ঈদে হাজী দানেশের বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা

করোনা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ত্যাগের মহিমায় ভিন্নরকম ঈদ উযযাপন করলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। তবে নিজ পরিবার এবং মাতৃভূমি থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে পড়তে এসে কিছুটা ভিন্নরকম এক ঈদ উযযাপন করেছে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বিদেশি শিক্ষার্থীরা। বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো খুলে দেওয়া হবে এই আশায় এবং ঝামেলা এড়াতে নিজ দেশে ফেরেননি হাজী দানেশের এসব শিক্ষার্থী। তাই পরিবার, আত্নীয়-স্বজন ছাড়াই ক্যাম্পাসের বাঙালি বন্ধুদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন তারা।

ভারত, ভুটান, নেপাল, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ ছয়টি দেশ থেকে আসা এসব বিদেশি শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের ঈদ অনুভূতি। বাংলাদেশে ঈদ কেমন উদযাপন হলো জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ তম ব্যাচের কৃষি অনুষদের সোমালিয়ার শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ্ আলী ইব্রাহিম বলেন, মহামারির সময়ে পরিবার থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ঈদ উদযাপন করাটা কিছুটা কঠিন ছিল। তবে এই অপূর্ণতা বুঝতে দেয়নি এখানকার বন্ধুরা। আমরা অনেক মজা করার চেষ্টা করেছি এবং মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের পর এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করেছি। প্রচুর ছবিও তুলেছি। এর ফাঁকে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলেও আনন্দ ভাগাভাগি করেছি।

এই জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বাঙালি বন্ধু তাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। একটু ভিন্নভাবে ঈদ উদযাপন করার সুযোগ করে দেওয়ায় মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড  ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) অনুষদের নেপালি শিক্ষার্থী দিপক শাহ বলেন, প্রথমত আমি অনেক আনন্দিত যে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম এক সংস্কৃতিতে এবারের ঈদ উদযাপন করা দেখলাম। এখানকার বাংলাদেশি বন্ধুরা অনেক বেশি আন্তরিক। আমার রংপুরের বন্ধু আবির রহমান ঈদে তার বাসায় নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমি তাদের সঙ্গে ঈদ উযযাপন করেছি। তার পরিবার ঈদে আমাকে উপহার হিসেবে নতুন পোশাক এবং নগদ টাকা দিয়েছে।

হাজী-দানেশ-বিদেশী-শিক্ষার্থী-২

ঈদের দিন নতুন টাকা পেয়ে কিছুটা বিস্মিত এই শিক্ষার্থী বললেন, নতুন টাকা হাতে পেয়ে কিছুটা বিস্ময় লাগছিল। পরে বন্ধু জানালো ঈদের দিনে এমন রীতি আছে, ঈদ সেলামি হিসেবে এই টাকা দেওয়া হয়। তা ছাড়াও তার পরিবারের সবাই আমার অনেক যত্ন-আত্তি করেছে। বন্ধু আবির রহমান ও তার পরিবারের জন্য অনেক ভালোবাসা রইলো।

কথা হয় নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থী আবু বকর সাঈদু-র সঙ্গে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্যই হাজার-হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি। এখন পরিবারের বাইরেও আরেকটি পরিবার হয়ে উঠেছে, যার নাম হাবিপ্রবি পরিবার। বাঙালিসহ সকল বিদেশি বন্ধুরা একসাথে ঘোরাঘুরি ও আনন্দ করেছি। আমার ডায়েরির অনেকগুলো পাতায় লিখে নিয়েছি এই ঈদের অভিজ্ঞতা। এই ঈদ আমার জীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা হয়ে থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮তম ব্যাচের কৃষি অনুষদের ভারতীয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সফিউল্লাহ জানান, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির জন্য প্রায় দেড় বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো খুলে দিবে এই আশায় থেকে আর দেশে ফেরা হয়নি। এজন্য আগের মতো ঈদের আনন্দ তেমনভাবে উপভোগ করতে পারিনি। আসলে বন্ধু-পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করতে পারাটা অনেক মজার। যাইহোক, ঈদে ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ পড়ে বাংলাদেশি বন্ধুরাসহ অন্যান্য দেশের বন্ধুদের সাথে বেশ মজা করেছি এবং প্রচুর ছবি তুলেছি। এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার মাঝেই ঈদের আনন্দকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি। 

কৃষি অনুষদের সোমালিয়ার শিক্ষার্থী লিবান আলী মাহমুদ ঈদের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, 'আসলে করোনা পরিস্থিতির জন্য এবছর সোমালিয়ায় গিয়ে ঈদ উযযাপন করতে পারিনি। এজন্য কিছুটা খারাপ লাগছে যদিও। তবে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতায় এই খারাপ লাগা কিছুটা হলেও কমে গিয়েছে। এছাড়াও ঈদে অন্যান্য বাংলাদেশি এবং বিদেশি বন্ধুদের সাথে বেশ ভালোই সময় কাটিয়েছি'।

1-(2)

বিদেশি এসব শিক্ষার্থীকে ঈদে ঘুরে নিয়ে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঈদে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে বেশ ভালো সময় কাটিয়েছি। নানা কারণে ঈদে এবার আমারও বাড়ি ফেরা হয়নি। এজন্য বিদেশি এসব বন্ধুদের সাথেই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছি, অনেক আড্ডা দিয়েছি। আড্ডায় তাদের ছোটোবেলার ঈদ স্মৃতিচারণ শুনে বেশ ভালো লেগেছে। বিভিন্ন দেশের বন্ধুরা একসাথে নিজেদের রীতি-রেওয়াজ সম্পর্কে  শুনে অনেক কিছু জেনেছি, শিখেছি। এবারের ঈদে আমার বিদেশি বন্ধুদের একাকিত্ব অনুভব করার সুযোগ দেইনি।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভারত, ভুটান, নেপাল, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ ছয়টি দেশের শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নের দিক থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে হাজী দানেশের অবস্থান দ্বিতীয়।