বেন ওকরির গল্প

ব্রিজের নিচে অট্টহাসি

তখন দিনগুলো বেশ দীর্ঘ ছিলো। আমরা ঘাসের ওপর বসে অপেক্ষা করতাম কখন বোমা পড়বে। আমাদের সাময়িকী পরীক্ষা শুরুর আগেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আমাদের বোডিং স্কুল তখন চটজলদি ফাঁকা হয়ে যায়। শিক্ষকরা দ্রুত চলে যান। ইংরেজি প্রধান শিক্ষক বাড়িতে পালিয়ে গেছেন, এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিলো। এমনকী প্রথম উড়োজাহাজটি মাথার ওপর দিয়ে যাবার আগেই রান্নাঘরের বাবুর্চিরা সব পালিয়ে গেছে। বাবা-মা এসে তাদের বাচ্চাদেরকে নিয়ে চলে যান। সেদিন আমরা কেবল তিনজন বাকি ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম কেউ না কেউ তো এসে আমাদের নিয়ে যাবে। বেশিরভাগ সময় আতঙ্কে চুপ করে ছিলাম।

হঠাৎ আকাশে শকুন দেখা যায়। সেগুলো কিছুদিন স্কুল ক্যাম্পাসের উপরে চক্রাকারে ঘুরেছে। সন্ধ্যাবেলা কিছু ধর্মভীরু লোককে দেখা যেতো। তারা ফাঁকা ক্যাম্পাসে হাঁটতো এবং বলতো পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে, বিচার দিবস আর বেশি দূরে নেই। আর তারপর শহর থেকে উচ্ছৃঙ্খল লোক এসে বিদ্রোহী উপজাতি লোকদের খুঁজতো। তারা গির্জার দরজাগুলো ভেঙে ফেলেছিলো এবং গির্জার মূর্তি ও মখমলের পর্দা লুট করেছিলো, এমনকী তারা খ্রিষ্টের বিবর্ণ মূর্তিটিও নিয়ে গিয়েছিলো। সকালবেলা আতঙ্কিত আইরিশ পুরোহিতকে তার বাইসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছিলাম আমরা। তিনি চলে যাওয়ার পর গির্জায় অন্ধকার নেমে আসে। এক রাতে আমরা গির্জার বেদী ধসে পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেয়েছি। পরদিন দেখি গির্জার দেয়াল বেয়ে টিকটিকি ওঠছে।

আমরা তখন ছাত্রাবাসে থাকতাম। গ্রামের মাঠে খাদ্যের জন্য আমরা শাক-সবজির বীজ রোপণ করেছিলাম। আমরা পাম গাছের নিচ থেকে তাড়িওয়ালার মদও চুরি করেছিলাম। এমনকী  রান্নাঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সিদ্ধ ডিম, সার্ডিন মাছ এবং পুরোনো বাসি রুটি চুরি করে নিয়ে আসতাম। আমরা দিনের বেলা স্কুলগেটের কাছে ঘাসের ওপর বসে অপেক্ষা করতাম; চেয়ে থাকতাম আমাদের বাবা-মা আসে কিনা। মাঝে মধ্যে আমরা পশুর খাবার আনতে শহরে যেতাম। তখন আমরা বোমা হামলা নিয়ে আলাপ করতাম, যেগুলো প্রায়ই আমাদের কানে ভেসে আসতো। একদিন শহরের একমাত্র বেকারি থেকে রুটি চুরি করে আনার পরে আমরা ছাত্রাবাসে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি সেই টিকটিকিগুলো—আমাদের দ্বিতল বিছানার ওপর, এমনকী কাপ বোর্ডের ওপর এতো পরিমাণে ছড়িয়ে ছিলো যে, সেখানে থাকা কিংবা ঘুমানো আমাদের জন্য সম্ভব ছিলো না। সারাদিন আমরা বোমা পড়ার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। পুরোটা সময় মনিকাকে আমার মনে পড়েছিলো।

মনিকা অনেক ছোটো ছিলো; তখন আমি কেবল একা একা প্রস্রাব করতে শিখেছি। যখন আমি প্রথম লজ্জাস্থান ঢাকতে শিখি, সে তার লম্বা লম্বা পা নিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াতো একটা বন্য-সুন্দর বিড়ালের মতো। সে অনেক দস্যি মেয়ে ছিলো। নাপিতের দোকান, রাস্তার পাশের খাবারের দোকান এবং পুল অফিস ক্ষয়ক্ষতি করার বিশেষ খ্যাতি ছিলো তার। একবার আমাদের শহরের নদীতে ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সে প্রায় ডুবেই গিয়েছিলো। আমার মনে পড়ে ছেলেগুলো ওকে কর্দমাক্ত পানির মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো। তখন মনিকার মুখ বিবর্ণ হয়েছিলো, মনে হচ্ছিল সে নিজের শরীর আর নিতে পারছে না। তারপর থেকে মনিকা মুখোশসহ পোশাক পড়ে চাবুক হাতে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো, ঠিকমতো নাচতে না পারার জন্য মুখোশধারী নর্তকীদের ধমকা-ধমকি করতো। সে আমাদের যৌনতার ট্যাবু ভেঙে দিয়েছিল; সব লোকদের দেখিয়ে সে রাস্তার মাঝখানে মুখোশসহ পোশাক পরে নাচত। সে এতো ভালো নাচতো যে, কৃপণ দর্জিওয়ালা এবং পুল-দোকানের মালিক আমাদেরকে খুচরো পয়সা দিতো। মনে পড়ে, ছুটির সময় এক রাতে আমি বাইরে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং সহজেই পেছনের উঠান পেরিয়ে যাই। হঠাৎ দেখলাম গাছগাছালীর ঝোপের কাছে সে রাতের বেলা গোসল করছে; তখন জ্যোৎস্না রাত ছিলো। যখন টিকটিকিগুলো ছাত্রাবাস থেকে তাড়া করে আমাদেরকে বের করে দিয়েছিলো, তখন আমার মনে হয়েছে এটা ওর-ই নতুন একটা আকৃতি। যখন যুদ্ধ প্লেনের ভয়ানক শব্দ চারপাশ কাবু করে ফেলতো, তখন বারবার ওর-ই কথা মনে হতো, এ যেন ওর-ই একটা নতুন রূপ।

আমি জানি না, কেন আমার কাছে সেটা একটা সুন্দর সময় ছিলো। চারপাশে এতো বেশি সাইরেন আর আগুন নেভানো গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ থাকতো যে, আমার মনে হত যেনো দেশের কোথাও বড় উৎসব চলছে। আমরা দেখেছিলাম, এক লোককে আক্রমণকারীরা ধরেছিলো। তারা ওর মাথায় কাচের বোতল দিয়ে আঘাত করে এবং সব কাঠের লাঠি ভেঙে ফেলেছিলো। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। সেই সময়টা আমার কাছে সুন্দর মনে হতো। তার একটা কারণ হতে পারে যে, আমরা বেশিরভাগ সময় স্কুলের মাঠে বসে থাকতাম; সেখান থেকে সাতটি পাহাড় দেখা যেতো—দূর থেকে মনে হতো সেগুলো ভূগর্ভে পোঁতা কালচে-সবুজ স্তম্ভ; কারণ আমরা কাঁদছিলাম না। একদিন আমরা খাবার খুঁজে বাড়ি ফিরছিলাম, দেখলাম মাঠের মাঝখানে কে যেনো কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কাছে এগিয়ে যাই। তবুও অবয়বটি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেখলাম তিনি আমার মা। তিনি আমাদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু  আমাকে চিনতে পারেননি। ভয় মানুষকে বিহ্বল করে দেয়। অবশেষে যখন তিনি আমাকে চিনতে পারলেন, আমাদের তিনজনকেই একসঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন, যেন আমরা একটি পরিবার।

মা আমাদের কিছু খেতে দিলেন। খাওয়া শেষ হলে তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার বন্ধুদেরকে নিয়ে যেতে পারছিনা।’

মা জীর্ণ মুখে আরো বললেন, ‘আমি এতটাও খারাপ মানুষ না যে, এই অসহায় বাচ্চাগুলোকে রেখে চলে যেতে পারব। আমার কারণে যদি ওরা আক্রমণকারী সৈনিকদের হাতে পড়ে, তাহলে আমি মরেও শান্তি পাব না।’

আমি কিছুই বুঝিনি। আমি আমার বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা শুরু করলাম। মা ওদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমাদেরকে অবশ্যই তোমাদের বাবা-মা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে; অথবা প্রথম যিনি আসবেন, তার সঙ্গে তোমরা দুজনই চলে যেও। ব্যবস্থা করতে পারবে না?’ ওরা মাথা ঝাঁকাল। মা অনেকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন; তারপর কেঁদে ফেললেন।

মা যেসব খাবার এনেছিলেন, সেগুলো এবং কিছু টাকা ওদের জন্য রেখে গেলেন। এছাড়া একটা চাদর রাখেন যাতে শীতের রাতে ওরা গায়ে জড়াতে পারে। ওদেরকে ফেলে যেতে খুবই খারাপ লাগছিলো। মা ওদের জন্য প্রার্থনা করেন; আমরা দীর্ঘ পথ হেঁটে গ্যারেজের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন আমি ওদের সম্পর্কে না ভেবে থাকতে চেষ্টা করি। কেননা খালি মাঠের মধ্যে ওদের দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে আমাকে যেন দেখতে না হয়। তারপর লরির হট্টগোল, বাসের ভেঁপুর শব্দ, বাড়ির দিকে মানুষের দৌড়াদৌড়ি, মহিলাদের কান্না, শিশুদের  চিৎকার, সৈনিকদের যুদ্ধ পোশাকে ছোটাছুটি, বন্দুকের শব্দ—পুরো পরিস্থিতি নিমেষের মধ্যেই আমার দুই বন্ধুর স্মৃতিকে পুরোপুরি মুছে দিলো। কয়েক ঘন্টার পর অবশেষে আমরা একটা লরি খুঁজে পাই, যেটা দিয়ে আমরা বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারব। আমি শুধু মনিকার কথা ভাবতে থাকি।

আমরা যে লরিতে উঠেছিলাম, সেটা ছিলো অনেক পুরোনো এবং ধীর গতির। ইঞ্জিন থেকে সারাক্ষণ ঘরঘর শব্দ হচ্ছিলো। ড্রাইভার ছিলো খুবই বাচাল আর দাম্ভিক। সেখানে বিভিন্ন ধরনের আলমারি ছিলো, ছিলো লম্বা ঝাড়ু আর বস্তার মধ্যে বিভিন্ন জিনিসপত্র। দেখলাম পুরোনো কাঠের ওপর খোদাই করা একটি চিত্রকর্ম; সেখানে লেখা রয়েছে: ‘দ্য ইয়ং শ্যাল গ্রো’।  লরিতে নড়াচড়া করার একদম জায়গা ছিলো না, কারণ শহরের সবাই জীবন যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র নিয়ে লরিতে উঠেছে। আমরা কাঠের ব্রেঞ্চিতে বসেছিলাম এবং আমাদের সবার সঙ্গে ছিলো বালতি, সেলাই মেশিন, তোষক, মাদুর, জামা-কাপড়, পাতিল, ফ্রাইপেন, দেশলাই। এমনকী জুজুদেরও চোখ এড়াচ্ছিলো না। আমরা সবাই অবাক হয়ে জুজুদের প্রার্থনার মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তখন আমার এত অস্বস্তি হচ্ছিলো যে, আমি ঘুমে ঢুলতে থাকি—এবং তাই ছিলো একমাত্র স্বস্তি।

যাত্রা ছিলো দীর্ঘ। মনে হচ্ছিলো পথের কোনো শেষ নেই। গাছের পাতা এবং ঝোপঝাড় ধুলোবালিতে জর্জরিত ছিলো। এছাড়া আরো ছিলো রাস্তায় শতাধিক চেকপয়েন্ট। সব চেকপয়েন্ট সৈনিকদের মধ্যে একধরনের যুদ্ধের মেজাজ ছিলো। তারা সব যানবাহন থামিয়ে সবাইকে তল্লাশি করছিলো; সবার ব্যাগ ও বস্তা খালি করে দেখছিলো এবং পেছনে বন্দুক ঠেকিয়ে হাজারটা প্রশ্ন করছিলো। আমরা বনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন দেখতে পেলাম অসংখ্য মরদেহ রাস্তার পাশে পড়ে আছে, পুরো পরিবার ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে, নাম না জানা শিশু একা একা রাস্তায় বসে কাঁদছে।

এক সময় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা আমাকে ডেকে তুললেন। দেখলাম আরেকটা চেকপয়েন্ট। অনেক সৈনিক চারপাশে ঘিরে রয়েছে; তারা প্রচন্ড চিৎকার করছিলো এবং সবাইকে হুকুম দিচ্ছিলো। পথের মধ্যে একটা ব্যারিকেট ছিলো। ব্যারিকেটের কাছাকাছি একটা গর্ত ছিলো। তিনজন বিশাল দেহী লোকের লাশ পুঁটলির মতো পেঁচিয়ে সেখানে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এদের একজনের দাঁতে গুলি লেগেছিলো, আরেকজনের মুখে গুলি লেগে এত বিকৃত হয়েছিলো যে, মনে হচ্ছিলো অতিরিক্ত হাসার কারণে লোকটি মৃত্যুবরণ করেছে। এই চেকপয়েন্টে সৈনিকেরা আমাদের সবাইকে লরি থেকে নামতে বললো। আরো একবার শুরু হবে সবাই লরি থেকে নামা, সব বস্তা নামানো, সব দড়ি খোলা, ব্যাগ ও বস্তা সব শূন্য করে তাদেরকে তন্ন তন্ন করে দেখানো। তারপর আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে অপেক্ষা করব কাদেরকে ওরা বিদ্রোহী সন্দেহ করে রেখে দিবে।

‘নাম, সবাই! এক্ষুনি নাম!’ সৈনিকেরা চিৎকার করে বললো। আমরা সবাই নামলাম। তারা আমাদেরকে রাস্তার ওপর লাইন করে দাঁড় করায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলো, সূর্য ঘন লাল হয়ে গেয়েছিলো। জঙ্গল পোকামাকড়ের ঝিঁঝিঁ শব্দে আচ্ছন্ন ছিলো। তাদের অনেকেরই আঙ্গুল বন্দুকের ট্রিগারে ছিলো। তারা লরির ভেতর তল্লাশি করতে শুরু করে। একজন সৈনিক নাক ঝাড়ে এবং নাকে লেমন-গ্রাস চেপে ধরে। তারা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে, কারা ভয়ে কাঁপছে। আমাদেরকে তারা একপাশে ঝোপের মধ্যে নিয়ে যায় এবং একজন একজন করে প্রশ্ন করতে থাকে। আমি ক্ষুধার্ত, বিরক্ত অবস্থায় সেই গম্ভীর সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর মনিকার কথা ভাবছিলাম। মাঝে মধ্যে শুনতে পাই এক মহিলা চিৎকার করে কাঁদছেন। শুনলাম বন্দুকের পশ্চাতদেশ দিয়ে একজনের মাথায় জোরে আঘাত করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ কোনো শব্দ করছে না। তারা একটা লম্বা সময় ধরে আমাদেরকে প্রশ্ন করতে থাকে। সূর্যের রঙ টকটকে লাল থেকে ধীরে ধীরে মলিন কমলা হয়ে যায়। আমি লেমন-গ্রাস নাকে নিয়ে শুকছিলাম আর মনিকাকে স্মরণ করছিলাম। একজন সৈনিক আমার দিকে এগিয়ে এলো।

সে চিৎকার করে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কি পাগল?’

তার কথা আমি কিছুই বুঝিনি। সে আমার মাথায় আঘাত করে। দেখলাম মনিকার একটি মুখোশ আকাশে তারার মাঝে ভাসছে।

সৈনিকটি আবার চিৎকার করে উঠল, ‘তুই কি পাগল?’

আমি তখনো বুঝতে পারছিলাম না যে, সে কী বলতে চাচ্ছে। সে তার হাতের কনুই দিয়ে আমাকে এতো জোরে আঘাত করে যে, আমি ছিটকে বিবর্ণ ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। আমার মা তাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করেন। সৈনিকটি মাকেও এতো জোরে ধাক্কা দেয় যে, মা আমার ওপর এসে পড়েন। কাশতে কাশতে মা কোনোভাবে উঠে দাঁড়ান, তার চোখমুখ একদম কালো হয়ে যায়। আমি লেমনগ্রাসের ওপর পড়ে থাকি। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছিলো। আমার পেছনে ঝোপের মধ্যেই আরেকটি সৈন্য একজন মহিলাকে প্রহার করছিলো। যে সৈনিক আমাকে ফেলে দিয়েছিলো, আমাকে খুঁজতে সে আবার ঝোপের দিকে আসে। বন্দুকটি আমার দিকে তাক করে। মা ভয়ে কাপুরুষের মতো পেছনে গিয়ে লুকান।

এরই মাঝে একজন বললো, ‘ফ্র্যাঙ্ক ও’নেরো! অসহায় ছেলেটিকে ছেড়ে দাও এক্ষুণি, এ মুহূর্তে!’

ফ্র্যাঙ্ক ও’নেরো ভেসে আসা কণ্ঠস্বরের দিকে ফিরে তাকায় এবং সেদিকে বন্দুক তাক করে। তারপর আবার আমার দিকে বন্দুকটি ধরে। তার চোখে রক্ত জমা ছিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম এবং ভাবছিলাম সে হয়তো উন্মাদ হয়ে গেছে।

সে হুংকার দিয়ে বললো, ‘এই যে বড়লোকের ছোকড়ারা, তোরা কী ভেবেছিস স্কুলে যাওয়ার জন্য যা ইচ্ছা তাই করতে পারবি? তোরা জানিস না, যুদ্ধ চলছে? ছাগলের দল!’ 

আমার মা দুর্বল কন্ঠে বললেন, ‘আমার ছেলেকে ছেড়ে দিন, দয়া করে ছেড়ে দিন। সৃষ্টিকর্তা আমাকে আর কোনো ছেলে দেননি!’

ফ্র্যাঙ্ক ও’নেরো একবার মার দিকে তাকায় এবং আরেকবার আমার দিকে। একসময় সে ঝোপের দিকে চলে যায়, যেখানে যাত্রীদেরকে তল্লাশি করা হচ্ছিলো। তারপরই আমাদেরকে ডাকা হলো।

ঝোপের পেছনে তিনজন সৈনিক মারিজুয়ানা সেবন করছিলো। তার অল্প দূরে দুজন অর্ধনগ্ন সৈনিক হালকা গায়ের রঙের একটা মেয়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছিলো। যে তিনজন সৈনিক মারিজুয়ানা সেবন করছিলো, তারা মাকে প্রশ্ন করে। সেগুলো আমি কিছুই শুনিনি। আমার মনোযোগ ছিলো সৈনিক দুজন মেয়েটির সঙ্গে কী করছে—সেদিকে। তারা মাকে জিজ্ঞেস করে মা কোথা থেকে এসেছে। যখন সৈন্য দুজন মেয়েটিকে ধর্ষণ করছিলো, তখন আমার মনিকার কথা মনে পড়ে। তারা মাকে জোর করতে লাগলো যেন মা তার এলাকার ভাষায় প্রভুর প্রার্থনা পাঠ করে শোনায়। মা খুবই ইতস্তত করছিলো, যখন সৈনিকরা ওই মেয়েটির দুই পা ফাঁকা করে ধরলো। মা সাবলীল ভাবেই বাবার এলাকার ভাষায় প্রভুর প্রার্থনা পাঠ করে শোনালেন। যদিও মা সেই বিদ্রোহী দলেরই একজন ছিলেন, কিন্তু বাবা অনেক আগেই জোরপূর্বক মাকে এই ভাষাটি শিখিয়েছিলেন।  মা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সৈনিকেরা ঠিকমতো ভাষাটি জানেনা। তাই তিনি প্রার্থনা  দীর্ঘায়িত করেন; তাদের বাবা-মাকে গালিগালাজ করেন, অভিশাপ দেন যাতে তাদের এই নির্মমতার শাস্তি তারা পায়, তাদের হাড়গোড় যেন পোকায় খায়, তাদের অন্ত্র যেন গলে গলে পড়ে…। এদিকে উলঙ্গ সৈনিক দুজন মেয়েটিকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করতে থাকে, যতক্ষণ না সূর্য তোমার চোখ বেয়ে উপরে ওঠলো, মনিকা! সৈনিকরা স্বস্তির সঙ্গে মার প্রার্থনা শুনলো। তারপর তারা আমার দিকে ফিরে তাকায় এবং আমাকে আমাদের ভাষায় ঐতিহ্যবাহী খ্রিস্টান প্রার্থনা ‘হেইল মেরি’ পাঠ করে শোনাতে বললো। ওদিকে ঝোপের উলঙ্গ সৈনিক দুজন মেয়েটিকে ছেড়ে দেয় এবং পাতা দিয়ে নিজেদের পরিষ্কার করে। যে সৈনিকটি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি্লো, আমি তাকে বললাম যে, আমি ভালো মতো আমাদের ভাষায় কথা বলতে পারি না।

সৈনিকটি অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কেন পারিস না?’

আমি চুপ করে থাকি, কারণ আমার কাছে কোনো উত্তর ছিলো না। মেয়েটি ঝোপের কাছে মেঝেতে পড়েছিলো। তার মুখ চুপসে গেছে আর তার শরীর ঘেমে একাকার।

‘আমি তোর সঙ্গে কথা বলছি, হারামজাদা!’ সৈনিকটি চিৎকার করে বললো। ‘তুই যদি তোদের ভাষায় কথা বলতে না পারিস, তাহলে তুই তোর মার সঙ্গে যেতে পারবি না, বুঝেছিস!’

আমি মাথা ঝাকাই। তাদের মারিজুয়ানার ধোঁয়ায় আমারও নেশার মতো লাগছিলো। মা দৌঁড়ে আসেন; তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন আমি বাড়িতে বড় হইনি। মাটিতে সেই মেয়েটি নিঃশব্দে গোঙাতে থাকে। মা আমার ওপর রাগ দেখালেন, খোঁচা দিতে লাগলেন সেই ভাষায় কথা বলার জন্য, ছোটবেলার গান মনে করিয়ে দিতে লাগলেন, গল্পের শুরুর দিকটা মনে করিয়ে দেন। সত্যি বলতে কী, সেই মুহূর্তে আমার কিছুই মনে পড়ছিলো না। আমার মাথাটা পুরোপুরি খালি হয়ে গিয়েছিলো। বরং তখন আমি অনেক কষ্টে নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করি।

সৈনিকটি মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘যদি সে তোমাদের ভাষায় কথা বলতে না পারে, তার অর্থ হলো সে কোনোভাবেই তোমার ছেলে না।’

তখন আমি কোনোভাবেই নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, যদিও তখন মা আমাকে খামচি মেরে সতর্ক করেছিলেন, এমনকী প্রশ্নকর্তা কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু কোনোভাবেই আমি হাসি থামাতে পারছিলাম না। নিমেষের মধ্যেই ফ্র্যান্ক ও’নেরো হেচকা টান দিয়ে আমাকে ঝোপের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। মা আমাকে ধরে রাখার অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। মেয়েটি অমানুষের মতো চিৎকার করছিল। হুট করে আমার সব ভয় কেটে যায় এবং আমি আমার জানা ওই ভাষার একটি শব্দ বলে উঠলাম। আমার মা তখনই চেঁচিয়ে বললেন, ‘ঐতো, আমার ছেলে বলেছে! সে এইমাত্র বলেছে যে, সে হাগু করতে চায়!’

ফ্র্যাঙ্ক ও’নেরো থামে এবং রাগে-ক্ষোভে সে আমার কবজি অনেক শক্ত করে ধরে। সে একবার বাকি সৈনিকদের দিকে তাকায়, একবার মার দিকে তাকায় এবং একবার আমার দিকে। তারপর সে এতো জোরে গর্জে ওঠে যে, আমরা সবাই চমকে যাই। মা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আমাকে হেচকা টান দিয়ে লরির দিকে নিয়ে যান। ব্যারিকেডের চারপাশে পুরো এলাকা জুড়ে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। তখনো যারা আসেনি, তাদের জন্য লরিতে ওঠে আমরা অপেক্ষা করি। ততক্ষণে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটিকে আর দেখা যাচ্ছিলো না, কিন্তু আমি ওর গোঙানির শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলাম। যখন আমরা চলে যাচ্ছিলাম, তখন রাত হয়ে গিয়েছিলো। মেয়েটিকে ফেলে যেতে আমাদের বাধ্য করা হয়েছিলো।

মা সারা রাস্তা আমাকে বকতে বকতে আসেন এবং বললেন যে, যারা নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারে না, তাদেরকে ওরা মেরে ফেলে। মার বকা শোনার সময় মনিকার কথা মনে পড়ে, যে কিনা নিজের ইচ্ছা মতো কাজ করতো। আমার জানতে ইচ্ছা করে, যখন ওরা মনিকাকে ধরতে আসবে, তখন কি সে নিজের ভাষায় একটি শব্দ বলার মতো যথেষ্ট সময় পাবে।

যাত্রার পরবর্তী সময় আমার জন্য তেমন একটা সুখকর ছিলো না। অন্ধকার থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতা আমার সম্মুখে স্পষ্ট  হয়ে আসে, সবকিছু গোলকধাঁধার মতো তন্দ্রায় জড়িয়ে যায়। ছদ্মবেশী সাঁজোয়া গাড়ির আচমকা উঠানামা—এ সবকিছু রাস্তার মধ্যে একটা ঘোরের মতো ঝিম মেরেছিলো। মাথার ওপর দিয়ে প্লেনের অবিচ্ছিন্ন যাতায়াতের শব্দ ঘুরঘুর করছিলো। কিছুক্ষণ পরপর চালক উন্মাদের মতো গাড়ি চালায়। এক সময় সে হুট করে রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে দেয় এবং তারপরই ঝোপ-ঝাড়ের দিকে গাড়ি চালাতে থাকে। তাকে বুঝিয়ে গাড়ি ফেরাতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।

‘আমি আর কখনো এরকম পাগলের মত গাড়ি চালাব না,’ সে অনবরত বলতে থাকে।

এই উন্মাদতার স্বাদ ছিলো অনেকটা বসন্তের নদীর মতো কিংবা যুদ্ধের ব্যারিকেডের সেই অট্টহাসির মতো। হয়তো এ কারণেই আমার কাছে সুন্দর সময় মনে হয়েছে। মাঝেমধ্যে সৈনিকদের জিপগুলো সশব্দে আমাদের লরির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যায়। আমরা সবাই তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি। আমাদের সেই নীরবতার পরিমাপ ছিলো বিশাল। অবশেষে যখন আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই, আমার মনে হয়েছে আমি যেনো কয়েক জীবনকাল অতিক্রম করে এসেছি।


(ইংরেজিতে ‘লাফটার বিনীথ দ্য ব্রিজ’ গল্পের অনুবাদ)