নববর্ষ—সে সময় আর এসময়

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে।  চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য50পহেলা বৈশাখ। সকাল সাড়ে নটা। ছুটির দিনগুলোতে বেলা করে ওঠায় অন্যরকমের একটা আমেজ আছে। ঘুম ভেঙেই দেখলাম স্নিগ্ধর ছোট ছোট পাগুলো আমার পেটের নিচে চাপা পড়ে আছে। ওইটুকুন ছেলেটা কী বিকট শব্দে শ্বাস নিচ্ছে, বাবার মতো, বারো মাস ঠাণ্ডা লেগে নাক বন্ধ হয়ে থাকে, মানুষ কী অদ্ভুতভাবে বাবা-মার বৈশিষ্ট্যগুলো পেয়ে যায়। বাসায় কেউই ওঠেনি, এমনকি কাজের লোকগুলোও না। শেলী কাল রাতেই বৈশাখী আয়োজন শেষ করে রেখেছে। অভ্যাসবশত বসার ঘর পেরিয়ে মেইন ডোরের নিচে তাকিয়ে পেপার নজরে এলো না। ওহহহ,আজ তো পেপার আসবে না। সকালে পেপারটা হাতে না পেলে কেমন যেন কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগে। দৈনিকগুলোর বন্ধ থাকা উচিত না, বিশেষ ব্যবস্থায় ছাপানো উচিত, মানুষের প্রতিদিনকার অভ্যাসগুলোতে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো অধিকার ওদের নেই। বরং চ্যানেল আইতে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার দেখি। ডাইনিং টেবিল পেরোতে গিয়ে বাঁয়ের জানালাটায় যথারীতি চোখ চলে গেল। প্রতিদিনের মতো জানালার পাশে খালি গায়ে লুঙ্গি পরা, পেপার হাতে, প্রথিতযশা লেখক হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে পেলাম না। জানালার পর্দাটা খোলাই আছে, হুমায়ূন আহমেদ বেডরুমে কিছু একটা করছেন। ডানের বারান্দা দিয়ে সকালটা দেখলাম, ঝরঝরে সোনালি সকাল। ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’র এ ফ্ল্যাটটা থেকে ডানের আকাশটা অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়, বিডিআর মার্কেট অবধি। সন্ধ্যায় শেরাটন হেলথ ক্লাবের কিছু মেম্বার-পরিবার আসবেন, পুরো দিনটাতে কিছুই করার নেই। নিজের বেডরুমে ফিরে যাওয়ার আগে মা-বাবার রুমে উঁকি দিতেই দেখতে পেলাম মুগ্ধকে মাঝে নিয়ে মা-বাবা গভীর ঘুমে আছন্ন। মুগ্ধটা উঠলে একটু রবীন্দ্র সরোবরে বৈশাখী অনুষ্ঠান দেখাতে নিয়ে যাব, ছেলেটার প্রিয় জায়গা, মার সঙ্গে প্রতি বিকেলে যাওয়া চাই, লেকের ধারে হাঁটার চাইতে ঝালমুড়ি খাওয়ার আকর্ষণই বেশি। লেকের ধারে হাঁটতে যাওয়া সবার সঙ্গে কথা বলাটাও আরেক আকর্ষণ, ছেলেটা বড় হলে রাজনীতি করার সম্ভাবনা আছে, রাস্তাঘাটে সবার সঙ্গে কথা বলা চাই।

নিজের বেডরুমেই ফিরে গেলাম। সাউন্ড সিস্টেমে গত সপ্তাহে কেনা অদিতি মহসিনের রবীন্দ্রনাথের গানের সিডিটা শুনতে ইচ্ছে হলো। বেডরুমে গান, টিভি কোনোটাই চালানো সম্ভব না, সকালের ঘুমটা শেলীর খুবই প্রিয়। সারাটা রাত বাচ্চাদের দেখভাল করতে করতে একটানা কিছুক্ষণ ঘুমানোটা আসলেই অসম্ভব। আর আজকালের বাচ্চাগুলোও রাতে ঘুমোয় না, বেলা অবধি ঘুমোতে খুব পছন্দ করে। ওয়ারড্রব থেকে স্নান করে পরার জন্য পাজামা-পাঞ্জাবি বের করতে যাব, গতরাতে লুকিয়ে রাখা শেলীর জন্য লালমাটিয়া আড়ং থেকে কেনা শাড়িটা নজরে এল। মা-বাবার জন্য কেনা শাড়ি আর পাজামা-পাঞ্জাবিও দেয়া হয়নি। শেলীর শাড়িটা গিফট প্যাকে মোড়ানোই রয়েছে, হালকা বেগুনি রঙে সারাটা গায়ে সোনালি সুতোয় ছোট ছোট কাজ করা জামদানি। আমার জন্যও হালকা বেগুনি সুতির পাঞ্জাবি কিনেছি। পরিবারের সবাই ম্যাচ করে জামাকাপড় পরার বোধটাই আলাদা। মনে হয়, পুরো পরিবারটা একই ভালোবাসার-প্রেমের সুতোয় গাঁথা। ঘুম ভাঙলেই যাতে দেখতে পায়, তাই শেলীর জন্য কেনা শাড়িটা গিফট প্যাকে মোড়ানো অবস্থায়ই বেডসাইড টেবিলে রেখে দিলাম।

সকালে মুখ না ধুয়ে, খালি পেটে, লিটার খানেক জল খাওয়াটা আমার অনেকদিনের অভ্যাস। সাউন্ড কমিয়ে বসার ঘরের টিভিটায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখছি, ডাইনিংয়ে মা-বাবার কথা বলার শব্দ শুনতে পেলাম। ওয়ারড্রব থেকে মা-বাবার জন্য কেনা শাড়ি আর পাঞ্জাবিটা নিয়ে ডাইনিংয়ে চলে এলাম। মা-বাবাকে শাড়ি আর পাঞ্জাবির প্যাকটা দিয়ে ‘শুভ নববর্ষ’ জানালাম। মা বলল, পা ছুঁয়ে প্রণাম করো, বাঙালির শাশ্বত এ রীতিগুলো চর্চা করো, তাহলেই তোমাদের পরের প্রজন্ম তোমাদের দেখে এ রীতিগুলো শিখবে। উপুড় হয়ে মার পা ছুঁয়ে প্রণাম করব, কিন্তু কেন যেন কিছুতেই মার পায়ের নাগাল পাচ্ছি না। সামনেই স্পষ্ট মার পা জোড়া দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ছুঁতে পারছি না কেন? উপুড় হয়ে হাত বাড়িয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছি, ঘেমে নেয়ে একাকার, কিন্তু মার পায়ের ওপর আমার হাত কিছুতেই পৌঁছুচ্ছে না। মা কি রুষ্ট, অভিমান করল, মা কি তাহলে আমাকে নববর্ষের আশীর্বাদ দেবে না! মা, আমি জানি, আমি তোমার অপদার্থ সন্তান, আমাকে নিয়ে তোমার কোনো আশাই পূর্ণ করতে পারিনি, তাই বলে আমায় আশীর্বাদ করবে না?!  আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, উপুড় হয়ে থাকতে থাকতে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মার পা ছোঁয়াটা তাহলে কি আর হবেই না?!

ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম আমি ঘেমে নেয়ে একাকার, উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছি, আমার লন্ডনের বাসায়। ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’র সে ফ্ল্যাট ছেড়ে এসেছি প্রায় পনেরো বছর। আচ্ছন্ন অবস্থা, সম্বিত আসতেই মনে পড়ল, মা তো নেই, মার পা ছোঁব কী করে, তিন বছর আগেই তো মা চলে গেল, না ফেরার দেশে। বাবা তো আরও আগেই চলে গেছে। নববর্ষের আশীর্বাদ পাওয়ার পাগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে, প্রণম্যের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এখন আশেপাশে কোনো পা খুঁজে পাই না, পূজা-পার্বণে, নববর্ষে প্রণাম দেয়ার জন্য, আশীর্বাদের হাতগুলো আর সস্নেহে, পরম ভালোবাসায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না, আর পাই না অসীম শান্তির সে পরশগুলো।

কার্টেন সরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আকাশটা ভীষণ নীল, সোনালি রোদে চারদিক ছেয়ে গেছে। লন্ডনে এধরনের মন ভালো করা দিন পাওয়াই যায় না। অন্য কোনো সময় হলে দেখতাম নেইবাররা লংড্রাইভে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, গাড়িতে খাবার-বাক্স পেঁটরা তুলছে। কিন্তু আজ বাইরেটা আশ্চর্য রকমের জনমানবহীন, শূন্য। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষ নিজেকে গৃহবন্দি করে ফেলেছে। ঘড়িতে দেখলাম সকাল নটা, বাংলাদেশে এখন বিকেল পাঁচটা, যাই নিচে নেমে, দশটায় বিবিসিতে করোনার আপডেট দেখতে হবে, আর এখনই নেটে বাংলাদেশের আপডেটটাও পেয়ে যাব। ভাবছি, প্রকৃতি তার আগের রূপ-সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছে ঠিকই, মানুবকুলকে হয়তো আবার নতুন করে গড়তে হবে তাদের বিধ্বস্ত সমাজ।

ফেলে আসা নববর্ষগুলো কেন আর ফিরে আসে না, অতল প্রেমের সে নববর্ষগুলো কি তাহলে হারিয়েই গেল কালের গর্ভে, চিরদিনের জন্য!