জবিতে জকসুর ১৫ দফার ভিত্তিতে সর্বজনীন আচরণবিধি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত

‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। জকসুর এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সর্বজনীন কোড অব কন্ডাক্ট (আচরণবিধি) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

‎শনিবার (১৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে তার কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় ৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় ও সমঝোতাসহ জকসুর পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। 

‎জকসুর ১৫ দফায় যা রয়েছে

‎জকসুর প্রস্তাবনায় ক্যাম্পাসে সব ধরনের সহিংসতা, হামলা, মারামারি, হুমকি, উসকানিমূলক কার্যক্রম প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সাংগঠনিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে হয়রানি, হুমকি বা হামলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও করেছে জকসু।

‎কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ওপর শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটলে ঘটনার গুরুত্ব ও প্রকৃতি বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধিমালা ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

‎ক্যাম্পাসে অস্ত্র বা দেশীয় অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি জাতীয় আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।

‎জকসু বলেছে, কোনো ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচি, প্রচারণা বা সাংগঠনিক কার্যক্রমে অন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে বৈষম্য বা হয়রানি না করার বিষয়েও প্রস্তাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

‎একইসঙ্গে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাডেমিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের চাপ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার কথা বলা হয়েছে।

‎বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব

‎ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচয় যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে জকসু। শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ‎নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কোনো ঘটনার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নের প্রস্তাব রয়েছে।

‎অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সময়সীমা চায় জকসু

‎শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব করেছে জকসু। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

‎এ ছাড়া ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের আচরণবিধি, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ওপর না চাপানোর কথাও বলা হয়েছে।

‎সংকটে সংঘাত নয়, আলোচনার প্রস্তাব

‎সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা, সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ অনুসরণের প্রস্তাব করেছে জকসু।

‎বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেতৃত্বে ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় সভা আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবনায় এসব সভা অন্তত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‎জকসুর প্রস্তাবের ভিত্তিতে হবে কোড অব কন্ডাক্ট

‎সভায় জকসুর ১৫ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সার্বজনীন কোড অব কন্ডাক্ট তৈরির সিদ্ধান্ত হয়।

‎উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, জকসুর সভাপতির উপস্থাপিত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।

‎তিনি বলেন, মত ও সংগঠন যার যার, জবি পরিবার আমার, সবার। এই চেতনাকে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংগঠনকে সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

‎উপাচার্য আরও বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে এবং ভুল বা অসংগতির সমালোচনাও হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন ভাষা কিংবা পারিবারিক পরিচয় তুলে অবমাননাকর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতার মধ্য দিয়েই মতপার্থক্যের চর্চা হওয়া উচিত।

‎সভায় জকসুর ১৫ দফা প্রস্তাবনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ৪ আগস্টের ঘটনার পর সৃষ্ট পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।