পরিস্থিতি পুরোটাই বদলে গেছে। বছরের পর বছর ধরে যেখানে মরিয়ম চিকিৎসা পাননি সেখানে এখন প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর পর এসে তিন/চারজন চিকিৎসক দেখে যাচ্ছেন তাকে। আগে নার্সরা যেখানে বকাবকি করতেন এখন সেখানে তারা নিজ হাতে তাকে ওষুধ খাইয়ে যাচ্ছেন। মেয়েটির গোসল হচ্ছে প্রতিদিন। নার্সরা গায়ে মলম লাগিয়ে যাচ্ছেন নিজ হাতে,বিছানাও বদলে দিয়েছেন-গত কয়েকদিন ধরেই আমরা এসবের সাক্ষী। মেয়েটা এ কয়দিনেই বদলে গেছে। বলছিলেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চার নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দার এক রোগী। দেখার লোকও অনেক বললেন তিনি।
গত বুধবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে মরিয়মের বেডের কাছে যেতেই এ প্রতিবেদককে তিনি এসব কথা বলেন।
গত ২১ এপ্রিল ‘মেয়েকে নিয়ে ৫ বছর ধরে হাসপাতালে আছেন মা,হচ্ছে না চিকিৎসা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে টনক নড়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের। একইসঙ্গে দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই বাংলা ট্রিবিউন অফিসে এবং এ প্রতিবেদককে ফোন করে জানান,মরিয়ম এবং তার মেয়েকে তারা সহযোগিতা করতে চান।
এদেরই একজন স্পেনের রাসেল পোদ্দার। তিনি এ প্রতিবেদককে ফোন করে জানান, প্রতিবেদনটি পড়ে তিনি দেশে আসছেন এবং এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি যেতে চান মা-মেয়ের কাছে। তবে এয়ারপোর্ট থেকে না যেতে পারলেও গত বুধবার রাসেল গ্রামের বাড়ি থেকে ছুটে আসেন ঢাকায় এবং দেখা করেন মরিয়ম এবং মারিয়ার সঙ্গে। সেদিন মারিয়ার হাতে তুলে দিয়েছেন স্পেন থেকে নিয়ে আসা নানা রকম ক্যান্ডি, জ্যুস এবং চুইংগাম। মারিয়াকে নিয়ে ঘুরেছেন হাসপাতালের সামনে থাকা প্রতিটি দোকানে। মারিয়া যা যা খেতে চেয়েছে সবই কিনে দিয়েছেন তিনি, কিনে দিয়েছেন মালা, চুড়ি, স্যান্ডেল এবং জামা-কাপড়।
আরও পড়ুন:
রাসেল পোদ্দার এ প্রতিবেদককে বলেন,আমি যখন এ প্রতিবেদনটি পড়েছি তখন থেকেই ভালো কিছু খেতে পারছি না,আমার কেবলি মারিয়ার মুখ মনে পড়েছে। দেশ আসার পর বাড়িতে বাবা-মা নানা রকম খাবার নিয়ে সামনে বসেছেন,আমি অপেক্ষা করেছি কখন মারিয়ার হাতে খাবার তুলে দিতে পারবো। তাই তো আজ মাংস কিনে ওকে সামনে বসিয়ে জোর করে খাইয়েছি।এখন কিছুটা হলেও শান্তি পাচ্ছি,বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন এ তরুণ।
রাসেল আরও বলেন,তবে আজ এখানে এসে দেখতে পেলাম, অনেকেই ওদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাই আমি কেবল তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করার কথা আর ভাবছি না,স্পেনে গিয়ে আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করবো, মারিয়ার জন্য স্থায়ীভাবে ব্যাংকে টাকা রাখবো বলে চিন্তা করছি, যাতে ওর কোনও সমস্যা না হয় ভবিষ্যতে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকে আছেন জুবায়ের।তিনি বলেন,আমি এক ছোট ভাইকে নিয়ে প্রথম দিন গিয়েছি আপনার নিউজ দেখেই। তখন আমার সাধ্যমতো ওদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি, এরপর এখন চেষ্টা করছি স্থায়ীভাবে কিছু করার।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা আমানুল্লাহ নোমান মরিয়মের চিকিৎসার তদারকি করছেন,প্রতিনিয়ত তার ফেসবুকে আপডেট দিচ্ছেন ওদের নিয়ে, কাছের মানুষদের সহযোগিতা চাইছেন,সেসব সহযোগিতা নিয়ে তিনি কিনে দিচ্ছেন মরিয়মের ওষুধ,পোশাকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
শুক্রবার বিকেলে আমানুল্লাহ নোমানকে ফোন করলে তিনি বলেন,‘আপা, আমি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। একটা টেবিল ফ্যান কিনে দিয়েছেন আমার বাহরাইন প্রবাসী এক বন্ধু, সেটি দিয়ে গেলাম। ওদের ওখানে তো বাতাস যায় না, যা গরম পড়েছে, ওদের কষ্ট হচ্ছিল ।নোমান জানালেন,এর আগে তারা একটি হুইল চেয়ার কিনে দিয়েছেন মরিয়মকে।হুইল চেয়ারটি কিনে দিয়েছেন তার কোরিয়া প্রবাসী বন্ধু মোস্তফা ভুঁইয়া রানা।
আমানুল্লাহ নোমান বলেন,বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদটি পড়ে তিনি তার বন্ধু দোলন,দোলনের মা এবং স্ত্রীসহ মরিয়মকে দেখতে যান। সেদিনই দোলনের মা মরিয়মকে নিজ হাতে গোসল করান,চুলে তেল দিয়ে আচড়ে দিয়েছেন,খাইয়েও দিয়েছেন তাকে। হাসপাতালের নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন প্রতিদিন মরিয়মকে গোসল করানো এবং খাওয়ানোর কাজটা যেনো তারা করেন।
পরিচ্ছন্নতা কর্মী ফিরোজাও বলেন একথা। ফিরোজা বলেন,একজন আমার হাতে টাকা দিয়ে বলে গেছেন, মরিয়মকে যেন আমি দেখে রাখি। ওকে এখন প্রতিদিন আমি গোসল করাই,সকালে,দুপুরে মুখে তুলে খাইয়ে দেই, ওষুধ খাওয়াই। ওর বিছানার চাদরও বদলে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালেন ফিরোজা।
এভাবেই দেশ-বিদেশ থেকে নানাজন হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মরিয়ম আর মারিয়ার দিকে। সঙ্গে আছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দিনে একাধিকবার চিকিৎসকরা এসে দেখে যাচ্ছেন মরিয়মকে, গত কয়েকদিন ধরেই মরিয়মের বেশ কিছু টেস্ট (পরীক্ষা) করানো হয়েছে। আজ শনি কিংবা রবিবারে তার এমআরআই হবে বললেন, ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায়। তার তত্ত্বাধায়নেই বর্তমানে রয়েছেন মরিয়ম।
ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাসপাতালে যেসব ওষুধ রয়েছে সেগুলোতো আমরা দিচ্ছিই, একইসঙ্গে যেসব ওষুধ হাসপাতালে নেই সেগুলোও আমরা ওকে কিনে দিচ্ছি, অনেকেই এসে ওদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন,সেখান থেকেও ওরা টাকা দিচ্ছে। ডা. গোবিন্দ আরও জানান,এই হাসপাতালে এমআরআই করাতে চার হাজার টাকা লাগে, আমি হাসপাতালের পরিচালকের কাছে সুপারিশ করেছি মরিয়মের এমআরআই যেন বিনামূল্যে করা হয়।আশা করছি,সেটির অনুমোদন পাবো। এমআরআই রিপোর্ট পেলেই একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়ে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করবো এই মাকে সুস্থ করে তুলতে।
তিনি আরও বলেন,বিভিন্ন সময়ে ভর্তি থাকায় যাওয়ার কোনও জায়গা ছিল না বলে ওর (মরিয়মের) হাঁটতে সমস্যা ছিল। ওর নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার রয়েছে বলে আমরা ধারনা করছি, যেটা এখনও কনফার্ম হয়নি,এমআরআই রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হতে পারবো।
ডা.গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, এখন তো ও সবার সহযোগিতা পাচ্ছে।অনেকেই তাকে ওষুধ,ইনহেলার কিনে দিয়ে গেছেন। এখন ওকে কতোটুকু সুস্থ করে তুলতে পারবো সেটাই ভাবাচ্ছে আমাদের।
আরও পড়ুন:
/এমএসএম /আপ-এআর/