কুবির লোক প্রশাসন বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ৪ মাস

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তিন শিক্ষার্থীর উপস্থিতির শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরীক্ষায় বসতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ। সেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলে পরীক্ষা বর্জন করেন একই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। পরে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের হস্তক্ষেপে ওই পরীক্ষা আয়োজন হলেও, ফরম পূরণ করা দুই শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি। অথচ তাদের উপস্থিতির হার ফরম পূরণ শুরুর আগেই জানিয়ে পরীক্ষায় বসতে পারবেন কি-না, তা অবগত করার দায়িত্ব ছিল বিভাগের।

ওই ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার উপস্থিতির শর্ত পূরণ না করতে পারায় তার ছাত্রত্ব বাতিল হতে যাচ্ছে।

এদিকে এসব বিষয় নিয়ে চার মাস ধরে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ করার দায় পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের ওপরেই দিচ্ছেন বিভাগটির প্রধান। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য বিষয়টিকে বলছেন ‘দুঃখজনক’। আর উপাচার্য বলছেন, ‘নিয়মের বাইরে গিয়ে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে মানবিক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি, পরীক্ষা পেছানোর কালচার নিয়ে অসন্তুষ্ট অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল।’

ঘটনা জানতে ওই ব্যাচের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তারা শুরুতে ‘বিভাগের ভয়ে’ কথা বলতে রাজি হননি। পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুখ খোলেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, এই ঘটনায় তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। করোনার দীর্ঘ ক্ষতির পর নতুন করে চার মাস অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অন্য সব বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে চরম হতাশায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

লোক প্রশাসন বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ২২ আগস্ট ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ সেমিস্টার পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উপস্থিতির শর্ত পূরণ না হওয়ায় তিন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাননি। অথচ তাদের ফরম ফিলাপ করা ও টাকা জমা দিতে দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিভাগে তাদের কাগজপত্র জমা দেওয়ার সময়ও জানানো হয়নি তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ফরম ফিলাপের সব কাজ শেষ হওয়ার পর তাদের জানানো হয়, তারা উপস্থিতির শর্ত পূরণ না করায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

বিভাগের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান ওই ব্যাচের সব শিক্ষার্থী। তারা সহপাঠী তিন জনকে নিয়ে পরীক্ষায় বসতে চেয়ে বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু কোনও সুরাহা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্তে নেন তারা।

শিক্ষার্থীরা জানান, পরীক্ষায় বসতে লিখিত আবেদন, উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সমাধান পাননি তারা। এভাবে কেটে যায় চার মাস। এ ঘটনা পরে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে গেলে উপস্থিতির শর্ত পূরণ করতে না পারা তিন শিক্ষার্থীকে ছাড়াই ২ জানুয়ারি থেকে চার মাস ধরে আটকে থাকা পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়।

শিক্ষার্থীরা চেয়েছেন, ফরম পূরণ যেহেতু হয়ে গেছে, বিভাগ থেকে সবাইকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক। তাই সবাই একমত হয়ে পরীক্ষা বর্জন করেছিলেন। কিন্তু পরে এটিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিভাগ থেকে আমরা শুধুই অবহেলা পেয়েছি। চারটি মাস অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে ছিলাম। এতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পরিবার থেকে বাবা-মা পড়াশোনা কতদূর জানতে চাইলে কোনও উত্তর দিতে পারি না। হতাশায় দিন কাটছে। এভাবে পড়াশোনা বিচ্ছিন্ন থাকবো এতদিন এটা কল্পনাও করিনি। পারিবারিক চাপে ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের এমন অবহেলায় অনেকেরই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে।’

ছাত্রত্ব বাতিল হতে চলা সেই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি ইনকোর্সের সবকিছু সম্পন্ন করেছি। চারটি কোর্সের মাঝে দুটি কোর্সে আমার ৬০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি রয়েছে। আর দুটিতে ৩৫ শতাংশ করে উপস্থিতি। কারণ ক্লাস খুব বেশি নেওয়া হয়নি, যা নেওয়া হয়েছে কোর্সের শুরুতেই হয়েছে। অথচ আমাকে কখনও জানানো হয়নি এই দুই কোর্সে আমার উপস্থিতি কম; পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নাও পেতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। আমি ফরম পূরণ করেছি, ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছি। এমনকি বিভাগেও কাজগপত্র জমা দেওয়ার সময়েও বিষয়টা আমাকে জানায়নি বিভাগ। পরেব জানানো হয়, আমার উপস্থিতির শর্ত পূরণ হয়নি, আমি পরীক্ষা দিতে পারবো না।’

এদিকে চার মাস পিছিয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ দায় শিক্ষার্থীদের উপরই দিচ্ছেন বিভাগীয় প্রধান মোসা. শামসুন্নাহার। তিনি বলেন, ‘তারা ইচ্ছা করেই পরীক্ষা দেয়নি। তাদের দাবি ছিল সহপাঠীদের সাথেই পরীক্ষায় দেবে। কিন্তু তাদের উপস্থিতির শর্ত পূরণ হয়নি। তারা উপাচার্যের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেছে। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলেও তাদের ছাড়া পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত আসে। তিন শিক্ষার্থীকে এখানে বিভাগের বা পরীক্ষা কমিটির কোনও দায় নেই। ওরা পরীক্ষা পিছিয়েছে এটা ওদেরই দায়।’

বিভাগ ছাড় দিলে সুযোগ ছিল বলে মনে করছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নুরুল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সবকিছু যেমন নির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুযায়ী চলে, তেমনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেও কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির শর্ত পূরণ হয়নি। তবে বিভাগ থেকে যদি সুপারিশ করা হতো তবে আমরা হয়তো ছাড় দিতাম।’

চার মাস অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা ‘দুঃখজনক’ উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এটা নিয়ে অ্যাকাডমিক কাউন্সিলে দীর্ঘ সময় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর আমাদের মানবিক হতে হয় নিয়মের মাঝে থেকেই। যে উপস্থিতির শর্ত পূরণ করতে পারেনি তার বিষয়টি বিভাগও গ্রহণ করেনি। আর বিভাগও আমার মনে হয় না কোনও সুপারিশ দিয়েছে। আর যে আগেও রিঅ্যাডমিশন নিয়েছে এবারও শর্ত পূরণ করতে পারেনি, এখানে তার নিজেরও গাফলতি রয়েছে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিয়মে চলে। দুইবার রিঅ্যাডমিশন নিয়েও এবার ৪০ শতাংশ উপস্থিতির যে শর্ত সেটা তার ছিল না। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে মানবিকভাবে দেখা বা কোনোভাবে সুযোগ দেয়া যায়, কি-না তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্ত নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলেও মানবিক কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরীক্ষা পেছানোর কালচারটা নিয়ে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মেম্বাররা সবাই অসন্তুষ্ট। যাদের সমস্যা তারা ছাড়া বাকিদের পরীক্ষা নিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সবাই সম্মত হয়েছে।’