তুতেনখামেনের বউ

মেয়েটার আদতে কোনো নাম নেই; নাম তো স্রেফ কতগুলো সামাজিক ধ্বনির সমষ্টিমাত্র—মানুষ যা দিয়ে একে অপরকে ধাতস্থ করে, সনদের কাগজে বা পরিচিতি পত্রে কালি দিয়ে আটকে রাখে। কিন্তু কিছু চেহারা; যা নামের ক্ষুদ্র সীমানা পেরিয়ে সরাসরি সুপ্রাচীন রূপকথা ও রহস্যের গহিনে গিয়ে নোঙর ফেলে—মেয়েটি বুয়েটের স্থাপত্যকলা বিভাগে পড়ে; তার প্রতিদিনের ব্যস্ততা কাটে খসখসে ট্রেসিং পেপারের ওপর টি-স্কেল ঘষে, সিভিল ড্রয়িংয়ের ইটের সমান্তরাল রেখা টেনে শূন্য স্থানকে বাঁধার জ্যামিতিক হিসাব কষে। অথচ শৈশব থেকেই সে বুঝেছে, সুন্দরের সবটুকু সার্বভৌমত্ব যেন তাকে ঘিরেই অনবরত আবর্তিত হচ্ছে।

সে নিজে কখনো সৌন্দর্যের রূপরেখা বা ব্যাকরণ শেখেনি; চারপাশের নিমগ্ন চোখের চাহনি কিংবা অকারণ থমকে যাওয়া ও অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস তাকে প্রতিনিয়ত চিনিয়ে দিয়েছে—সে সাধারণ কোনো মরণশীল অস্তিত্ব নয়। রাজধানীতে থাকা এ মেয়েটি পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী। দেশের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন আর্কিটেকচারাল মেকানিক্সের পাঠ চুকিয়ে; স্বাবলম্বী। কিন্তু এ যান্ত্রিক ঢাকার রাস্তায় যখন সে হাঁটে, তার হাঁটার মাঝে এক অদ্ভুত রাজকীয় সাবলীলতা ফুটে ওঠে। তার দীর্ঘ গ্রীবা, সুনির্দিষ্ট চোয়াল যেন কোনো দক্ষ ভাস্কর অসীম ধৈর্য ও সময় নিয়ে পাথর কেটে রূপ দিয়েছেন—পদ্মাবতীর মতো অমোঘ রূপসি, ক্লিওপেট্রার মতো মায়াবী চোখ—কাজিনরাসহ শৈশবের খেলার সাথি-সহপাঠী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবাই একবাক্যে বলে এসেছে, তার জন্ম নাকি বিশ্বসুন্দরী হওয়ার জন্যে; কিন্তু পৃথিবীর এ চপল-সস্তা তোষামোদ ও সস্তা প্রশংসার কোলাহল মেয়েটিকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। প্রশংসার প্রাচীর তাকে ঘিরে ধরলেও সে নিজেকে একাকী এক দ্বীপে বন্দি করে রাখে; সে ভাবতে ভালোবাসে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে—আদতে কে সে? শুধুই কি রক্ত-মাংসের তৈরি একজন নারী স্থপতি? নাকি তার এ মাটির অবয়বের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্তা? কেন এ প্রশ্ন নিজের ভেতর জাগে বারবার তাও সে হদিশ করতে পারে না।

ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাফেটেরিয়ার লাল ইটের দেয়ালে দুপুরের রোদ এসে পড়েছিল; চারপাশে সহপাঠীদের ড্রয়িং বোর্ডের খসখস শব্দ ও চা-কফির কাপের টুংটাং—মেয়েটি জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল; লাল ইটের স্তূপ এবং কদম গাছের ছায়ার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—এই চেনা জ্যামিতি যেন তার জন্য নয়, তার আত্মার ভেতরে শৈশব থেকেই এক অচেনা-অলৌকিক বোধ ডালপালা মেলেছে, এক অদেখা টান যা তাকে সব সময় অজানা শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়—যেন তার সৌন্দর্য আত্মার এক সুপ্রাচীন সংকেত, যা পার্থিব জগৎকে এক নিমেষে অচেনা করে তোলে এবং সত্তাকে তার হারিয়ে যাওয়া স্বদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঢাকার কোলাহল যখন মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় তলিয়ে যায়, তখন মেয়েটির ধানমন্ডির একাকী ঘরটিতে ফুটে ওঠে এক মায়াবী আবহ—সে ঘরের বাতি নিভিয়ে দেয়; কেবল ড্রয়িং টেবিলের ছোট টেবিল ল্যাম্পের ম্লান হলদে আলো তখন ঘরে রাজত্ব করে এবং সে ড্রেসিং টেবিলের দীর্ঘ আয়নাটির সামনে দাঁড়ায়—আয়নার স্বচ্ছ পারদের আস্তরণ ভেদ করে ফুটে ওঠে তার রূপ—দীর্ঘ গ্রীবা, টানা গভীর চোখ এবং এসবের মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নবিদ্ধ ও বিষাদময় ঠোঁটের কোণ। কিন্তু সে সাধারণত আয়নার সামনে রূপচর্চা করতে দাঁড়ায় না; সে দাঁড়ায় নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক প্রতিবিম্বকে খুঁজতে—যা হয়তো তারই ভেতরে থাকা বিপরীত এক সত্তাকে উন্মোচিত করবে।

আলোকিত কাচের দিকে সে অপলক চেয়ে থাকে; তার মনে হয়, কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কেবল তার চোখের প্রতিচ্ছবি নয়; ও অন্য কেউ। এক সুপ্রাচীন নারী, যার চোখের দৃষ্টিতে রয়েছে হাজার বছরের সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা, এক অনন্ত বিরহ। মেয়েটি ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় আয়নার কাচের দিকে। আঙুলের ডগা যখন কাচ স্পর্শ করে, তখন এক অদ্ভুত মায়াজাল ঘিরে ধরে রুমটাকে, কাচ তখন সাধারণ কোনো শীতল পদার্থ থাকে না; মেয়েটি স্পষ্টভাবে অনুভব করে, কাচের ওপার থেকে ধেয়ে আসছে সুদূর মরুভূমির শুষ্ক, তপ্ত সাহারার বালুকণার উষ্ণ বাতাস।

ঘরের নীরবতায় তার মনে হতে থাকে, দূর থেকে ভেসে আসছে নদীর তরঙ্গধ্বনি। কিন্তু সেই নদী বুড়িগঙ্গা, মেঘনা বা যমুনা নয়—তার স্রোতে ভেসে আসে যেন শণপত্র, লোবান আর সোনা দিয়ে বাঁধানো সুপ্রাচীন মন্দিরের সুবাস। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে—কেন সে বারবার এই আয়নার গভীরে নিজেকে হারায়? কেন তার মনে হয়, বুয়েটের এই ড্রয়িং বোর্ড, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নকশা—সব স্রেফ এক সাময়িক মুখোশ! যেন আয়নায় কেবল তার মুখের ছবি দেখায় না; উপযুক্ত চেতনার মুখোমুখি হলে তা সময়ের দেয়াল ভেঙে আত্মাকে তার সুপ্রাচীন আদি রূপের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এসব ভাবতে ভাবতেই তার চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে—কাচের ওপাশের প্রতিবিম্বটি যেন সেই আর্দ্রতামিশ্রিত মলিন মুখ দেখে এক বিষাদময় হাসি হাসে। মেয়েটি অনুভবে করে, তার জীবনের মূল অধ্যায়টি এখনও লেখা শুরু হয়নি।

বুয়েটের সুবিশাল ডিপার্টমেন্টাল ক্লাসরুমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন। প্রজেক্টরের আলো পড়েছে সামনের সাদা পর্দায়। আজ বিষয়বস্তু: হিস্ট্রি অফ আর্কিটেকচার: ইজিপশিয়ান সিভিলাইজেশন। প্রফেসর একের পর এক স্লাইড পরিবর্তন করছেন; স্ক্রিনে ভেসে উঠছে গিজা, স্ফিংক্সের পাথুরে মুখ, কার্নাক ও লুক্সরের মন্দিরের সুবিশাল স্তম্ভসমূহ। মেয়েটির চোখ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো নোট নেওয়ার দিকে কোনোভাবেই নেই—সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়েছিল পর্দার নীল, লাল আলোর মিশ্রণে তৈরি হওয়া সেই প্রাচীন পৃথিবীর দিকে।

হঠাৎ প্রজেক্টরের স্লাইডে ফুটে উঠল এক অপূর্ব আবক্ষ ভাস্কর্য সম্রাজ্ঞী নেফারতিতি। স্লাইডের তীব্র আলো মেয়েটির চোখে গিয়ে পড়তেই তার পুরো মেরুদণ্ড বেয়ে এক অলৌকিক বিদ্যুতের শক খেলে গেল! প্রজেক্টরের স্লাইডের সেই দীর্ঘ গ্রীবা, নিখুঁত সুনির্দিষ্ট চোয়াল আর বিষাদময় সম্রাজ্ঞীর চাহনি। পুরো ক্লাসরুমের এয়ার কন্ডিশনারের ঠান্ডা বাতাস যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল; মেয়েটি স্পষ্ট অনুভব করতে পারে—এক তপ্ত মরুঝড় তার মুখাবয়বে আছড়ে পড়ছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় স্লাইডের নেফারতিতির চেহারার সাথে মেয়েটির নিজের মুখের আদলের অবিকল শতভাগ মিল!

পরের স্লাইডেই ভেসে উঠল বালক সম্রাট তুতেনখামেন—তার বিখ্যাত সোনার মাস্ক, চোখে কাজলটানা রাজকীয় গম্ভীরতা, ঠোঁটে এক নীরব হাহাকার; তুতেনখামেনের প্রতিকৃতি দেখা মাত্রই মেয়েটির বুকের বাঁ পাশে সুতীব্র এক যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল—এ যেন প্রেম নয়, এ যেন যুগ যুগ ধরে জমতে থাকা সুপ্রাচীন ব্যাকুলতার তীব্র বহিঃপ্রকাশ!

—কী রে, এত মন দিয়ে কী দেখছিস? পাশে বসা সহপাঠী রকি ফিসফিস করে বলে উঠল—তোর এক্সপ্রেশন দেখে তো মনে হচ্ছে তুতেনখামেন তোর এক্স!

পেছনের সারিতে বসা অনিক ও অন্য বন্ধুরা ফান করে হেসে উঠল। অনিক নিচু স্বরে বলল—দূর ভাই, ও তো সাধারণ কেউ না। আমাদের ডিপার্টমেন্টের নেফারতিতি! আজ থেকে তোর নতুন নাম তুতেনখামেনের বউ!”

বন্ধুদের এই হালকা চপলতা আর হাসাহাসির মাঝেও মেয়েটি কিছু বলতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ‘তুতেনখামেনের বউ’ কথাটি ক্লাসরুমের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে যেন এক অলৌকিক কালজয়ী মন্ত্রের মতো তার কানে অনবরত বাজতে লাগল। যেন রসিকতা মাঝে মধ্যে কেবল হাসির খোরাক নয়; তা সময়ের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা কোনো মহাসত্যের প্রারম্ভিক বার্তা।

ক্লাস শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগে। বুয়েটের আর্কিটেকচার বিল্ডিংয়ের ল্যাবগুলো একে একে খালি হয়ে আলো নিভে যাচ্ছে, কেবল মেয়েটির টেবিলের ছোট ড্রয়িং ল্যাম্পটি জ্বলছিল। বাইরে তখন ঢাকার শ্রাবণের অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। ইটের ওপর বৃষ্টির টাপুরটুপুর শব্দে পুরো শহর স্থবির। কিন্তু মেয়েটির স্কেচবোর্ডে চলছিল এক সম্পূর্ণ বিপরীত পৃথিবীর নির্মাণ—সে পেনসিল হাতে ট্রেসিং পেপারের ওপর টি-স্কেল ঘষছিল। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় তার হাত দিয়ে কোনো আধুনিক বহুতল ভবন বা ব্রিজের নকশা বের হচ্ছিল না। তার পেনসিলের সুনির্দিষ্ট টানে ট্রেসিং পেপারে একে একে ফুটে উঠছিল তিন হাজার বছর আগের সুপ্রাচীন নীল নদের গতিপথ, সূর্যদেবতা আতেন-এর মন্দিরের প্রাঙ্গণ ও পিরামিডের মাটির নিচের গোপন প্রকোষ্ঠের অদ্ভুত সব জ্যামিতিক অলিন্দ।

সে পেনসিল থামিয়ে স্কেচবুকের দিকে তাকাল—তার চোখের সামনে ঢাকার শ্রাবণের বৃষ্টি ম্লান হয়ে গেল; সে দেখতে পেল এক স্বর্ণালি মরুভূমি, যেখানে বালুর ঢেউয়ের ওপর আছড়ে পড়ছে রক্তিম সূর্যাস্ত এবং সেই মরুভূমির দূর সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ সম্রাট তুতেনখামেন। সম্রাটের মাথায় সোনার কেউটে সাপের চিহ্ন, হাত বাড়িয়ে সে ডেকে চলেছে তাকে। মেয়েটি নিজের বুকের ওপর হাত রাখে—তার হৃৎস্পন্দন সাধারণ মানুষের মতো সুষম নয়; মাঝে মধ্যেই তা থমকে যায়, যেন কোনো কালানুক্রমিক জ্যামিতিক ঘড়ির কাঁটা হুট করে থমকে গেল। স্মৃতি কেবল মস্তিস্কে খোদাই করা তথ্য নয়; কখনো কখনো রক্তের লোহিত কণিকায় ভেসে থাকা সুপ্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক্স; যা উপযুক্ত বৃষ্টি বা বাতাসের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে। সে কিছু একটা হচ্ছে নিজের ভেতরে এটা অনুমান করে কিন্তু বুঝতে পারে না, বন্ধুরা যাকে ‘তুতেনখামেনের বউ’ বলে ঠাট্টা করেছে, তা হয়তো কোনো রূপকথা নয়। পঁচিশ বছরের এই তন্বী তরুণীর আধুনিক জীবনের আড়ালে যে জাতিস্মর বাস করছে, সে এবার দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছে।

পঁচিশ বছর বয়সটা যেন এক অদ্ভুত মায়াবী সন্ধিক্ষণ—যেখানে জীবনের শৈশব-কৈশোরের রূপকথাগুলো বাস্তবতার রূঢ় টানে ধীরে ধীরে স্মৃতির ধুলোয় ঢাকা পড়তে শুরু করে, আধুনিক পৃথিবীর কঠোর জ্যামিতি তার বিষাক্ত ডালপালা মেলে। আসন্ন অক্টোবরে মেয়েটির পঁচিশতম জন্মদিন। বন্ধুরা মিলে এবার পূজার ছুটিতে কক্সবাজার ট্রিপের পরিকল্পনা করে—কিন্তু সকলেই বিরাগ! দেশে নয়, এবার বিদ্যাশ! ঠিক হলো নেপাল! রকিই সব ব্যবস্থা করেছে—ওরা শুধু টাকা দিয়েছে—রকির আবার এসব কাজে বেশি আনন্দ! ওকে সবাই বলে—তুই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টেই কর! ঢাকায় কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততা, ট্র্যাফিকের কোলাহল, ট্রেসিং পেপারের ক্লান্তি পেরিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল নেপালের উদ্দেশে পা বাড়ানোর। মেয়েটির নিজের কোনো ইচ্ছা ছিল না কোথাও যাওয়ার; তার মনের গহিনে প্রতিনিয়ত বাজছিল সুদূর সাহারার বালুঝড় আর এক প্রাচীন মরুভূমির অলৌকিক আহ্বান। কিন্তু বন্ধুদের প্রবল পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি হতেই হয়।

ঢাকা বিমানবন্দরেই জটিলতা শুরু—অনেকেরই প্রথম ফ্লাইট, ফ্রেশ পাসপোর্টে ফরেন ট্রিপ ইমিগ্রেশনে নানাপ্রশ্ন যেমন করে, সন্দেহ করে যদি না ফেরে! গরিব দেশের নাগরিকের এই এক সমস্যা—কেউ বিশ্বাস করে না। প্রকৌশলী বন্ধু মনিরুজ্জামান মিন্টুর খালাতো ভাই এয়ারপোর্টের এসপি লিমনকে বলিয়ে অবশেষে ইমিগ্রেশন পার হওয়া। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই হঠাৎ পরিবেশের পরিবর্তনটা মেয়েটির ভেতরে এক নতুন আধ্যাত্মিক কম্পন তৈরি করল। কাঠমান্ডুর ঘিঞ্জি গলি, পোড়া কাঠের ও চন্দনের সুবাস, থামেলের সরু পথের দুধারে বাতাসে ঝুলে থাকা রঙিন প্রার্থনার পতাকাসমূহ—সবকিছুই যেন এক সুপ্রাচীন রহস্যে ঘেরা। বন্ধুরা যখন থামেলের এক ক্যাফেতে বসে গরম মোমো আর কফির আড্ডায় মশগুল, মেয়েটি তখন একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছিল কাঠমান্ডু নতুন দরবার স্কয়ারের সুবিশাল প্রাঙ্গণে। কাঠের কারুকাজে খোদাই করা প্রাচীন দেব-দেবীর মূর্তির দিকে তাকাতেই তার মনে হলো, সুদূর প্রাচ্যের এই স্থাপত্য ও নীল নদের তীরের সূর্য মন্দিরের জ্যামিতিক বিন্যাসের মাঝে কোথাও এক অলৌকিক অদৃশ্য সুতা জড়িয়ে রয়েছে। যে আত্মা একবার সময়ের সীমা লঙ্ঘন করেছে, তার কাছে পৃথিবীর সব সুপ্রাচীন পথই চেনা মনে হয় যেন সে বহুকাল আগে এই পথে হেঁটে গিয়েছিল। দুই দিন কাঠমান্ডুর ধুলোবালি ও কাঠের মন্দির পেরিয়ে তারা যখন পোখরার উদ্দেশে রওনা হলো, তখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তার বাঁকে বাঁকে মেঘের অলৌকিক খেলা শুরু হয়েছে। মেয়েটি বাসের জানালায় কপাল রেখে দূরে তাকিয়ে থাকে। তার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, এ যাত্রা কেবল বন্ধুদের সাথে সাধারণ কোনো ছুটির ভ্রমণ নয়; এটি তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে যেখানে আকাশের সাথে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম, যেখানে তার আসল স্বাতন্ত্র্য উন্মোচনের নীল আলো অপেক্ষা করছে। ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন ভক্তপুরের পুরোনো দরবার স্কয়ারের এক কোণে, যেখানে হাজার বছরের পুরোনো এক কাঠের প্যাগোডা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে হঠাৎ এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে— মেয়েটি যখন একাকী হেঁটে একটি সুপ্রাচীন শিলালিপির কারুকাজ পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন রাস্তার পাশে বসে থাকা এক বয়োবৃদ্ধ পাহাড়ি তিব্বতি লামা তার দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন। বৃদ্ধের চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর বিস্ময় ও অদেখা ভীতি। মেয়েটি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে লামার সামনে দাঁড়াতেই, বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে মেয়েটির অবয়বের চারপাশের শূন্যতা স্পর্শ করার চেষ্টা করলেন। লামা বিড়বিড় করে তিব্বতি ফোকলোরের সুপ্রাচীন ভাষায় কিছু বললেন, যার মর্মার্থ দাঁড়ায়—

"তুমি তো বরফ বা পর্বতের আত্মাদের অন্তর্ভুক্ত নও, হে রাজপুত্রী! তোমার চারপাশে তো সুদূর সাহারার স্বর্মিম বালুকা আর সূর্যদেবতার নীল আভা ঘুরপাক খাচ্ছে"

পাশে এসে দাঁড়ানো বন্ধুরা লামার এ কথা শুনে হাহা করে হেসে উঠল। অনিক রসিকতা করে বলল, “দেখলি তো! নেপালের লামারাও বুঝে গেছে তুই বুয়েটের আর্কিটেক্ট না, তুই আসলে মিসরের ফারাওদের ঘরানার কেউ!”

বন্ধুরা বিষয়টিকে রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে দিলেও, মেয়েটির বুকের ভেতর এক সু-তীব্র বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে যায়—তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে। সে অনুভবে পুনরায় নিজের ভেতর সেই অচেনা বোধের অনুরণন পায় এবং এই পাহাড়ি প্রাচীন উপত্যকা তার ভেতরের সুপ্ত চেতনাকে দ্রুত জাগিয়ে তুলছে। পোখরায় এসে ফেওয়া লেকের শান্ত স্বচ্ছ জলের মুখোমুখি—বিকেলের ম্লান আলোয় হ্রদের দর্পণতুল্য জলে অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণির তুষারশুভ্র প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে—ঠিক যেন এক বিশাল রুপালি ক্যানভাস। মেয়েটি লেকের ঘাটে বাঁধানো একটি কাঠের ডিঙি নৌকায় গিয়ে বসে। জলের গভীরে দৃষ্টি দিতেই তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। সে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলো, কিন্তু সেই প্রতিবিম্বে তার আধুনিক প্যান্ট-শার্ট পরা রূপের পেছনে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল এক সুপ্রাচীন রাজকীয় নারীর অবয়ব। মাথায় সম্রাজ্ঞীর স্বর্ণমুকুট, গলায় নীল ফিরোজা পাথরের ভারী রাজকীয় হার। সে চমকে উঠে জলে হাত দেয়; অমনি জলের তরঙ্গভেদে সেই রূপ মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার ভেজা হাতের তালুতে রয়ে গেল মরুবালুর এক অনভ্যস্ত বিষাক্ত উত্তাপ। পানি কেবল তৃষ্ণা মেটায় না; তা যখন স্থির হয়, তখন তা চেতনার গভীরে লুকিয়ে থাকা অতীতেও রূপ নেয়।

— কী ভাবছিস এত?

রকি তার দিকে গরম কফির কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

— ট্যুরে জন্মদিন পড়ছে মানে তোর পঁচিশতম জন্মদিনের ট্রিপ, তুই এভাবে পাথরের দেবীর মতো গম্ভীর হয়ে আছিস কেন?

মেয়েটি এক বিষাদময় মায়াবী হাসি হেসে কফির কাপে চুমুক দিল।

— কিছু না রে, মনে হচ্ছে এই পর্বতগুলো আমাদের সাধারণ কোনো দর্শনার্থী ভাবছে না। ওরা হয়তো কোনো সুপ্রাচীন বার্তার অপেক্ষা করছে।

— আমাদের নেফারতিতি এখন মারাত্মক দার্শনিক হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু আসল অ্যাডভেঞ্চার তো কাল থেকে। আমরা পোখরা থেকে সোজা চলে যাচ্ছি আপার মুসতাংয়ের দিকে। এই কাঠমান্ডু, পোখরা আর চিতোয়ান তো কেবল ট্রেইলার ছিল!

পরদিন ভোরে তারা ফোর-হুইল সুমো জিপে করে রওনা হলো আপার মুসতাংয়ের উদ্দেশে। যতই তারা উঁচুতে উঠতে লাগল, পরিবেশ ততই রুক্ষ, বৃক্ষহীন ও ভৌতিক রূপ ধারণ করতে লাগল। সবুজ প্রকৃতি উধাও হয়ে ভেসে উঠল ধূসর, রিক্ত, প্রকাণ্ড সব পাহাড়—শুভ্র পর্বত আর অন্নপূর্ণার কোল ঘেঁষে যাওয়া এই পথ যেন এক ভিন্ন গ্রহে প্রবেশের সুপ্রাচীন রূপক। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথ, কাদা-পাথরের গিরিখাত পেরিয়ে তাদের জিপ অবশেষে এসে পৌঁছাল মুসতাং ভিলেজের ঐতিহাসিক ও রহস্যময় জনপদ মারফা-তে। আপেল বাগানে ঘেরা এ গ্রামটি সাদা মাটির বাড়ি ও পাথুরে সরু গলি দিয়ে সাজানো এবং চারপাশের প্রকাণ্ড তুষারাবৃত শৈলশৃঙ্গগুলো গ্রামটিকে যেন এক প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়ের মতো পাহারা দিচ্ছে। মারফার বাতাস প্রচণ্ড ঠান্ডা ও তীক্ষ্ণ, কিন্তু আকাশ অনাবিল নীল আর পরিষ্কার। গ্রামে ঢোকার মুখে সারি সারি ‘মণি-চক্র’ বাতাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরছে; পাহাড়ি ফোকলোরে বিশ্বাস করা হয়, মুসতাংয়ের এই নিষিদ্ধ উপত্যকা হলো এমন এক স্থান যেখানে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের সীমানা সবচেয়ে পাতলা। পঁচিশতম জন্মদিনের রাত নেমে এলো মুসতাং উপত্যকায়। তারা যে ঐতিহ্যবাহী কাঠের কটেজে উঠেছিল, তার বিস্তৃত ব্যালকনি থেকে পুরো তুষারাবৃত পর্বতমালা দেখা যায়। রাত যত বাড়তে লাগল, চারপাশের শব্দহীনতা ততটাই প্রগাঢ় হয়ে উঠল। কটেজের ভেতরে আগুনের পাশে বসে বন্ধুরা গান গাইছিল, কেক কেটে হইচই করছিল, কিন্তু সে নিশ্চুপ!

কটেজের ব্যালকনিতে এসে সে একা দাঁড়ায়—আকাশে পূর্ণিমার ম্লান চাঁদ, আর চাঁদের আলোয় বরফের শৃঙ্গগুলোকে মনে হচ্ছে কোনো ধসে পড়া সুপ্রাচীন মন্দিরের রাজকীয় স্তম্ভ। মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে—হিমেল কনকনে হাওয়ার মাঝে। সে আবার স্পষ্ট পেল শণপত্র, চন্দন আর মিসরের প্রাচীন মন্দিরের ধূপের তীব্র সুবাস। রাত বারোটা বাজতে মাত্র কয়েক মুহূর্ত বাকি—আকাশের বুক চিরে নেমে আসার অপেক্ষায় এক অতিলৌকিক মহাজাগতিক স্নো ফলের কালবৈশাখি।

রাত সাড়ে এগারোটা। কাঠের কটেজের ভেতরের পরিবেশ উৎসবমুখর; ফায়ারপ্লেসে কাঠের খড়ি পুড়ছে, পপ মিউজিকের সাথে বন্ধুরা ল্যাপটপের আলোয় নাচানাচি করছে। কিন্তু মেয়েটির কাছে এই পুরো আনন্দ আয়োজনকে মনে হচ্ছিল বহু দূরে ঘটে যাওয়া কোনো পরাবাস্তব নাটকের দৃশ্য। সে ব্যালকনির কাঠের রেলিংয়ে হাত রাখে—নেপালের মুসতাং উপত্যকার কনকনে ঠান্ডা হাওয়া তার চিবুক ও গ্রীবা ছুঁয়ে যাচ্ছে। অথচ তার চামড়ার নিচে এক ধরনের উষ্ণ রক্তস্রোত বইছিল, যা বরফের হিমেল স্পর্শকে এক নিমেষে উধাও করে দেয়।

হঠাৎ করেই বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। হিমালয়ের পাইন আর আপেল বাগানের ঘ্রাণ ছাপিয়ে মেয়েটির নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল এক তীব্র সুবাস—চন্দন, লোবান, শুকিয়ে যাওয়া পদ্মরেণু আর কফিনের শণপত্রের গন্ধ। সে চোখ বন্ধ করল। আকাশে ছড়ানো তারাগুলোর দিকে তাকাতেই তার মনে হলো, তারাগুলো সাধারণ জ্যোতিষ্ক নয়; তা যেন সুপ্রাচীন ফারাওদের পিরামিডের মাথায় আঁকা হায়ারোগ্লিফিক লিপির উজ্জ্বল বর্ণমালা—হয়তো যখন আত্মা তার হারিয়ে যাওয়া স্বদেশের ঘ্রাণ পায়, তখন ভৌগোলিক সীমারেখাগুলো কেবল মানচিত্রের কাল্পনিক রেখা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। পঁচিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে মাত্র কয়েক মিনিট পর; অথচ তার বুকের অন্দরে টিকটিক করে চলা ঘড়িটা যেন সংকেত দিচ্ছে এই সময়টা আধুনিক জীবনের নয়, এই সময়টা তিন হাজার বছর আগের অসমাপ্ত কোনো এক কালানুক্রমিক চক্রের।

রাত বারোটার ঠিক দুই মিনিট আগে হঠাৎ করে পুরো পাহাড়ি উপত্যকার বাতাস এক হিংস্র হুংকারে স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই আকাশ কালো করে ধেয়ে এলো প্রচণ্ড এক তুষারঝড়—কটেজের কাঠের ফ্রেমগুলো যেন বাতাসের ধাক্কায় মড়মড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। ঘরের ভেতরের আলো দপ করে নিভে গিয়ে পুরো কটেজ ঘন আঁধারে ডুবে গেল। বন্ধুরা ভয়ে চিৎকার করে উঠে, কিন্তু মেয়েটি যেন এক অদৃশ্য আবেশে টেনে নেওয়া পুতুলের মতো কটেজের ব্যালকনি থেকে সরাসরি খোলা বরফের চাদরের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক রাত বারোটায়, পাহাড়ের সুউচ্চ বরফাবৃত চূড়ার ওপর আকাশ চিড়ে নেমে আসে প্রকাণ্ড এক বিদ্যুতের আলো—সেই বিদ্যুৎ সাধারণ সাদা বা হলুদ রঙের নয়; গভীর, উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় নীল, যা প্রাচীন মিশরের রাজমুকুটে ব্যবহৃত হতো লাপিস লাজুলি—যেন অলৌকিক পাথরের অগ্নিনির্ভর আলোর রূপক এসে এ আলোয় ভর করেছে। সেই নীল আলোর রশ্মি সরাসরি এসে আঘাত করল মেয়েটির চোখের মণি ও বুকের ঠিক মাঝখানে। বুয়েটের আর্কিটেকচারাল মেকানিক্স, ঢাকার চেনা ইটের শহর আর বন্ধুরা এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল সুররিয়ালিস্ট এক অলৌকিক ধাক্কায়। মেয়েটি তুষারাবৃত বরফের ওপর আচমকা হয়ে ঢলে পড়ে—যেন মহাজাগতিক সত্য যখন চেতনায় আছড়ে পড়ে, তখন পার্থিব অস্তিত্বের সমস্ত যুক্তি ও জ্যামিতি চুরমার হয়ে যেতে বাধ্য।

মেয়েটির দেহ বরফের ওপর পড়ে থাকলেও তার চেতনা তখন কালপরিক্রমার এক সুদীর্ঘ টানেল দিয়ে তিন হাজার বছর পেছনে ছুটে চলেছে—চোখ খুলতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করলো এক সুবিশাল, আলোকময় রাজপ্রাসাদের অলিন্দে। তার পরনে মিহি সাদা লিনেনের পোশাক, গলায় ফিরোজা ও সোনা দিয়ে তৈরি রাজকীয় অলংকার এবং নিচে শান্ত গতিতে বয়ে চলেছে নীলনদ, যার জলধারায় আছড়ে পড়ছে সূর্যাস্তের রক্তিম আলো। সে এখন ঢাকার সেই নামহীন তরুণী স্থপতি নয়; সে প্রাচীন মিশরের সূর্যদেবতা আতেন-এর উপাসক, রাজকীয় সম্রাজ্ঞী নেফারতিতি! যেন সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সদ্য তরুণ সম্রাট তুতেনখামেন, সোনার তৈরি ফণা তোলা কেউটে সাপের চিহ্নসংবলিত রাজমুকুট, চোখে গাঢ় কাজল, চেহারায় এক অসীম বিষাদময় সৌন্দর্য।

তুতেনখামেন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তার হাত দুটি আঁকড়ে ধরে বলল— তুমি ফিরে এসেছ, আমার সূর্যদেবী? আমি জানতাম তুমি কালচক্র পেরিয়ে আবার আমার কাছেই ফিরবে। নেফারতিতি তার দিকে তাকাল—কোনো রূপকথা নয়, কোনো ইতিহাসের বইয়ের পাতা নয়; এই স্পর্শ, এই চোখের গভীরতা তার শত শত বছর ধরে চেনা। তাদের আত্মায় আত্মায় এক অপরূপ মেলবন্ধন ঘটে গেল সেই মুহূর্তেই। কিন্তু রাজপ্রাসাদের সেই মনোরম স্বর্ণালি দৃশ্যপট হঠাৎ করেই এক রক্তিম আঁধারে ডুবে গেল। চেতনার ক্যানভাসে ফুটে উঠল তাদের ইতিহাসের অভিশপ্ত অধ্যায়। প্রাসাদ চক্রান্ত ও বিষক্রিয়ায় সম্রাট তুতেনখামেন মারা গিয়েছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে এবং তার বিরহে ও আতেন-ধর্মের বিরুদ্ধে চলা ষাটমুখী চক্রান্তের শিকার হয়ে ঠিক একই বয়সে শেষ হয়েছিল নেফারতিতির জীবনও। কিন্তু তাদের এই অকালপ্রয়াণ সাধারণ মৃত্যু ছিল না; তা তৈরি করেছিল এক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা মহা-অভিশাপ। পুরোহিতদের চক্রান্তে তাদের মৃতদেহ মমিকৃত করার পর দুটো পৃথক কফিনে বন্দি করা হয়। তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সংরক্ষণ করা হয় সুদূর কায়রোতে—মিউজিয়ামে, নেফারতিতির অনাবিষ্কৃত মমি গোপনেই আছে গিজার ভূগর্ভস্থ কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে। মেয়েটি শুনতে পায় এক অলৌকিক বার্তা—দুই মমি আলাদা হয়ে থাকার কারণে তোমাদের আত্মা শান্ত হয়নি। প্রতিটি জন্মে তোমরা পুনর্জন্ম গ্রহণ করছো, কিন্তু অভিশাপের নিয়মে ১৯ বছর বয়স পার করার পরপরই কোনো আকস্মিক ঘটনায় মৃত্যু তোমাদের আলাদা করে দিচ্ছে। এ জন্মে অলৌকিক জাদুবলে ২৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে আছ, কিন্তু মহাজাগতিক হিসাব অনুযায়ী সেই চূড়ান্ত মৃত্যুর মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে... তৈরি হও! ফিরে যাও সম্রাটের কাছে—নিজের কাছে!

মুসতাংয়ের পোহাড়ি কটেজের নরম বিছানায় যখন মেয়েটি চোখ খুললো, জানালার কাচ ভেদ করে সোনালি রোদ এসে পড়েছে তার ফ্যাকাশে মুখে— বাইরে বরফের শৈলশৃঙ্গগুলো শান্ত, শুভ্র; কিন্তু তার বুকের ভেতর জেগে উঠেছে তিন হাজার বছরের এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি। বন্ধুরা ব্যাকুল হয়ে তাকে ঘিরে বসে আছে। রকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠে—যাক জ্ঞান ফিরেছে! ভাইরে ভাই, কাল রাতের ওই নীল বিদ্যুৎ, তোর বরফের ওপর ঢলে পড়া দেখে আমরা ভেবেছিলাম সব শেষ!

মেয়েটি বন্ধুদের উদ্বেগের দিকে তাকাল। অনিক ব্ল্যাক কফির মগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্য বন্ধুরা ওকে স্পর্শ করে ট্রমার মাত্রা বোঝার চেষ্টা করছে—এই আধুনিক চেনা পৃথিবী—স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, ঢাকার ট্র্যাফিক আর বিকেলে বেঙ্গল বইয়ের চা, সবকিছুকে এখন তার কাছে এক অলীক মায়াজাল বলে মনে হচ্ছে।

সে কোনো কথা না বলে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করে—বন্ধুরা না করে। বলে—ওয়াশরুমে যাবে। বাথরুম অবধি তার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে সে স্পষ্ট অনুভবে পাচ্ছিল লোবান, চন্দন আর প্রাচীন মিসরের রাজকীয় ধূপের সুবাস। বুয়েটের ডিগ্রিধারী স্থপতি সত্তা ও তিন হাজার বছর আগের সম্রাজ্ঞী নেফারতিতি সত্তা এখন পুরোপুরি একীভূত—চেতনার শক্ত পর্দা যখন একবার ছিঁড়ে যায়, তখন বাস্তবতার রূপকগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে; প্রতিটি দৃশ্য তখন পরিণত হয় এক সুনির্দিষ্ট সংকেতে; এটাই হয়তো জীবনের সারসত্য।

বাথরুম থেকে ফিরে এসে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলে—আমাদের দ্রুত ঢাকায় ফিরতে হবে। আমার খারাপ লাগছে, আমার সময় শেষ হয়ে আসছে। বন্ধুরা সবাই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ঢাকায় ফিরে এসে মেয়েটি ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে একপ্রকার আত্মগোপন করে—বুয়েটের সহপাঠী বা পরিবারের সব যোগাযোগ ছিন্ন করে সে ড্রয়িং রুমের সুবিশাল দেয়াল জুড়ে টাঙিয়ে দিল গিজা মালভূমি ও সুপ্রাচীন কায়রোর জটিল আর্কিটেকচারাল ব্লু-প্রিন্ট। বুয়েটের আধুনিক জ্যামিতিক মেধা ও নেফারতিতির জাতিস্মর স্মৃতি—দুইয়ের এক অলৌকিক সংমিশ্রণ ঘটল তার স্কেচবোর্ডে। স্যাটেলাইট ম্যাপ যা কোনোদিন উদ্ধার করতে পারেনি, মেয়েটির পেনসিলের সুনির্দিষ্ট টানে তা ফুটে উঠতে লাগল খসখসে ট্রেসিং পেপারে। সে আঁকতে লাগল গিজার দ্বিতীয় পিরামিডের ভূগর্ভস্থ গোপন পথ। কিন্তু সময় যে বালুঘড়ির বালুর মতো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে!

প্রতিদিন রাত বারোটা বাজলেই তার বুকে শুরু হতো এক তীব্র দহন ও অসহ্য যন্ত্রণা—ঠিক যেমনটি হয়েছিল তিন হাজার বছর আগে রাজপ্রাসাদে চক্রান্তের বিষক্রিয়ায়। শরীরের তাপমাত্রা নেমে যেত হিমাঙ্কের নিচে, ত্বক হয়ে উঠত ফ্যাকাশে, চোখের মণি জ্বলে উঠতো নীল আভায়। ১৯ বছরের সেই অভিশপ্ত মৃত্যুর শেষ মুহূর্তগুলো এ জন্মের ক্যালেন্ডারেও ছায়া ফেলছে। যেন অভিশাপ সময়ের বুকে আঁকা এক অনন্ত জ্যামিতিক বৃত্ত; শেষবিন্দুতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তা বারবার পুনরাবৃত্ত হতে থাকে।

মৃত্যুর নির্ধারিত তারিখের মাত্র তিন দিন বাকি। মেয়েটির ধানমন্ডির ঘরে আলো আঁধারিতে কেবল পেনসিলের খসখস শব্দ। তার ল্যাপটপের মনিটরে ভেসে থাকা গিজা ও কায়রোর নকশার ওপর সে পেনসিল দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দু চিহ্নিত করল—দ্বিতীয় পিরামিডের উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি গোপন ব্ল্যাক এরিয়া মূলত এটিই সেই প্রকোষ্ঠ; সেখানেই হাজার বছর ধরে বন্দি রয়েছে তার সুপ্রাচীন অবয়ব—নেফারতিতির আসল মমি। কিন্তু এই মধ্য রাতে যেন তার শরীর ভেঙে পড়ছে মোমের মতো—মাঝরাতেই তার গলার কাছে চলে আসে রক্তের লোনা স্বাদ। প্রতিটা নিঃশ্বাসে মনে হয় বুকের পাঁজর ফুটো করে বেরিয়ে আসছে এক প্রাচীন হাহাকার; সে ড্রয়িং টেবিলের ওপর মাথা রেখে নিজের হাত দুটি দেখে—আঙুলের নখগুলোতে যেন অলৌকিকভাবে ফুটে উঠছে সোনা ও ফিরোজা রঙের প্রাচীন রাজকীয় নকশা। সে বুঝতে পারে, পার্থিব শরীর বেশিদিন এই দুই জগতের টান সহ্য করতে পারবে না। তাকে মৃত্যুর চূড়ান্ত থাবা বসানোর আগেই মিশরের মাটিতে পৌঁছাতে হবে। প্রেমিকা যখন মৃত্যুর সাথে বাজি ধরে, তখন সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড হয়ে ওঠে এক একটি শতাব্দীর সমান।

মেয়েটি কায়রোর একমুখী একটা টিকিট কেটেছে—বন্ধু স্বকৃত নোমানের সহযোগিতায় মিশরের ভিসা নিয়েছে এবং কী অলৌকিক যোগাযোগ ইজিপ্ট এয়ার ঢাকা টু কায়রো ফ্লাইট চালু করেছে ১৪ মে ২০২৩! সে বুঝে গেছে এইসব আয়োজন শুধু তার জন্যে—গুছিয়ে নেওয়ার মতো তার কোনো পার্থিব জিনিসপত্র ছিল না; কেবল ছিল একটি স্কেচবুক, পেনসিল আর গিজার সেই গোপন ভূগর্ভস্থ নকশা—রওনা হওয়ার আগে সে শেষবারের মতো ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়—আয়নার ওপারে এখন কোনো দ্বিধা বা দুই সত্তার দ্বন্দ্ব নেই। পদ্মাবতী বা ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যের যে অহংকার তাকে ঘিরে রেখেছিল এতদিন, তা এখন রূপ নিয়েছে এক পরম ও চিরন্তন ত্যাগের সংকল্পে; কারণ সে নেফারতিতি; সে জাতিস্মর!

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় দায়িত্বরত অফিসার তার পাসপোর্টের ছবি ও মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন। এত অমানুষিক রূপ ও চোখে ফুটে থাকা অতলস্পর্শী নির্জনতা কোনো সাধারণ মরণশীল মানুষের হতে পারে না; এবার ইমিগ্রেশন আটকানোর প্রথম কারণ একমুখী টিকিট; ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট ছাড়া ইমিগ্রেশন ওকে করবে না এবং আবারও বন্ধু মিন্টুর সহযোগিতা! ফোনে মাহমুদের সাথে যোগাযোগ হলে তিনি অপেক্ষা করতে বলেন। মাহমুদের সাথে তার পরিচয় নেই—মিন্টুর কাজিন। হেল্প করবে কি না জানা নেই। সে কি তাহলে রিটার্ন টিকিট কাটবে? এসব ভাবতে ভাবতেই মাহমুদ এসে যায়—দেখে অপলক; প্রথম বাক্য

— এত সুন্দরী মেয়ে একা মিশরে যাবেন কেন? কেউ সাথে নাই?

— না। একাই যাচ্ছি।

— রিটার্ন টিকিট করেননি কেন?

— ফেরার তারিখ ঠিক করিনি তাই।

— ফিরবেন তো? নাকি অন্য দেশে চলে যাবেন? পাসপোর্ট দেখি। অন্য দেশের ভিসাও তো নেই। আচ্ছা মিন্টু যখন বলেছেন, দিয়ে দিলাম। ঘুরে আসেন। আসার সময় কায়রো থেকে পারফিউম নিয়ে আসবেন।

ধন্যবাদ বলে চলে আসে—প্লেন যখন ঢাকার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ছেড়ে নীল দিগন্তের দিকে ডানা মেলল, মেয়েটি জানালার বাইরে তাকায়—মেঘের ধবধবে স্তরগুলোকে তার মনে হচ্ছিল সুদূর নীল নদের প্রকাণ্ড ঢেউ। কায়রোর মাটি তাকে ডাকছে। ডাকছে সেই বালক ফারাও, যে কাচের বাক্সে তিন হাজার বছর ধরে বন্দি হয়ে তার ‘সূর্যদেবী’র জন্য অপেক্ষা করছে—কারণ যে যাত্রা আত্মায় শুরু হয়, তা শেষ করতে কোনো পার্থিব মানচিত্রের প্রয়োজন হয় না।

যখন প্লেনের চাকা কায়রোর তপ্ত মাটিকে স্পর্শ করে, তখন প্রথাসিদ্ধ বিকেলের সূর্যাস্ত মিশরের মরুভূমিতে রক্তিম ক্যানভাস এঁকে দিচ্ছে। বিমানবন্দরের কাচের দেয়াল ভেদ করে আসা রোদের আলোয় মেয়েটি বাইরে তাকায়—ইমিগ্রেশনে সমস্যা হয়নি, তবে অফিসারটি কোনো কারণ ছাড়াই তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সির জানালায় মুখ রেখে যখন সে কায়রো শহরের আধুনিক কোলাহল পেরিয়ে ঐতিহাসিক নীল নদের তীরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল এক সুপ্রাচীন ঘ্রাণ—পলিমাটি, লোবান, শুকিয়ে যাওয়া লিলি ফুল আর তিন হাজার বছরের পুরোনো বালুকণার উত্তাপ। আধুনিক কায়রো শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন কিংবা ট্র্যাফিক লাইটের লাল-সবুজ আলো—কোনো কিছুই মেয়েটির চেতনায় ধরা দিচ্ছিল না—সে ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে নিজের স্কেচবুকটি শক্ত করে ধরে রইল। তার বুকের ভেতরের যন্ত্রণা এখন চরম শিখরে পৌঁছেছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে সাথে গলার কাছে বিষাক্ত লোনা স্বাদ ঘন হয়ে উঠছে; তার শরীরের রক্তকণিকাগুলো যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে পার্থিব জীবনের বিরুদ্ধে। অথচ তার চোখে কোনো ভয় নেই, নেই কোনো মৃত্যুর আতঙ্ক। তার চোখে ফুটে উঠেছে কেবল এক অসীম রাজকীয় কর্তৃত্ব ও আদিম ব্যাকুলতা। নদীর শান্ত জলধারার দিকে তাকাতেই তার মনে হলো—নীলনদ মোটেও নিঃশব্দ নয়। নদীর প্রতিটি ঢেউয়ের কলতানে লুকিয়ে আছে তিন হাজার বছর আগের সেই রাজকীয় দরবারের ফিসফাস, সূর্যদেবতা আতেন-এর মন্দিরের উলুধ্বনি ও তুতেনখামেনের শেষ দীর্ঘশ্বাস। ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থাকা শুষ্ক বর্ণমালা নয়; তা হলো প্রবহমান কোনো নদীর মতো, যা উপযুক্ত আত্মাকে পেলেই তার অতীতে আছড়ে ফেলে। ট্যাক্সি এসে থামে কায়রো মিউজিয়ামের প্রাচীন চত্বরে, সে হোটেল বুকিং করেছে হোটেল র্যামেসেস কায়রো ইন্টারন্যাশনাল কিন্তু সেখানে যায়নি—সোজা মিউজিয়ামে এসেছে। মেয়েটি ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়—মরুভূমির সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে গিজার পিরামিডগুলোর ছায়া সুদূর দিগন্তে প্রকাণ্ড স্তম্ভের মতো মাথা উঁচু করে রয়েছে। কায়রো মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বারে তখন শেষ মুহূর্তের দর্শনার্থীদের ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে। মিউজিয়ামের বিশাল পাথুরে স্তম্ভগুলোর ছায়া প্রাঙ্গণে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। মেয়েটিই সেদিনের শেষ টিকিট ক্রেতা—টিকিট কেটে দ্রুত মিউজিয়ামের অন্ধকারাচ্ছন্ন, নীরব গ্যালারিগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করে—সে কোনো মানচিত্র বা নির্দেশিকার দিকে তাকায় না; তার আত্মা তাকে অলৌকিকভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মিউজিয়ামের সবচেয়ে সংরক্ষিত প্রকোষ্ঠের দিকে; যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে সদ্যতরুণ সম্রাট তুতেনখামেনের বিখ্যাত সোনার কফিন ও মাস্ক।

সে ঘরটিতে প্রবেশ করে—ঘরের মাঝখানে কাচের বাক্সের ভেতরে রাখা তুতেনখামেনের সোনার তৈরি রাজকীয় কফিন ও মাস্ক; ল্যাপিস লাজুলি ও ফিরোজা পাথরের নীল নকশায় খোদাই করা বালক ফারাওয়ের প্রতিচ্ছবি। মেয়েটি ধীরপায়ে কাচের বাক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়; ঘরের বাকি দর্শনার্থীরা তার অভূতপূর্ব রূপ ও রাজকীয় চাহনি দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটির সমস্ত জগৎ তখন এসে থমকে গেছে কাচের বাক্সের ওপারে ঘুমিয়ে থাকা সেই তিন হাজার বছরের পুরোনো দেহাবশেষের ওপর। সে কেঁপে ওঠা দুটি হাত বাড়িয়ে দিল কাচের বাক্সের গায়ে; তার হাত কাচ স্পর্শ করতেই এক অবিশ্বাস্য মায়াজাল ঘিরে ধরে পুরো মিউজিয়ামকে—গ্যালারির সমস্ত বাতি একসাথে কেঁপে উঠল; ঘরের ভেতরের শীতল বাতাস মুহূর্তের মধ্যে এক অলৌকিক উত্তাপে রূপান্তরিত হয়, শূন্যে ভেসে উঠল সুপ্রাচীন মিশরীয় পুরোহিতদের স্তোত্রপাঠের সুর—কফিনের ওপর শুকনো, কালো হয়ে যাওয়া সুপ্রাচীন পদ্মফুলের মালাটি অলৌকিকভাবে তাজা হয়ে উঠল এবং রক্তিম পাপড়ি মেলতে শুরু করল। পুরো গ্যালারি ভরে গেল এক তীব্র পদ্মসুধায়।

মেয়েটির চোখ থেকে একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ল কাচের ওপর; কাচের বাক্স ভেদ করে তুতেনখামেনের সোনার মাস্কের চোখের মণিতে যেন এক নীল আলোর স্পন্দন জেগে ওঠে—কাচের ওপার থেকে সেই সুপ্রাচীন আত্মাসত্তা থরথর করে কেঁপে উঠে সাড়া দিল মেয়েটির চেতনার সাথে যেন—পার্থিব দেয়াল কিংবা কাচের আস্তরণ শরীরকে বন্দি রাখতে পারে; কিন্তু যখন দুই অভিশপ্ত আত্মা একমুখী হয়, তখন জ্যামিতির সব বাধা চুরমার হয়ে যেতে বাধ্য। মেয়েটি অস্ফুট আবেগে উচ্চারণ করে—আমি এসেছি, আমার সম্রাট। এবার আমাদের অভিশাপমুক্ত হওয়ার পালা। কায়রো মিউজিয়ামের সেই স্বর্ণালি কফিন থেকে তুতেনখামেনের আত্মা যেন এক জ্যোতির্ময় আলোর সুতোয় যুক্ত হয়ে গেল মেয়েটির বর্তমান চেতনার সাথে—অভিশাপের সুদীর্ঘ বৃত্তের প্রথম অর্ধেক পূর্ণ হয়। সবগুলো বাতি একসাথে নিভে যায় এবং ইমারজেন্সি সাইরেন বেজে ওঠে...

রাত তখন গভীর। কায়রোর আকাশে ফুটে উঠেছে কোটি কোটি তারকা। গিজার বিশাল মালভূমির ওপর মরুভূমির কনকনে ঠান্ডা বাতাস বালুকণা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে পিরামিডের গা ছুঁয়ে। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে মেয়েটি সোজা চলে এলো গিজার পিরামিড প্রাঙ্গণে। রাতের এ সময়ে গিজা মালভূমিতে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, চারপাশ থমথমে নীরবতায় ঢাকা। কিন্তু মেয়েটির কাছে নিরাপত্তা দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না কারণ সে সম্রাজ্ঞী, এ গিজার সকল গোপন পথ তার নখদর্পণে। সে ধীরপায়ে হেঁটে যায় দ্বিতীয় পিরামিডের উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে—বুয়েটে পড়া তার স্থাপত্যবিদ্যার জ্যামিতিক জ্ঞান ও নেফারতিতির স্বজাত্য স্মৃতির অলৌকিক টানে সে খুঁজে বের করলো পিরামিডের গায়ে পাথরের বিশেষ খাঁজটি। মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর হাঁটু গেড়ে বসে এবং নিজের ড্রয়িং স্কেচবুকটি খুলে পেনসিলে আঁকা নকশাটি মেলালো রাতের আকাশে ফুটে থাকা অরিয়ন কনস্টেলেশন মণ্ডলীর তিনটি প্রধান তারার বিন্যাসের সাথে—তার বুকের ভেতরে বিষক্রিয়া ও অভিশাপের যন্ত্রণা এখন চরমে পৌঁছেছে—গলার কাছে রক্তের লোনা স্বাদ, চোখে ঝাপসা নীল আলো, হাত-পা হিমাঙ্কের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে; সে অনুভবে বুঝতে পারে—তার নশ্বর এ জন্মের বাংলাদেশি শরীরের সময় মাত্র কয়েক মিনিটের ওপর দাঁড়িয়ে। সে শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে হাত বাড়ালো পিরামিডের গায়ে খোদাই করা একটি নির্দিষ্ট ‘আঙ্ক’ চিহ্নের পাথুরে বোতামের ওপর—মুহূর্তের মধ্যে এক গভীর সুপ্রাচীন শিলার ঘর্ষণের শব্দে মরুভূমির মাটি কেঁপে উঠল। ভারী পাথরের স্ল্যাব সরে গিয়ে খুলে গেল এক ভূগর্ভস্থ অন্ধকার সুড়ঙ্গ—যার বুক থেকে ভেসে এলো তিন হাজার বছর ধরে বন্দি থাকা লিনেন, শণপত্র আর রাজকীয় লোবানের সুবাস এবং এই স্থাপত্যবিদ্যা কেবল ইটের ওপর ইট সাজানো নয়; তা পাথরের সংকেতে বন্দি থাকা আত্মাকে মুক্তির পথ চিনে নেওয়ার এক অলৌকিক মানচিত্র।

মেয়েটি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে, তার শরীরের অলৌকিক আলোই তাকে পথ দেখাচ্ছে—হাতে থাকা নীলক্ষেত ফুটপাত থেকে কেনা টর্চটির চেয়েও এ আলো অনেক বেশি উজ্জ্বল—যেখানে প্রকোষ্ঠের আঁধারে ঘুমিয়ে আছে তার সুপ্রাচীন পার্থিব রূপ—নেফারতিতির আসল মমি। ভূগর্ভস্থ গোপন প্রকোষ্ঠটি সুপ্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে আঁকা চিত্রাবলীতে সাজানো। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা সুবিশাল পাথরের তৈরি সারকোফেগাস; তার ঢাকনায় খোদাই করা সম্রাজ্ঞী নেফারতিতির সেই চিরচেনা রূপ। মেয়েটি কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে দাঁড়ায় সেই সারকোফেগাসের পাশে—কায়রো মিউজিয়াম থেকে সাথে করে বয়ে আনা তুতেনখামেনের জাগ্রত আত্মা এবং তার নিজের বর্তমান চেতনার ব্যাকুল প্রবাহ—সব এসে কেন্দ্রভূত  হয়ে ওঠে এই প্রকোষ্ঠের এক বিন্দুতে। ঠিক তখনই, বাইরে গিজার পিরামিডের চূড়ার ঠিক ওপরের আকাশে হঠাৎ চমকে উঠল প্রকাণ্ড নীল বিদ্যুৎ। মুসতাং উপত্যকায় পঁচিশতম জন্মদিনের রাতে যে নীল বিদ্যুৎ তার চেতনার দরজায় কড়া নেড়েছিল, আজ গিজার রাতে সেই বিদ্যুৎ রূপ নিলো এক সুবিশাল মহাজাগতিক আলোকস্তম্ভে; সেই নীল আলোর রশ্মি পিরামিডের সু-কঠিন পাথর ভেদ করে সরাসরি এসে আছড়ে পড়ে ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভেতরে এবং মেয়েটি তার স্কেচবুকটি সারকোফেগাসের ওপর রেখে ধীরপায়ে এলিয়ে পড়ে পাথরের বেদিতে—তার চোখের মনি থেকে শেষ একবিন্দু নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল প্রকোষ্ঠের দেয়ালে। কিন্তু এই পার্থিব অবসান কোনো পরাজয় নয়; তা তিন হাজার বছরের অভিশাপ চুরমার হয়ে যাওয়ার পরম মহানির্মাণ—নীল আলোর সেই অলৌকিক স্তম্ভে সারকোফেগাসের ভেতরে থাকা নেফারতিতির মমি, কায়রো মিউজিয়ামের কাচের বাক্সে থাকা তুতেনখামেনের মমি এবং মেয়েটির বিদায়ি আত্মা—সব সুতা একজায়গায় মিলে একাকার হয়ে যায়—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ১৯ বছরের অকালমৃত্যু ও বিচ্ছেদের অভিশাপ এক নিমেষে ছাই হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়—যেন মৃত্যু কেবল মরণশীল পোশাক খুলে ফেলে অনন্তের চাদর গায়ে জড়ানো; প্রেম জয়ী হয় তখনই, যখন তা স্থান, কাল এবং ইতিহাসের সীমানা মুছে দিয়ে আত্মায় আত্মায় এক হয়ে যায়।