১০
৯ নভেম্বর ১৯৮৭, সকাল ৮টা ৩০
শরীর যদি হয় ক্লাসরুম, তবে মস্তিষ্ক তার ব্ল্যাকবোর্ড, আর চোখ-কান-ত্বক এসব হলো একেকজন মাস্টার মশাই। চারপাশে যা কিছু তারা দেখে, শোনে, অনুভব করে—মস্তিষ্কের ওপর ক্রমাগত তারই ছাপ ফেলতে থাকে। ইন্দ্রিয়সমূহের হস্তক্ষেপ ছাড়া মানুষের মস্তিষ্ক একটা ‘টেবুলা রাসা' বা শূন্য ব্ল্যাকবোর্ডমাত্র। মস্তিষ্কের এই কোলাহল শূন্য পরিস্থিতিকে পৃথিবীর কিছু কিছু ফ্রিঞ্জ ধর্মীয় সংগঠন মানুষের ইহলৌকিক জীবনের পবিত্রতম অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এবং ঈশ্বর আরাধনার সবচেয়ে উপযুক্ত মুহূর্ত হিসেবে ধরে নেয়। ‘অর্গাজম' বা চরম পুলকের মুহূর্ত এমন একটা সময়, যখন মানুষের মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য একদম শূন্য হয়ে যায়। সে সময়ে মস্তিষ্কে কোনো চেতনা থাকে না। আবেগ, অনুভূতি কিছুই কাজ করে না। ওই গোপন সংস্থার সদস্যরা মাঝখানে সংগমরত এক জোড়া নর-নারীকে রেখে গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে থাকে তাদের ধর্মের ঈশ্বরের কাছে। প্রার্থনারত মানুষগুলো ধরে নেয় যে সংগমরত দম্পতির অর্গাজমে উপনীত হবার ‘পবিত্র' মুহূর্তে তাদের প্রার্থনা পূরণ হয়।
সকালবেলা ঘুম ভেঙে প্রথম চোখ মেলবার পরও যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মানবমস্তিষ্কে একই রকম প্রভাস্বর শূন্যতা বিরাজ করে, সেটা কি গবেষকেরা জানে? মোকামের বয়স ত্রিশের কোঠায়, কিন্তু তার জীবনে ফার্স্টহ্যান্ড কোনো যৌন অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই চরম পুলকসংক্রান্ত তার সমস্ত জ্ঞানই পুঁথিগত বিদ্যা। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে দিয়ে সে হস্তমৈথুন করে। কিন্তু মাস্টারবেশন শেষে তার মন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা কিংবা অপরিচিত এক অপরাধবোধ অথবা এর সংমিশ্রণজাত কোনো অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, যার ফলে মস্তিষ্কে কোনো শূন্যতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না। সে গেল চরম পুলকের আলাপ। তবে ঘুম থেকে উঠবার পর তার যে দুনিয়াদারির সবকিছু বেভুলো লাগে একদম, এ ব্যাপারে সে শতভাগ নিশ্চিত। সকালবেলায় মস্তিষ্কের এ শূন্য, বিহ্বল অনুভূতি তেমন গ্ল্যামারাস কিছু নয় বলেই হয়তো এ সময়কার চিত্তের শূন্যতা নিয়ে তেমন আলোচনাও হয় না।
সদ্যই ঘুম ভাঙা মোকাম শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের ছাড়া ছাড়া ঘুম, দিনমান ঝিমুনি পেরিয়ে আজ শেষ রাতে চোখ লেগে আসার পর যেটা হলো, তাকে বেশ গভীর ঘুমই বলা চলে। মোকামের ফ্রেশ লাগে, ঝাড়া হাত-পা অনুভূত হয়। শীতকাল। ফ্যান বন্ধ। বন্ধ ফ্যানের শরীরে ময়লা আর ঝুল। কে জানে কত দিন ঝাড়পোঁছ করা হয়নি। পরিষ্কার করা দরকার। জানালার গরাদ পেরিয়ে মেঝের ওপর বাঁকা হয়ে শুয়ে থাকা একচিলতে রোদের দৈর্ঘ্য দেখে বোঝা যায়, বেলা বেশি দূর এগোয়নি। ঘড়ির কাঁটায় আটটা-সাড়ে আটটা হয়তো। কামরার মেঝেতে শীতলপাটির মতো এলিয়ে পড়ে থাকা সকালের মিষ্টি-বর্ধিষ্ণু রোদ মোকামের শরীরে পুনরায় আলস্যের আবেশ এনে দেয়। তার স্নায়ুর পরতে পরতে তখনো ঘুমের মাদকতা জড়ানো। গায়ের ওপর থেকে সরে যাওয়া পাতলা কাঁথাটা মোকাম আবার টেনে আনে বুকের ওপর। চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ চোখের পর্দার ওপর সিনেমার রিল ফেলবার মতো করে ভেসে ওঠে মৌলীর ধারালো, আবেদনময় চেহারা। যে চেহারার ধার গতকাল রাতে ঘুমের অপেক্ষায় বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে থাকা মোকামের মনকে ফালা ফালা করে কেটেছে। তাকে জাগিয়ে রেখেছে প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত। সে স্মৃতি স্মরণে আসামাত্র মোকাম শরীর থেকে কাঁথা সরিয়ে একঝটকায় উঠে বসে। আড়মোড়া ভেঙে মাথা থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে চায় মৌলীর চিন্তা। তাতে খুব একটা লাভ হয় না। মশারি থেকে বাইরে বেরোতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ে যে খাটের যেদিকটা দিয়ে সে মশারির ভেতর ঢোকে কিংবা বের হয়, সেদিকের মশারি খোলা। মোকামের ভ্রু কুঁচকে যায়। মশারির ভেতরে ঢুকে যত্ন করে জাজিমের নিচে মশারি গুঁজে না দিলে মশারির ভেতরেও সারা রাত মশার তাণ্ডব চলে। কাজেই ঘুমানোর আগে সে মশারি গোঁজেনি, এমনটা হওয়ার কথা নয়। রাতে কি সে বিছানা ছেড়ে উঠেছিল? উঠলে কখন?
বাথরুমের ঘষা কাচের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে মোকামের প্রবল ইচ্ছা জাগে, নিচে, বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারে গিয়ে সকালের নাশতাটা সারতে। ওদের ছোট ছোট, হাতের ছড়ানো তালুর সমান পরোটার সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া ডালভাজি মিক্সড আর হালুয়া খেতে। সঙ্গে যদি মুরগির গিলাকলিজা পাওয়া যায়, তবে তো আর কথাই নেই। কিন্তু ঠান্ডা পানি দিয়ে কুলকুচো করতে করতে ওর সে ইচ্ছা আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে যায়। পয়সাকড়ির টানাটানি একটা বিষয়। একই সঙ্গে এই সাতসকালে নাশতা খাওয়ার জন্য নিচে যাওয়া আরেক হ্যাপা। মোকাম সিদ্ধান্ত নেয় আপাতত একখানা ডিমসেদ্ধ দিয়ে সকালের নাশতা সারার।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে কামরার ছোট টেবিলটার ওপর চোখ যাওয়ামাত্রই মোকাম ধাক্কা খায়। টেবিলের ওপর একটা প্লেট এবং ছোট ছোট দু-তিনটে বাটি ঢেকে রাখা। মোকাম পেটভর্তি খিদে আর মনভর্তি বিস্ময় নিয়ে এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে। ঢাকনাগুলো একে একে উল্টে দেখে, প্লেটের ওপর তিনটা পরোটা, আর বাটিগুলোর একটায় মুগডাল, অন্যটায় সবজি এবং সবশেষটায় মুরগির গিলাকলিজা। কোথা থেকে এল এ সমস্ত খাবার? এতগুলো আইটেম দিয়ে শেষ কবে মোকাম নাশতা করেছে, তা তার মনে নেই। ভালো লাগবার বদলে মোকামের মনে এক পরিচিত দুশ্চিন্তা ফিরে আসে। টেবিলের সামনে পেতে রাখা চেয়ার টেনে সে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে।
ঠিক এমন সময় রান্নাঘর থেকে সাইরেনের আওয়াজের মতো হেঁড়ে গলার ‘সা রে গা মা পা ধা নি সা' ভেসে আসে। সঙ্গে বেসুরো হারমোনিয়ামের প্যাঁ পোঁ আওয়াজ। রান্নাঘরে হারমোনিয়াম একটা আছে বটে। মায়ের স্মৃতিবিজড়িত এ যন্ত্রটি মোকামের ফেলে আসা শৈশবের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী সেতু। তাই নষ্ট হয়ে গেলেও মোকাম ফেলে দেয়নি যন্ত্রটা। তুলে রেখেছিল রান্নাঘরের ওপরের তাকে। এই বাতিল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সাতসকালে গলা সাধছে কে? একটা উত্তরই জলঢোঁড়া সাপের মতো ভুশ করে জেগে ওঠে মোকামের মাথায়, কিন্তু সেভাবে মোকামের চিন্তা করতে ইচ্ছা করে না। বহুদিন পর এক সুন্দর দিনের শুরু। মোকাম চায় না গতকালের মতো কিম্ভূতকিমাকার কিছু ঘটনায় আজকের দিনের এ সুন্দর শুরুয়াদও নষ্ট হয়ে যাক। অবশ্য মানুষের আকাক্সক্ষার সঙ্গে বাস্তবের ঘটনাপ্রবাহের মিল থাকে সামান্যই। মোকাম গালে রাখা হাত টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতে না রাখতেই অত্যুৎসাহী টিকটিকি নিজে থেকে লাফাতে লাফাতে এসে হাজির হয় মোকামের সামনে। গতকালের লুঙ্গি আর গেঞ্জির ওপর শরীরে একটা চটের বস্তা জড়ানো।
'শীত লাগে, স্যার,’ একগাল হেসে গায়ে চটের বস্তা জড়ানোর ব্যাখ্যা দেয় সে। ‘যদিও আমরা শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী, কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা হবার পর থিকাই আমারও রক্ত গরম হইবার লাগছে। ফলে এখন শীতে শীত আর গরমে গরম লাগবার শুরু হইছে।’
মোকাম জোরে জোরে কয়েকবার চোখ কচলায়। একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। একবার আলো-আঁধারিঘেরা বাথরুমের ভেতরে চোখ রাখে। তারপর আবার সোজাসুজি তাকায় টিকটিকি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে। জন্তুটা এখনো তার সামনে দাঁড়ানো। লেজ নাড়াচ্ছে—ডান থেকে বামে, আবার বাম থেকে ডানে। কিছু একটা হিসাব মেলে না মোকামের মাথার ভেতর। ছেলেবেলায় করা পৌনঃপুনিকের অঙ্ক না মিললে মাথার ভেতর একটা ভোঁতা যন্ত্রণা কাজ করত। মুখটা তিতকুটে স্বাদে ভরে যেত। টিকটিকির সামনে দাঁড়িয়ে মোকামের পুরোনো সেসব স্মৃতি ফিরে আসে। কী সুন্দর একটা ঘুম দিয়েই না উঠল সে। শরীরটাও বহুদিন পর বেশ ফ্রেশ লাগছিল...
'আমারে এখনো আপনার চোখের ভ্রম বইলা মনে হইতেছে, স্যার?’ টিকটিকির প্রশ্নে মনখারাপের সুর। ‘যাউক, আমি আসলেই আছি, না আমি আসলে আপনার ঘুমহীন মস্তিষ্কের কল্পনামাত্র—এই নিয়া আপনের কনফিউশন দূর করা আমার পক্ষে সম্ভব না।’
টিকটিকির হাতে এতক্ষণ একটা বই ছিল, মোকামের চোখে পড়েনি। বইটা সে মোকামের সামনে তুলে ধরে দেখায়— 'আপনার পুরানা ট্রাংকের ভিতরে এই বইখান পাইলাম।’
রংজ্বলা সবুজ বইটার নাম ছোটদের সা রে গা মা। লেখক মুনশি রইসুদ্দিন। বইটা ওস্তাদজি ছোটদের জন্যই লিখেছেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর থেকে উপকার অর্জন করতে সক্ষম প্রায় সব বয়সের সংগীতানুরাগী মানুষ। মোকামের মায়ের দৈনন্দিন রেওয়াজের সঙ্গী ছিল বইটি। প্রায় বিলীন হয়ে আসা দুঃখী মায়ের স্মৃতি মস্তিষ্কের গহিন হতে উঠে আসায় মোকামের মন আর্দ্র হয়ে আসে। তবু কণ্ঠে কিছু বিরক্তি নিয়েই সে টিকটিকিকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি আমার ট্রাংক ঘাঁটাঘাঁটি করছ কেন?’
'রাগ করলেন, স্যার?’ টিকটিকিকে বিব্রত দেখায়। ‘ট্রাংকের ভিতরে পুরানা কিছু বইপত্র ছাড়া দামি বা দরকারি তেমন কিছু তো দেখলাম না। আর ট্রাংক খোলার পরই যে ভ্যাপসা গন্ধ আইসা নাকে ধাক্কা দিল, দেইখা মনে হয় নাই যে আপনে গত প্রায় দশ বছরে একবারও এইটা খুলছেন। তাই আমি বাইর কইরা কিছু কিছু বই উল্টায়া-পাল্টায়া দেখলাম। এই বইটা খুঁইজা পাইলাম ভোরবেলা নাগাদ। তখন আপনে মনের সুখে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছেন।' টিকটিকি আবারও বইটা তুলে ধরে মোকামের মুখের ওপর। বইয়ের প্রচ্ছদে মুনশি সাহেব একগাদা বাচ্চাকে নিয়ে বসে সরগম শেখাচ্ছেন। মোকাম মনে মনে কল্পনা করে—এই বাচ্চাগুলোর পাশে টিকটিকিও বসে আছে। খুব গম্ভীরভাবে রেওয়াজ করছে— 'সারেগা রেগামা গামাপা...’ ইত্যাদি। মোকাম ফিক করে হেসে ফেলে।
'এই মহল্লায় তো গানবাজনার ভালোই চল,’ টিকটিকি মোকামের হাসিকে পাত্তা দেয় না। ‘প্রতিদিন সকালে বেশ কয়েকটা বাসা থিকা রেওয়াজের আওয়াজ ভাইসা আসে। ওইখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়া নিজেই সকাল সকাল একটু পেকটিস করলাম। দেখেন, হয় কি না—
সারে রেগা গামা
রেগা গামা মাপা
গামা মাপা পাধা
মাপা পাধা ধানি
পাধা ধানি নিসা’
আরোহণ শেষ হলে একইভাবে অবরোহণও ঠিকঠাক গেয়ে শোনাল টিকটিকি। মোকাম মোটামুটি বিস্মিত হয়ে গেল ওর দক্ষতায়। কণ্ঠ হেঁড়ে, খুব একটা সুরেলাও নয়, কিন্তু প্রতিটা নোট একদম ঠিকঠাক লাগিয়েছে সে। এক বেলার রেওয়াজই এই অবস্থা, তায় আবার কোনো গুরুর কাছে নাড়া না বেঁধেই!
'নাশতা শুরু করেন, স্যার। সকাল সকাল আপনের জন্য বিক্রমপুর হোটেলের গরম নাশতা লয়া আনছি।' টিকটিকির সংগীত প্রতিভায় বিমূঢ় মোকামকে ঘোর থেকে টেনে তোলে টিকটিকি। নাশতাও ওর নিয়ে আসা? যাব্বাব্বা!
'তুমি খাবে না?’ ডালভাজি আর মুরগির গিলাকলিজার বাটি কাছে টেনে নিতে নিতে প্রশ্ন করে মোকাম টিকটিকিকে।
'আমার ঘন ঘন খিদা পায় না, স্যার,’ এই বলে সে একটু বিরতি নেয়। কী যেন চিন্তা করে। তারপর তার চিন্তালব্ধ হাইপোথিসিসের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে, ‘ঘন ঘন খিদা আসলে মানুষেরও পায় না। মানুষের হইল গিয়া চোখের খিদা। আমাগো চোখের খিদা নাই। তাই প্রয়োজনের বাইরে আমরা খাই না কিছু। একটু স্মরণ কইরা দেখেন, বড়সড় টিকটিকি জীবনে দেখছেন হয়তো, কিন্তু কোনো দিন কোনো বিশাল ভোটকা টিকটিকি দেখছেন? বাজি ধইরা কইতারি, দেখেন নাই।' আবারও একটু বিরতি নিয়ে সে বলে, ‘গতকাল রাতেই তো প্যাট ভইরা ডিম-খিচুড়ি খাইলাম আপনের লগে। প্যাট এখনো ভরাই আছে। যাক, ধইরা দেখেন, স্যার, পরোটাগুলি এখনো গরম থাকার কথা। বহুত আগে ভাজা ঠান্ডা পরোটা গছায়া দিবার চাইছিল। আমি শালার কলার ধইরা পাছায় একখান লাত্থি দিয়া কইছি তাওয়া থেকে মাত্র তেলে ভাইজা তোলা গরম পরোটা দিতে।’
মোকাম টিকটিকির কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ পরোটা আর মুরগির গিলাকলিজা চিবাতে থাকে। হোটেলে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করা তার স্বভাব নয়। সাধারণভাবে তার সামনে যা পরিবেশন করা হয়, সে তা-ই খায়। তাদের মহল্লার অধিকাংশ হোটেলের মালিক তাদের বাবুর্চি ধরে রাখতে পারে না। বেশি বেতনের লোভে বাবুর্চিরা ঘন ঘন কর্মস্থল বদলায়। কাজেই রুটি-পরোটার পুরুত্ব ও সাইজ থেকে নিয়ে ডাল-সবজি, মুরগির স্যুপ কিংবা গিলাকলিজা, এমনকি ডিম মামলেটের স্বাদ পর্যন্ত কিছুদিন পরপরই বদলে যায়। কোনো দিন পরোটা রবারের মতো স্থিতিস্থাপক হয়, টেনে ছেঁড়া যায় না। কোনো দিন তা আবার এত তেল-জবজবে হয় যে এক লোকমা গেলামাত্র গ্যাসের যন্ত্রণায় বুক জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। আবার কোনো দিন সবকিছু ঠিকই থাকে, তবে পরোটার সাইজটা এত ছোট হয়ে যায় যে একসাথে তিন-চারটা খেলেও পেট ভরে না। কোনো দিন সবজির ওপর এক আঙুল পরিমাণ তেল মেশানো পানি ভেসে থাকে। কিন্তু মোকাম উচ্চবাচ্য করে না কখনো। ঝামেলা ছোট হোক কি বড়, ব্যক্তিগত হোক কিংবা সামাজিক, খানাখাদ্য নিয়ে হোক বা বাসাবাড়ি, অফিস-সংক্রান্ত—কোনো বিষয়েই গলা উঁচিয়ে চেঁচানো তার ধাতে নেই। এমনকি যখন তার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কারও দ্বারা, তখনো। তবে যাদের গলা চড়া তানে বাঁধা, যারা চেঁচিয়ে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে পারে বা সমস্যার সমাধান করতে পারে, মোকাম মনে মনে তাদের শ্রদ্ধা করে। তাদের মতো হতে চায়, কিন্তু পারে না।
'তুমিই তাহলে গলা সাধছিলে এতক্ষণ?’
'চেষ্টা করতেছি, স্যার, যদিও হইতেছে কি না কিছু, জানি না।' বিনয়াবনত কণ্ঠে টিকটিকি বলে।
বাঙালিয়ানা রপ্ত করবার পথে টিকটিকির উন্নতি বেশ দ্রুতগতিতেই হচ্ছে। বাঙালির ঘরে ঘরে একসময় সাতসকালে রেওয়াজের ধ্বনি ভেসে আসত, তা বোধয় ব্যাটার জানা নেই। জানা থাকলে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্তে রেওয়াজে বসার সঙ্গে শাশ্বত বাঙালির অভ্যাসগত মিল খুঁজে পাওয়ার খুশিতে হয়তো নগদে দুটো ডিগবাজি দিত।
টিকটিকি মেঝেতে আসন গেড়ে বসে সুর ভাঁজতে থাকে—
আলবেলা সাজান আয়ো রে
মোরা আত মানা আসুখা পাওরে
আলবেলা সাজান আয়ো রে
মোকাম ভেতরে-ভেতরে চমকে ওঠে টিকটিকির কণ্ঠে রাগ আহির ভায়রোর এই ত্রিতালের বন্দেশ শুনে। জানতে ইচ্ছা করে এ বন্দেশ ও শুনল কোথায়, আর কণ্ঠে তুললই-বা কীভাবে। ভোরে রেডিও ছাড়লে ওস্তাদ মিথুন দের কণ্ঠে এই রাগের পরিবেশনা মোকাম শুনেছে আগে। আজও কি গাইলেন তিনি? টিকটিকি সেখান থেকেই শুনেছে হয়তো। বড়ই রুচিশীল, সংস্কৃতিমান টিকটিকি।
'ওস্তাদজির কণ্ঠেই রেডিওতে প্রথম শুনছি এইটা,’ টিকটিকি গাওয়া থামিয়ে বলে।
'কোন ওস্তাদজি?’ মোকাম হকচকিয়ে যায়।
'ওস্তাদ মিথুন দে,’ বিস্ময়াভিভূত মোকামকে উদ্দেশ করে টিকটিকি বলে চলে। ‘উচ্চাঙ্গসংগীতের উপরে একটা বড় আলোচনা শুনলাম আইজকা ভোরবেলা, রেডিওতে। আপনে তখন জবর একখান ঘুম দিছেন। উপস্থাপিকা বেডি খুব তাজিমের লগে আলাপ করলেন এই বিদ্যা লইয়া। ওস্তাদজি আফসোস কইরা কইলেন, ঘরে ঘরে এখন উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা নাই বইলাই দেশের উন্নতি হইতেছে না।’
'ঘরে ঘরে উচ্চাঙ্গসংগীত প্র্যাকটিস হয় না বলে দেশে উন্নতি হচ্ছে না?’ মোকাম অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করে।
'তাই তো কইলেন তেনারা।’
'ওই তো,’ মোকাম নিরাসক্ত কণ্ঠে বলে, ‘সবাই সবার কর্ম করে খাওয়ার বিদ্যাকে সমাজের জন্য অনন্য-অতীব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।’
'তা এই বিদ্যারে উচ্চাঙ্গসংগীত কেন কয়?’ টিকটিকি লেজের ডগা দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে প্রশ্ন করে। ‘শরীরের উচ্চ অঙ্গ, তথা মুখ দিয়া গীত হয় বইলাই কি এই সংগীতরে উচ্চ অঙ্গের সংগীত বলে?’
মোকাম এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। মনোযোগ দিয়ে মুগডাল ঘুঁটে চলে আঙুল দিয়ে। পাশে সবজির বাটিতে সবজি দেখা যাচ্ছে না তেলে-ঝোলে ডুবে থাকার কারণে। টিকটিকি পরোটার হিসাব-নিকাশ বুঝলেও সবজির ব্যাপারটা বোঝেনি। তেল-পানিতে আধেক ডোবা সবজির পুঁটুলি গছিয়ে দিয়েছে ওকে।
'এই উচ্চাঙ্গসংগীতও কি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ?’ আগের প্রশ্নের উত্তরে মোকামের নীরবতা দেখে টিকটিকি প্রসঙ্গান্তরে যায়।
টিকটিকির এই প্রশ্নে মোকাম খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়। এই বাড়িতে ভোরবেলা রেওয়াজ সর্বশেষ শোনা গেছে তার মায়ের কণ্ঠেই। প্রতিদিন সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি সবার আগে রেওয়াজে বসে যেতেন। মোকাম যখন অনেক ছোট, সে দিনগুলোতে মোকামের ঘুম ভাঙত মায়ের রেওয়াজের শব্দে। মোকাম মুগডালের বাটির কিনারে ঘষে আঙুলে লেগে থাকা তেলটুকু কাচিয়ে ফেলার পর আঙুল চুষে নেয়। এই করতে করতে সে ভাবে, আজীবন এক কামরার দেয়াল থেকে আরেক কামরার দেয়ালে ঝুলে ঝুলে দিন গুজরান করা টিকটিকিকে সে কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে উচ্চাঙ্গসংগীতের সম্পর্কের মতো একটা জটিল বিষয় বোঝাবে। শেষমেশ চিন্তাগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে সে নিজের মতো করে শুরু করে।
'উচ্চাঙ্গসংগীত প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত,’ মোকাম মুগডালের বাটিতে আঙুল নাড়তে নাড়তেই বলতে থাকে। ‘শাস্ত্রীয় সংগীত বলা হয়, কারণ, এটা একটা আলাদা শাস্ত্র, আলাদা একটা বিদ্যা। আর এর জন্মের ইতিহাসও অতি পুরোনো। তখনো ইংরেজরা আসেনি। দেশভাগ হয়নি। আফগানিস্তানের সীমান্ত থেকে আরাকান সীমান্ত পর্যন্ত পুরোটাই ভারতবর্ষ। ফলে এটার উৎসকে আলাদাভাবে ভারতের কোনো একটা অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে জুড়বার বদলে পুরো অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করাটাই শ্রেয়। সবাই যে যার মতো করে ধারণ করেছে এই বিদ্যাকে, এই সংগীতের উন্নয়নে সংযোজন-বিয়োজনও করেছে যে যার সাধ্যমতো। বাংলার কবিতা-সাহিত্য-চিত্রকলা-নাটক-সিনেমা-ভাস্কর্য—সবকিছুই ইংরেজ বা ইউরোপিয়ানদের থেকে ধার করা। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীত এ অঞ্চলের একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। আমরা গর্ব করতে পারি এই বিদ্যাটাকে নিয়ে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে শত শত বছর ধরে বাংলা অঞ্চলে উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা হয়ে এসেছে। এটা বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ।’
'কিছু কিছু শব্দ নতুন কানে ঠেকল, তবে সেগুলির মানে কিছুটা আন্দাজ কইরাই নিতেছি অখন। এই ধরেন ইংরেজ, ইউরোপিয়ান কিংবা দেশভাগ। আমার আগ্রহের বিষয়টা আসলে এগুলি না। আমি আসলে জানতে চাই যে,’ এই বলে টিকটিকি থম মেরে যায়, যেন সে নিজেও ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছে না যে সে কী বলবে। মোকাম হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকে টিকটিকির দিকে। তার প্লেটে এখনো আধখানা পরোটা পড়ে আছে এবং টিকটিকির এই আলাপ সিরিয়াস দিকে মোড় নেওয়ার আগপর্যন্তও তার মনে কেবল চিন্তা ছিল এই যে এক গ্লাস চায়ে পরোটাটা ডুবিয়ে খেতে পারলে সকালবেলাটা পরিপূর্ণ হয়ে উঠত।
'ধরেন, আমি আসলে জানতে চাই যে,’ টিকটিকি তার আগের অসমাপ্ত বাক্যের পুনরাবৃত্তি করে, ‘যে ভাষায় গাইলাম, কী জানি বলে এইটারে, রেডিওতে শুনলাম, হ্যাঁ, বন্দেশ, উচ্চাঙ্গসংগীতের বন্দেশ, ওই যে “আলবেলা সাজান আয়ো রে" —এইটার কথা তো বাংলা ভাষায় লেখা হয় নাই, তাই না?’
মোকাম ওপরে-নিচে মাথা নাড়ে, ‘হিন্দি ভাষায় লেখা এ বন্দেশ।’
'তো যেই বিদ্যা বা যেই শাস্ত্র আপনেগো সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেইটা আপনারা বাংলায় চর্চা করেন না কেন?’
মোকাম হকচকিয়ে যায় টিকটিকির প্রশ্নে।
'ভারতে সবাই কি এই উচ্চাঙ্গসংগীতশাস্ত্র এই ভাষাতেই পেকটিস করে?’ টিকটিকি আবারও প্রশ্ন করে। ‘কী জানি ভাষাটার নাম বললেন মাত্র?’
'হিন্দি,’ মোকাম মিনমিন করে উত্তর দেয়।
'ভারতে সবাই কি হিন্দি ভাষাতেই উচ্চাঙ্গসংগীত গায়?’
'না বোধয়,’ মোকাম একটু ভেবে উত্তর দেয়। ‘দক্ষিণ ভারতে তো শাস্ত্রীয় সংগীতের আলাদা একটা ধারাই আছে। মারাঠি, গুজরাতি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবিরাও যে যার মাতৃভাষাতেই উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা করে।’
'তাইলে আমারে স্যার আপনে কাইন্ডলি এইটা বুঝাইয়া বলেন,’ টিকটিকি তার লেজ হাতের মুঠোয় নিয়ে আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে সরু বানাতে থাকে। ‘যে শাস্ত্রীয় সংগীতরে আপনেরা আপনাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন, সকাল সকাল যেইটা চর্চা কইরা আপনারা বাঙালি হয়া উঠেন, সেইটা আপনেরা আপনেগো মুখের ভাষা বাংলায় কেন পেকটিস করেন না?’
মোকাম বাক্রুদ্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ আলাপ ডানে-বামে ঘুরিয়ে, নানা কথাবার্তা বলে টিকটিকি অবশেষে মোক্ষম প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছে তার দিকে। সত্যিই তো, বাঙালির ভাষা নিয়ে গর্বের শেষ নেই। ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে এই দেশের মানুষ। ঠাকুরকে বুকে আগলে রাখতে আইয়ুব শাহি জালিমশাহির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছে তারা। এই বাংলাদেশে বটমূলের দখল নিল যারা, নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান ধারক-বাহক-পৃষ্ঠপোষকের তখতে সমাসীন করল যারা, তারাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের কালচারের সঙ্গে আমদানি করল বিমাতার ভাষায় উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা। এর বাংলায়নের কোনো জরুরত তারা অনুভব করল না কখনো?
'এটা ঠিক যে উচ্চাঙ্গসংগীত হিন্দি ভাষায় আমরা চর্চা করি,’ মোকাম আমতা-আমতা করে নিজের মতো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। ‘কিন্তু উচ্চাঙ্গসংগীত ভেঙে অনেক রাগপ্রধান বাংলা গানও আমরা বানিয়েছি।’
'রাগপ্রধান গান আবার কী? ওইটাও উচ্চাঙ্গসংগীত?’
'উমমম, না, উচ্চাঙ্গসংগীত না, তবে উচ্চাঙ্গসংগীত ভেঙেই রাগপ্রধান গান বানানো হয়।’
'উচ্চাঙ্গসংগীত ভাইঙ্গা রাগপ্রধান গান বানানো হয়?’ টিকটিকি সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় মোকামের দিকে। ‘তাইলে ওই রাগপ্রধান গান কি উচ্চ অঙ্গ দিয়া গায়, নাকি নিম্ন অঙ্গ দিয়া গায়?’
মোকাম বুঝে পায় না এই প্রশ্নের কী উত্তর হবে বা হওয়া উচিত।
'কই, শোনান না দেহি একটা।’
টিকটিকির অনুরোধে মোকাম টিকটিকিকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে গান শুনতে পছন্দ করে, কিন্তু গাইতে পারে না। টিকটিকি অবশ্য তার যুক্তি মানতে রাজি হয় না। সে জবরদস্তি করতেই থাকে। অগত্যা মোকামকে গুনগুনিয়ে উঠতে হয়—
জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি
গলি দিয়ে চলে যায়, লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি...
ঠিক এমন সময় কেউ দরজার কড়া নাড়ে—ঠক ঠক ঠক। মোকাম চমকে উঠে গান থামিয়ে দেয়।