জুলাই শহীদদের স্মরণে টিএসসিতে 'কাঁন্দে আমার মায়'

জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ও আন্দোলন পরবর্তী ১০০তম দিন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে পালন করা হয়েছে 'কান্দে আমার মায়' শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান।

বুধবার (১৩ নভেম্বর) 'জুলাই গণহত্যার ১০০ তম দিনে' শহীদদের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন পায়রা চত্বরে ইনকিলাব মঞ্চ এই  আয়োজন করে।

এই আয়োজনে স্মৃতিচারণ ছাড়াও শোকগীতি, পথনাট্য, দোয়ার আয়োজন করা হয় জুলাই অভ্যুত্থানে আহত-নিতদের স্মরণে।

এতে অংশ নিয়ে আগস্ট ছেলে হারানোর কথা বলছিলেন আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দুইটা গুলি করা হয়েছে। একটা গলায় ডানপাশে, সব রগ ছিঁড়ে গিয়েছে। আরেকটা পিঠের পিছনে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ডাক্তার পিঠের পিছনটা দেখতেই পারেনি। আমি জানি, আমার ছেলে আমার জন্য কি ছিল! সে হয়ত দেশের জন্য করে গেছে কিন্তু ছেলেটা আমি ও আমার ছোট ছেলের জীবনটাকে পুরোপুরি তছনছ করে দিয়েছে। তিন মাসে আমরা একটুকো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। ছোট ছেলেকে নিয়ে মাসের ১৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। ইতোমধ্যে তাকে ৫টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে, ছেলেটার বয়স মাত্র ১৩ বছর। এতো বড় একটা যুদ্ধ, এই লড়াইটি আমি আমার বড় ছেলেকে ছাড়া কীভাবে লড়বো। আমি এমন এক মা যে, জীবন যুদ্ধে দুই ছেলের কাছে হাইরা গেছে।’

রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল আবদুল্লাহ বিন জাহিদ। এ বছর ১৭ বছরে পা দিতেন আবদুল্লাহ। এবারের জন্মদিন একাই পার করতে হয়েছে মা ফাতেমা তুজ জোহরাকে। আরেক ছেলে ১৪ বছর বয়সী মাহমুদুল্লাহ বিন জিসান কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ আনন্দ মিছিল করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় আবদুল্লাহ। বড় ছেলেকে গোসল-খাওয়া সব করিয়ে দিতেন ফাতেমা। বাসায় ডিশ না থাকায় মাকে নিয়ে খবর দেখতে নানু বাড়ি যায় আবদুল্লাহ।

এছাড়াও ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে করে দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পড়ার টেবিলের ওপর মাকে উদ্দেশ করে একটি চিঠি লিখে বেরিয়ে যায়। ওই স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অংশ নেয় আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দিপ্তী।

ছেলে মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সানজিদা খান দিপ্তী। তিনি বলেন, ‘১৬ বছরে আমার সন্তান। কিছুই জানে না, তারপরেও আন্দোলনে গিয়েছে। সব হারিয়ে ফেলেছি আমি, আনাস আপনাদের কাছে শুধু একটি শহীদদের নাম কিন্তু আমার কাছে আমার সন্তানটা ছিল সারা পৃথিবী। আমার সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। আর যেন কোন যুদ্ধে যেন আর কোন মায়ের কোল খালি না হয়। যে দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমাদের সন্তানরা যে আন্দোলনে নেমেছিল তাদের রক্ত বৃথা হতে দেবেন না, সেই স্বপ্নের দেশটা যেন এ জাতি পায়।’

এছাড়া এতে অন্যান্যদের মধ্যে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীন, শহীদ ফাহমিন জাফরের মা, শহীদ আব্দুল আহাদের বাবাসহ অনেক আহত-নিহত পরিবারের সদস্যরা আপনজন হারানোর স্মৃতি তুলে ধরেন।