আমাদের বিল্ডিংটা একটা খালের উপরে দাঁড়ানো। এইটা কোনো রূপক কথা না। দুই হাজার তিন সালে আমার আব্বা তিনশো ট্রাক বালু ফেলে খালটা ভরাট করেছিলেন, আমি তখন আট, বাসার বারান্দা থেকে রাস্তায় গাড়ি আর ট্রাক গুনতাম। খালটার নাম ছিল না। এলাকার লোক বলত, দক্ষিণের খাল।
আমার মা এই খালের পাড়ে বড়ো হয়েছেন। ওনার বাপের বাড়ি ছিল খালের ওই পাড়ে, এখন যেখানে একটা ফার্মেসি কাম একটা বিকাশের দোকান আর বহুতল শপিং মল। মা এই খালে সাঁতার শিখেছেন, এই খালে ওনার বড়ো ভাই নৌকা বাইতেন, এই খালের পাড়েই ওনাকে প্রথম দেখেছিল আমার আব্বা, যে তখন কেবল একটা প্লট কিনেছে আর একটা ডেভেলপার কোম্পানির নাম ঠিক করেছে।
মা সেই লোকটাকে বিয়ে করেছেন, যে পরে ওনার খালটা ভরাট করেছে।
ঢাকায় একসময় পঞ্চাশের উপরে খাল ছিল, বইয়ে পড়েছি, সংখ্যাটা একেক বইয়ে একেক রকম। এখন যা আছে তাকে খাল না বলে ড্রেন বললে সত্যের কাছাকাছি হয়। বাকিগুলার উপরে আমরা থাকি। রাস্তা, মার্কেট, স্কুল, এগারো তলা অ্যাপার্টমেন্ট। শহরটা পানির উপরে বালু ফেলে বসে আছে, আর ভান করছে যে এইটা মাটি। আমাদের শহরটা ভেনিস হতে পারত। সব খালগুলাকে মেরে ফেলা হলো। আমার আব্বাও মেরেছেন বহু।
আমি আব্বার কোম্পানিতে কাজ করি। জমি দেখি, কাগজ দেখি। আমি নিজেও তিনটা প্রজেক্টে সই দিয়েছি, যার নিচে পানি ছিল।
এই গল্পে আমি ভালো লোক না। আগে থেকে বলে রাখলাম, যাতে পরে অবাক না হন।
ঘটনাটা প্রথম টের পাই একটা লোডশেডিংয়ের রাতে।
জুলাই মাস, রাত বারোটা, কারেন্ট গেছে দুই ঘণ্টা হয়। গরমে ঘুম আসে না, আমি নিচে নামলাম সিগারেট খেতে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গ্রাউন্ড ফ্লোরে গিয়ে থামলাম।
পার্কিংয়ে পানি।
বন্যার পানি না। ড্রেনের পানি না। স্বচ্ছ, কালচে, হাঁটু পর্যন্ত। কাদার গন্ধ, শাপলার গন্ধ। আব্বার গাড়ির চাকা ডুবে গেছে। আর পানিতে কিছু একটা নড়ছে, ফোনের আলো ফেললাম, পুঁটি মাছ। এক ঝাঁক। আমাদের পার্কিংয়ে।
আমি চিৎকার দিতে যাব, তখন দেখি কেউ একজন গেটের কাছে টুলের উপরে বসা, পা পানিতে ডুবিয়ে। নিজাম চাচা। আমাদের দারোয়ান। বিশ বছর ধরে।
সে আমাকে দেখে মোটেও অবাক হলো না। বলল, "আব্বাজান, আওয়াজ কইরেন না। মাছ ভয় পায়।"
আমি বললাম, "চাচা, এইটা কী?"
"খাল।"
"খাল কেমনে? খাল তো ভরাট।"
সে হাসল। "কারেন্ট আসলে ভরাট। কারেন্ট গেলে খাল।"
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। সে বলল, "আমি এই খালে জাল ফালাইছি ষোলো বছর। আপনার বাপে বালু ফালানের পর কামের খোঁজে আইছি, উনি দারোয়ানের কাম দিছে।
আমি ভাবছিলাম, যাউক, খালের উপরেই তো আছি। তারপর একদিন রাতে হঠাৎ কারেন্ট গেল, নাইমা দেখি, পানি। প্রথম প্রথম ডরাইছি। এখন বুঝি।"
"কী বোঝেন?"
"আলোতে এই নতুন শহর। আন্ধারে যেইটা আগে আছিল, সেইটা। মাটি কিছু ভুলে না আব্বাজান। খালি চুপ থাকে।"
রাত সাড়ে বারোটায় কারেন্ট এলো। বাতি জ্বলল, পাখা ঘুরল, আর পার্কিংটা শুকনা। একটা ফোঁটা পানি নাই। নিজাম চাচা টুল থেকে উঠে পা মুছল লুঙ্গিতে, আর পা-টা ভিজা ছিল, এটা আমি দেখেছি।
এরপর আমি প্রায় রাতেই নামতাম। কারেন্ট গেলে নামতাম।
তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে একটা জিনিস খেয়াল করলাম, পানির উচ্চতা এক থাকে না।
প্রথম রাতে হাঁটু। পরের সপ্তাহে হাঁটুর একটু উপরে। ভাদ্র মাসের এক রাতে কোমর পর্যন্ত, আমাকে সিঁড়ির তিন ধাপ উপরে দাঁড়াতে হয়েছিল।
আমি দারোয়ান চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, পানি বাড়ে কেন?”
সে বলল, "যেই মাসে যেমুন আছিল। ভাদ্র-আশ্বিনে খাল ফুইলা উঠত। এই পানি তারিখ মনে রাখে আব্বাজান। আমাগো চাইতে ভালো মনে রাখে।"
আর একটা জিনিস। জাল।
নিজাম চাচার একটা পুরোনো মাছ ধরার জাল ছিল, গেটের পাশের ছোটো ঘরের মধ্যে ঝোলানো, আমি বিশ বছর ধরে ওইটা দেখেছি আর ভেবেছি, এটা এখানে কেন? এক রাতে দেখি সে জালটা নামিয়েছে। পানিতে ঝপ করে ফেলল। টানল।
জালে মাছ উঠল না। উঠল একটা জিনিস।
একটা জুতা। কালো, ছোটো, ফিতা ছেঁড়া। বাচ্চাদের সাইজ।
নিজাম চাচা জুতাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কার এটা?"
সে বলল, "আমার ছোটো ছেলের। রুবেল। আটানব্বইয়ে ডুবছিল, এই খালে। বয়স সাত। লাশ পাই নাই।"
আমি কী বলব বুঝলাম না। সে জুতাটা পানিতে আবার ফেলে দিল। বলল, "নিয়া গেলে আর দিব না। এইটা এইখানেই থাক। আমি খালি দেখতে আসি।"
আমি বললাম, "চাচা, বিশ বছর ধরে আপনি এইখানে বসে আছেন এই কারণে?"
সে অনেকক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে বলল, "খাল আমার ছেলেরে নিছে আব্বাজান। আমি ওইটার কাছ থেইকা সরি কেমনে? আমি বইসা থাকি। একদিন যদি ফেরত দেয়।"
কারেন্ট চলে আসলো। আলো জ্বলে উঠলো চারদিকে। পানি নাই। খুঁটিতে জাল ঝুলছে, শুকনা।
ফ্ল্যাট এইট-বি। ভাড়াটে, দুই বছর হলো উঠেছে। স্বামী ব্যাংকে চাকরি করেন, স্ত্রী নাজিয়া, একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ান, আর একটা মেয়ে আছে, ছোঁয়া, বয়স সাত।
আমার যাওয়ার একটা অজুহাত ছিল। বিল্ডিংয়ের ম্যানেজিং কমিটির হিসাব আমি দেখি, সার্ভিস চার্জ, জেনারেটরের তেল, লিফটের মেইনটেন্যান্স। মাসে একবার গেলেই যথেষ্ট ছিল। আমি সপ্তাহে দুইবার যেতাম।
নাজিয়ার স্বামীকে আমি দোষ দিতে পারি না, এবং এইটা লিখতে আমার খারাপ লাগছে। লোকটা মারধর করত না। মাতালও ছিল না।
লোকটা যা করত, তা হলো, লিফটে সবার সামনে বলত, "ও তো কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ায়, ওইটা চাকরি না, টাইম পাস।" নাজিয়া হাসত।
লোকটা কমিউনিটি সেন্টারে খেতে বসে বলত, "তুমি আর বিরিয়ানি নিও না, তোমার তো ওজন বাড়ছে।"
নাজিয়া প্লেট নামিয়ে রাখত। মেয়েটা কোন ক্লাসে পড়ে, লোকটা একবার আমার সামনে ভুল বলেছিল।
এইগুলা কোনো অপরাধ না। থানায় গিয়ে লেখানো যায় না। এইগুলা খালি বছরের পর বছর একজন মানুষকে ছোটো করে দেয়, এত ধীরে যে সে নিজেও টের পায় না কবে সে ছোটো হয়ে গেছে।
আমি টের পেয়েছিলাম। আর টের পাওয়ার পরেও যা করেছি, সেটা সাহায্য না।
নাজিয়া আমাকে সবার সামনে ভাইয়া ডাকতো। একা থাকলে নাম ধরে ডাকতো। আমরা একে অন্যের সান্নিধ্য উপভোগ করা শুরু করলাম। দুনিয়া থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে দুজন একটু সুখের সময় কাটানোর চেষ্টা করতাম।
একদিন নাজিয়া বলল, "তুমি জানো আমার সবচেয়ে খারাপ কী লাগে? তোমার সাথে থাকার সময়ও আমি ঘড়ি দেখি। ছোঁয়ার কোচিং ছুটির সময় দেখি। মানে আমি এইখানেও পুরাটা থাকি না।"
আমি বলেছিলাম, "কেউই কোথাও পুরাটা না।"
"দার্শনিক হয়ে যাচ্ছ!”
আমি মাকে কিছু বলিনি। পানির কথাও না, আট তলার কথাও না। মাকে বলার আগে মা-ই একটা কথা বললেন।
এক সকালে চা খেতে খেতে মা বলল, "তুই কাল রাতে নিচে নামছিলি?"
"কেন?"
"না, আমি নামছিলাম। ভাবলাম তুইও দেখছিস কিনা।"
আমি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলাম। "মা, তুমি জানো?"
"আমি এই খালের পাড়ে বড়ো হইছি। আমি জানব না? তোর আব্বা বালু ফেলার পর প্রথম যে রাতে কারেন্ট গেছে, সে রাতে আমি নামছি।"
"তারপর?"
"তারপর কিছু না। বসি। পা ভিজাই। কোনো কোনো রাতে আমার বড়ো ভাইয়ের নৌকার আওয়াজ শুনি, দূরে। দেখি না, শুনি। ওইটুকুই।"
আমি বললাম, "মামা তো খুলনায়। বেঁচে আছে।"
মা আমার দিকে তাকাল। বলল, “আমার আরো একজন বড়ো ভাই ছিল। এই খালে নৌকা বাইতো। মাঝে মাঝে আমাকেও সাথে নিয়ে যেত। তোর মামা এই খালে ডুবছে, বিরাশি সালে, তুমুল বন্যায়, আমার চোখের সামনে লাফ দিল নৌকা থেকে। মনে হলো ইচ্ছা করেই ডুব দিল। আর উঠলো না। আমি পাড়ে দাঁড়ায়ে চিৎকার করছিলাম, সাঁতার জানতাম না, কেউ শুনলো না আমার চিৎকার।"
আমি চুপ করে ছিলাম। মা চায়ের কাপে ফুঁ দিল, যেন সাধারণ কথা।
"এরপর আমি এই পানিতে আর নামি নাই বাইশ বছর। তারপর তোর আব্বা ভরাট করল, আর লোডশেডিং হলে পানি ফিরে আসা শুরু করলো। এখন আমি নামি। পা ভিজাই।”
"আব্বা জানে?"
মা হাসল। ওই হাসিটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না।
বলল, "তোর আব্বা সব জানে। তোর আব্বা জানে বলেই তিনশো ট্রাক বালু ফেলছিল, দুইশো দিয়েই হতো।"
এই বিল্ডিংয়ে আরেকজন মানুষ জানতেন। হাশেম মোল্লা, ফ্ল্যাট বি-থ্রি, আশির উপরে বয়স। এই খাল পাড়ের জমির আগের মালিক। আব্বার কাছে বেচে দিয়ে বিনিময়ে দুইটা ফ্ল্যাট নিয়েছিলেন।
উনি কারেন্ট গেলে কোনোদিন নিচে নামতেন না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে থাকতেন। আমি একবার লিফটে তাকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "চাচা, আপনি তো খালের সময়ে ছিলেন, রাতে কারেন্ট গেলে নিচে নামেন কখনো?"
উনি বললেন, "আমি জমিটা বেচছি আব্বা। আমি কাগজে সই দিছি। যে সই দেয়, পানি তার ভার নেয় না।"
"তাহলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন কেন?"
উনি অনেকক্ষণ পর বললেন, "লোভ। উপর থেইকা দেখতে চাই। নিচে নামার সাহস নাই, না দেইখা থাকারও উপায় নাই। এই দুইটার মাঝখানে আমার আঠারো বছর গেছে।"
হাশেম চাচা মারা যান পরের শীতে। ওনার জানাজায় আমি আবিষ্কার করলাম, আমার আব্বার হাত কাঁপে।
আব্বার সাথে কথাটা হলো পানি দেখার এক মাস পরে। আব্বা রাতে বসার ঘরে টিভি দেখছেন, আমি সামনে বসলাম। বললাম, "আব্বা, পার্কিংয়ে পানি ওঠে, জানেন?"
উনি চ্যানেল বদলে দিলেন। বললেন, "সিপেজ। কন্ট্রাক্টরকে বলেছি।"
"পুঁটি মাছ সিপেজ দিয়া আসে?"
উনি রিমোট নামিয়ে রাখলেন। অনেকক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর যা বললেন, সেইটা আমি হুবহু লিখছি, কারণ আমার আব্বা আমার সাথে জীবনে এইভাবে কথা বলেননি।
"তোর মায়ের সাথে আমার বিয়ের আগে, আমি ওই পাড়ে দাঁড়ায়ে এই পাড়ের বাড়িটা দেখতাম। আর দেখতাম তোর মাকে। হেঁটে বেড়াচ্ছে খালের পাড়ে। মাঝখানে খাল। তখন ভাবতাম, এই খালটা না থাকলে হেঁটেই যাইতে পারতাম। বিয়ের পরে ভাবলাম, খালটা না থাকলে এইখানে বিল্ডিং তোলা যায়। দুইটা ভাবনা এক না, কিন্তু কাজটা এক। আমি বালু ফেললাম। খাল ভরাট হলো।”
"তারপর?"
"তারপর লোডশেডিংয়ের রাতে নিচে নেমে দেখি, আবার পানি। আমি ভাবছিলাম চোখের ভুল। আমি তোর মাকে দেখলাম, পানিতে পা ডুবায়ে বসা, আমাকে দেখে নাই। আমি উঠে আসছি। এরপর কারেন্ট গেলে আমি আর নিচে যাই না।"
"কেন?"
"কারণ পানিটা তোর মাকে নেয়, নিজামকে নেয়, তোকেও নিয়েছে শুনলাম। আমাকে নেয় না। আমি নামলে পানি সরে যায়। আমার পায়ের নিচে শুধু বালু থাকে।"
আমি বললাম, "আব্বা, আপনি খালটার কাছে মাফ চেয়েছেন কখনো?"
উনি রিমোট তুলে টিভিটা অফ করলেন। "খাল কি মানুষ? মাফ চাইব কেমনে।"
কিন্তু টিভিটা আর চালু করলেন না।
নাজিয়ার মেয়ে ছোঁয়ার একটা সমস্যা ছিল। ঘুমের মধ্যে হাঁটত।
নাজিয়া একদিন বলল, "দারোয়ান চাচাকে বলো তো, রাতে নিচের আর ছাদের গেটটা যেন তালা দিয়া রাখে। ছোঁয়া রাতে হাঁটে। গত সপ্তাহে ওকে পাইছি সিঁড়ির ধাপে। কী যে টেনশনের ব্যাপার।"
“আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, "কারেন্ট ছিল?"
উনি অবাক হয়ে বললেন, "কারেন্ট? না, ছিল না। কেন?"
"ও কিছু বলছিল?"
"বলছিল, পানিতে পা ভিজাচ্ছিলাম"।
“বাচ্চা মানুষ, স্বপ্ন দেখছে।" আমি আর নাজিয়ার মধ্যে ভয় ঢোকালাম না।
আমি সেই রাতে নিজাম চাচাকে বললাম। সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, "বাচ্চারা ভালো দেখে আব্বাজান। ওরা তো দুনিয়ার সুন্দর অংশ, তাই চোখে ময়লা কম।"
তারপর একটু থেমে বলল, "কিন্তু বাচ্চাগো ডাকলে ওরা কথা শোনে। এইটাই সমস্যা।"
"কে ডাকে?"
সে উত্তর দিল না। খুঁটি থেকে জালটা নামিয়ে কোলের উপর রাখল।
অক্টোবরের চার তারিখ। জাতীয় গ্রিড ফেল। দুপুর দুইটায় পুরা ঢাকায় লোডশেডিং।
আমি অফিসে ছিলাম, গুলশান। কারেন্ট গেল, জেনারেটর চালু হলো, তারপর জেনারেটরও বন্ধ হয়ে গেল, কেন কেউ জানে না। আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম, বারো তলা।
লবিতে পানি।
আমি রাস্তায় বের হলাম। গুলশান অ্যাভিনিউতে পানি। হাঁটুসমান, স্বচ্ছ, শাপলা ভাসছে, মাছ দৌড়াচ্ছে। গাড়িগুলা দাঁড়িয়ে আছে, লোকজন নেমে আসছে, কেউ চিৎকার করছে না, সবাই খালি তাকিয়ে আছে নিচের দিকে, নিজের পায়ের দিকে।
আমি হাঁটা শুরু করলাম বাসার দিকে। তিন ঘণ্টা।
মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে পানি, উপরে লোক দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে আছে। ফার্মগেটে একটা বুড়ো লোক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, "এইখানে বাঁক আছিল! আমি কইছিলাম! এইখানে বাঁক আছিল!"
রিকশাওয়ালারা তাদের টেসলার ছাদে বসে আছে, হাঁটু পানিতে।
সবচেয়ে বেশি যেটা মনে আছে, শব্দ। ঢাকায় হর্ন থাকে না এমন কোনো মুহূর্ত আমি জীবনে পাইনি। ওইদিন হর্ন ছিল না। গাড়ি চলে না। জেনারেটর চলে না। তার বদলে ব্যাঙ। পুরা শহরে ব্যাঙ ডাকছে। কারওয়ান বাজারে ব্যাঙ। বনানীতে ব্যাঙ। ওরা কোথায় ছিল এতদিন?
একটা মসজিদ, ইন্দিরা রোডের, পানি এখানেও। আছরের আজান হলো। মুয়াজ্জিন কারেন্ট ছাড়া, মাইক ছাড়া, জোরালো গলায় আজান দিল। মনে হলো মৃত শহরে প্রাণের সঞ্চার। এত সুন্দর সেই আজানের কণ্ঠ। এতদিন শুনিনি কেন?
আর পানি বাড়ছিল। সারা বিকাল হাঁটুতে ছিল, মাগরিবের পর কোমরে। বনানীতে আমি মাঝবয়সি এক মহিলাকে হাত ধরে তুললাম, উনি হড়কে গিয়েছিলেন,
উঠে বললেন, "ভাই, নিচে কী যেন টানল।"
বাসার গেটে নৌকা।
নিজাম চাচা নৌকার মাঝি। বাঁশের ডিঙি, কোথা থেকে এনেছে জিজ্ঞেস করিনি। চাচা বৈঠা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, লুঙ্গি কোমরে বাঁধা, বিশ বছরে এই প্রথম বোধহয় ওনার মুখে আলো দেখলাম।
আর একটা কান্নার আওয়াজ শুনলাম।
নাজিয়া পানিতে বসে পড়েছে, শাড়ি ভিজে গেছে, দুই হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরা। ছোঁয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিকাল থেকে। দরজা খোলা ছিল, বাচ্চাটা নেমে গেছে।
নাজিয়া আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল, আর সবার সামনে আমার হাত ধরে ফেললো। ওর স্বামী তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে যেন উঁচু গলায় কথা বলছে, ফায়ার সার্ভিস, থানা, কেউ ধরছে না। সে খেয়াল করলো না।
আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। এবং এই একটা কাজের জন্য আমি নিজেকে আজও ক্ষমা করতে পারি না। একটা মা তার মেয়েকে হারিয়ে ফেলেছে, আর আমি ওই মুহূর্তে ভাবছিলাম কে দেখল। তবে এভাবেই আমরা বড়ো হয়েছি। চিৎকার, গালি, মারামারি সব প্রকাশ্যে করতে পারি, তবে ভালোবাসা, আদর, চুমু এসব গোপনে।
নাজিয়া খুব শান্ত গলায় বলল, "রায়হান, ওকে খুঁজে দাও প্লিজ। আমি তোমার কাছে জীবনে কিছু চাইব না।"
সবার সামনে। নাম ধরে বলল।
আমি নিজাম চাচার কাছে গেলাম। সে আমার দিকে তাকাল, বলল, "উঠেন আব্বাজান। তাড়াতাড়ি।"
"কই যাব?"
"ওই পাড়ে। আপনার মায়ের বাপের বাড়ি। বাচ্চা ওইখানে।"
"আপনি জানেন কেমনে?"
সে বৈঠা পানিতে ঠেকিয়ে বলল, "আমার ছেলেটারেও ওইদিকেই ডাকছিল।"
আমি উপরে তাকালাম। বারান্দায় মা, চিন্তিত লাগছে না। আর সিঁড়িঘরের দুই তলার ল্যান্ডিংয়ে আব্বা, বসা, পানি তার পায়ের এক ধাপ নিচে থামছে। ঠিক এক ধাপ। আশেপাশে সব ডুবে আছে, ওনার ধাপটা শুকনা।
আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠে আব্বার কাছে গেলাম, বললাম, "আব্বা, নৌকা আসছে। আট তলার বাচ্চাটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। চলেন যাই।”
আব্বা বললেন, "পানি আমাকে নেয় না।"
"নৌকা নিবে। পানি না।"
উনি অনেকক্ষণ চুপ। তারপর উঠলেন। ধাপে ধাপে নামলেন। শেষ ধাপে দাঁড়ালেন, পানির ঠিক উপরে। আর আমি দেখলাম, পানিটা সরল না। উনি পা দিলেন, ডুবল। হাঁটু পর্যন্ত। তারপর কোমর।
উনি খুবই অবাক হয়ে ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আজকে নিছে।"
নৌকা ছাড়ল। আমি, আব্বা, নিজাম চাচা।
মা ছাদ থেকে চিৎকার করে বলল, "ওই পাড়ে বকুল গাছটা আছে কিনা দেখে এসো!"
আব্বা উপরে তাকিয়ে বললেন, "আছে।"
"তুমি জানো কেমনে?"
"আমি কাটি নাই।"
ওই পাড়ে ফার্মেসি নাই। বিকাশের দোকান নাই। শপিং মলটাও নাই। একটা টিনশেডের ছোটো বাড়ি, উঠানে বকুল গাছ। বকুল ফুল পড়ে আছে উঠানে।
আর বকুল গাছের নিচে ছোঁয়া। বসা, জেগে আছে। সাত ঘণ্টা ধরে পানি চারদিকে। একটা সাত বছরের বাচ্চা এই পাড়ে চলে এল, আর ওর জামা শুকনা।
ওর কোলে একজোড়া কালো স্কুলের জুতা। ফিতা ছেঁড়া।
নিজাম চাচার হাত থেকে বৈঠাটা পড়ে গেল পানিতে।
আমি নেমে পাড়ে উঠলাম। ছোঁয়াকে কোলে তুললাম। জিজ্ঞেস করলাম, "মা, তুমি এইখানে আসলা কীভাবে?"
ও বলল, "একজন বন্ধু হাত ধরে নিয়ে এসেছে!”
বলল, “তোমাকে বাড়ি চিনিয়ে দেই।"
"কোন বন্ধু?", "ছোটো বন্ধু। আমার সমান।" ও জুতাজোড়া বাড়িয়ে দিল নিজাম চাচার দিকে।
"এইগুলা তোমাকে দিতে বলছে।
বলছে, আব্বাজান যেন আর না বসে থাকে।"
নিজাম চাচা নৌকার উপর দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। কাঁপতে থাকলো তার শরীর।
সে একটা জুতা হাতে নিল। ফিতাটা দেখাল। "এই ফিতা ও নিজে বান্ধতে পারতো না। আমি বাইন্ধা দিতাম, ডাবল গিঁট। এইটা ডাবল গিঁট না। এইটা কেউ খুইলা আবার বানছে। যে বানছে সে জানতো না আমি কেমনে বান্ধি। অনেক শখ কইরা কিনছিল আমার ছোটো আব্বার জুতাটা!”
কেউ কিছু বলল না। পানিতে নৌকা দুলছে।
"পানিতে পড়লে সবাই কয় ডুবছে। থানা কয় ডুবছে। গ্রাম কয় ডুবছে। বাপে কয় ডুবছে, কারণ বাপের আর কিছু কওয়ার সাহস থাকে না।"
সে জুতাটা বুকের কাছে ধরল।
"খাল আমারে এত বছর কিছু কয় নাই। আইজ কইলো। খাল রাগ করে না, আব্বাজান। খাল খালি যা তার ভিতরে ফালানো হইছে, সেইটা ফিরায়া দেয়।"
আব্বা নৌকা থেকে নামলেন। পানিতে দাঁড়ালেন, বকুল গাছের নিচে, ওনার নিজের হাতে ভরাট করা খালের ভেতরে। উনি নিজাম চাচার হাত থেকে জুতাজোড়া নিলেন। ফিতার গিঁটটা দেখলেন অনেকক্ষণ। তারপর বুকের সাথে চেপে ধরলেন, আর আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন, "বালু ফালানোর সময়ে। আমার লোকজন রাতে কাজ করতো। নেশাপানিও করতো। ওদের মধ্যেই একজন কাজটা করছে। থানা পুলিশ করে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই ব্যাপারটা চেপে যাই তখন। আর কুলাঙ্গারগুলাকে বের করে দেই প্রজেক্ট থেকে। আমার কিছু করার ছিল না। আমাকে মাফ করো।”
রাত নয়টায় কারেন্ট এলো।
পুরা শহর একসাথে জ্বলে উঠল। আর পানি নাই। রাস্তা শুকনা। গাড়ি চলা শুরু, হর্ন শুরু, জেনারেটর শুরু, ব্যাঙ চুপ। রাস্তায় খালি কিছু ঝিনুক পড়ে ছিল, আর শাপলার ডাঁটা, পরদিন সিটি কর্পোরেশনের লোকজন ঝাড়ু দিয়ে তুলে নিল, কেউ জিজ্ঞেস করল না কোত্থেকে এসেছে।
আমরা তখন ফার্মেসির সামনের ফুটপাথে। বাতি জ্বলার সাথে সাথে টিনের ঘর নাই, বকুল নাই, উঠান নাই। আমার কোলে একটা ঘুমন্ত বাচ্চা, আব্বার হাতে একজোড়া জুতা, আর পিছনে বিকাশের সাইনবোর্ড জ্বলে উঠল, নীল আলোয়।
নৌকাটা রাস্তার উপরে পড়ে ছিল, কাত হয়ে।
নিজাম চাচাকে আর খুঁজে পেলাম না কোথাও।
আমরা খুঁজেছি। থানায় গিয়েছি, গ্রামের বাড়িতে খবর পাঠিয়েছি, নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে। কিছু হয়নি। বিশ বছর ধরে যে লোকটা আমাদের গেট পাহারা দিয়েছে, তার একটা ছবিও কারো কাছে ছিল না, ডায়েরিতে ছবির ঘরটা খালি গেছে।
পরদিন পত্রিকায় লিখল, জাতীয় গ্রিড ফেল, তদন্ত কমিটি। পানির কথা একটা লাইনও না। আমি অফিসে গিয়ে তিনজনকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই, কালকে পানি দেখছেন? তিনজনই বলেছে, কোন পানি?
নাজিয়াও বলেছে, "মেয়েটা ছাদের চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে খেলছিল সারাদিন। পরে লোডশেডিংয়ে সব অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় ভয় পেয়েছে। আমার ছাদে গিয়ে ডাকাডাকি করার পর পেয়েছি।"
আমি আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করিনি।
মানুষ যেটা ব্যাখ্যা করতে পারে না, সেটা ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। তাই ভুলে যেতে চেষ্টা করলাম।
নাজিয়ার পরিবার এই ফ্ল্যাট ছেড়েছে পরের জুনে।
নাজিয়া একটা সরকারি কলেজে চাকরি পেয়েছে, রাজশাহীতে। স্বামী রাজি হয়নি, বলেছিলেন, “এই বয়সে এইসব পাগলামি। উনি ছোঁয়াকে নিয়ে চলে গেছেন। ডিভোর্স হয়েছে কিনা আমি জানি না, জিজ্ঞেস করার অধিকার আমার নাই।”
যাওয়ার আগের দিন নাজিয়া একবার এসেছিল হিসাবের কাগজ বুঝিয়ে দিতে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, "তোমাকে একটা কথা বলি। ওইদিন যখন ছোঁয়াকে পাওয়া যাচ্ছিল না, আমি একবারও তোমার কথা ভাবি নাই। একবারও না। তখন বুঝছি, আমার জীবনে তুমি ততটাও গুরুত্বপূর্ণ না।"
আমি বলেছিলাম, "এইটা তো ভালো কথা।"
সে বলেছিল, "হ্যাঁ। আমার জন্য ভালো।" তারপর সবার সামনে যেভাবে ডাকত, সেভাবেই বলল, "ভাইয়া, ভালো থাকবেন।"
আমি ওকে থামাইনি। এই গল্পে আমি একটা কাজই ঠিক করেছি হয়ত।
ঘটনার তিন মাস পরে অফিসে একটা ফাইল এলো। পূর্বাচলের কাছে একটা প্রজেক্ট। কাগজে লেখা "নাল জমি"। আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখলাম, নাল জমি না। খাল। সরু হয়ে গেছে, ময়লায় ভরা, কিন্তু পানি চলে। পাড়ে চারটা পরিবার থাকে, একটা ছেলে হাত-জাল দিয়ে মাছ ধরছিল।
আমি সই দিইনি। আব্বাকে বললাম, এই ফাইলটা আমি ছাড়ব না। উনি কিছু বললেন না, খালি মাথা নাড়লেন। কোম্পানি প্রজেক্টটা ছেড়ে দিল।
দুই মাস পরে ওই জমিতে বালু পড়া শুরু হলো। অন্য একটা কোম্পানি।
নিজাম চাচার ডিঙিটা এখন আমাদের পার্কিংয়ে রাখা, আব্বার গাড়ির পাশে। বিল্ডিং কমিটি আপত্তি করেছিল, আব্বা বলেছেন, বিল্ডিং আমার, নৌকা থাকবে।
আর বাচ্চাটার সেই জুতাজোড়া আব্বার আলমারিতে, কাগজপত্রের বাক্সে, দলিলগুলার উপরে।
কারেন্ট গেলে উনি এখন নিচে নামেন। মায়ের পাশে বসেন। পা ডুবান।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আব্বা, কী বদলাইল?"
উনি বলেছেন, "আগে পানিতে নামতাম জমির মালিক হইয়া। এখন নামি খালের পাড়ের মানুষ হইয়া।"
আমরা নিশ্চিন্ত থাকি একটা কারণে। কারেন্ট আবার আসবে। বাতি জ্বলবে, পানি চলে যাবে, আমরা আবার বলব কিছুই দেখি নাই।
কিন্তু ইদানীং কারেন্ট গেলে আমি ঘড়ি দেখি।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
বিশ মিনিট।
আর ভাবি, কোনো এক রাতে যদি বাতিটা আর না জ্বলে?
সেদিন দক্ষিণের খাল একা থাকবে না। ঢাকার নিচে ঘুমিয়ে থাকা খালগুলা একে অন্যকে চিনে ফেলবে। তারা নতুন কোনো রাস্তা বানাবে না। তাদের নতুন রাস্তা লাগবে না।
পুরোনো রাস্তা তাদের মনে আছে।
আমরা বলব, শহর ডুবে গেছে।
শহর হয়ত বলবে, না। আমি খালি আগের রূপে ফিরে আসছি।