হারুন সাহেব নিজের সম্পর্কে প্রায়ই একটা কথা বলেন। তিনি মানুষ খারাপ না। রাগ একটু বেশি, মুখও মাঝেমধ্যে খারাপ হয়। কিন্তু মনটা পরিষ্কার।
হারুনের বয়স ছেচল্লিশ। স্ত্রী নাসরিনের বয়স চল্লিশ। ছেলের নাম আয়ান। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। আয়ান স্কুলে কাকে ভয় পায়, কোন শিক্ষক তাকে পুরো ক্লাসের সামনে অপমান করে, পরীক্ষার আগের রাতে কেন তার বুক ধড়ফড় করে কিংবা কেন সে কয়েক মাস যাবৎ ছবি আঁকা বন্ধ করে দিয়েছে, এসব নিয়ে বাবা-ছেলের বিশেষ কথা হয় না।
বুধবার হারুন শুনল, আয়ান গণিতে সাতাশি পেয়েছে।
রেজাল্ট হাতে নিয়ে প্রথম প্রশ্ন, “তেরো নম্বর তোর বাপে আইসা খাইছে?” আয়ান নিচু গলায় বলল, “দুইটা অঙ্ক...” হারুন থামিয়ে দিল, “চুপ। বেশি বুঝাস না। টাকা দিয়া স্কুলে পড়াই, কোচিং দেই। তোর এই ফল? আমি তোর বয়সে...” এই বাক্য হারুন প্রায়ই বলে। “আমি তোর বয়সে...” বাকি অংশ পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়।
দিন তিনেক পর আয়ান স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। “আব্বু, স্কুলে কয়েকটা ছেলে আমাকে প্রায়ই...” হারুন ফোনে রিল দেখছিল। “কী?” আয়ান বলল, “আমাকে নিয়ে হাসে।” হারুন তাকাল, “তুই মাইয়া নাকি?” আয়ান চুপ। হারুন বলল, “কেউ কিছু বললেই মুখ বেজার? শালার জেনারেশন একখান। পোলাপান সব হিজড়া হইতেছে। দুইডা কথা সহ্য করতে পারে না।” নাসরিন রান্নাঘর থেকে বলল, “ও কী বলতে চাচ্ছে আগে শোনো তো।” হারুন ফোন নামিয়ে তাকাল। “তুমি চুপ থাকো। তোমার লাই পাইয়া পোলা এইরম হইছে।” আয়ান আর কিছু বলল না।
রাতে হারুন ফেসবুকে একটা পোস্ট শেয়ার করল। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখুন। আপনার সন্তান হয়ত মুখে কিছু বলছে না, কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়ছে। সে ক্যাপশন দিল, “বর্তমান যুগের বাবা-মায়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।” দুইশো তিনটা রিঅ্যাকশন। পঁয়ত্রিশটা শেয়ার। একজন কমেন্ট করল, “ভাই, আপনার মতো সচেতন বাবা আজকাল খুব কম দেখা যায়।” হারুন হার্ট রিঅ্যাক্ট দিল। নাসরিন পোস্টটা দেখল। কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা উল্টো করে রাখল।
হারুনের জীবনের মূল সমস্যা অবশ্য ছেলে না। বউ, বাপ-মা, চাকরি, টাকা, দেশ, কিছুই না। তার জীবনের মূল সমস্যা, সে সেক্স পায় না। অন্তত তার তা-ই ধারণা। দিনের মধ্যে কতবার সেক্সের চিন্তা তার মাথায় আসে, সে নিজেও জানে না। অফিসে ফাইল খুলে বসেছে। সেক্স। ফেসবুক ওপেন করেছে। সেক্স। রাস্তায় কোমর দেখা গেল। সেক্স। বউ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। সেক্স। বউ ক্লান্ত। তার মাথায় প্রশ্ন, আজকে দিবে? বউ অসুস্থ। আজকে দিবে? বউয়ের মাথা ব্যথা। আজকে দিবে? বউয়ের সঙ্গে সারাদিন কথা হয়নি। রাতে দিবে?
রবিবার সন্ধ্যায় নাসরিন বলল, “আমার সাথে একটু বসে কথা বলো।” হারুন জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?” নাসরিন বলল, “এমনিই।”
—এমনিই আবার কী কথা?
—আমাদের নিয়ে।
হারুন বিরক্ত হলো। “সারাদিন কামলা দিয়া আইছি। এহন দাম্পত্য সম্পর্কের মিটিং বসাবা?” কথোপকথন সেখানেই সমাপ্ত।
রাত একটা বাজে। হারুন নাসরিনকে হাত দিয়ে টেনে কাছে নিল। নাসরিন বলল, “আজকে না।” হারুনের মুখ বদলে গেল। “ক্যান?”
—ভালো লাগছে না।
—প্রতিদিনই তোমার ভালো লাগে না।
—প্রতিদিন তো বলি না।
—একই কথা। বিয়া করছি কী জন্য?
নাসরিন চুপ করে আছে। হারুন বলল, “স্বামীরও একটা হক আছে।”
ভোরে ফজরের অ্যালার্ম বাজছে। হারুন চোখ খুলল না। হাত বাড়িয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে পাশ ফিরে আবার ঘুমাল। সকাল আটটার দিকে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে ইউটিউবে ওয়াজ ছেড়ে দিল। স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হলে কী হবে বয়ান চলছে। হারুন টুথব্রাশ মুখে নিয়ে মাথা নাড়ল। “এইডাই তো।” ভিডিয়ো শেষ। পাশে আরেকটা ভিডিয়ো উঠে এলো, ফজরের নামাজ ছেড়ে দিলে পাঁচ ভয়াবহ পরিণতি। ভিডিয়োটা পরে দেখবে ভেবে সে সেভ করে নিল।
অফিসে যাওয়ার সময় ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে অচেনা মেয়ের ছবি সামনে। পোশাকটা হারুনের পছন্দ হলো না। সে কমেন্ট করল, “মাগি, কাপড় কিনার টাকা নাই?” এ ধরনের কথা মাঝেসাঝে সে বলে ফেলে। মুখে না। ফেসবুক কমেন্ট সেকশনে। কখনো, “বাপ ভাই নাই?” কখনো, “খানকিগুলার জন্য সমাজ নষ্ট।” রাতে হারুন বাসায় ফিরে রফিকের টেলিগ্রাম গ্রুপে ঢুকল। রফিক লিখেছে, “মাল পাঠাইলাম।” হারুন ইয়ারফোন লাগাল। একটা ভিডিয়ো দেখল। তারপর আরেকটা। অতঃপর আরেকটা। মাঝে ফোন নামিয়ে পানি খেল। আবার চালাল।
পরদিন দুপুরে ফেসবুকে পোস্ট দিল, চোখের হেফাজত করুন। অশ্লীলতা জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। রফিক হাহা রিঅ্যাক্ট দিল। হারুন ইনবক্সে লিখল, “শালা।” রফিক উত্তর দিল, “কাল রাত মনে নাই?” হারুনও একটা হাসির ইমোজি পাঠাল।
অফিসে হারুনকে অবশ্য বেশ ভদ্র বলে সবাই জানে। বস ডাকলেন। হারুন দরজায় টোকা দিল। “মে আই কাম ইন, স্যার?” বস ফাইল দেখিয়ে বললেন, এখানে চেঞ্জ দরকার। হারুন বলল, “এক্সাক্টলি, স্যার।” আরেকটা আইডিয়া দিলেন। “ভেরি গুড আইডিয়া, স্যার।” একসময় একটু ধমকও দিলেন। “নো ইস্যু, স্যার। ফিক্স করে দেব।” হারুন রুম থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করল। ডেস্কে ফিরে বসল। দিন শেষে অফিস থেকে বের হলো।
রাস্তার পাশে কিছু রিকশা।
—মিরপুর যাবি?
—দেড়শ।
—দেড়শ তোর বাপ দিব?
—স্যার, জ্যাম...
হারুন থামিয়ে দিল, “চুপ কর ফকিরের বাচ্চা। একশ।”
—একশতে যামু না।
—যা, ভাগ। তোদের মতো চোরের জন্য দেশডা শ্যাষ।
আরেকটা রিকশা নিল একশ বিশে। বাসার সামনে পৌঁছে একশ টাকা দিল। রিকশাওয়ালা বলল, “স্যার, একশ বিশ কথা হইছিল।” হারুন চোখ বড়ো করে বলল, “কী? আমার লগে তর্ক করস?” লোকটা বলল, “না স্যার, কিন্তু...” হারুন বলল, “কিন্তু কী? বেশি কথা কইলে এক টাকাও দিমু না।” রিকশাওয়ালা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর চলে গেল।
হারুনের মাথা মাঝে মাঝে এমন গরম হয়। বাসের হেলপার পাঁচ টাকা বেশি চাইলে, “এই শুয়োরের বাচ্চা, হাত নামা।” চায়ের দোকানের ছেলে চা দিতে দেরি করলে, “কানে শুনস না? গাধার বাচ্চা।” বাসার কাজের মহিলা একদিন দেরি করে এলো। হারুন দরজা খুলেই বলল, “গরিবের পুতের সমস্যা এইডাই। কাজের ঠিক নাই।”
শুক্রবার বিকেলে নাসরিন কাজের ফাঁকে বলল, “মানুষের সাথে একটু ভালোভাবে কথা বলতে পারো না?” হারুন ঘুরে তাকাল। “তুমি আমারে এখন আদব শিখাইবা?”
—আমি শুধু বললাম...
—চুপ থাকো। দুনিয়া সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে? এদের মাথায় তুললে মাথায় উইঠা নাচে।
—এরা মানে?
—এই লোয়ার ক্লাস।
নাসরিন আর কিছু বলল না।
শনিবার খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। রাতে বৃদ্ধ এক রিকশাওয়ালা হারুনকে বাসার সামনে নামাল। ভাড়া আশি টাকা। লোকটা টাকা নেওয়ার আগে বলল, “স্যার, দশটা টাকা বাড়ায়া দিয়েন। রাস্তা খুব খারাপ ছিল।” হারুন থেমে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকল। “তোমরা মানুষেরে কী মনে করো?” বৃদ্ধ অবাক হলো। “না স্যার, আমি তো...” হারুন বলল, “আশি কথা হইছে না?” লোকটা বলল, “হইছে।” হারুন বলল, “তাইলে দশ টাকা ক্যান চাইছস? ভিক্ষা করস?” রিকশাওয়ালা চুপ করে থাকল। হারুন আশি টাকা দিয়ে গেটের ভেতর ঢুকে পড়ল।
বাসায় এসে কাপড় বদলিয়ে ফোন। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা ভিডিয়ো সামনে এলো। একজন বৃদ্ধ রাস্তার পাশে বসে কাঁদছে। ক্যাপশন, “আমরা মানুষ হব কবে?” ভিডিয়োটা হারুন শেয়ার দিল। ক্যাপশন: “খুব কষ্ট লাগে এসব দেখলে।” নাসরিন শেয়ারটা দেখল। রিঅ্যাক্ট দিল না।
বিয়ের সাত মাসের মাথায় নাসরিন লক্ষ্য করেছিল, দিনের পর দিন তাদের কথা কমে আসছে। নাসরিন কিছু বললে হারুনের মুখ থেকে কিছু মুখস্থ বাক্য বের হয়।
“চুপ করো।”
“বেশি কথা বইল না।”
“আমি বাইরে কী ফেস করি কোনো আইডিয়া আছে?”
“তুমি সারাদিন বাসায় বইসা থাকো।”
এক দুপুরে নাসরিন পাল্টা উত্তর দিয়ে ফেলল, “বাসায় বসে থাকি মানে?” হারুন তিন সেকেন্ডের জন্যে থতোমতো খেলেও দ্রুত সামলিয়ে উত্তর দিল, “হ, খুব সিইও হইছ তুমি।” নাসরিন শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর আরেকটা জবাব দিল। কথা বাড়ছে। হারুনের গলা উঁচু হচ্ছে। চড়টা সেদিনই পড়ল। ঘরে একটা ছোট শব্দ হলো। নাসরিন কয়েক সেকেন্ড হারুনের দিকে তাকিয়ে থাকল। হারুনও তাকিয়ে আছে। তারপর মুখ গোমড়া করে বলল, “এহন খুশি তুমি? তুমি আমারে ওই জায়গায় নিয়া গেলা।”
পরদিন হারুন ফুল নিয়ে এসেছিল। নাসরিন দরজা খুলে ফুলের দিকে তাকাল। হারুন উষ্ণ গলায় বলল, “আমি কালকে যা করছি ঠিক করি নাই। তুমি তো জানো আমার মাথা গরম।” নাসরিন কিছু বলল না। কিছুদিন গেল। আবার ঝগড়া। কখনো চড়। ধাক্কা। কখনো হাত চেপে ধরা। কখনো দেয়ালের দিকে ঠেলে বলা, “বেশি মুখ চালাবি না।” প্রায় পাঁচ বছর আগে এক আত্মীয় তাকে এভাবে গায়ে হাত তোলা বন্ধ করতে বলেছিল। হারুন জিজ্ঞেস করেছিল, “আমি কি ওরে মাইরা হাড্ডি ভাইঙ্গা দিছি?”
মঙ্গলবার বন্ধুদের আড্ডায় নারী নির্যাতনের টপিক উঠেছে। একজন লোক ফোন হাতে ভিডিয়ো করতে করতে তার স্ত্রীকে মারধর করেছে। হারুন মুখ বাঁকাল। “আমি লাইফে কোনো মেয়ের গায়ে হাত তুলি নাই।” আড্ডা অন্যদিকে চলে গেল। হারুনের সম্ভবত তখন নাসরিনের কথা মাথায় আসেনি। কিংবা এসেও পাত্তা পায়নি।
বাসায় এসে অন্য এক কাজে আলমারির তল থেকে হারুন আয়ানের পরীক্ষার খাতা খুঁজে পেল। সে খাতাটা হাতে নিয়ে আয়ানের ঘরে ঢুকল। “এইডা কী?” আয়ান চুপ। হারুন আবার জিজ্ঞেস করল, “কী এইডা?”
—কথা বল।
—আমি ভয় পাইছিলাম।
—আমারে ভয় পাইছস?
আয়ান আবার চুপ। হারুন কাছে গিয়ে কানের নিচে কষে থাপ্পড় দিল। চিৎকার করে বলল, “তরে এহন ভয় কারে কয় দেখামু?” নাসরিন দৌড়ে এলো। “তুমি পাগল হয়ে গেছ?” হারুন চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি দূরে যাও।” নাসরিন বলল, “বাচ্চাটারে...” হারুন বলল, “চুপ কর মাগি!” ঘর থমথম করছে। আয়ানের চোখ বড়ো। নাসরিন স্থির। হারুন দুই সেকেন্ড পর বলল, “আমার মাথা গরম করাইও না।”
রাত বাড়ল। আয়ান নিজের ঘরে শুয়ে আছে। হারুন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। বিছানার পাশে বসে বলল, “বাপেরা শাসন করে ভালোর জন্য। বুঝছস?” আয়ান মাথা নাড়ল। হারুন মাথায় হাত বুলিয়ে বের হয়ে এলো। আদর করতে পেরে তার ভালো লেগেছে।
এভাবে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। হারুন অফিস যায়। আয়ান স্কুলে যায়। নাসরিন ঘরের কাজ করে। প্রতিদিন গালি। মাঝেমধ্যে চড় থাপ্পড়।
দুই মাস পরের ঘটনা। সন্ধ্যায় ফেরার পথে বাসে আজ প্রচণ্ড ভিড়। হারুনের সামনে একজন নারী। বাস ব্রেক করল। সবাই সামনে এগোল। হারুনও। মেয়েটা ঘুরে তাকাল। হারুন অন্যদিকে তাকাল। আরেকবার বাস ব্রেক করল। এইবার হারুনের হাত গিয়ে লাগল কিন্তু সে সরাল না। একটু বেশি সময় রাখল। মেয়েটা দ্রুত সরে গেল। ঘুরে তাকাল হারুনের দিকে। হারুন মুখ শক্ত করে বলল, “কী?” মেয়ে কিছু বলল না। ভিড়ের মধ্যে জায়গা বদলে নিল। হারুনও জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর বাস আবার চলতে শুরু করেছে।
তবে এটা প্রথম ঘটনা না। বেশ আগে থেকেই হারুনের ভিড়ের বাস ভালো লাগে। ভিড়ের বাস। মানুষ গায়ে গায়ে ঠেসে আছে। এরকম। মাঝে মাঝে মেয়ে সামনে পাওয়া যায়। সামনে পড়লে হারুনের শরীরের ভিতর হিসাব শুরু হয়। কোথায় হাত রাখলে দুর্ঘটনা মনে হবে। কতক্ষণ থাকলে বেশি হয়ে যাবে। বাস ব্রেক করলে শরীর এগিয়ে যায়। অনিচ্ছাকৃত এক ইঞ্চি, ইচ্ছাকৃত তিন ইঞ্চি। খুব অল্প। হারুনের ধারণায় অল্প অপরাধ অপরাধ না। সে ধর্ষক না। এই বিষয়ে সে নিশ্চিত। ধর্ষক হচ্ছে অন্য মানুষ। ধর্ষক জঙ্গলে নেয়, ছুরি ধরে। মারধর করে। খবরের কাগজে আসে। হারুন বাসে একটু ছুঁয়েছে। “এত ভিড়ের মধ্যে লাগতেই পারে।”
ফেসবুক ইনবক্সেও কিছু ঘটনা আছে। কিছুদিন আগে হারুন যেমন পাঠিয়েছিল, প্রথম মেসেজ: হায়। দুই ঘণ্টা পর: হ্যালো? পরদিন: “রিপ্লাই দ্যান না ক্যান?” তারপর, “এত ভাব কীসের?” অতঃপর, “নিজেকে কী মনে করেন?” রাত বাড়লে, “খানকি মাগি রিপ্লাই দেস না ক্যান?” সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতের মেসেজ দেখে হারুনের ভয় লাগে। স্ক্রিনশট নেয় যদি? সে আনসেন্ড করে ফেলে। রফিকের সঙ্গে সিগারেট খেতে খেতে বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি হলো। রফিক বলল, “দোস্ত, তুমি ডেস্পারেশনে মারা যাইতেছ।” হারুন বলল, “বউ যদি ঠিকমতো দিত, এইসব লাগত?” সবাই হেসে উঠল।
জীবনের চাকা ঘুরতে ঘুরতে প্রায় এক বছর পর, শুক্রবার রাতে নাসরিন বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি জানো তোমার সমস্যা কী?” হারুন ফোন দেখছিল।
—আবার শুরু করছ?
—তুমি সবসময় রেগে থাকো।
—আমি রাগী, নতুন কী?
—না। তুমি দুর্বল মানুষের ওপর রাগ দেখাও।
হারুন ফোন নামাল। “মানে?” নাসরিন বলল, “তোমার বস কিছু বললে তুমি ইয়েস স্যার। রিকশাওয়ালা দুই টাকা বেশি চাইলে কুত্তার বাচ্চা।” হারুনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—আমারে অপমান করতেছ?
—আমি কথা বলছি।
—তোর সাহস বেশি হইয়া গেছে।
—দেখো, আবার।
হারুন উঠে দাঁড়াল। “কী আবার?” নাসরিন বলল, “এইটাই।” হারুন বলল, “কী এইডা?” নাসরিন বলল, “তুমি কথা বলতে পারো না। শুধু পারো ভয় দেখাতে।” হারুন হাত তুলল। নাসরিন এবার পিছাল না। সে তাকিয়ে আছে। হারুনের হাত কয়েক সেকেন্ড বাতাসে থাকল। তারপর নিচে নামল। “আমার সামনে থেকে যা। নইলে খারাপ কিছু হইব।” নাসরিন চলে গেল।
সকাল হলো। হারুন অফিস গেল। কাজের চাপ অনেক। বিকেল নাগাদ রাতের কথা আর উঠল না। এক মাস গেল। দুই মাস। আরও কয়েক মাস। তারপর এক বৃহস্পতিবার হারুন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দরজা খুলে থামল। কী যেন আলাদা। সে জুতা খুলে ভেতরে এলো। ডাইনিং টেবিলে আয়ানের পানির বোতল নেই। বেডরুমে ঢুকে আলমারি খুলল। অর্ধেক ফাঁকা। আয়ানের স্কুলব্যাগ নেই। কিছু বইও নেই। নাসরিন নেই। টেবিলের ওপর একটা খাম।
হারুন খাম খুলল। পড়া শুরু করল। “আমি বহু বছর ধরে...” তারপর, “তোমার ভয়...” “গালি...” “হাত...” “আয়ান...”
সে আর পড়তে পারল না। কাগজ ছুড়ে ফেলল। ফোন বের করল। দুইবার। চারবার। সতেরোবার। নাসরিন ধরল না। মেসেজ গেল: “এইসব নাটক কী?” “বাচ্চা নিয়া গেছ ক্যান?” “তুই আমারে চিনস না।” “একটা থাপ্পড় খাইছস দুইদিন, তাতেই সংসার শ্যাষ?” “সব পুরুষ রাগ করে।” “তোর মাথা নষ্ট।” “তোরে এত ভালো রাখছি এই প্রতিদান?” “মাগির সাহস দেখ।” আধাঘণ্টা গেল। হারুন আবার ফোন হাতে নিল। “প্লিজ ফোন ধর।” “আমি তোমারে ছাড়া বাঁচব না।” আরও সময় গেল। রাত নামল। “আল্লাহর কসম তুমি আমার জীবন শেষ করছ।”
হারুন কাঁদল। সত্যি সত্যিই কাঁদল।
রফিক খবর পেয়ে রাতে এলো। সিগারেট ধরাল। সব শুনল। হারুন বলল, “দোস্ত, আমি কী করছি?” রফিক সিগারেটে টান দিয়ে বলল, “বন্ধু, মাইয়া মানুষরে বেশি মাথায় তুললে এই হয়।”
—আমি ওরে কী দেই নাই?
—এইডাই।
—নিজে পুরান শার্ট পরছি। ওরে জামা কিন্না দিছি।
—ভিডিয়ো দে।
—কী ভিডিয়ো?
—নিজের কথা বল।
হারুন প্রথমে রাজি হয়নি। কিছুক্ষণ পর ফোন জানালার পাশে দাঁড় করানো হলো। রেকর্ডিং শুরু হলো। হারুন কথা শুরু করল। মাঝখানে থামল। আবার শুরু করল। আলো ঠিক হলো না। রফিক ফোনটা একটু সরিয়ে দিল।
হারুন ক্যামেরার দিকে তাকাল। “আমি সাধারণ একটা মানুষ। আমার টাকা নাই। বউরে আমি জান দিয়ে ভালোবাসছি।” গলা ধরে এলো। “নিজে না খাইয়া পরিবাররে খাওয়াইছি।” সে থামল। “নিজে ভালো জামা পরি নাই।” আরেকটু পরে বলল, “বউ-বাচ্চার জন্য সব করছি।” চোখ দিয়ে পানি পড়ল। “আজ সে আমারে ছাইড়া গেছে। আমার অপরাধ কী? আমি গরিব? আমি ওরে বেশি ভালোবাসছি?”
ভিডিয়ো শেষ হলো। হারুন চোখ মুছে বলল, “বেশি নাটকীয় লাগতেছে?” রফিক বলল, “না। রিয়েল।”
রাত ১১টা ১৭ মিনিটে ভিডিয়ো পোস্ট হলো।
ঘুম থেকে উঠে হারুন দেখে ফোনে নোটিফিকেশন থামছে না। সকাল গড়িয়ে দুপুরে ভিডিয়ো আট লাখ ভিউ ছাড়িয়েছে। একটা পেজ শিরোনাম দিয়েছে, “পুরুষের কান্না কেউ দেখে না।” আরেকটা, “টাকা না থাকলে ভালোবাসার দাম নেই। সাথে ব্রোকেন হার্ট ইমোজি।” কমেন্ট প্লাবিত। “ভাই আপনি কিং।” “নারী জাতটাই এমন।” “ভালো পুরুষের কদর নাই।” “আল্লাহ আপনাকে উত্তম স্ত্রী দিন।” “একদিন বুঝবে।” “পুরুষ মানে এটিএম মেশিন।”
একজন মহিলা কমেন্ট করল, “স্ত্রীর বক্তব্যও শোনা উচিত।” তার নিচে একটার পর একটা উত্তর এলো: “ফেমিনিস্ট মাগি।” “তোর জামাই পালাইছে নাকি?” “ভাইয়ের চোখের পানি দেখস না?” “তগো মতো মেয়েদের জন্য সংসার টিকে না।”
নাসরিনের এক আত্মীয় তাকে ভিডিয়োটা পাঠাল। সঙ্গে লিখল, “আপু, ভাইয়া তো আপনাকে অনেক ভালোবাসে মনে হয়।” আরেকজন পাঠাল। কয়েকজন ফোন করল। “বাচ্চার কথা ভেবে হলেও ফিরে যান।” “সংসারে একটু আধটু ঝগড়া হয়ই।”
নাসরিন প্রথমে দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাস লিখল। তারপর ড্রাফট অবস্থায় ডিলিট করল। হারুনের তিন মিনিটের কান্নার বিপরীতে তার বিশ বছরের জীবন বোঝাতে গেলে বিশ বছরই লাগবে। তারিখ, ঘটনা, মেসেজ, শব্দ, প্রমাণ, কনটেক্সট লাগবে। তাছাড়া ক্যামেরার সামনে চাইলেই কাঁদতে পারা যায় না।
দু’সপ্তাহ পর।
হারুন পডকাস্টে বসেছে। নাম, “পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও নীরব কষ্ট।” ক্যামেরা চলছে। সামনে মাইক্রোফোন। নরম আলো। কথা হলো, পুরুষ মানুষ সব সহ্য করে। পুরুষের কথা কেউ শোনে না। পুরুষকে সম্মান দিতে হবে। আমাদের সমাজে পরিবার ভাঙছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নষ্ট করছে। ভিডিয়ো বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল হলো। তারপর আরেকটা ভিডিয়ো। আরও সাক্ষাৎকার। লাইভ। ফলোয়ার দ্রুত বাড়ছে। দশ হাজার। তিরিশ হাজার। সত্তর হাজার। এক লাখ। হারুন প্রোফাইল বায়ো বদলাল। দাড়ির কাট, চুলের স্টাইল, এগুলোও বদলে গেল।
ক্যামেরার সামনে হারুন এখন স্বচ্ছন্দ। রিং লাইটের সামনে বসে একদিন বলল, “আপনার সন্তানকে কখনো গালি দেবেন না। একটি খারাপ শব্দ শিশুর মনে আজীবন ক্ষত তৈরি করতে পারে।” ভিডিয়োটা ছড়িয়ে পড়ল। স্কুলে আয়ানের বন্ধু ফোন এগিয়ে দিল। “এইটা তোর বাপ না?” আয়ান স্ক্রিনের দিকে তাকাল। “হ।” বন্ধু বলল, “আংকেল অনেক ভালো কথা বলে।” আয়ান বলল, “হুঁ।” ভিডিয়ো চলতে থাকল।
রাস্তায় মানুষ হারুনকে চিনতে শুরু করেছে। একজন এগিয়ে এসে বলে, “ভাই, আপনার ভিডিয়ো দেখে কান্না করছি।” হারুন মাথা নিচু করে উত্তর দেয়, “দোয়া করবেন।” আরেকজন বলে, “আপনি অনেক ভালো মানুষ ভাই।” হারুন হাসে, “চেষ্টা করি।”
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে, রাতে হারুন বাসায় ফিরেছে। ফিরে দরজা বন্ধ করল। ফোন হাতে নিয়ে সে খেয়াল করল, রফিক কিছু লিংক পাঠিয়েছে। মিনিট বিশেক সেগুলো দেখল। তারপর ফেসবুকে ঢুকল। স্ক্রল করতে করতে র্যান্ডম ফিমেল মডেলের কিছু ছবি সামনে এলো। হারুন কমেন্ট বক্সে গেল। আঙুল কিছুক্ষণ চলছে। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। বাজে কমেন্ট করা যাবে না, মানুষ তার নাম চিনে ফেলতে পারে।
হারুন মেসেঞ্জার খুলল। একজন নারী তার একটা ভিডিয়োর প্রশংসা করে মেসেজ দিয়েছে। হারুন লিখল, “হাইই।” রিপ্লাই এলো। আরেকজনকে লিখল। তারপর আরেকজনকে। কিছু রিপ্লাই এলো, কিছু এলো না। এক ঘণ্টা পর একটা চ্যাটে লিখল, “তোমার শরীরের খুদা মেটাবে? আমি আছি।” কেউ ব্লক করল। অন্য একটা কথোপকথন চলতে থাকল।
রাত বাড়ছে। ঘরের আলো নিভে গিয়েছে। ফোনের আলো বরাবর হারুনের মুখে পড়ছে।
ভোরের দিকে ফজরের অ্যালার্ম বাজছে। হারুন চোখ না খুলেই বন্ধ করে দিল। পাশ ফিরে ঘুমাল। ঘরের আলমারির ওপরে অনেকদিন যাবৎ ধুলোজমা কোরানের বাংলা অনুবাদ পড়ে আছে। মাঝখানে নীল বুকমার্ক।