খাচ্চর বই || মুম রহমান

noname‘‘এখন যেমন ব্রাউজার খুললেই চাইলেই বা না চাইলেও কতো পর্ণোগ্রাফিক ওয়েবসাইট চলে আসে, ছেলেমেয়েরা মায়ের পেট থেকে পড়েই ডেটিং-এ যায়, তখন বাংলাদেশটা অতো দ্রুত ছিলো না, অতো গোলও ছিলো না। আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে ‘বিকিনি’, ‘ব্রা’, ‘প্যান্টি’ স্রেফ কাপড়- আমাদের কাছে তা রহস্যময় যৌন উত্তেজনা’’

যতদূর মনে পড়ে তখন চার টাকা হালি ডিম। সন তারিখ মনে নাই। সেই সময় হাতে একটা বই এলো। বইয়ের নাম ‘মূল্য এক কোটি টাকা মাত্র।’ তখনও হাজার কোটি টাকা চুরি সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই আমাদের। স্কুলে পড়ি, ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে। রেলস্টেশনে পাওয়া যায় কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজগুলি। বড়দের বই, ছোটদের কেনা নিষেধ। পাঁচ টাকা-ছয় টাকা দাম। একদিন স্কুল পালালাম। জমানো টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম একটা মাসুদ রানার বই, ‘মূল্য এক কোটি টাকা।’ বই পড়বো কী! বইয়ের নাম আর প্রচ্ছদেই আটকে থাকি। প্রচ্ছদে একটা বিদেশি মেয়ের নাচের ছবি। আর বইয়ের নাম নিয়ে হিসাবে বসি এক কোটি টাকা মানে কতো, কোন জিনিসটার দাম এক কোটি টাকা। আমি তখনও দুনিয়াটাকে দেখি ডিমের হিসাবে। মানে ডিম আমার কাছে সবচেয়ে সেরা আর মূল্যবান খাদ্য। ডিম পেলে আর কিছুই লাগে না। ভাবলাম, এক কোটি টাকায় পাওয়া যাবে ২৫ লাখ ডিম, এই পরিমাণ ডিম খেলে সারা জীবনে আর কোনও অভাব থাকবে না। তাহলে মাসুদ রানার অভিযানটি হচ্ছে ২৫ লক্ষ ডিমের সমান গুরুত্বপূর্ণ অথবা একটি বালকের বাকী জীবন নিশ্চিন্তে খাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল পালিয়ে ময়মনসিংহ জংশনের ওভারব্রিজে বসে থাকা আর টাকা জমিয়ে মাসুদ রানার নিষিদ্ধ গন্ধ নেয়ার আগে আমার জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। সেটি হলো, বই সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টে যাওয়া। বই মানেই খুব পবিত্র একটা কিছু। এমনকি জিলাপির ঠোঙাও যদি পথে পড়ে থাকতো আর তাতে পা লেগে যেতো আমরা উঠিয়ে সালাম করতাম। তখনও পলিথিন নামের যন্ত্রণার আবিষ্কার হয়নি। যাই কিনতাম হয় ঠোঙায় অথবা পদ্ম পাতায় পেতাম। সেই সময়টায় বাবা-মা আর মুরব্বিরা শিখিয়েছে বই মানে জ্ঞানের ভাণ্ডার, বই মানেই অনেক সম্মানের জিনিস। কিন্তু স্কুলে একদিন নেহাল এসে বললো, ‘খাচ্চর বই পড়বি।’ আমার মাথাটা কেমন আউলা-ঝাউলা হয়ে গেলো। ‘খাচ্চর বই’ সেটা কী জিনিস! ‘খাচ্চর’ মানে তো ‘খারাপ’, বই কখনো খারাপ হয় নাকি! নেহালের হাত থেকে বইটা নিলাম। বিরাট এক কড়ই গাছের তলায় পড়তে বসলাম। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত সম্পর্ক নিয়ে শিক্ষামূলক কোনও বই হবে! পড়তে পড়তে নিজের হাফপ্যান্ট পরা জীবনটা নিয়েই বিব্রত হলাম। সে কি কথা, এতো রহস্যও আছে নারী পুরুষের জীবনে। সেই বইটার নাম মনে নেই। তবে শিহরণটা ছিলো ধাক্কার মতো। আস্তিক যেমন ধাক্কা খায় ডারউইন কিংবা ফ্রয়েডের বই পড়ে, বালক মুম রহমান নাম ভুলে যাওয়া সেই বই বাসর, মিলন, কামনা ইত্যাদি শব্দ শুনে, শিখে; তেমনই ধাক্কা খেলো।
ইতোমধ্যেই বড়দের হাতে মাসুদ রানা নামের বইখানা দেখেছি। মামাদের কেউ কেউ সাবধান করে দিয়েছে, খবরদার, এই বই ধরবি না, ধরলে কান টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। আমরা মানুষ জাতি, সৃষ্টিকর্তা যেটা ধরতে না করে সেটা ধরতেই বেশি আগ্রহী, আর তো মামা খালা। তক্কে তক্কে থাকলাম, এই বই পড়তে হবে। পরে ভাবলাম, আমি নিজেই মালিক হবো। লুকিয়ে কিনে ফেললাম, ‘মূল্য এক কোটি টাকা।’ ‘খাচ্চর বই’ চিনলাম, এবার কিনলাম ‘বড়দের বই’। তারপরে শিখলাম, ‘অশ্লীল বই’, ‘নিষিদ্ধ বই’, ‘বিতর্কিত বই’... আরও কতো কি! বইয়ের এই সব শ্রেণিকরণে আমি কেমন যেন বিব্রত। অনেক ‘অশ্লীল বই’, ‘বিতর্কিত বই’, ‘নিষিদ্ধ বই’ আমার প্রিয় তালিকায় আছে অথচ মকসুদুল মোমিনিন কিংবা ডেল কার্নিগীর ভালো বই আমাকে টানে না। আমি লোকটাই বোধহয় খারাপ।
সেই কারণেই কিনা, জানি না, ‘মূল্য এক কোটি টাকা’ আমার দারুণ ভালো লেগে গেলো। পুণ্য বা ভাল ব্যাপারটা বোধহয় বোরিং, আমাকে তাই বরাবরই ‘খারাপ’ জিনিস টানে। ‘মূল্য এক কোটি টাকা’ বইটার মধ্যেই প্রথম জানলাম ‘স্ট্রিপটিজ’, ‘বিকিনি’, ‘ব্রা’, ‘প্যান্টি’, ‘ড্রেসিং গাউন’, ‘ডার্লিং’র-এর মতো কতো অজানা জিনিসই পৃথিবীতে আছে। মনে রাখতে হবে, সেটা ইন্টারনেটের যুগ ছিলো না। এখন যেমন ব্রাউজার খুললেই চাইলেই বা না চাইলেও কতো পর্ণোগ্রাফিক ওয়েবসাইট চলে আসে, ছেলেমেয়েরা মায়ের পেট থেকে পড়েই ডেটিং-এ যায়, তখন বাংলাদেশটা অতো দ্রুত ছিলো না, অতো গোলও ছিলো না। আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে ‘বিকিনি’, ‘ব্রা’, ‘প্যান্টি’ স্রেফ কাপড়- আমাদের কাছে তা রহস্যময় যৌন উত্তেজনা।
এই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ বুঝি, মাসুদ রানা, ‘মূল্য এক কোটি টাকা’র মতো কতো মূল্যবান ছিলো আমাদের ছেলেবেলায়। নিষিদ্ধ এই বই থেকে আমরা মিত্র, রেহানা, সোহানাকে খুঁজে নিয়েছি। দেশের জন্য আমেরিকা, রাশিয়ার মতো পরাশক্তির হয়ে গোপন প্রাণঘাতী সব মিশনে গিয়েছি মাসুদ রানার সাথেই। কেবল কিছু যৌন শব্দ নয়, প্রাপ্ত বয়স্ক, পরিণত ভাবনার খোরাক দিয়েছে মাসুদ রানা। তিনি ছিলেন আমাদের হিরো, আজও আছেন। এখন মাসুদ রানা পড়তে গিয়ে বুঝি কাজী আনোয়ার হোসেন যুগের পর যুগ আমাদেরকে একজন দুর্ধর্ষ, দেশপ্রেমিক হিরো দিয়েছেন। ওদের আছে স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান, সুপারম্যান– এরা সবাই সুপার হিরো। আমাদের সুপার হিরো নেই, আছে মাসুদ রানা, অনেক বেশি মানবিক, অলৌকিক গুণে নয়, বুদ্ধি আর চৌকসতায় সে অনন্য।
শেষটায় একটা কথা বলতে চাই আমার বন্ধু নেহালের উদ্দেশ্যে। জানি না নেহাল কোথায় আছে, কেমন আছে। আমার জেলা স্কুলের বন্ধু, ধর্মে হিন্দু, স্কুলের পাশেই বাসা, আমরা টিফিনে কতো কী খেতাম, ও খেতো পান্তা ভাত, কোনও কোনও দিন গরম ভাত। ওর সঙ্গে বহুদিন ভাত খেয়েছি, ওর মা মুখে তুলে দিতেন। কী অদ্ভুত স্বাদ ছিলো তার। নেহাল তুই যদি এই লেখা কোনওদিন পড়িস, মাসীকে আমার আদাব দিস। আর তুই জেনে রাখ গাধা, ‘খাচ্চর বই’ বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। পৃথিবীতে বই মানুষই লেখে, মানুষের জন্য। মানুষের মধ্যে যেমন ভাল-মন্দ মিলিয়ে মানুষ, বইও তাই। দুয়েকটা বই হয়তো ভালো মতো লেখা হয়নি। অনেক নামী লেখকও আছে খুব ভালোভাবে লিখতে জানে না। তবু সবচেয়ে পচা বই থেকেও মানুষে শেখে কিছু না কিছু, আমি শিখেছি।


 

বিশেষ সংখ্যার আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন :

দু’নম্বর বই || হাসান আজিজুল হক

আরব্য রজনীর নিষিদ্ধ কুহক || পাপড়ি রহমান

নাবালেক ও বালেক কাল || নাজিব তারেক