প্রিয় দশ

যেখানে আকাশ শেষ হয়ে যায় মেঘের শুরু

অরণ্যের খুব কাছাকাছি বেলাভূমিতে

লো-ফ্রিকোয়েন্সি জ্যোৎস্নার মতো 

নিঃশব্দ গ্রাস করে সবকিছু

আমার চোখ বহু দূরে

যেখানে জল ও সূর্যের মিতালি

যেখানে আকাশ শেষ হয়ে যায়

শুরু হয় শুধুই মেঘ।

 

মেঘগুলো কেটে কেটে কাছে আসে নীল আকাশ 

ঘুরে দাঁড়ায় তুমুল বৃষ্টি  

রংধনুর নগ্ন উল্লাস

ঝাউবন ছবি আঁকে দূরের চোখে

মেঘ, তারপরেও মেঘ। তারপরে বৃষ্টি, রংধনু...



একটু মাটি হই, একটু কাদা হই

চলো না প্রিয়তমা একটু মাটি হই, একটু কাদা হই 

জানি, আগাছায় তোমার পায়ের আলতার ছাপ নিচ্ছে চুষে

কী আর করা বলো!

আমরা তো কয়েকজনই

এ-পথে পা বাড়িয়েছি

স্রোতের বিপরীতে কয়জনই বা যেতে চায়, বলো?

 

পথ তো মসৃণ নয়—অগোছালো

মেঘে মেঘে ঢাকা—বহুস্তরের রকমফের

তাই তো আকাশও বর্ণিল—ছেঁড়া ফাটা

কী আর করা বলো!

তবুও রয়েছে বিস্তর সাধ, সীমাহীন স্বপ্ন।

 

মাথায় কাজ করে কিছু বোধ

বিস্তীর্ণ জলরাশি—ওপারেই সোনালি চাবি

কী কণ্টকময় লোভ! সঙ্গে নিতে চাই তোমাকেও

চলো না প্রিয়তমা একটু মাটি হই, একটু কাদা হই।



কেন একটি বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব

আমি কেন একটি বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব?

সে তো জল-প্রতিরোধী

সে তো বৃষ্টির জ্যাকেট—আনন্দদায়ী এবং আশ্রয়কারী

বরং তাকে জাঁকিয়ে দেই

সে তো তিমির-বিনাশী জোনাকির আলো

সারা বাগানের আলো

সে তো উচ্ছ্বাস, সে তো সৃষ্টিকারী

সে তো বন্যফুল—সরু টানেলের মুখের আলো

সে তো ক্রমশ আকাশচুম্বী—

অযথা, আমি কেন ওই বন্যফুলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাব!



মল্লিকাদের পিঠে অক্ষত দুর্ভাগ্যের নদী

আজ মনে হচ্ছে, আমি কখনোই এত সুন্দর ফুল দেখিনি 

এই রূপসি এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে

বসন্তের চাঁদের নিচে দুলছে

দুলছে আর বসন্ত বাতাসের মধুর ধ্বনি 

আমি কখনোই এত সুমধুর সংগীত শুনিনি 

বসন্ত চাঁদে মল্লিকার ঘ্রাণে মিষ্টি সুর— 

যতটা মিষ্টি একটি কণ্ঠস্বর তার সবটুকু

মল্লিকা আমাকে মোহগ্রস্ত করেছে  

আমি কখনোই এত পবিত্র অনুভূতি অনুভব করিনি...

 

অথচ, এই মল্লিকাদের পিঠে অক্ষত দুর্ভাগ্যের নদী বয়ে যায় 

মল্লিকারা এক-একটি মায়া অ্যাঞ্জোলা, সিলভিয়া প্লাথ, বেগম রোকেয়া...



স্বাধীন      

ঘাসের উপর পড়ে আছে কত তারা!

মধ্যরাতে চাঁদের আলো—

ঘাসের উপর তারার ঝলক—হীরের নাকফুল।

 

ও তারা, তোমরা কি স্বাধীন আছো?

ও ঘাস, তোমরা কি স্বাধীন আছো?

না, আমার মতো...

 

আমি তো স্বপ্ন দেখি!

ও তারা, ও ঘাস, আমি কি স্বাধীন?

তোমরা তো বিলিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত!

 

আমি কেন ঘাস হলাম না!

আমি কেন তারা হলাম না!



কিন্তু

তোমাকে যেতে বলেনি—তুমি যেতে পারছ না

তোমাকে হাঁটতে বলেনি—তুমি দৌড়াতে পারছ না

তোমাকে ছুঁতে বলেনি—তুমি ছুঁতেও পারছ না

 

পলাশের আগুন কই? কই শিমুলের প্রোজ্জ্বল?  

পলাশের আগুন বুকে জ্বলে উঠবে বলে

মেঠোপথ—আলপথ বেয়ে বেয়ে

পলাশের খোঁজে বহুদূর

 

পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল মুখিয়ে আছে 

আমাদের অপেক্ষায়—

তার গায়ে ছোপ ছোপ ছেঁড়া শিমুল



প্রতীক্ষা

আসছ আসছ করেও তুমি আসলে না

বাজবে বাজবে করেও কেনো তোমার নূপুর বাজল না

দ্যাখো, ওই ফুঁটেছে দিঘির জলে বাহারি সব পদ্মফুল

নীল জলে সাঁতার দিয়ে পদ্মগুলো তুলে তুলে

গুঁজতে চাই তোমার খোঁপায়

চেতন কিংবা অচেতন মনে ভেবেই যাচ্ছি অহর্নিশ

সকাল-দুপুর-বিকেল পেরিয়ে

আসছ আসছ করেও তুমি আসলে না

বাজবে বাজবে করেও কেনো তোমার নূপুর বাজল না

 

লাল শাড়ি আর পারফিউমে বেলোয়ারির সুমধুর

মাথা থেকে তেপান্তর বাজে যেন সুরের ঝুমুর।

তোমার নূপুর বাজবে না আর?

তোমার চুড়ি নাচবে না আর?

আসছে আসছে করেও তুমি কেনো আসলে না

বাজবে বাজবে করেও কেনো তোমার নূপুর বাজল না!



নীলাদ্রি: দর্শনা টু পার্বতীপুর

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়িয়ে যায়

হঠাৎ গা গরম, প্রচণ্ড জ্বর

রেলপাতে সুরের ঝংকার অনিমেষ চোখ আমার

গতির ঝড়

মেয়েটিকে দেখেছি ট্রেনের কামরায়

নির্বিকার। 

 

মেয়েটিকে নিয়ে রূপসা চলে গেল চিলাহাটি

আমার গন্তব্য পঞ্চগড়—সমতলের চা-বাগান

তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোর বৃদ্ধ মহানন্দা, ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘা

অমনোযোগী হয়ে পড়ি মাঝেমধ্যে

মাঝেমধ্যে কানে বাজে মেয়েটির উদ্দেশে বান্ধবীর ডাক—নীলাদ্রি?  



টুথপেস্ট

প্রত্যুষে উঠে আমাকেই ব্যবহার করা হয়

পরিষ্কার করি মুখ

ময়লা আবর্জনা দূর করি দাঁতের

ফরসা হয় কিংবা ধারালো হয়

দাঁতাল হয়েই গ্রাস করে অনেকেই   

রক্ত, সাগর, পুকুর

তারপর আমার মুখ বন্ধ করে রাখা হয়—

পরের সকালের অপেক্ষায়  

পরের সকালের অপেক্ষায়...



নূপুরের গতিই বিজয়ের অভিলাষ

এসো, এই বিজয়ে মাখি আলিঙ্গনে

শিকল যেন আর না থাকে তোমার পায়ে

বুনো চুল এলোমেলো 

হয়েছিল রোকেয়ার শহরেই উল্লাসের আয়োজন

দ্বিগুণ বিজয়ে না অভিমান

না দরকষাকষি

তোমার নূপুরের অনুপ্রাসের সুষম গতি

বলে দেয় বিজয়ের পরিকাঠামো।  

 

আমি দেখি না কোনো বন্ধু, আমি দেখি না কারো দাদাগিরি

আমি দেখি শুধুই তোমার নূপুরের গতি

তোমার নূপুরের গতিই বলে দেয় বিজয়ের অভিলাষ কতদূর;

তারপর আমি ঠিক করি আমার গতিপথ।