রিংকু আকন পাল বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল। আগে এখানে না এলেও পাল বাড়ির পথঘাট তার বিশেষ অচেনা মনে হল না। মজিদ রাড়ীর বর্ণনা তার চোখে ভাসছে। চিত্রকল্প বাস্তবে রূপায়িত হল পাল বাড়ির সম্মুখভাগ। যেখানে বিপ্লবী দিলীপ পালের রক্ত ঝরেছে। বিপন্ন হয়েছে প্রাণ। বাড়িতে ঢুকবার কালে রিংকু দেখল পাল বাড়ির উল্টোদিকে সড়কের পাশে জলাশয়, সেখানে দুধ-মানকুচু পাতা ডানে-বায়ে ক্রমাগত দুলছে। কচুরি পানা, শেওলা ও সবুজ গুল্ম জলের সিংহভাগ দখল করে রেখেছে। তার পাশে বেতঝাড়। কন্টকযুক্ত বেতের শরীরে ফুল এসেছে। বুনো বেতফুল। স্নিগ্ধ আর শুভ্র। বাড়ির ভিতরে পৌঁছলে দিলীপ পালের বৌ বিষ্ণু পাল তাকে বসবার জন্য বেতের মোড়া এগিয়ে দিল। রিংকু যেখানে বসেছে ঠিক সামনে আরেকটি মোড়া এনে নিজে বসল বিষ্ণু পাল। মাঝে একটি ছোট মোড়া পেতে তাতে একটি প্লেটে মুড়ির কয়েকটি মোয়া রাখল। পাশে স্টিলের একটি রুপালি গ্লাসে পানি। যেখানে রিংকু বসল, সেখান থেকে স্বল্প দূরে চোখে পড়ল একটি কলাগাছ। গাছে একথোর কলা ঝুলে আছে। সেই থোরের মাথায় ঝুলে আছে বিকশিত একটি কলার মোচা। না গোলাপি না খয়েরি রঙের পাখ ছড়ানো মোচা থেকে মৃদু সুবাস ছড়িয়েছে উঠোনজুড়ে। এমন সময় রিংকু বলল, বিষ্ণু, আমি তোমারে ভালোবাসি। সে কোনো রাখঢাক রাখল না। এতদিন যে ‘দিলীপের বৌ’ বলে ডেকে এসেছে সেই রিংকু আজ বিষ্ণুর নাম ধরে ডাকল। তুমি সম্বোধন করল। এক সুদর্শন তরুণ কারবারির মুখে সরাসরি ভালোবাসার কথা শুনে বিষ্ণুর মুখাবয়বে বিশেষ কোনো ভাবলক্ষণ দেখা গেল না। বিষ্ণুর কাছে এটি যেন অনুমেয় ছিল। দিলীপের মৃত্যুর পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, এখনও, দিলীপের সংসার আঁকড়ে থাকা বিষ্ণু বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে শুধু বলল, আমাকে ভালোবাসেন? রিংকু একরাশ চুলসমেত মাথা নাড়াল। বিষ্ণু এবার বলল, ক্যান? এই ভালোবাসার কথা এর আগেরও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছে রিংকু। তবে রিংকু আকনের এবারের প্রস্তাব দৃঢ়, পরিপূর্ণ আর একাগ্রতায় ভরপুর। চোখে মুখে সেই দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি। রিংকু বুঝতে পারেনি যে—বিষ্ণু তার কাছে ভালোবাসার কারণ জানতে চাইবে। ভালোবাসার কোনো কারণ থাকে নাকি। হয়ত থাকে, হয়ত থাকেনা। রিংকু বলল, একবার মনে অয় তোমারে ভালোবাসি, ফের মনে অয় তোমারে না, ভালোবাসি তোমার সাহস। বিষ্ণুর সাহস বিষ্ণুকে ভয়ের দুয়ার ভাঙতে শিখিয়েছে। তার সাহসই তাকে মোবারেক মোল্লার চাতাল পর্যন্ত টেনে এসেছে। রক্তাক্ত হত্যায় সে নিজের হাত রাঙিয়েছে। নিজের প্রাণের পতির খুন দেখেছে নিজ চোখে। বিষ্ণু রিংকুকে বলল, আমার কাজ এহনো শেষ অয় নাই। দিলীপরে এহন ছাইড়া যাইতে পারমু না রিংকু ভাই। রিংকু বলল, তোমার সব কাজের দায়িত্ব এহন আমার। তোমার আর কাজ করার দরকার পড়বে না। রিংকুর কথা শুনে হাসল বিষ্ণু। সামান্য নড়াচড়ায় তার মাথা থেকে শাড়ির আঁচল নেমে গেল। বিষ্ণু নিজের দুই হাত নিজের কোলের ভিতর গুটিয়ে রাখল। প্রথম দেখায় মনে হবে যেন কাচুমাচু ভাব। বিষ্ণু বলল, আমার সব দায়িত্ব নিবার পারবেন আপনে? করবার পারবেন আমার কাজ? রিংকু বুঝে-না-বুঝে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
বিষ্ণু বলল, আপনে আবেগে ভাসতেছেন। সব শর্ত আপনে এহন মানবার পারবেন। যে সিদ্ধান্তে আবেগ থাহে সেডা ভাল সিদ্ধান্ত অয় না। রিংকু বলল, কোন বড় কাজ আবেগ ছাড়া অইছে তুমি কও বিষ্ণু। সহসা বিষ্ণু বলল, আমি ক্ষিতিশ মন্ডলরে শেষ করবার চাই। লগে মোবারেক মোল্লারেও। রিংকুর চোখ এবার কপালে উঠল। সে ক্ষিতিশ মন্ডলের কথা জানে। মজিদ রাড়ী তাকে সবিস্তারে ক্ষিতির মন্ডলের কথা বলেছে। প্রিয়লাল মন্ডলের সাগরেদ ক্ষিতিশ দীর্ঘ পরিকল্পনা করে দিলীপের প্রাণ সংহার করেছে। বিপ্লবী অভিযানকালে বিষ্ণুর ট্রুপস প্রিয়লাল মন্ডলকে হত্যা করায় তারা বিষ্ণুকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিষ্ণুকে তারা প্রাণে মারেনি তবে তার পতি হত্যা করে সারা জীবনের গ্লানিতে ডুবিয়েছে।
রিংকু মোবারেক মোল্লার বিষয়টি বুঝলনা। তবে কিছু জানতেও চাইলনা। তার চোখভরা বিষ্ময়। বিষ্ণু এবারও হাসল। রিংকু এখন বিষ্ণুর চোখের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল—একা এক নারী বিপুলা পৃথিবীর সব শক্তি ধারণ করে আছে। অথচ তার হেয়ালি দেখলে তা কে বুঝবে। রিংকুর অসহায় বদন দেখে বিষ্ণু তাকে বলল, মোবারেক মোল্লা ফসলের শত্রু। কৃষাণের শত্রু। গরিবের মাল লুট কইরা সে এহন মহাজন সাজছে। তার ক্ষমা নাই। রিংকু বুঝল—এই মোরারেক মোল্লার উত্থানের গল্পও ছোট নয়। প্রিয়লাল মন্ডল ও জয়েন মল্লিকদের অনুগামী সে। বিষ্ণু বলল, সন্ধ্যা নদীতে বিপ্লবী বান শুধু এবারই আসে নাই রিংকু ভাই। এর বহু আগেও জ্বলছে এই আগুন। কিন্তু সেইবার এই বিপ্লব সফল অয় নাই। সেইকালে জিরাকাঠির চেয়ারম্যান হায়দার মোড়ল নিজের দুই নম্বরি বুদ্ধি খাটাইয়া নিজের ব্যবসা টিকাইছে। মেলা লোকরে জেলে দিছে। জেলে দিয়া আসামি আর পুলিশ—দুই পক্ষ থেইকা টাকা খাইছে, সুবিধা নিছে। বিপ্লবের হেন ক্ষতি নাই সে করে নাই। শেষে বিপ্লবী দলের হাতে ধরা খাইয়া আব্বা ডাকছে। বিপ্লবী দলে পাঁচশ মন চাইল দেওনের কতা কই দিছে পঞ্চাশ মণ। হে সারাজীবন লোক ঠকানোর লোক আছিল। নিজের কোনো কারবার না থাকলেও সারা দুনিয়ার লোক তারে বড় কারবারি মনে করত। মানুষের মাতায় কাঁঠাল ভাঙ্গা আছিল তার মূল কাজ। দুনিয়া ছাড়নের আগে বুড়া হায়দার মোড়ল কচি শয়তান মোবারেক মোল্লার উপর ভর করে। মোড়লের ব্যবসায়ের হাল ধরে মোবারেক মোল্লা। হায়দার মোড়লের দেহানো পথে সে এহন চাতাল দিছে, সারা দুনিয়ার কারবারিগো এইহানে আইনা জড়ো করছে। সগলের মাথার উপর থেইকা হে এহন মাখন তোলে। মানুষ ঠকায়। বিপ্লবী অভিযানের সময় বিপ্লবী দলের বিরুদ্ধে ফাঁড়িতে লোক পাঠায়া তথ্য দিছে। মানুষ মারার কল পাতছে। এহন ভেগ ধরছে—কিছু বোঝে না। জয়েন মল্লিকের লগেও তার শক্ত যোগাযোগ আছিল। রিংকু অবুঝের মত বিষ্ণুর কাছে জিজ্ঞেস করল—এখন তার সাজা কী? বিষ্ণু বলল, মৃত্যু। রিংকু বলল, এজন্য এখন তারে মরতে হবে? বিষ্ণুর বলল, পরের ফিরিস্তি তার অনেক লম্বা। চাতালের একটা ছুকরি মাইয়ার লগে সে অসভ্য কাম করছে। পরে মাইরা গাঙে ভাসাইছে। মোবারেকের মাপ নাই।
দুপুরবেলা রিংকুর জন্য খাবার সাজালো বিষ্ণু। ঘরের মেঝেতে পাতা মাদুরে রিংকু বসল। তার সামনে খাবারের থালা। সালুনের বাটি। জলের গ্লাসে ও নুনের পাত্র। দুটি কাসার থালার প্রত্যেকটিতে আমন চালের সামান্য ভাত। দেখে মনে হচ্ছে যেন লাল খই। একটি বাটিতে পুঁইশাক দিয়ে টাকিমাছ ভুনা, অন্য বাটিতে আমরা দিয়ে মসুরের ডাল। আরেকটি বাটিতে রাখা আছে কলার মোচা ভাজি। বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি ঘরে ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো ঢুকছে। মাদুরে মুখোমুখি বসা দুজনের মুখমন্ডল আজ আলোয় উদ্ভাসিত। শুরুতে রিংকুর পাতে কলার মোচা ভাজি তুলে দিতে দিতে বিষ্ণু বলল, রিংকু ভাই, আজ বিশেষ কিছু করবার পারলাম না, আতালের মুরগিও ধরবার পারি নাই। আসলে মন ভাল নাই। রিংকু কোনো কথা বলল না। দুজনে নিঃশব্দ আহার শেষ করল।
বিষ্ণুর শাশুড়ি বয়স্ক মানুষ। কোমরে ভর দিয়ে চলে। রিংকু আসায় বিষ্ণু আজ তেমন খোঁজখবর করতে পারেনি। শুধু দুপুরের খাবার দিয়ে এসেছে। ও ঘর থেকে তার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সম্ভবত বিষ্ণুকে ডাকছে। বিষ্ণু সেদিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ করলনা। সে বিড়বিড় করে বলল, উস্তে ভাজা কড়কড়া, সালুন কাঠি মাতুব্বরা, দুধ হলি কডা খাতি পাড়ি। তার এই কথা দূরে পৌঁছাল না। কিছুক্ষণ পরে বিষ্ণুর শাশুড়ি বিরক্ত হয়ে জোর গলায় বলে উঠল—পিছামারার অতীত আইছে নড়েও তো না।
রিংকু আর বিষ্ণু রাতের বেলা বেরিয়ে পড়ল। বিষ্ণু নিজের কোমরে চাকু গুঁজে নিল। রিংকু নিজের সঙ্গে নিল ঝোলা ব্যাগ। তার ভিতরে মাঝারি সাইজের হাসুয়া। ধানের খড় দিয়ে মোড়ানো। চকচকে ধারালো। বিষ্ণু শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় বড় ঘোমটা তৈরি করল। ভ্যান গাড়ির সামনের দিকে দুজন দুই দিকে পা ছড়িয়ে বসল। কার্তিক মাসের সন্ধ্যা। ওয়াপদা সড়কের দুই দিকে ধানক্ষেত। সড়কের গা ঘেঁষে নানা পদের গাছ। তালগাছ, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া। ধানক্ষেত্রে ধানের ছড়া ছাড়তে শুরু করেছে। আসছে অঘ্রাণে ধান পরিপক্ব হবে। এখন ধানের ভিতরে সবে দুধ এসেছে। সপ্তাহ দুয়েকের ব্যবধানে এই দুধ চালে রূপ নেবে। বিশালাকার ধানক্ষেতজুড়ে এখন মিষ্টি সুবাস, খুব তীব্র নয়। ঘণ্টা দুয়েক হয় রাত নেমেছে। ঘুটঘুটে অমাবস্যা। ভ্যানচালকের হাতে একটি ছোট্ট টর্চ লাইট। পথ দেখা যায়, কখনো স্পষ্ট দেখাও যায় না। ভ্যানে বসা অবস্থায় রিংকু বিষ্ণুর হাত ধরে রইল। বিষ্ণু এই হাত ধরে থাকার অর্থ বুঝল না। শক্তভাবে হাত ধরার অর্থ কি দৃঢ়তা, নাকি ভয়। বিপ্লবী অভিযান পর্বে বিষ্ণুর পালের দীর্ঘ প্রক্ষিক্ষণ আছে। আছে অপারেশনের অভিজ্ঞতা, তীব্র সাহস ও প্রতিশোধ আকাঙ্ক্ষা। পক্ষান্তরে রিংকু এখন রিক্ত পুরুষ। এক নারীর প্রতি ভালবাসা ছাড়া এই অভিযানে তার বিশেষ কোনো সহায় নেই। সম্বল নেই। সম্ভবত তীব্র ঘাটতি আছে সাহসেরও।
পূর্বসূত্র অনুসারে তারা দুজন হারতা বাজারে পৌঁছাল। মদন ময়রার মিষ্টির দোকানে বসে চায়ের অর্ডার করল। দোকানে ছোট একটি আলো জ্বলছে। কাপের ভিতর ঘুটঘুট আওয়াজ শেষে দুই কাপ চা দুজনের হাতে দিল মদন। ইশারায় সামনের গলি দেখাল সে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা নিশ্চিত হল—কয়েক গজ দূরে মিতালী সংঘ ক্লাবের ভিতরে নিজের লোকবল নিয়ে বৈঠক করছে ক্ষিতিশ মন্ডল। ক্ষিতিশের আজকের বৈঠকের হেতু বিশেষ কিছু না। রোজকার আড্ডার মতো, লোকজনকে নিজেদের শক্তি জানান দেওয়া। হা হা হি হি করে সময় কাটান। কিছুক্ষণের মধ্যে চায়ের পয়সা মিটিয়ে দুজনে সেখান থেকে সটকে পড়ল। পরেরদিন সকালে বাজারের অদূরে পাওয়া গেল ক্ষিতিশ মন্ডলের দেহ। বিশালাকার দেহের ক্ষিতিশ চার-হাত পা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে মাটিতে। পেটের ভিতর একটি হাসুয়া খাড়া হয়ে আছে। সেখান থেকে ক্রমাগত রক্ত ঝরছে। ক্ষিতিশের মৃত্যুর পর তার লোকেরা এলাকা ছেড়ে পালাল। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, তার দখল করা আড়ত ও প্রিয়লাল মন্ডলের পরিবার মারফত পাওয়া মাছের ঘের ও শাপলার বিলের সাইনবোর্ড থেকে ক্ষিতিশের নাম সরিয়ে নেওয়া হল। তাদের কাছে খবর পৌঁছাল ফের বিপ্লবী বাহিনী মাঠে নেমেছে। প্রাণভয়ে তারা নিজ নিজ গ্রাম থেকে দূরে চলে গেল। যারা পালাতে পারলনা তারা অন্তত নিজেরদের নিরাপত্তা জোরদার করল। বাড়িতে অতিরিক্ত প্রহরী নিয়োগ করল, বাড়ির চতুর্দিকে আলোবাতির বন্দোবস্ত করল।
হায়দার মোড়লের নাতি মেঘনাদ রিহিল মোবারেক মোল্লার চাতালে হাজির হল। নুরুর নৌকায় কচা নদী পার হওয়ার সময়টুকুতে তার দেখা হল বিষ্ণুর সঙ্গে। বিষ্ণুকে দেখিয়ে নুরু বলল, দিলীপের বৌ তুমি একটু তারে চাতালে নিয়া যাও। উনি মোল্লা সাহেবের লগে সাক্ষাৎ করবেন। মোড়ল সাহেবের নাতি। বিষ্ণু এক লহমা তাকে দেখল।
মোবারেক মোল্লার চাতালের শেষ দিকে নদীর কিনারে নৌকায় আলকাতরা দিচ্ছিল বাসু। সে মোবারেক মোল্লার চাতালে কাজ করে। তাকে আলকাতরা মাখতে দেখে হাক ছাড়ল ওস্তাগার মাঝি বাড়ির ভাসাই ঘরামি মেয়ে মাহেলা। সে বিষ্ণুর সঙ্গে চাতালে ধান-চাল ঝাড়ে। হাক ছেড়ে বাসুকে বলল, আসল কাম বাদ দিয়া হারাদিন নৌকা নিয়া কী করস বাসু। কি করমু, দেহস না, নাওয়ে ডামিশ লোহা মারি। মাহেলা হাসল, বলল, আমি তো হেদি, নাওয়ে গাব দেস। তোর তো আবার আমাশার দোষ। হারাডা ডাওর তো হাইগা কাটাইছিস। এহন ভাল কইরা কাম কর। একথা শুনে বাসুর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। মাহেলা ফের বলল—টাক টুক বর্ষাকাল হাগার সুখ। এবার দুজনেই সশব্দে হাসল।
চাতালের অভ্যন্তরে মেঘনাদ রিহিলের সঙ্গে মোবারেক মোল্লার বাক-বিতণ্ডার আওয়াজ বাইরে এলো। ঠিক কী নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হল তা অনুমান করতে পারল না মাহেলা ও বাসু। মাহেলা দৌড়ে গেল বিষ্ণুর কাছে। জিজ্ঞেস করল, দিদি ওই লোকটা কেডা। তুমি না তারে নিয়া খৈলানে ঢুকছিল। হের পরিচয় কী? বিষ্ণু বলল, উনি হায়দার মোড়লের নাতি। মোল্লার লগে ওনার কি জানি হিসাবনিকাশ আছে। কিছুক্ষণ পর হন্তদন্ত মোবারেক মোল্লা নিজের কামড়া থেকে বেরিয়ে এল। বলল, শালা, আমি সব পাহারা দিলাম, ছোট জিনিস বড় করলাম, এহন দুই যুগ পরে আইছে ভাগ মাড়াইতে। ভাগ এক্কেরে যাগামত ভইরা দিমু। মোবারেক মোল্লার কথা শেষ হতে না হতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল রিহিল। সোজা মোবারেক মোল্লার দিকে তেড়ে গিয়ে তার টুটি চেপে ধরল। বলল, শালা তোর কলিজা বের করে নিমু।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে বিষ্ণু নুরু মাঝিকে বলল, আমি না কওয়া পর্যন্ত আইজ খেয়া বন্ধ করবা না মাঝি। নুরু উৎসুক হয়ে বলল, ক্যান তুমি আবারও পাড় হবা নাকি আইজ? বিষ্ণু বলল, একটু পরে আইতাছি। ঘন্টা দুয়েকের মাঝে বিষ্ণু ফিরে এল। তার সঙ্গে ছোট্ট একটি ব্যাগ। নুরু বলল, এত রাইতে কই যাও দিলীপের বৌ? বেরাইতে? বিষ্ণু তেমন কিছু বলল না, কিছুক্ষণ চুপ রইল। শুধু বলল, তোমারে পরাণে মারলাম না মাঝি। না বুইঝা ভুল করছ, আইজ আবার নিদানের রাইত পাড় করলা, তোমারে মাফ কইরা দিলাম। নৌকা ঘাটে ভিড়লে এক পা মাটিতে রেখে বলল, বিনারারে নিয়া ভাল থাইকো।
দৌড়ে এসে পিছন থেকে মোবারেক মোল্লার মাথায় বিরাট এক ডামিশ লোহা ঢুকিয়ে দিল বাসু। বলল, শালা আমার বোইনের রক্ত খাইছিস। নরকে যা। মোবারেক মোল্লা বসা ছিল, মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার গলায় পারা দিয়ে নিঃশ্বাস আটকে দিল রিংকু আকন। গলায় পা দেওয়া অবস্থায় দুইজন প্রহরী ছুটে এলো। তাদের একজন রিংকুর পেটে ছুড়ি চালিয়ে দিল। রিংকুর চোখদুটি বেড়িয়ে পড়ার উপক্রম হল। সে বমি করে দিল। বিষ্ণু এতক্ষণ ঘরের বাইরে ছিল, ঘরে ঢুকে দেখলে রিংকু মাটিকে লুটিয়ে পড়েছে। মোবারেক মোল্লা ও রিংকু আকন দুজনের রক্তে সয়লাব হল কার্পেট। দুজনের রক্তই লাল—একজন অন্যায়ের জন্য, আরেকজন ন্যায়ের জন্য রক্ত দিল।
রিংকুর দেহের উপর নিজের মস্তক ঠেকিয়ে রেখেছে বিষ্ণু। মেঘনাদ রিহিল বিষ্ণুর হাত ধরল। তার ভিতর অস্থিরতা। বলল, জলদি চল, রাত গভীর হচ্ছে। বাসু, বিষ্ণু ও রিহিল ধরাধরি করে রিংকু আকনের দেহ তার বড় নাওয়ে তুলল। একটি রেশমি চাদরে ঢেকে রাখা হল তার দীর্ঘ দেহ। বাসু নাওয়ের হাল ধরল, বাদাম তুলে নাও ভাসাল।
নাওয়ের পাটাতনে শোয়ানো রিংকু আকনের পাশে বসা বিষ্ণুর দু-চোখ ভেঙে শাওনের বৃষ্টি নামল। জীবন ও মরণের দুই পাড়ে দুই জন—মনে হল—দীর্ঘ এ রাত ভেঙে আর ভোর হবে না।
শেষ