বন্যা, সাইক্লোন, ভূমিকম্প ছাড়াও ভবিষ্যতে ‘মহাদুর্যোগ’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বজ্রপাত। আবহাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বজ্রপাত যে দুর্যোগ হতে পারে বিষয়টি আমাদের চিন্তাতে ছিল না বললেই চলে। কিন্তু প্রতিবছর মে মাসে যে সংখ্যক মানুষ বজ্রাঘাতের কারণে মারা যাচ্ছে সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রামে বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন তারা।
বিগত কয়েক বছরে বজ্রাঘাতে মৃতের সংখ্যা অনেক। ফলে ২০১০ সাল থেকে বজ্রপাতকে আলাদাভাবে দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে এটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ সম্পর্কিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, বজ্রাঘাতে একদিনে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন। কখনও কখনও এই সংখ্যা ৫০ জনেরও বেশি।
আরও পড়ুন:
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। বছরে মাত্র দেড়শ’র মতো লোকের মৃত্যুর খবর বাংলাদেশের পত্রিকায় ছাপা হলেও আসলে এ সংখ্যা পাঁচশ’ থেকে এক হাজার।
দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বজ্রপাতে ২৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় মে মাসে। এই মাসে মোট ৯১ জন মারা যান। এর মধ্যে মে মাসের ২ তারিখে ১৯ জন, ৭ তারিখে ১৮ জন এবং ১৫ তারিখে ১৪ জন মারা যান।
২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কেবল বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে ১৪ শিশু ও ৩১ জন পুরুষ। ২০১০ থেকে গত ৬ বছরের হিসাব বলছে, একেবারেই নজর না দেওয়া এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
আরও পড়ুন:
কেন বজ্রাঘাতে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে বলতে গিয়ে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বড় গাছের অভাব বজ্রপাতে মৃত্যুর একটা কারণ হতে পারে। এছাড়া শহরাঞ্চলে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্র নিরোধক থাকায় বজ্রপাতের ঘটনা কম। কিন্তু গ্রামে এই নিরোধক হিসেবে কাজ করতো যে বড় গাছ, তার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে গ্রামাঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটতে দেখা যায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেন, সম্প্রতি বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে এবং এটি একসময় আপদ হিসেবে দেখা হলেও দুর্যোগের পর্যায়ে ছিল না।
কেন বজ্রাঘাতে পুরুষ মৃত্যুর হার বেশি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বজ্রপাতের ঘটনা খোলা জায়গায় বেশি দেখা যায়। আগে কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। এখন মাঠে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে গেছে। ফলে মাঠে কাজ করা মানুষ আক্রান্ত হয় বেশি।’
আবহাওয়াবিদ শাহ আলম বলেন, ‘জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। কালো মেঘ থেকে বিদ্যুৎ ও বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এই কালো মেঘ বেশি হচ্ছে বলে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর গ্রামে উচ্চ ভবন, বড় গাছ কম থাকায় বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।’
/এসটি/এএইচ/