কেউ একজন কোথাও একা বেঁচে আছে

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameএক.

ঘুম থেকে যেন জেগে উঠলাম যুদ্ধক্ষেত্রে।

বাইরে ঠা ঠা করে যে শব্দ হচ্ছে একটু থেমে থেমে সেটা যে গুলির সেই ব্যাপারে আমার ক্ষীণ সন্দেহ হয়তো দূর করে দিল স্মৃতিকোষে লুকিয়ে থাকা কোনো এক বিদেহি বুলেটের মৃত শব। শুনেছিলাম আমার পূর্বপুরুষের কেউ জলদস্যু ছিল। সন্দ্বীপ বেল্টে আমার বাড়ি। তাই ফ্যামিলির ট্রি কোনো এক চূড়ায় জলদস্যু থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়েও দেয়া যায় না। হয়তো শখানেক বছর আগে জন্ম হলে আমি দস্যু হতাম। সোশ্যালাইজেশনের খপ্পরে পড়ে একটা সুবোধ জীবন আমাকে যাপন করতে হচ্ছে।

এমনকি এই মাঝরাতে এই অতর্কিত সম্ভাব্য গণ্ডগোলও আমাকে বিচলিত করতে পারে না। কাল সকাল ৭টায় একটা ক্লাস নিতে যেতে হবে, ঘুমটা ভেঙে যাওয়াতে বরং বিরক্তই লাগে।

একটা বালিশ চেপে ধরে কোনোক্রমে শুয়ে থাকি আর হয়তো এর ভেতরে অনন্তকাল নদীর মতো বয়ে চলে আমাকে সকালের কাছে নিয়ে যায়। ওভাবেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আশেপাশের চেনা শব্দরা ফিরে এসেছে;ফ্যানের ঘড়ঘড়,রিকশা বেলের শব্দ,হৈ হৈ একটা দূরবর্তী আওয়াজ, পাশের ঘরেচেঁচামেচি।

কলাপসিবল গেট খুলে বাইরে যেতেই সবকিছু কেমন অচেনা ঠেকে। শহরের সব শাড়ির দোকান এখানে একজোট পেকে ব্যবসা করছে। আজ গুমোট একটা আবহাওয়া। দোকানপাট বন্ধ, একটা দলা পাকানো ভয়, গলা দিয়ে উঠতে চাইছে, বের হয়ে যেতে চাইছে না। কিন্তু পারছে না। বমির অনুভূতির সঙ্গে এর খানিকটা মিল আছে।

একটা রিকশাও দেখি না। দেখি না কোনো মানুষ। কোনো বাড়িতে জানালার পর্দা নড়ছে না, কোথাও মৃদু আওয়াজ পর্যন্ত নেই, যেন একটা মৃত মহল্লায় দাঁড়িয়ে আছি।

ইন্দ্রীয়ের কোনো একটা অংশ আমাকে পা চালাতে বলে দ্রুত। আমি পা চালিয়ে মূল সড়কে উঠে আসি। কাজ চলছে মেট্রোরেলের। এখানে সেখানে জমে আছে জল। তেমনই একটা ডোবামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখি মশার লার্ভা থেকে বের হচ্ছে মশা। এত কাছ থেকে মশার জন্ম কখনো দেখিনি। ডেঙ্গু নিয়ে দেশে তোলপাড় হয়ে গেলেও এতকাছ থেকে দেখা হয়নি। আর সময়টা এমন বিষয়টা সময় নিয়ে দেখারও মন নেই। ওই মশার বাচ্চাগুলো আর আমি ছাড়া পুরো শহরটাই কি গায়েব হয়ে গেল?

মোবাইলটা বের করে অন্তর্জালে ঢুকে আবার ধাক্কা খেলাম। ফেসবুকে কেবল আমার স্ট্যাটাস ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সেখানে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে কাল রাতে দেয়া আমার স্ট্যাটাস, এদিকে কনটাক্ট লিস্টেও নেই কোনো নম্বর।

ছুটতে শুরু করলাম বাসার দিকে। যে পথে এসেছিলাম সেই পথেই। কলাপসিবল গেট কোনোমতে খুলে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকতেই আবার সকালের সেই রিকশার শব্দ, পাশের ঘরে চেঁচামেচি ফিরে এল যেন।

রবিন, শুনতে পাচ্ছ?

ঝগড়ার শব্দ থামে।

রবিন বলে, জি ভাই। আজ ক্লাস নাই নাকি আপনার?

আমতা স্বরে বলি, সেটা আছে। কিন্তু তুমি কি আজ বাইরে যাও নাই?

রেডি হইতেছিলাম ভাই। যাব।

ফোনলিস্টে ফিরে এসেছে নম্বর। ফেসবুক একটিভ। হোমপেজে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে কোথাও দেখি না কোনো ছন্দপতন। রবিনের দেখাও পাওয়া গেল। সকালটা এতক্ষণ পুরো মিথ্যা ছিল। এখন সত্যি হয়েছে। সাতটা বাজতে বেশি বাকি নেই। সাড়ে ছয়টা। তবে চাইলে এখনও সময়েই পৌঁছানো যাবে।

ঘরের দরজা লাগিয়ে রাস্তায় নামতেই আবার আমার চমকানোর পালা। বাতাসে একইরকম স্থবির চারপাশ। আমি আবার ছুটে ফ্লাইওভার পর্যন্ত যাই। দেখি ওই একইভাবে মুক্ত হয়ে উড়ছে মশা।


দুই.

আমি কোথাও যেতে পারি না। বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকা ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা, ‘যদি এই কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতাম’—কী বিচ্ছিরিভাবে চোখ রাঙাচ্ছে, তারপরও মুছে ফেলতে পারছি না।

আমার দিন আর বেশি নেই। এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েও যদি আবার এইদিনে ফিরে আসি এই ভয়ে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না।

হাঁটতে হাঁটতে একদিন বহুদূর পর্যন্ত চলে গিয়েছি। অথচ প্রতিটা মোড় যেন শেষ হয়ে যায় আমার গলির সামনে।

আমি কি কোনোদিন আর কোথাও যেতে পারব না?