ক্ষতিপূরণ

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameএকটা বাড়ি একটা খামার। বারখাদায় খোলামাঠে সেমিনার।

বুড়া মেলা বকলো। বুড়া লোকগুলো এক কথা কতবার বলে! কথা মূল্যবান হলে বারবার বলে মূল্যহীন করতে এঁদের জুড়ি নাই।

—আপনার সাথে কথা আছে।

পিছন ফিরে দেখি আরেক বুড়া।

—আমি ভেবেছিলাম আপনি শহর থেকে এসেছেন, এখন শুনি এই জুগিয়া থেকেই এসেছেন! খুব ভালো বলেছেন!

—অহ্, তাতে কি কোনো সমস্যা তৈরি হলো জনাব!

থতমত খেয়ে তিনি পিছিয়ে দাঁড়ালেন।

এগিয়ে কাছে গেলাম, ফিসফিস করে বলি, আমি আসলে সাদা শাড়ি পরা মঞ্চের সেই ভদ্রমহিলাকে খুঁজছি, আপনার পাশেই বসে ছিলেন যে!

—খুঁজুন!

ঝাঁঝটা ধরা পড়ল কানে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। এ নিয়ে অন্য সময় ভাববো। ইনিও মঞ্চে ছিলেন, ছিলাম গাদাগাদি করে দশ এগারজন। আয়োজক বুড়া একাই গিলে নিয়েছে অর্ধেক সময়। আমরা বলতে গেলে পাঁচ মিনিট না যেতেই চিরকুট পেয়েছি তাঁর লেখা। আয়োজক বুড়া সবার সময় খেয়ে একাই বকে গেলেন ঘণ্টা দেড়েক। সাদা শাড়িকেও তিনি চিরকুট দিয়েছেন, মহার্ঘ বটে।

বয়সের ভারে বুড়াগুলো নুয়ে আসছেন কিন্তু পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকেন, সত্যি বলছি, মিলিয়ে নেবেন!

আমি দেখছি প্যান্ডেলের বাঁশের গায়ে হেলান দিয়ে চা পান করছেন তিনি। আমি ধুলা আর মরা ঘাস মাড়ায়ে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াব। বরাবার তার চোখে চোখ রাখব, তাঁর শকুনি চোখ প্রথমে আমাকে আগন্তুক ঠাওরাবে, ও আচ্ছা, বলে একটু অনুমোদন দিয়ে সরে পড়তে চাইবে। আমি আরেকটু কাছে ঘেসে দাঁড়াব। দাঁড়িয়ে বলব, মা, জানেন তো কিছু কিছু মানুষের কাছে কি রকম উষ্ণতা থাকে! হ্যাঁ, এইভাবে তার কিছু মানুষ তাকে বলে, বলে তার সান্নিধ্য কামনা করে, তার খুদকুড়া হাত পেতে নেয়, নিয়ে বর্তে যায়। তারপর তার মহানুভবতা ছোটাছুটি করে দিকবিদিক।

মিটিঙের মানুষের হাতে সিঙ্গারা জিলিপির প্যাকেট, কেউ খেয়েদেয়ে আঙুল চুষে বাঁশপাতার কাগজ পায়ে মাড়ায়। বাঁশপাতা ধুলা আর মরা ঘাসকে বরণ করে নিরুপায়। কিছু বাঁশপাতা জেগে জেগে উঠছে, মাথা নাড়াচ্ছে শীতের বাতাসে। কনকনে ঠান্ডা আসছে গড়াই কি মধুমতির নামে। মৃত নদীর যেমন হাহাকার, বাতাসেও তা। কিন্তু এইসব শয়তান বুড়াবুড়িদের কোনো হাহাকার ছোঁয় না, এরা হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকে শুধু মানুষকে কষ্ট দেয়া জারি রাখতে।

মঞ্চের তিনটা বুড়া এসে জমেছে বুড়িটার কাছে। বুড়ি একটা দামি সাদা শাড়ি পড়েছে, জারদারি কাজ করা ব্লাউজ। বড় গলায় দুধসাদা পিঠ, মাখন। কাছে গেলে পাবেন গাঢ় তীব্র সুগন্ধ। কিন্তু আমার নাকে এসে আছাড় খায় দুর্গন্ধ, পচা মাছের আঁশটে গন্ধ!

বুড়িটা আমাকে এতক্ষণে দেখেছে। না দেখার ভান করে বুড়াগুলোর সাথে জমিয়েছে খুব। বুড়াগুলো ভারী, রাসভারি। সন্ধ্যার ধোঁয়াটে আঁশটে ঘ্রাণও কিছু ছুঁয়েটুয়ে গেল বুঝি। বুড়াটাই মধ্যমনি, পিঠটা একটু ধনুকের মত বেঁকে গেছে, বুড়াশিয়াল। বক্তৃতা দেয়ার এক সময় তিনি বলেছেন, সুচরিতা সাহিদা, ও আমার স্বপ্নের মেয়ে, আগামির বাংলাদেশ। ওর উপর আমার অনেক ভরসা, আপনারা ওর জন্য দোয়া করবেন।

কেন দোয়া করবেন! হাহা, সে কথাই তো বলছি। আমার বিয়ে দিয়ে সর্বনাশ করার চেষ্টার পরের বছর আমি একটা এনজিওর সাথে জুটে যাই। কিছু কাজ-টাজ হয়, কাজ শহরের দামি দোকানে যায়। এই বুড়া আমার এই সব মহিলাদের দেখায়ে, তাদের কাজ দেখায়ে বিদেশ থেকে ফান্ড আনার চেষ্টা করতে থাকে। প্রশ্রয় আমার বাবার, দামি লোক। তার মেয়ে বিয়ের ঘটক। বিয়ের সময়ও বাবা বলেছিলেন, বড় মানুষ মা, না বল না। বিয়ের তিনদিন পর কি এক উৎসব বলে বুড়িটা ছেলেকে নিয়ে ভারত গেল আমাকে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে, ভাঙা আলমিরার চাবি দিয়ে। তোমায় আমরা খুব ভালোবাসি মা, বলে।

আমি কি করব কি করব না এ কথা জিজ্ঞাসা করার আর প্রয়োজন মনে করলাম না। বান্ধবীরা ফোন দেয়, দাওয়াত দেয়। বলি, সে তো মুম্বাই। মুম্বাই কেন, হানিমুন! আমি বলি বুঝে নে, বুঝতে পারলে উপহার দিব, অনেকগুলো রিং পেয়েছি বিয়েতে।

তারপর বেরিয়ে আসি, সঙ্গে আনি আমার যাবতীয় গহনা। ক্ষতিপূরণ! হ্যাঁ বুড়ির দেয়াগুলোও। অনেক নয়, সব মিলিয়ে দশভরি হবে। নেশাখোর নিয়ে কেনো সংসার করব! আমি কি জলে পড়েছি!

না না, মামলা করেনি, সমাজের মানি লোক না তারা!