ওয়েবসাইট খুলে ডাকসুর ‘শিক্ষক মূল্যায়ন’, এখতিয়ার নিয়ে বিতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের পেশাদারত্ব মূল্যায়নে ‘শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি’ চালু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এ জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (duevaluation.com) চালু করেছে তারা। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি অনেক শিক্ষক ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা আপত্তি জানিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষকদের মূল্যায়নের এখতিয়ার আদৌ ডাকসুর আছে কি না।

কারও কারও অভিযোগ, ডাকসুর এই উদ্যোগ এখতিয়ারবহির্ভূত। শিক্ষকদের মূল্যায়নের নামে তাদের মান ক্ষুণ্ন ও হেনস্তার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। আবার কেউ কেউ এ ধরনের মূল্যায়নে রাজনীতিকরণের আশঙ্কা করছেন।

তবে ডাকসুর চালু করা প্ল্যাটফর্মে রবিবার বিকাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬টি বিভাগের ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষকের বিষয়ে ১১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করেছেন। কোনো কোনো শিক্ষক ৫-এর মধ্যে ৫ রেটিং পেয়েছেন। আবার কেউ পেয়েছেন ১ বা ২।

শিক্ষক মূল্যায়নের একাল-সেকাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে ২০২২ সালে প্রথম শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়। ২০২৪ সালে এর অংশ হিসেবে ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারতেন।

সেই পদ্ধতিতে প্রতি সেমিস্টারে ৭০ শতাংশ ক্লাসে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা মত দিতে পারতেন। যে শিক্ষার্থী যে সেমিস্টারে পড়ছেন, সেই সেমিস্টারের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ছাড়া অন্য কাউকে মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। বেশ কিছু বিভাগে এটি বাস্তবায়নও করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতায় শিক্ষক মূল্যায়নের এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবারও এটি চালুর কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এদিকে ডাকসুর উদ্যোগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।

ওয়েবসাইটের নিয়ম অনুযায়ী, একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করলে ওই ঠিকানায় একটি কোড পাঠানো হয়। সেই কোড ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের যেকোনো শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারবেন। অর্থাৎ কোনো শিক্ষকের ক্লাস না করেও তাকে মূল্যায়নের সুযোগ থাকছে। এ নিয়েই সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

‘শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু অনধিকার চর্চা করছে’

শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু অনধিকার চর্চা করছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষককে স্বেচ্ছাচারী হতে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাস-সুলভ ব্যবহার করতেও দেখা যায়।

তবে শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু যা করছে, তা অনধিকার চর্চা বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এটি করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। ডাকসু এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে পারে, চাপ তৈরি করতে পারে।’

তিনি বলেন, ডাকসুর এমন কার্যক্রমের ফলে এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, যা পরবর্তী সময়ে মবেও রূপান্তরিত হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক মূল্যায়নের ইতিবাচক ফলাফল থেকে বঞ্চিত হবে।

শিক্ষক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে খোরশেদ আলম বলেন, শুধু কাগজে-কলমে মূল্যায়ন করলেই হবে না। পাশাপাশি মূল্যায়ন প্রতিবেদন শিক্ষক নিয়োগ, অন্য প্রতিষ্ঠানে আবেদনের ক্ষেত্রে, পদোন্নতি ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির মতো বিষয়েও মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া শিক্ষকদের ফ্যাকাল্টি, ইনস্টিটিউট বা বিভাগ থেকে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

‘ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম এখতিয়ারবহির্ভূত’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মনে করেন, শিক্ষকদের মূল্যায়ন ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত কার্যক্রম।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাকসুর এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আছে। তারা যদি নিজেদের বিকল্প প্রশাসন হিসেবে মনে করে, চায় করুক। কিন্তু আমাকে মূল্যায়ন করার এখতিয়ার তাদের নেই।’

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রে শিক্ষকসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বের কথা বলা হয়নি। এখন ডাকসু আগ বাড়িয়ে যেটা করেছে, সেটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বসবে। আলাপ-আলোচনা করে কী করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

‘প্রশাসনের গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে উদ্যোগ’

শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ডাকসু এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাকসু ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমরা কারও নিয়োগপ্রাপ্ত না। শিক্ষার্থীরা যেহেতু আমাদের তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছে, তাই তাদের কল্যাণে আমরা কাজ করার চেষ্টা করেছি।’

ডাকসুর এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হবে না উল্লেখ করে ফরহাদ বলেন, ‘এর মধ্যে দিয়ে কোনো রাজনীতিকরণ হবে না। এ নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন ওঠে, আমরা তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জবাব দেবো।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলেই ডাকসুর এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানান ডাকসুর জিএস।