কাইন্দো না

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প।  লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

noname‘আব্বা আইজকেও চাল আনো নাই, খামু কী?’

সাত বছরের ছোট মেয়ের কথা শুনে যেন বুকটা ফেটে যায় রিকশাচালক বাবার। কিছু বলতে পারে না। এদিকে মেয়ের সাতদিন ধরে জ্বর। খাবারই জোটে না ওষুধ কিনবে কীভাবে।

—‘বুঝছি আব্বা, আইজকেও পাওনাই। কাইন্দো না তো। কাল যাইও, হুনলাম লাইনে দাঁড়াইলেই চাল পাওন যায়?’
—‘হ রে মা, পাওন তো যায় কিন্তু আমিই পাইলাম না, তোর কাকায়ও পায় নাই। পাশের গ্রামের মতিনরা পাইছে...’ বলতে বলতে অসুস্থ মেয়ের কপালে হাত দিয়ে হতচকিত হয়ে যায় বাপ। জ্বরে যে গা পুড়ে যায়।
—‘কাইল তোরে নিয়ে হাসপাতালে যামু, আইজকে একটু সহ্য কর মা।’
—‘ভাইব না তো, আমি ঠিক হয়ে যাব। চেয়ারম্যানের বাড়িতে দেখলাম ট্রাক আইল, সব কি চাল নাকি আব্বা?’
—‘হ চাল আছে, ডালও আছে। তুই এই শরীর নিয়ে আবার বাইরে গেছিলি ক্যান রে, বুঝিস না ভাইরাস আইছে দ্যাশে।’

ও কথায় কান না দিয়ে মেয়ে বলে—‘এত চাল আইল এত ডাল আইল আমাগো দিতেও পারে, কী অরব এত চাল ডাল দিয়ে।’
—‘না রে মা, চেয়ারম্যানের বাড়িতে পুলিশ আইছিল, চাল নিয়ে কী ঝামেলা হইছে হুনলাম। তর কাকায় কইল চাল ডাল যা আইছে আমাগো দেওনের লাইগাই আনছে। কিন্তু চেয়ারম্যান নাকি দিবার চায় নাই, সব নিয়ে গুদামঘরে রাখছে।’
—‘এত চাল দিয়ে তো আমাগো পুরো গ্রাম খাওন যাইব। উনারা কী অরব। নষ্ট হয়ে যাইব তো।’
—‘কিছু মানুষের পরানডা ভরে না রে মা, ওগোরে যতই দাও ওগো ভরব না। তুই এত কথা বলিস না ঘুমা। আকাশে মেঘ আইছে, ঝড় আইব মনে হয়।’
—‘আমার ভালো লাগতেছে না আব্বা, মাথাডা ধরছে।’

—‘তুই একটু চোখ বুইঝে ঘুমা দেখি মা, কাইল ডাক্তার দেহামুনে।’

আক্কাস মিয়া দরজা খুলে বাইরে যায় ঝড়ের বেগ দেখতে। গতবছর ঝড়ে ঘরের চাল উড়ে গিয়ে করিমদের পুকুরে পড়ছিল। সেই স্মৃতি মনে করে ভয়ে শিহরিত হয়ে ওঠে আক্কাস মিয়া। আজান শুরু করে, আজকের আজান তার কাছে দীর্ঘ মনে হয়। আজানের প্রতিটি শব্দ যেন কোথায় আঘাত করে আবার ফিরে আসে তার কাছে। আজান শেষে ঘরে ঢুকে মেয়ের গায়ে হাত দেয়, সঙ্গে সঙ্গে কারেন্টের শক খাওয়ার মতো কেঁপে ওঠে তার শরীর। মেয়ের ঠান্ডা শরীরটা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে, তার আওয়াজ যেন ঝড়ের শব্দকেও হার মানায়। পরের দিন মেয়ের কবরে শেষ এক মুঠো মাটি ফেলে দিয়ে আক্কাস মিয়া ভাবে, ‘মা রে তোরে মরার আগে প্যাট ভইরে দুমুঠো খাওনও দিতে পারলাম না।’

তার চোখের পানি কবরের মাটিতে পড়েই ভিজে মাটির সঙ্গে মিশে কোথায় যেন মিলিয়ে যায় যার খোঁজ কেউ রাখে না।
মাটির নিচে থেকে হয়তো কেউ বলে ওঠে, ‘কাইন্দো না তো আব্বা।’