মজু মিয়ার ডান চোখের উপরের চামড়াটা কুঁচকে ছোটো হয়ে গেছে। এই এক চোখের দৃষ্টি দিয়েই সে দুনিয়াটাকে দেখে, আর তার মনে হয় পুরো দুনিয়াটা একটা প্রকাণ্ড জালের ভেতর ছটফট করছে}
মজু মিয়া একজন দক্ষ শিকারি। নদী-নালা আর হাওরের বিলে বাজপাখি আর ডাহুক ধরা তার কাজ। সে জানে, শিকারের ফাঁদ পাতার পর ধৈর্যই আসল জিনিস। যে তাড়াহুড়ো করে, শিকার তাকে ফাঁকি দেয়।
আজ সকালে মজু মিয়া তার ঘরের সামনের মাটির দাওয়ায় বসে বাঁশের সরু বাখারি ছুলছিল। তার সামনে হাঁটুতে থুতনি দিয়ে বসে আছে মজিদ। মজিদ মজু মিয়ার আপন ছোটো ভাই, কিন্তু রক্ত ছাড়া ভাইদের মধ্যে আর কোনো মিল নেই। মজিদ সোজা-সরল, বোকা টাইপের লোক। গায়ে গাধার খাটুনি খাটতে পারে, কিন্তু হিসাব-নিকাশ একদম বোঝে না।
ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মজিদ খুব নিচু গলায় বলল, "দাদা, মহাজন তো কইলো আজ রাতের মধ্যে পাওনা ত্রিশ হাজার টাকা না দিলে ভিটা নিলামে তুলব।"
মজু মিয়া বাখারি থেকে চোখ তুললো না৷
ধীর গলায় বললো, "মহাজন তো ভুল কয় নাই। টাকা তো আমরা নিছিলাম।"
মজিদের গলায় একটু যেন কান্নার সুর, "কিন্তু ঐ টাকা তো বাপের কাফন-দাফন আর তোর চোখের চিকিৎসার জন্য গেছিল! আমি কি একলা খাইছি?"
মজু এবার হাত থামালো। এক চোখে মজিদের দিকে তাকালো। সেই চোখে কোনো ছায়া নেই, কোনো ভালোবাসা নেই, কেবল একটা গভীর হিসাব।
"সংসারে মহাজন টাকা পায়, বুঝলি মজিদ? কান্না দিয়ে দেনা শোধ হয় না। আর মহাজন তো ভালো মানুষ, সোজা হিসাব চায়।"
মজিদ চুপ হয়ে গেল। সে জানে, তার এই দাদাটা বড্ড শক্ত মনের মানুষ।
সন্ধ্যা নামার মুখে মজু মিয়া মজিদকে বললো, "চল, হাওরের চরে যামু। আজ রাতে এক বিশেষ শিকার আছে।"
মজিদ অবাক হলো, "এই ঘোর অমাবস্যায় কীসের শিকার দাদা?"
"ডাহুক। অমাবস্যার রাতে চরের ভেতর ডাহুকের সুর চেনা যায় না। অন্ধের মতো আইসা ফাঁদে পড়ে।"
দুটো হারিকেন আর জালের ব্যাগ নিয়ে দুই ভাই হাওরের চরে গেল। চারপাশ থমথমে অন্ধকার। কাদার উপর দিয়ে হাঁটার ছপছপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
চরের এক নির্জন জায়গায় এসে মজু মিয়া থামলো।
একটা বড়ো গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে সে মজিদকে বললো, "তুই এই গর্তের ভেতরে নাম মজিদ। হারিকেনটা নিচে রাখ। আলোটা উপরের দিকে মারবি। পাখিরা আলো দেইখা নিচে নামব, আর আমি উপর থেইকা জাল ফেলমু।"
মজিদ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে গর্তে নেমে গেল। নিঃশব্দে হারিকেনটা জ্বালিয়ে মুখের আলোটা উপরের দিকে তুললো। সে তার দাদাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে।
কিন্তু গর্তে নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যেও উপরে কোনো জালের শব্দ হলো না।
মজিদ নিচু গলায় ডাকলো, "দাদা! জাল পাতছোস?"
উপর থেকে কোনো উত্তর এলো না।
মজিদ আলোটা উপরের দিকে তুলতেই দেখলো, মজু মিয়া গর্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার হাতে কোনো জাল নেই। তার হাতে একটা মস্ত কাঠের গুঁড়ি আর কোদাল।
মজিদের গলার আওয়াজ হঠাৎ কেঁপে উঠলো, "দাদা?"
মজু মিয়া উপর থেকে এক চোখের ঠান্ডা দৃষ্টিতে নিচে তাকালো। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো হিংসা নেই। একদম শান্ত, বরফের মতো শীতল মুখ।
মজিদের বুকের ভেতরটা খালি হয়ে গেল। সে হারিকেনের আলোয় তার দাদার মুখটা দেখতে চেষ্টা করলো। কোনো রাক্ষস নয়, কোনো শয়তান নয়, তার নিজের আপন রক্ত, যে তাকে এতকাল ভাত খাইয়েছে, আজ সেই তাকে জ্যান্ত কবর দিচ্ছে।
মজিদের গলা দিয়ে আকুতি বের হলো, "দাদা, তুই আমারে মারবি? আমি তোর ভাই না?"
মজু কোদাল দিয়ে এক কোপ মাটি কেটে গর্তের ভেতরে ফেললো।
"ভাই তো অবশ্যই। ভাই না হলে কি আর এই চরে তোকে বিশ্বাস করে আনতাম? পর মানুষকে কি এত সহজে শিকার করা যায় রে বোকা?"
মাটি পড়া শুরু হলো। মজিদ চিৎকার করার চেষ্টা করলো, কিন্তু অন্ধকার হাওরে সেই চিৎকার বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের নিচে চাপা পড়ে গেল। সে বুঝলো, তার দাদা যে পাখিদের শিকার করতো, তাদের চেয়েও বড়ো শিকার সে নিজে। শিকারি কোনোদিন শিকারের আকুতি শোনে না।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাটি ঢাকা শেষ হলো। হাওরের চরে এখন একটা সমান মাটির ঢিবি।
পরদিন সকালে গ্রামে হুলুস্থুল পড়ে গেল। মজু মিয়া উঠোনে বসে বুক চাপড়ে কাঁদছে। চোখের পানি আর নাকের জলে তার মুখ ভেসে যাচ্ছে।
"আমার সোনার ভাইটারে কোন শয়তানে মাইরা ফেললো রে, মহাজনের লাঠিয়ালরা কাল রাতে চরে দেইখা আসছিলো!"
পাড়াপড়শিরা এসে মজু মিয়াকে ধরে শান্ত করছে। মহাজন ভয়ে আত্মগোপন করেছে, পাড়ার লোক মহাজনের বাড়ির দিকে তেড়ে যাচ্ছে।
বিকেলে পুলিশ এসে তদন্ত করে গেল। সবাই মজু মিয়ার কান্না দেখে সমবেদনা জানাচ্ছে।
কেউ একজন বললো, "মজু ভাই, এত বড়ো শোক সামলাবা কীভাবে?"
মজু কান্নার মাঝখানেই আঁচল দিয়ে এক চোখের পানি মুছলো।
তারপর নিচু গলায় বললো, "আল্লাহর বিচার। ভাইডা গেল, কিন্তু ভিটাডা বেঁচে গেল। এখন বাকি জীবনটা এই ভিটাতেই কাটিয়ে দেব।"
সন্ধ্যা নামলো। মজু মিয়া নিজের মাটির দাওয়ায় একাই বসে আছে। চারপাশ নিঝুম। সে একটা বাঁশের বাখারি ছুলতে শুরু করলো।
হঠাৎ দূরে, হাওরের দিক থেকে একটা ডাহুকের ডাক ভেসে এলো।
মজু মিয়া বাখারি থেকে চোখ তুলে অন্ধকারে তাকালো। তার একমাত্র চোখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। সে জানে, এই দুনিয়ায় বাঁচার একমাত্র উপায় হলো, শিকার হওয়া এড়াতে হলে নিজেই শিকারি হয়ে যেতে হয়। তাতে ভাই মরুক বা বাপ, ভিটা বেঁচে থাকে।
মজু মিয়া মুখে একটা বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে আবার বাখারি ছুলতে মন দিলো।