হল প্রভোস্টের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবির আন্দোলনে ক্যাম্পাসে পুলিশি হামলার ঘটনায় উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। অবরোধমূলক আন্দোলন থেকে সরে এলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেশনজট ও ক্লাস-পরীক্ষা চালু নিয়ে শঙ্কা। তবে করোনাকালে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্ধেক জনবল নিয়ে চলমান রয়েছে দাফতরিক কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারের উচ্চ মহলের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের প্রদত্ত আশ্বাসের ১৩দিন পেরিয়ে গেলেও কোনও সুরাহা হয়নি। এ জন্য সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ শিক্ষকরাও চাচ্ছেন সরকারে পক্ষ থেকে একটি সিদ্ধান্ত জানানোর মাধ্যমে যেন পরিস্থিতির দ্রুত স্বাভাবিক করা হয়।
এদিকে মঙ্গলবার (৮ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসে বাকি চারটি টং স্থাপন, সন্ধ্যায় ১৬ জানুয়ারি পুলিশি হামলার ঘটনার ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও মোমবাতি প্রজ্জ্বালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গত ২৬ জানুয়ারি শেষ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চ মহলের পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থিত হন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইককাল ও তার স্ত্রী অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক। একই দিন বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনশনকারী ২৮ শিক্ষার্থীর অনশন ভাঙান ড. জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক।
এর আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি আলোচনায় বসে এমন আশ্বাসও দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সেসময় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে দাবি যৌক্তিক হলে মেনে নেওয়ার আশ্বাসও দেন। তবে আশ্বাসের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনও সমাধান পাননি বলে জানিয়েছেন একাধিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী।
আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র ও অনশনকারী শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আবেদিন বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের প্রতিশ্রুতির ১২দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশে পুনরায় স্বাভাবিক করতে সরকার অতিসত্ত্বর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আন্দোলনকারী ৩০০ শিক্ষার্থী ও সাবেক পাঁচ শিক্ষার্থীর ওপর দায়ের করা পৃথক দুই মিথ্যা মামলাও এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি, বন্ধ রয়েছে বহু শিক্ষার্থীর বিকাশ, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আমরা চাই, মামলা দুটি প্রত্যাহার ও সবার মোবাইল ব্যাংকিং চালুসহ আমাদের মূল দাবি উপাচার্য পদত্যাগ করানোর জন্য দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বেশ কয়েকবার আন্দোলন করেছেন শিক্ষার্থীরা। অনেক আন্দোলনেই চূড়ান্ত দাবি হিসেবে উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন, আবার অনেক সময় আন্দোলন ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে গেছে। কিন্তু এ ধরনের আন্দোলনে প্রতিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থীরা। তৈরি হয় মাসের পর মাসের অচলাবস্থা ও সেশনজট। যেখানে চার বছরে স্নাতক ও এক বছরে স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার কথা, সেখানে স্নাতক শেষ করতেই ৫-৬ বছর লেগে গেছে। ফলে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষে চাকরির বয়স নিয়ে পড়তে হয়েছে নানা বিড়ম্বনায়।
সেশনজটে বিড়ম্বনার এমন চিত্রের আবারও পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলমান থাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা কিংবা নিজ নিজ স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। কিছু শিক্ষার্থীর বক্তব্য এমন যে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলুক তবুও ক্লাস-পরীক্ষা চালুর জন্য আমাদেরকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষকরাও চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসুক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস বলেন, যেহেতু বিষয়টা সরকার দেখছেন, সেহেতু আমাদের সরকারের প্রতি আহ্বান, যেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কেউই চায় না বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের পরিস্থিতি চলমান থাকুক। সুন্দরভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে এটাই সবার চাওয়া। যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের হাতে নেই, সরকার বিষয়টি মনিটরিং করছে, সেহেতু আমরা অপেক্ষা করছি দ্রুতই সরকারের নীতি নির্ধারণ পর্যায় থেকে একটা সমাধান আসবে।
উল্লেখ্য, বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টে পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে চলমান আন্দোলনে পুলিশি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকতা-কর্মচারী আহত হন। হামলার রাতেই তিন দফা দাবি উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভ, সমাবেশ, উপাচার্য পদত্যাগের আল্টিমেটাম, অনশন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, প্রতীকী লাশ নিয়ে মৌন মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেন শিক্ষার্থীরা। ১৬৩ ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের অনশন শেষে সাবেক দুই শিক্ষকের হাতে অনশন ভাঙেন ২৮ অনশনকারী শিক্ষার্থী। অবরোধমূলক আন্দোলন থেকে সরে আসেন তারা।