ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—১১

সরীসৃপতন্ত্র

৮ নভেম্বর ১৯৮৭, রাত ৮টা ২৪

ঘণ্টা দেড়েক পর দেখা যায়, মোকাম আর টিকটিকি মেঝেতে বসে সুড়ুত সুড়ুত করে ডিম আর ল্যাটকা খিচুড়ি খাচ্ছে। মোকাম তার বাইরের পোশাক পাল্টে একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেছে। টিকটিকির পরনেও লুঙ্গি আর মেরিলিন মনরোর সে গেঞ্জি। গলায় একটা চেইন ঝুলছে। সম্ভবত নাজমুলের দোকান থেকে ফিরবার সময় নিয়ে এসেছে। ইমিটেশনের মাল। চোখের চশমাটা কপালের ওপর সাইনবোর্ডের মতো টাঙিয়ে রাখা। বিপত্তিটা বেধেছে টিকটিকির কপাল মানুষের কপালের মতো চওড়া না হওয়ায়। প্রায়ই সেটা কপাল থেকে খুলে গিয়ে ঝুলে পড়ছে চোয়ালের নিচে। কখনো হাত অথবা পা দিয়ে, কখনোবা লেজের ডগার সাহায্যে পেঁচিয়ে চশমাটা আবার জায়গামতো সেট করতে হচ্ছে।

'চশমাটা আপাতত খুলে রাখলেই পারো,’ মোকাম পরামর্শ দেয়।

টিকটিকি লেজ দিয়ে চশমাটা আঁকড়ে ধরে তার নাকের সামনে নিয়ে এসে উল্টেপাল্টে দেখে।’

'এইটা চোক্ষে লাগাইলে দেখতে ইস্মার্ট লাগে। তা বাদে এই চশমার কী কাম?’

'সানগ্লাস বা রোদচশমা ব্যবহারের মূল কারণ নিজেকে স্মার্ট দেখানো না, মানুষ সানগ্লাস পরে রোদ থেকে চোখকে বাঁচাতে,’ মোকাম ডিম-খিচুড়ি মাখাতে মাখাতে বলে। ‘আর নরমাল চশমা, অর্থাৎ পাওয়ারওয়ালা সাদা গ্লাস, চোখে দেখতে পায় না বা দেখতে সমস্যা হয়—এমন মানুষদের দেখার কাজে সাহায্য করে। দূরের জিনিসকে কাছে নিয়ে আসে, কাছের অস্পষ্ট জিনিসকে আরও বড় করে তোলে।’

টিকটিকির দিকে তাকিয়ে মোকাম বলে, ‘তোমার হাতে যেটা আছে, ওটা সানগ্লাস। রোদচশমা। দিনে পরতে হয়। ঘরের ভেতর, রাতের বেলা জিনিসটা কপালে টাঙিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই।’

মোকামের পরামর্শে টিকটিকি সানগ্লাস খুলে নামিয়ে রাখে মেঝেতে।

বেশ অনেকখানি খিচুড়ি রাঁধা হয়েছে। নরম-নরম ল্যাটকা খিচুড়ি। দুজন মেঝেতে সবকিছু বিছিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসা। ছোট একটা মাদুর, তার ওপর একটা ডিশে রাখা ধোঁয়াওঠা গরম খিচুড়ি, পাশে একটা মেলামাইনের থালে ডিমভাজা, দুজনের জন্য তিনটা। মোকাম পারতপক্ষে কোনো কিছুর অপচয় করে না। পার হেড ডিম একটার বেশি লাগারও কথা না। তবু অতিথি আপ্যায়নের মানসিকতায় মোকাম অতিরিক্ত একটা ডিম ভেজেছে। টিকটিকি অবশ্য ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে অতিরিক্ত ডিমের দায়িত্ব মোকামকেই নিতে হবে। তার পক্ষে একটার বেশি ডিম খাওয়া সম্ভব নয়। মোকাম পাত্তা দেয়নি। বাঙালি মধ্যবিত্ত তার অতিথি আপ্যায়নে সাধ্যাতীত চেষ্টাচরিত্র করে। টিকটিকির জন্য সে সেটাই করছে। যদি অতিরিক্ত ডিমটা ও আসলেই খেতে না পারে, তবে মোকাম নিজেই সেঁটে দেবে। আজ রাতে পারলে আজ রাতেই, নইলে আগামীকাল সকালে, অফিসে বেরোনোর আগে, নাশতায়।

মোকাম আড়চোখে টিকটিকির দিকে তাকায়। একদম মানুষের মতোই ডিম আর খিচুড়ি মাখিয়ে নলা করে মুখে তুলছে প্রাণীটা। এতটা গুছিয়ে খাওয়া শিখল কোথায় ও? এমন এটিকেট, আঙুলের এমন নিপুণ ব্যবহার? শুধু খাবার মাখিয়ে মুখে তোলাই নয়, তারপর যথেষ্ট সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবার প্রায় ছাতু করে তারপর কোঁত করে গিলে পেটে চালান করছে সে। প্রতিবার মুখ হাঁ করার সময় যে জিবটা দেখা যাচ্ছে তার, তা আলবৎ মানুষের মতো। এমনকি দাঁতগুলোও। কেউ কি টিকটিকির পোশাক পরে মজা করছে আসলে তার সঙ্গে?

তবু মোকাম নরম গলায় বলে, ‘আপনি...মানে তুমি, আজ প্রথম এসেছ আমার ঘরে, আমার মেহমান হয়ে। তোমাকে ভালোমতো আপ্যায়ন করতে পারলাম না।’

ঝাঁটার বাড়ি থেকে মেহমানদারিতে শিফটের প্রস্তাবটা টিকটিকি ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করে। বিনয় বিগলিত কণ্ঠে বলে, ‘আমি কিন্তু এই ঘরে মেহমান না, স্যার। বাংলার প্রফেসরের বাড়ি ছাড়ার পর মহল্লার এই গাছ-ওই গাছ হয়া আপনার বাথরুমের ঘুলঘুলিতে আছি আজ প্রায় মাস তিন হইতে চলল। আমারে আপ্যায়ন করা নিয়া অত চিন্তা করা লাগব না। খালি ঠুন্ডাপিছা লইয়া অমনে আর লৌড়ানি দিয়েন না।’

'ওইটা আসলে একটা ভুল-বোঝাবুঝি। ওই ঘটনা তুমি আর মনে রেখো না।' মোকাম লাজুক হাসি হাসে। ‘কিন্তু আসল কথা হলো...’ মোকামের কথা জড়িয়ে আসে। আসল কথাটা কী, তা সে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ‘আসল কথাটা হলো...আসল কথাটা হলো...’

'ভয় খায়েন না,’ টিকটিকি আঙুল চাটতে চাটতে বলে। ‘একদম ফ্রি মাইন্ডে কন যা কইতে চান। সাইজে বড় হইতে পারি, কিন্তু আমি ডেঞ্জারাস না। টিকটিকির মতো প্রাণীরে এমনিতেও কেউ গোনায় ধরে না। এর মইধ্যে আপনি ভয় খান আমারে—এইটা শুনলে লোকে হাসব।' টিকটিকি আশ্বাস দেওয়ার সুরে বলে, 'যা প্রশ্ন আছে, একদম দিল খুইলা জিজ্ঞেস করেন। আমিও দিলখোলা উত্তর দিমু।’

'না, মানে,’ মোকাম আমতা-আমতা করে। ‘আমি এখনো আমার প্রশ্নগুলোর জবাব পাইনি। ধরো, তুমি আসলে কে? এখানে কী করছ? আমার কাছেই-বা তোমার ঠিক কী প্রয়োজন—এগুলোই জানা প্রয়োজন।’

'হ্যাঁ, এগুলি জরুরি আলাপ।' লুঙ্গির ফাঁক থেকে লেজ বের করে তার আগা দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে টিকটিকি বলে। ‘নিজেদের মইধ্যে এই ধরনের খোলামেলা আলাপের দরকার আছে। এই বোঝাপড়াটুকু তৈয়ার না হইলে আমরা এক বাসায় কেমনে থাকব?’

'আমরা একই বাসায় থাকব?’ মোকামের হাঁ করা মুখখানা দেখে মনে হয়, যেন তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

'তো আর কই যামু আমি?’ টিকটিকি হাই তোলে। ‘এইখানেই আছি। বেশ ভালো আছি।’

'তা ঠিক, তা ঠিক,’ মোকাম থাকাথাকির ইস্যুতে টিকটিকিকে আর ঘাঁটাতে চায় না। বোঝে, যেভাবে ও নিজেকে এই বাড়ির একজন স্থায়ী পুরোনো বাসিন্দা হিসেবে দাবি করছে, তাতে ওকে এ বিষয়ে আর প্রশ্ন করা অবান্তর। ‘তবে তুমি আমার কাছে আসলে কী চাও?...না না, এটাও না। আগে এটা বলো যে তুমি কি আসলেই টিকটিকি?’

মোকামের এই প্রশ্নে টিকটিকির মুখ অন্ধকার হয়ে যায়।

'আচ্ছা, থাক,’ মোকাম টিকটিকির গম্ভীর চেহারা দেখে আবারও প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার চেষ্টা করে।

'না, থাকবে কেন?’ টিকটিকি ক্ষুণ্ন কণ্ঠে বলে। ‘আলোচনা চলুক। তবে যে প্রশ্নটা আপনে করলেন, সেই প্রশ্নের ঝামেলাটা আপনের বোঝন লাগব। ধরেন, আপনারে দেইখা কী মনে হয়, একজন ব্যাটামানুষ, তাই না? অখন আপনার চলাফিরা, কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি—সব দেইখাও যদি আপনারে প্রশ্ন করি, তুমি কি আসলেই ব্যাটামানুষ?—তখন আপনে এই প্রশ্নের কী উত্তর দিবেন? হ্যাঁ, আমি ব্যাটামানুষ। তখন আসলে চেইন খুইলা নুনু না দেখাইলে প্রশ্নটার সেইম লেভেলের নোংরামি আপনে প্রডিউস করতে পারবেন না। অর্থাৎ, নুনু দেখানো ছাড়া আর যে উত্তরই আপনে দেন, তাতে আপনার অপমান আরও বাড়বই খালি। ঝামেলাটা বুঝতাছেন?’

টিকটিকির চেহারা গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হয়। ‘আমি টিকটিকি। শতকরা এক শ ভাগ টিকটিকি। আপনার পরিচিত অন্য যেকোনো টিকটিকির চাইতে আরও অধিক টিকটিকি।’

'প্লিজ, ক্ষমা করবেন,’ মোকাম দেঁতো হাসি হাসে, ‘...মানে, ক্ষমা করো...তোমার মতো এত গুণী কোনো টিকটিকির সঙ্গে আমার আগে কখনো দেখা হয়নি তো...’

'অখন এই ব্যাপারে আমি কী করতে পারি?’ টিকটিকির কণ্ঠে খেদ। ‘আপনারা তো মানুষ মানুষ করতে করতেই গোটা জীবন পার কইরা দেন। টিকটিকিদের নিয়া আলাদা কোনো চিন্তাফিকির আছে আপনেগো? টিকটিকিদের কি আপনেরা মানুষ মনে করেন যে আমাগো ব্যাপারে জানবেন বা আমাদের সঙ্গে আপনাদের চিনপরিচয়, আলাপ-সংলাপ থাকব?’ টিকটিকি গজগজ করতে থাকে। ‘কী একখান ডায়ালগ দিল, আর কোনো টিকটিকির লগে তার পরিচয় নাই বইলা আমি টিকটিকি কি না, হেইডা তার বিশ্বাস হইতেছে না...’

এরপর বেশ কিছুক্ষণ বিনাবাক্যব্যয়ে তারা ডিম-খিচুড়ি সাঁটাতে থাকে ক্রমাগত। কামরায় কেবল খিচুড়ির গামলায় চামচের ঠং ঠং নাড়াচাড়া, থালে স্ল্যাত স্ল্যাত খাবার মাখানো, আর চাকুমচুকুম খাবার গেলার বাইরে কোনো শব্দ থাকে না দীর্ঘ একটা সময়।

'আচ্ছা, অন্য একটা বিষয়...’ কিছুক্ষণ পর টিকটিকি গলাখাঁকারি দেয়। ‘আপনি তো স্যার বাঙালি, তাই না?’

মোকামের খাবার গলাতেই আটকে যায়। নিচে নামতে চায় না। বিষম খাবার মতো অবস্থা তৈরি হয়। টিকটিকি মোকামের অবস্থা উপলব্ধি করে দ্রুত পানিভর্তি গ্লাস এগিয়ে দেয় মোকামের দিকে। সেই পানি একটু একটু করে খেয়ে মোকাম ধাতস্থ হয়।

টিকটিকি তাকে প্রশ্ন করছে, সে বাঙালি কি না। বাঙালি বলতে কী বোঝায়, তা সে বোঝে? আর এ প্রশ্নই-বা এখন কেন? টিকটিকিকে তার টিকটিকি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করায় সে কি পাল্টা আক্রমণ শানাচ্ছে মোকামকে তার বাঙালি পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে?

'না না, ব্যাপার ওইটা না,’ মোকামের চোখের প্রশ্ন পড়তে পেরেই যেন টিকটিকি তার পরবর্তী কথাগুলো সাজায়। ‘আমি জানি যে আপনি মনে মনে নিজেরে একজন ফার্স্টকেলাস বাঙালি দাবি করেন। তাই আপনার মুখেই আসলে শুনতে চাইতেছিলাম, আপনাদের বাঙালিদের কোনো নির্দিষ্ট খাবার আছে কি না।’

মোকাম চোখ সরু করে তাকায় টিকটিকির দিকে। প্রাণীটা তার কাছে বাঙালি খাবারের ব্যাপারে আইডিয়া চাইছে। কিন্তু মানুষ সাধারণভাবে কী খায়, সে ব্যাপারে ওর স্পষ্ট ধারণা আছে? আলাদাভাবে বাঙালি খাবারের ব্যাপারে যদি মোকাম কথা বলেও ও কি বুঝবে কিছু?

'আরও খোলাসা কইরা বলি,’ টিকটিকি আঙুল চাটতে চাটতে বলে। ‘ধরেন, আমি তো হইলাম গিয়া একটা ডিফারেন্ট কেইস। আই মিন ভুসিমাল, কিন্তু স্টিল ডিফারেন্ট। তয় টিকটিকির সাধারণ কিছু খাবার আছে। খেয়াল করলে দেখবেন, টিকটিকি পোকা খায়, মাকড় খায়, তেলাপোকার ছোট বাচ্চা ধইরা খায়। তেমনি মানুষেরও কিছু খাবার আছে নিশ্চয়ই, যা অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা।’

টিকটিকির মুখ আর আঙুল—দুই-ই সমানভাবে চলতে থাকে। আঙুলগুলো থালের ওপর খিচুড়ি আর ডিমের মধ্য দিয়ে এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেমন করে ধানি জমির বুক চিরে লাঙল এগিয়ে চলে।

'ঠিক তেমনি, মনুষ্য প্রজাতির মধ্যে বাঙালি যারা, তাদের বিশেষ খাবার কী?’

'তোমার প্রশ্ন আমি বুঝেছি,’ মোকাম মাথা নাড়িয়ে বলে। ‘ওটা, আই মিন প্রশ্নটা তো অমন জটিল কিছু নয়। আমি জাস্ট ভাবছিলাম যে এ সমস্ত চিন্তাভাবনা তোমার মাথায় এল কোথা থেকে।’

'আমি পড়তে পারি,’ টিকটিকি পচাত পচাত করে খিচুড়ি চিবিয়ে কোঁত করে গিলে ফেলে। ‘আমি নই, বেশির ভাগ টিকটিকির মাঝেই অক্ষরজ্ঞান আছে। আপনেরা জানেন না সেইটা। যা-ই হোক, সারা দিন আপনে বাসায় ছিলেন না। তখন আমি বইসা বইসা আজকের পত্রিকা পড়লাম।’

মোকামের পত্রিকা অফিসের চাকরির সূত্রে অফিস থেকে মাসে তিনটা পত্রিকা রাখার বিল পায়। সে একটা পত্রিকা রেখে, বাকি দুটো পত্রিকার বিল রেখে দেয় নিজের কাছে।

'আজকের পত্রিকায় একটা কলামের হেডলাইন দেহি— "বিপ্লবী জাতিসত্তা আজ স্বৈরাচারের আক্রমণে বিপন্ন"। নিচে আরও লেখা, “আবারও সময় এসেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালির দেশকে শত্রুমুক্ত করার...”’ টিকটিকি তার খিচুড়ির ওপর লবণের কৌটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে। ‘চিন্তা করতেছিলাম, বাঙালি কইতে তো আপনারা, মানে এই এলাকার লোকেরা...’

'...এই দেশের লোকেরা।' মোকাম সংশোধন করে দেয়।

'মানে, হ্যাঁ, এই দেশের লোকেরা। পত্রপত্রিকা পড়লে মনে হয় আপনারা এই বাঙালি হওয়ার বিষয়টারে খুব সিরিয়াসলি নেন। আমার মাথায় ঘুরতেছিল যে বাঙালিত্বের চরিত্র কী কী,’ টিকটিকি তার বক্তব্য গোছানোর চেষ্টা করে। ‘ধরেন খাওনদাওন একটা ডেইলি বিষয়। তো, এমন কোনো খাওন আছে কি না, যা আপনেগো বাঙালিত্বের লগে সরাসরি যায়? মানে, যা না খাইলে আমি বাঙালি হইতে পারুম না, অথবা যা খাইলে আমার বাঙালিত্ব নষ্ট হইয়া যাইব?’

একটু থেমে টিকটিকি আরও প্রশ্ন করে, ‘বাঙালিত্ব শব্দটা কি সঠিক?’

'বাঙালিয়ানা বলতে পারো,’ মোকাম কিছুটা চিন্তা করে উত্তর দেয়।

'ঠিকাছে,’ টিকটিকি বলে। ‘বাঙালিয়ানাই সই। আপনার বাঙালিয়ানার লগে যায়, এমন খাওন তাইলে কী কী আছে? যেই খাওনটা আমরা অখন খাইতেছি, এইটারে কি বাঙালিয়ানা খাওন কওন যায়?’

মোকাম ভ্রু কোঁচকায়। পোলাও-বিরিয়ানি তার জানামতে মোগলাই খাবার। খিচুড়ি তো পোলাওয়ের জাতভাই। এটার অরিজিন কোথায়? এটা কি বাঙালি খাবার? না আফগানি-ইরানি-তুরানি? বাঙালি হিন্দুর হেঁশেলেও তো খিচুড়ি দারুণ জনপ্রিয়।

'ভাত, মাছ, শাক, তারপর ধরো ভর্তা-ভাজি—এ ধরনের খাবারগুলোই সরাসরি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মেলে।’

'আরে বাহ্!’ টিকটিকিকে খুশি খুশি লাগে। ‘এই যে তাইলে আমাগো প্লেটে যে ডিমভাজি আছে, এইটা তো তাইলে বাঙালি খাবারই। আইজকা রাতে তো তাইলে আমরা বাঙালি খাওনই খাইলাম।’

'হ্যাঁ, ডিমভাজি বাঙালির খুব পছন্দের একটা খাবার। তবে খিচুড়িটা যে ঠিক কোথা থেকে এল বা এটাকে অরিজিনালি আমাদের বাংলারই খাবার বলা যায় কি না, আমি ঠিক নিশ্চিত নই।’

'তাইলে আজকের পর আর কিছুড়ি খামু না,’ টিকটিকি উত্তেজনার চোটে খিচুড়ির খ-চ গুলিয়ে ফেলে। ‘অখন থিকা রেগুলার ভাত-ভর্তাই খামু।’

'এটার কারণ কী?’ মোকাম টিকটিকির অতিরিক্ত উৎসাহে ঘাবড়ে যায়। ‘কেন আপনাকে...আই মিন তোমাকে অন্য সবকিছু খাওয়া ছেড়ে স্রেফ ভাত-ভর্তা খেতে হবে?’

'কারণ, আমারে পুরাপুরি বাঙালি হইয়া উঠতে হইব, স্যার,’ টিকটিকির কালো পুঁতির মতো গহিন অন্ধকার চোখে শ্রদ্ধা চকচক করে। ‘কারণ, আমারে পুরাপুরি আপনার মতো হইয়া উঠতে হইব!’

'আমার মতো হয়ে উঠতে হবে কেন তোমার?’ মোকাম ভয়ে ভয়ে বলে। সে নিরুপদ্রব, শান্তিময় জীবন কামনা করে। অতিরিক্ত মনোযোগ—তা মানুষের তরফ থেকে হোক অথবা টিকটিকির—সে পছন্দ করে না।

'যা-ই হোক, খাবারের সঙ্গে বাঙালি হয়ে ওঠা, না ওঠার খুব নিবিড় কোনো সম্পর্ক আছে, এমনটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না,’ টিকটিকির অত্যুৎসাহের কারণ সম্পর্কে তখনো পুরোপুরি নিঃসংকোচ হয়ে উঠতে না পারা মোকাম আস্তে আস্তে কথা গোছায়। ‘আমি যদ্দুর বুঝি, জাতীয়তা এমন কোনো বিষয় নয়, যা কোনো দেশীয় খাবারের মধ্য দিয়ে কারও শরীরে ফুস করে ঢুকে পড়ে, অথবা ভিনদেশি বা ভিনজাতীয় কোনো খাবার খেলেই তা আবার পুচুত করে বেরিয়ে যায়।’

'জাতীয়তা না কী জানি একটা শব্দ কইলেন...’

'হ্যাঁ,’ মোকাম সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ‘একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী, একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই রুচির জনসমষ্টিকে একটা নির্দিষ্ট জাতি বলা যায়।’

'আইচ্ছা,’ টিকটিকি চিন্তাভাবনা করে একটু পর বুঝদারের মতো মাথা নাড়ায়। ‘কিন্তু আপনি মাত্রই না কইলেন যে ভর্তা-ভাজি হইল গিয়া বাঙালিত্ব খাবার?’

'বাঙালিত্ব খাবার না,’ মোকাম কারেকশন করে, ‘বাঙালির খাবার। হ্যাঁ, ভর্তা-ভাজি-পান্তাভাত—এসবকে বাঙালি খাবার বলতে কোনো দোষ নেই। তবে শুধু ভাত-ভর্তা খেলেই কেউ বাঙালি হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এত সোজাও নয়।’

'সবজি খাই যদি, স্যার?’ টিকটিকি উৎসাহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে। ‘বাঙালি সবজি যদি বেশি বেশি খাই? তাইলে হবে না? ভাত-ভর্তার লগে মিক্স কইরা বাঙালি সবজি?’

মোকাম মৃদুস্বরে বড় খতমের দোয়া আওড়ায়, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তুম মিনাজ জলেমিন। কী উটকো বিপদ! সাদামাটা জীবন নিয়ে তার আফসোস আর অভিযোগ ছিল বলেই কি এমন এক জলজ্যান্ত তামাশা খোদা তাআলা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন? সবজির জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলতে হবে এখন? মোকাম টের পায়, সে আর ডিম-খিচুড়ি উপভোগ করতে পারছে না।

'বাঙালি সবজি বলে কিছু নেই। সবজি হলো সবজি। সবজির জাতীয়তাবাদ হয় না।’

'কিন্তু স্যার,’ টিকটিকিকে কনফিউজড লাগে। ‘যদি আমি ভুল জাইনা না থাকি, তো আপনাদের তো জাতীয় ফল আছে, জাতীয় ফুলও আছে, জাতীয় আরও কী কী জানি আছে, আজকের পত্রিকার পড়ালেখা পাতায় দেখলাম। কিন্তু আপনেগো কোনো জাতীয় সবজি নাই?’

মোকাম নাই বলতে গিয়েও থেমে যায়। ভাষাকে আরও বিনীত করে বলে, ‘আমার জানামতে নাই।’

'আচ্ছা, খাওনের আলাপ থাউক,’ মোকাম বুঝতে পারে, টিকটিকি প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইছে। কিন্তু মোকাম খুশি হতে পারে না। টিকটিকি হয়তো এমন নতুন কোনো বিষয়ের অবতারণ করবে, যা আগেরটার চাইতেও প্রবলেম্যাটিক।

'এমন কোনো ডেরেস আছে বাঙালির, যা পরলে লগে লগে বাঙালি হওয়া যায়?’ টিকটিকি বলে। ‘ডেরেস বুচ্ছেন তো? পুশাক...পুশাক...। অথবা ধরেন, এমন কোনো পুশাক আছে, যা পরলে বাঙালির লিস্ট হইতে নাম কাটা যাইব?’

মোকাম আবার টিকটিকির দিকে তাকায়। ওর শরীরের নিচের অংশ আবৃত লুঙ্গিতে, গায়ে দেওয়া গেঞ্জিতে আঁকা মেরিলিন মনরোর ছবি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। মোকাম আরও একবার এই জীবন্ত অক্সিমোরনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, ‘লুঙ্গি কিংবা ধুতি, সঙ্গে গেঞ্জি বা পাঞ্জাবি—এসবই বাংলার চিরায়ত পোশাক। তবে আজকাল তো সবাই স্যুট-কোট-ব্লেজার ইত্যাদি পরে নানা কারণে বা প্রয়োজনে। অনেকে অফিসেও যায় এভাবেই। কাজেই বাঙালির সঙ্গে সরাসরি অ্যাসোসিয়েট করা যায়, এমন পোশাক আর নেই বললেই চলে।’

'জাতীয় খাবারের নাম কইতে পারলেন না, জাতীয় পুশাকের নামও জানেন না...’ টিকটিকিকে কিছুটা দিশাহারা লাগে। ‘একটা জাতির অংশ হইয়া উঠার লিগা তাইলে কী দরকার?’

টিকটিকির প্রশ্নের ওজনে মোকাম ভুলে যায় সে মানুষ নয়, একটা টিকটিকির সঙ্গে আলাপ করছে। সে একই মাপে উত্তর দেয়, ‘প্রথমে তো একটা কনশাসনেস লাগবে। নিজের পারিপার্শ্বিকতার ব্যাপারে একটা সচেতনতা আরকি। জাতীয়তাবোধের জন্ম হয় নিজের ভূগোল, নিজের রাষ্ট্র, নিজের সমাজব্যবস্থা, নিজের ভাষা, নিজের ধর্ম ইত্যাদির ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠার মাধ্যমে।’

'মানুষের হেইডা আছে, তাই তো?’

'আছে তো মনে হয়।’

'তয় সবজির সেই সচেতনতা থাকলে সবজিও জাতীয়তাবাদী হইয়া উঠত?’

মোকাম খাওয়া থামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।

'স্যার, আপনার চেহারা দেইখা মনে হইতেছে যে আপনে বিরক্ত হইতেছেন,’ দীর্ঘক্ষণ মোকামের দিক থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে টিকটিকি কিছুটা উদ্বিগ্ন স্বরে বলে। ‘আপনারে আর বেশি বিরক্ত করব না। আমার যেইটা জানা দরকার, এখন সরাসরি ওই পয়েন্টে আসি।’

মোকাম জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে আবার খাওয়া শুরু করে। টিকটিকি বলে চলে, ‘আপনের দৈনন্দিন খাইদ্যতালিকায় নির্দিষ্ট কোনো বাঙালি খাওন না থাকলেও তাতে আপনের বাঙালিত্ব রক্ষায় কোনো সমস্যা হয় না। আবার হুটহাট দুই-একটা ভিনজাতির রান্না খাইলেও আপনের জাত যায় না। তাই তো?’

মোকাম সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।

'এমন কোনো বিশেষ পোশাকও নাই, যা পরলে বা না পরলে কেউ বাঙালি থাকব না। ঠিক?’

মোকাম আবারও সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।

'তাইলে আমারে একটা জিনিস অখন বোঝান আপনে,’ টিকটিকি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে গ্যাঁট হয়ে বসে। ‘খাওয়া-পরার মতো বেসিক ব্যাপারগুলির লগে আপনেগো বাঙালিয়ানার সরাসরি কোনো সম্পর্ক বা শত্রুতা নাই। কিন্তু আপনেগো দৈনিক পত্রপত্রিকায় গণতন্ত্র আর স্বৈরাচার—এই দুইটা জিনিস লইয়া এত এত লেখালেখি করে আর প্যাচাল পাড়ে সাংবাদিকেরা, মনে হয় যেন এই নিয়া লড়াই-ঝগড়া না করলে আপনাদের বাঙালিয়ানা বিপদে পড়বে। পত্রপত্রিকায় স্বৈরাচার—ব্যাপারটার সমালোচনা এমনভাবে করে, মনে হয় যেন হেগো টয়লেট হয় না ম্যালা দিন। আর গণতন্ত্র নিয়া এমন মরাকান্না—যেন গণতন্ত্র না হইলে আর বাঙালি থাকন গেল না।' টিকটিকি মোকামের দিকে সিরিয়াস চোখে তাকায়। ‘এই স্বৈরাচার বা গণতন্ত্র—ব্যাপারটা আসলে কী? এই দুই জিনিসের সম্পর্ক কি আদায়-কাঁচকলায়? একটায় থাকলে আরেকটা থাকতে পারে না? স্বৈরাচার দূর কইরা গণতন্ত্রের চর্চাই কি বাঙালি হবার একমাত্র উপায়?’

মোকাম আবারও দীর্ঘ সময় চুপ থাকে। তারপর একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্লেটের খাবারগুলো শেষ করে। ‘এই আলাপ আরেক দিন,’ ছোট করে বলে সে।

***

টিকটিকি এক হাতে তার লুঙ্গি উঁচু করে ধরে রুমজুড়ে পায়চারি করতে থাকে। অপর দিকে মোকামের খাওয়া একটু বেশিই হয়ে গেছে। সে চেষ্টা করে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসতে, এর জন্যও তার বেশ কসরত করা লাগে।

'দেখো টিকটিকি,’ বলে মোকাম চুপ হয়ে যায়। যেন অপ্রীতিকর কিছু একটা বলার জন্য মনে মনে কথা গোছায় সে। ‘এখানে যা কিছু ঘটছে...এখানে...আমার সামনে, তোমার-আমার মধ্যে...এগুলো তো...এগুলো তো স্বাভাবিক কোনো ঘটনা না। সচরাচর ঘটে না এ রকম।’

'কোনটা স্বাভাবিক ঘটনা না?’ টিকটিকি প্রশ্ন করে। ‘কী সচরাচর ঘটে না?’

'না, মানে এই যে,’ টিকটিকির পাল্টা প্রশ্নে মোকাম কিছুটা থতমত খেয়ে যায়। ‘এই যে ধরো তুমি একটা টিকটিকি, এত বড় সাইজের, মানুষের মতো দুপায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছ, কথা বলছ। এগুলো তো ঘটে না কখনো। ঘটেনি আগে কোনো দিন। শুনিনি কখনো কারও কাছে। বুঝব কীভাবে, যা দেখছি চোখের সামনে, তার সবই যে স্বপ্ন নয়?’

টিকটিকি ব্যস্তসমস্তভাবে এদিক-ওদিক তাকায়। যেন প্রমাণ একটা টেনিস বল, সেটা পড়ে আছে মেঝের ওপরে কোথাও। একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে।

'এই যে,’ টিকটিকি আসলেই একটা টেনিস বল খুঁজে পেয়েছে, এমন ভঙ্গিতে ইশারা করে মোকামের পায়াভাঙা খাটিয়ার দিকে। ‘এই যে আপনার খাটের পায়া ভাঙা, এইটাই প্রমাণ যে আপনে যা দেখতেছেন, তা বাস্তবেই দেখতেছেন। আমি উপর থিকা পড়ার সময় গড়ায়া গিয়া ধাক্কা খাইসি এইডার লগে। তারপর পায়া ভাইঙ্গা গেছেগা।’

'কিন্তু এটাও তো একটা স্বপ্ন হতে পারে। হতে পারে না, আমি স্বপ্নে দেখছি যে এই খাটের পায়া ভাঙা? ঘুম থেকে উঠে হয়তো দেখব, পায়া আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে।’

'উম্মম্মম্মম...হুম্মম্মম্মম্ম...’ টিকটিকিকে চিন্তিত মনে হয়। ‘কিন্তু এই যে আপনে সন্দেহ করতেছেন, তলায়া চিন্তা করার চেষ্টা করতেছেন যে আপনি যা দেখতেছেন, তা স্বপ্ন না বাস্তব, এইটাই তো বড় প্রমাণ যে আপনে জাইগা আছেন। স্বপ্নে তো মানুষ এতটা জটিলভাবে চিন্তা করতে পারে না।’

টিকটিকির উত্তরে মোকামকে খুশি মনে হয় না। মোকামের স্বপ্নগুলো এমনিতেই অনেক দীর্ঘ এবং জটিল। তার একবার ইচ্ছা জাগে ওকে প্রশ্ন করতে যে ব্যাটা তুই টিকটিকি হয়ে মানুষের স্বপ্নের কথা কীভাবে জানিস? তবে মোকাম মুখ খোলে না। চিমসানো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

'যা-ই হোক, আপনে এখন স্বপ্ন দেখতেছেন, না জাইগা আছেন—এইটা খুব একটা জরুরি বিষয় না, স্যার। মূল কথা হইল, আপনের লগে নানা বিষয়ে আমার খোলামেলা আলাপ চালায়া যাইতে হইবে। এইটাই এই মুহূর্তে সবচে জরুরি কাজ।’

'কেন?’ মোকাম টিকটিকির কথার কোনো লেজ-মাথা খুঁজে পায় না।

'আপনার সঙ্গে আমার আলাপ জরুরি, কারণ...’ টিকটিকি থেমে যায় হঠাৎ করে। ডুবে যায় গভীর চিন্তায়। খানিকক্ষণ কী ভেবেটেবে আবারও হাসিমুখে তাকায় মোকামের দিকে। ‘কারণ, আপনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।’

'গুরুত্বপূর্ণ? আমি?’ মোকামের ঠোঁটের কোণে কৌতুকমিশ্রিত হাসি ফুটে ওঠে।

টিকটিকি লুঙ্গিতে হাত মুছে হেঁটে এগিয়ে আসে মোকামের দিকে। অত্যন্ত আবেগমথিতভাবে তার দুহাত দিয়ে মোকামের দুহাত ধরে। চোখে চোখ রেখে তাকায় মোকামের দিকে। মোকামও সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে থাকে টিকটিকির চোখে, একটা লম্বা সময়। কুচকুচে কালো পুঁতি কেউ যেন ঠেসে ভরে দিয়েছে ওর চোখের গর্তে। পাপড়ি নেই। কিন্তু সেই ঘোর অন্ধকার যেন মোকামের দুচোখের রাস্তা দিয়ে অন্তরাত্মার ভেতরে ঢুকে সবকিছু পড়ে ফেলছে।

'আপনে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, আপনের কাম ইতিহাস ল্যাখা।' টিকটিকির নিকষ কালো চোখে মোকামের প্রতি স্পষ্ট শ্রদ্ধা। ‘আপনে ইতিহাস ল্যাখবেন, নতুন কইরা। টাইগারপাড়ার ইতিহাস। ঢাকা শহরের ইতিহাস। এই দ্যাশের ইতিহাস। আপনেগো বাঙালিত্বের ইতিহাস। আপনি এখনো টের পান নাই। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা খুব দ্রুত ঘুরতেছে।’

'বাঙালিয়ানা...’ মোকাম অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে, অভ্যাসবশত। তার চোখে ঘোর ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে টিকটিকি।

এমন সময় হঠাৎ করে মোকামের চোখ গিয়ে পড়ে শোকেসের আয়নায় ঝুলে থাকা তাদের দুজনের প্রতিবিম্বের ওপর। তার হাতে হাত, চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে একটা টিকটিকি। বিশাল টিকটিকি। জন্তুটার চোখে তার প্রতি শ্রদ্ধা। পরিহিত লুঙ্গির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা একটা লেজ লটরপটর করছে। আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে প্রথমে ফিক করে, একটু পর সজোরে হেসে ওঠে। মোকামের বেমক্কা হাসিতে চমকে ওঠা টিকটিকি কিছু বুঝতে না পেরে প্রথমে মোকামের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর সে-ও তাকায় শোকেসের আয়নায়। টিকটিকির ভেতরে কী হয়, তা সে নিজেই ভালো জানে। প্রথমে আস্তে আস্তে, একটু পর পুরো কামরা কাঁপিয়ে হেলেদুলে সে টিকটিক টিকটিক আওয়াজ করতে থাকে। মোকামের হাসি আর টিকটিকির টিকটিক আওয়াজ মোকামের ঘরের খোলা জানালা দিয়ে মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ে টাইগারপাড়ার পথেঘাটে। ছড়িয়ে পড়ে গোটা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরজুড়ে। চলবে