ইসরায়েলকে সমর্থন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার দীর্ঘদিনের আধিপত্যই ক্ষয় করছে বলে মন্তব্য করেছেন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গেগরি জে সিমনস। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, বিশ্ব গণতন্ত্র, নৈতিক জবাবদিহি ও আত্মসমালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গেগরি জে সিমনস বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতকে শুধু ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব, ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়ও জড়িত।
তিনি বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা থাকলেও দুই দেশের স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র মূলত তার দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব বা ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত সেই প্রভাবকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
ইরান প্রসঙ্গে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্যের যে বয়ান দেওয়া হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গেগরি জে সিমনস পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ অভিযোগও তোলেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও নৈতিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদিও বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানে হামলার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কোনো অনুমোদন দেয়নি। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, যুদ্ধ শুধু সামরিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে অনেক সময় যুদ্ধের ঘটনাগুলো একপেশেভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল; কোনো পক্ষের হয়ে অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকতার কাজ নয়। সত্য, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই স্বাধীন গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যুদ্ধের আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিশু, স্কুল, নারী ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা কতটা বৈধ, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
যুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরতে বিশ্বের স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোকে ইরান সফরের আহ্বান জানান ইরানের রাষ্ট্রদূত। সাংবাদিকদের সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং নিজেদের মতো করে যুদ্ধের পরিস্থিতি তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস উদ্দীন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।