ জলে ক্ষার
চালাও স্টিমার বরিশাল


উজবুক

তুমি জল, আমিও শুশুক
বিরল প্রজাতি উজবুক
তুমি ঘানি, পিষে তুলে আনি
পুঁজিহীন পূজ রক্তখানি
আমি দলঅন্ধ যষ্টিহীন,
ভুলে গেছি কৃষকের ঋণ

...

সেবন্তী ঘোষের জন্ম শিলিগুড়িতে ১৯৬৭, ১৯ মার্চে। পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে। কবি ও গদ্যকার। কবিতার বই নয়টি।
সাহিত্য অকাদেমির তরফে নেপালি ভাষার কবি যশইয়াঞ্জন পিয়াসীর “শান্তি-সন্দেহ” কাব্যগ্রন্থ এবং একই ভাষার গল্পকার সানু লামার “মৃগতৃষ্ণা”-র বাংলা অনুবাদ করেছেন। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির ট্রাভেল গ্রান্ট, কৃত্তিবাস ও অনীতা সুনীলকুমার বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষায় স্নাতকোত্তরে তার ‘কবি’ নভেলাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।