মাতৃরং
তেরো
মা একটি উদার বৃক্ষ।
তিনি বেঁচে থাকাকালীন আমরা তাকে ব্যবহার করি
মৃত্যু ও তার পরবর্তীকালীনও ব্যবহার করি!
চৌদ্দ
উকুন: আমরা মায়ের মাথায় থাকি
তার সন্তান
করি রক্ত পান...
যতদিন বাঁচেন—
এভাবেই তাকে খেয়ে আরও দীর্ঘ হবে
আমাদের জীবন ও আয়ুরেখা।
পনেরো
জলময়ূরটি যে-রকম হাঁটে, ডাকে
ঠিক সেরকমই চেষ্টায় মেতে থাকে ছানাটি।
যেমন আমিও বাবার আঙুল ধরে
হুবহু এমন অনুকরণ করতে চেয়েছি কত!
আর মা এসব দৃশ্য প্রাণ ভরে দেখেছে—
আনন্দে কেঁদেছে।
ছানাটির সাথে আমার তফাত শুধু এটুকুই,
ওর মা উড়ে গেছে—
আমরা মাকে জড়িয়ে এখনো বেঁচে আছি...
কুড়ি
কখনও হুটহাট মায়ের মাথার ঘোমটা সরলে দেখি
কাঁচা ঘন চুলের ভিতর উঁকি দিয়ে ফিসফিস শব্দ করে
কিছু লাল সাদা চুল...
একুশ
সদর দরজা ঠেলে ছাইকালোশ্যাওলারঙা দোআঁশ মাটিতে পা রাখতেই দেখবে—
ঘরের চালে শিশুর মতো ফুটে হাসছে আশ্চর্য নীলবেগুনিশাদা রঙা শিমফুল,
বয়েসি চালকুমড়ারা ভরা পোয়াতির মতো শুয়ে আছে হেঁশেলের চালে,
আলোছায়া ঘেরা ঝিঙে আর বরবটির বাহানের নিচে—
জমে আছে, সকালের ঝাড় দেওয়া বৃদ্ধার চামড়ার মতো বাসি লতাপাতার স্তূপ।
উঠানের নৈর্ঋতে দাদির রোয়া বরই গাছটির বিছিয়ে থাকা ফুলপাতা,
ঈশান কোণে ঝাল মরিচের গাছ ও দেশি বিলাতি ধনেপাতা,
পরিষ্কার— মাটি ল্যাপা আঁখা, মিটসেফ ভর্তি তরকারি, ভর্তা, ভাত আর আঁচারের বয়াম;
লাল গামছা বাঁধা বাঁশের খুঁটি আর এঁটো বাসন ভর্তি কলপাড়
খড়ির ঘরের পাশে একটা ছোট্ট গোয়াল
আরও যা কিছু আছে সমস্তকিছুতেই পাবে মায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ…
আর পুরো বাড়িটার দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখতে পাবে
মায়ের সহজ মুখটি কি সুন্দর— হাসছে…
পিতৃঋণ
এক
বাবার দিকে তাকালে শামুকের কথা মনে আসে
একটি কঠিন ভঙ্গিমা ও গম্ভীর স্বরে—
তিনি কথা বললেই স্পষ্ট দেখতে পাই,
চোখের সামনে শামুক হেঁটে যায়,
কঠিন খোলসে তার দেহ, ভেতরে কোমল হৃদয়।
দুই
আর বাবার উপদেশ শুনলে মনে হয়—
দাঁড়িয়ে আছি বাড়ির দেশি নিমগাছটার নিচে,
দৃঢ় কাণ্ড, চিকন ডালে কটকটে সবুজ পাতা,
শাদা ফুলের নিঃশব্দ ঘ্রাণ ও পুঁচকে গুটি থেকে
শেকড়ের সমস্ত জটিল বিন্যাস—
কিংবা ভেতর থেকে বাহিরের ছাল,
সমস্তটাই ভয়ানক তেতো ও ভীষণ উপকারী।
তিন
বাবার গুণ ও দোষ আমার ভিতর চমৎকার গুনগুন করে।
চার
বাবার শার্টের পকেটে লুকিয়ে থাকা কয়েকটি শিমবিচি
হঠাৎ সন্তান হয়ে জোর দাবি করে—
‘আমরাও পিতার সমান উত্তরাধিকারী’।
ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে তুমুল কলহ বেড়ে হাতাহাতি চলতে চলতে
সমগ্র পরিবারের গলায় ছুরির ফলার মতো বিঁধে থাকে আমার অসুখ!
মৃত্যুর মতো শিমবিচির দল ক্রমশ ধেয়ে আসে
অশনির শ্বাস নিয়ে ভীষণ জ্বরে কাঁপতে থাকি
তবুও এই বিছানার পাশে ততক্ষণ মরব না জানি,
যতক্ষণ এই কপালে আছে দেবতার মতো পিতার হাত।
পাঁচ
‘এই এদিকে আয়’ যদিও গম্ভীর স্বরে বাবা ডাকেন
তবুও যতবার প্রণাম করি, ততবার বুকে টেনে নেন
গাঢ় আলিঙ্গনে অনুভূত হয়, হৃদয়ে একই রক্ত স্পন্দন
একই দেহের অনুক্রম, একই আত্মার অসীম অতল বন্ধন।