ঢাবি শিক্ষকদের পদোন্নতিতে পিএইচডি বাধ্যতামূলক কেন?

বাংলাদেশের জন্ম এবং বেড়ে ওঠার প্রতিটি পরতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই হয়ে আসছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। মানসম্মত শিক্ষাদান, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন করার লক্ষ্যে শিক্ষকদের গুণগত ও পেশাগত মান বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সম্প্রতি একাডেমি কাউন্সিলে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি ও উচ্চতর গবেষণা নির্ধারণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেওয়া উচিৎ ছিল।

হুট করেই এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো— সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে ডক্টরেট ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষকই নিয়োগ দেওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চতর শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে যেমন জ্ঞান বিতরণ হবে, তেমনি জ্ঞান উৎপাদনও হবে। গবেষণার মাধ্যমে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। শতবর্ষে এসে আমরা চিন্তা করেছি, শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী হলে তিনি শিক্ষার্থীদের যেমন ভালোভাবে সার্ভেলেন্স করতে পারবেন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে জাতীয়ভাবেও অবদান রাখতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র‌্যাংকিং নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের একটি সূচকও ধরা হয়, সেদিকে ঢাবি এগিয়ে যাবে। এসব বিষয় মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত ভালো, তবে বিলম্বে নেওয়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দীন খান বলেন, সিদ্ধান্তটা আসলে বিলম্বে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার ক্ষেত্রে বিশেষ করে গবেষণায় ম্যাচুরিটি দরকার এবং ভালো মানের পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে এই ম্যাচুরিটিটা খুব ভালোভাবে তৈরি হয়। তাই এই সিদ্ধান্তকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয়। তবে এই শর্ত বাধ্যতামূলক করার ফলে অনেকেরই পদোন্নতি বিলম্বিত হবে। 

পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘সারাবিশ্বেই সবকিছু পরিবর্তন হচ্ছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবছরেও যে পরিবর্তন হয়নি, সেটি হলো- নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরিবর্তন। নদীতে স্রোত না থাকলে যেমন আবর্জনা জন্মে, তেমনি পরিবর্তন না আসার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নিয়ম করা হয়েছে, তা আরও আগেই করা উচিৎ ছিল। সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এটি খুবই ভালো সিদ্ধান্ত।

এতদিন কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি

এতদিন কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা)  ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, বিভিন্ন কারণে এটি আগে করা হয়নি। দেশের কথা বিবেচনা করে, সুযোগ সুবিধার কথা বিবেচনা করে-এতো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ে আসে নাই। আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। আমাদের এখন অনেক সুযোগ-সুবিধা তৈরি হয়েছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে এসে আমরা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথোপযুক্ত সময় বলে মনে করেছি।'


প্রভাষক নিয়োগেই পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার দাবি

প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা উচিৎ উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দীন খান বলেন, প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।  তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও সুবিধা হয়। সুবিধাটা হলো পিএইচডি করার ফলে তিনি যে গবেষণার অভিজ্ঞতা তৈরি করেন তা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চর্চার সুযোগ পান। এরফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়, যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়া, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এসব আর থাকবে না। তবে এখন যা হয়েছে তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। 

শিক্ষক নিয়োগের ধরনও বদলানোর দাবি তুলেছেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে চুক্তিভিক্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, স্থায়ী চাকরি থাকে না। আর এই চুক্তি বাড়বে কিনা তা নির্ভর করে ওই শিক্ষকের গবেষণা ও প্রকাশনার ওপর। ওই শিক্ষক যে বিষয়ে কাজ করছেন সে বিষয়ে ভালো ও আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে লেখা প্রকাশ করা। সেজন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিজস্ব জার্নালগুলো আছে সেগুলোরও মান বৃদ্ধি প্রয়োজন। 

তবে জার্নালগুলোর সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হয়ে থাকেন উল্লেখ করে একে একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মন্তব্য করেন নজিম উদ্দীন খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জার্নালগুলোর একটা সমস্যা হলো এটির সম্পাদক থাকেন ডিন। আর তিনি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন, যার ফলে তার পক্ষে জার্নালের মান রক্ষা করা সহজ নয়। ভোটের বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি অনেক মানহীন লেখাও প্রকাশ করতে বাধ্য হন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শিক্ষকদের লেখা প্রকাশ করতে তাকে।’ এর মান বৃদ্ধিতে একজন পেশাদার সম্পাদক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন-বলেও তিনি জানান। 

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় বেশ কিছু ইন্সটিটিউট রয়েছে যেখানে ফ্যাকাল্টি মেম্বার হতে হলে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রি লাগে। প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া উচিত সাময়িকভাবে এবং সেখান থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে হলে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা উচিৎ। এই সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের ফলে তার চাকরিটি স্থায়ী হবে। এবং সেক্ষেত্রে ভালো মানের পিএইচডি থাকতে হবে। পিএইচডি করে শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাকরি দিতে চায় না। কারণ মাস্টার্স করাদের দিয়ে রাজনীতি করাতে পারে। আর পিএইচডি একজন শিক্ষার্থী সচেতন থাকে, তিনি (শিক্ষক) এধরনের রাজনীতি করে না।

তিনি মেধাসম্পন্ন শিক্ষক সংকট মেটাতে প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, ‘যদি বলা হয় বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের প্রথম ৫শ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরাসরি চাকরি দেওয়া হবে, তাহলে আমাদের কোনও শিক্ষকের অভাব হবে না। এটি কার্যকর করা হলে আমাদের মেধাপাচার বন্ধ হবে। আমরা অর্জনের পর অর্জন করবো।’