জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগে আত্মগোপনে থাকা ইসলামি ছাত্রশিবির এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের কমিটি প্রকাশ করেছে। ৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ১৪ জনের কমিটি দেয় ছাত্রশিবির। সেই কমিটির এক বছর যেতে না যেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান জানান দিলো সংগঠনটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এবং ১২টি সম্পাদক পদের মধ্যে ৯টিতে জয় পেয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা। ভোট সংখ্যায় তাদের ধারে কাছেও নাই কেউ। ছাত্রদল দ্বিতীয় পজিশনে থাকলেও ছাত্রশিবিরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়েছে।
২০২৪ সালের ১ আগস্ট সংগঠনটির কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করেছিল সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার।
আত্মপ্রকাশের এক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের এত ভোট কীভাবে নিজেদের করে নিলো তারা? ছাত্রদল যদিও অভিযোগ করে আসছে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ছাত্রশিবির। কিন্তু পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন কমিশন বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। তবে কিছু ছোট ছোট অসঙ্গতিও তুলে ধরেন পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন ঘিরে কয়েকটি ত্রুটি ও অসঙ্গতি তুলে ধরেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘কী প্রক্রিয়ায় পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে তা আমরা জানতে চেয়েছি। এই প্রক্রিয়া এতটাই অস্বচ্ছ যে আমরা সারাদিনেও বুঝে উঠতে পারিনি কী ক্রাইটেরিয়া মেনে তাদের সেখানে রাখা হয়েছে। এই অস্বচ্ছতার প্রভাব ভোটগ্রহণে পড়তে পারে। এছাড়াও জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হলের কেন্দ্রে দিনের শুরু থেকে বারে বারে ভোটগ্রহণ ধীরগতি করা হয়েছে। একাধিকবার এটি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। টিএসসি কেন্দ্রে একজন সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার পর ভোটগ্রহণে প্রভাব ফেলেছে।
শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবির মনোনীত প্রার্থীদেরই কেন তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিল? সে বিষয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদকের। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের ইন্টেলেকচুয়াল (মেধাবী) পাওয়ার, সুসংগত দলীয় কার্যাবলী, দূরদর্শন চিন্তাভাবনা এবং বলিষ্ঠ আন্তব্যক্তিক যোগাযোগের জন্য এত দ্রুত এটা সম্ভব হয়েছে। তাদের প্রত্যেকটি কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে করার মানসিকতা তাদের এই অর্জনে অনেক এগিয়ে দিয়েছে অন্যদের তুলনায়।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী পারভেজ মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির চব্বিশের বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং বিপ্লব পরবর্তীতে চেষ্টা করেছে শিক্ষার্থীদের সমর্থন জোগাতে। আর অন্যরা পিছু লেগেছে ছাত্রশিবির ঠেকাতে। শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগ স্টাইলে ছাত্রশিবিরকে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধী ট্যাগিংয়ের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্যকে বুঝতে পেরেছে। ছাত্রশিবির বরাবরই শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেকে সৎ, দক্ষ ও সৃজনশীল প্রমাণ করতে পেরেছে।’
অন্যদিকে ছাত্রদল কোন্দল ও উগ্রতার কারণে শিক্ষার্থীদের নিকট গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দলগতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
ছাত্রশিবির গোপনে হলে ছিল উল্লেখ করে শিক্ষার্থী আদিব বলেন, ‘একে তো তারা হলে হলে ছিল, ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যেটা অন্য কোনও সংগঠনের নেই। পাশাপাশি অনাবাসিকদের জন্য ক্যাম্পাসের বাইরে শিবির একাধিক মেস পরিচালনা করে, ফলে সেখান থেকে তাদের একটা বড় অংশের ভোট আসে। ফলে অপশন কম থাকা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক পাশাপাশি মেসের মাধ্যমে অনাবাসিকদের ভোট আয়ত্ত করেছে শিবির।’
শিক্ষার্থী রাফি বলেন, ‘এটা তাদের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ। তারা সাংগঠনিকভাবে খুবই দক্ষ হওয়ায় দ্রুত শিক্ষার্থীদেরকে রিচ করতে পেরেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও এখন নতুন কিছু চায়। ফলে ছাত্রশিবিরকে সবাই ভোট দিয়েছে।’
শিক্ষার্থী শাকিল শেখ বলেন, ‘শুধু শিবির না, যারা কাজ করতে পারবে শিক্ষার্থীরা তাদেরকেই ভোট দিয়েছে। আর ছাত্রশিবির সিস্টেমেটিক্যালি যারা কাজ করতে পারে তাদেরই প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত করেছিল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল উভয়ই অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু জুলাইয়ের ন্যারেটিভকে শিবির কাজে লাগালেও ছাত্রদল সেটাকে কাজে লাগায়নি। এর মূল কারণ হলো ছাত্রদল সেটাকে আপন করে নিতে পারেনি। অ্যান্টি শিবির অ্যাক্টিভিজম করতে গিয়ে তারা একাত্তরকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে। আমার মনে হয়েছে এটা শিবিরের পক্ষে কাজ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ব্যর্থটা হচ্ছে, তারা যে ছাত্রলীগের থেকে আলাদা হবে, সেই বার্তাটা তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন থেকে ওই শঙ্কাটা যায়নি। তাদের মধ্যে সেই গেস্টরুম-গণরুমের ভয়টা থেকেই গেছে। এখানে শিবির শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছে।’