কয়েক বছর ধরেই ব্লগার, লেখক, অধ্যাপক, ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ বিভিন্ন মতাদর্শের মুক্তমনা মানুষকে ইসলামের নামে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে দুই সমকামী অধিকারকর্মী খুন হওয়ায় বিষয়টি আরও জোরালোভাবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও তা আলোচনায় আসছে বারবার। নিরাপত্তার স্বার্থে তাই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বেড়ে গেছে। আর তাই আতঙ্ক বেড়েছে সাধারণ মুসল্লিদের মনে।
শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মসজিদের ইমাম ও মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে আতঙ্কের বিষয়টি জানা গেছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা বলছেন, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মসজিদগুলোতে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জানতে চাইলে উত্তরার মসজিদ আল মাগফেরার খতিব মুফতি অহিদুল আলম বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মসজিদ থেকে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং মুসল্লিদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়া যে কোনও সমস্যায় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগেরও পরামর্শ দিচ্ছি।’
শুক্রবার বায়তুল মোকাররম, পুরানা পল্টন জামে মসজিদ, মিরপুর এলাকার কয়েকটি মসজিদে পুলিশের অবস্থান দেখা গেছে। মসজিদে প্রবেশের সময় পুলিশের তল্লাশি ও নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। এছাড়া ধানমণ্ডি, উত্তরা, আজিমপুর, লালবাগ, যাত্রবাড়ী, শনির আখড়াসহ কয়েকটি এলাকার ইমাম ও মুসল্লিরা জানান, তাদের এলাকার মসজিদগুলোয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি সব সময় থাকে। তবে জুমার দিনে গোয়েন্দা সংস্থা ও সাদা পোশাকধারী পুলিশের নজরদারি অনেক বেশি থাকে।
আরও পড়তে পারেন: আসছে রমজানেই আইএসের বাংলাদেশি নেতার নাম ঘোষণা!
এ ব্যাপারে যাত্রাবাড়ীর খাদেমুল ইসলাম মসজিদ কমপ্লেক্সের খতিব মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ‘মসজিদে গোয়েন্দা নজরদারি বেড়েছে। মুসল্লিদের আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, বিনা বিচারে কোনও ধরনের হত্যাকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে না। সবাই যেন সর্তক থাকে।’
জানতে চেয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব ও ইমামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
পুলিশ ও গোয়েন্দারের কয়েকটি সূত্র জানায়, মসজিদগুলোয় তল্লাশির মাধ্যমে মুসল্লিদের হয়রানির কোনও উদ্দেশ্য থাকে না। নিষিদ্ধঘোষিত হিজবুত তাহরীর, জামায়াতে ইসলাম, ছাত্র শিবির ও জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর গোপন অনেক কার্যক্রমই মসজিদকে ব্যবহার করে চালানো হয়। ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময় জঙ্গিবাদীরা মিলিত হয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালায়। এমনকি নামাজের শেষে সরকারবিরোধী পোস্টার, লিফলেট প্রচার ঠেকাতেও মসজিদগুলোয় নজরদারি কাজে লাগে।
আরও পড়তে পারেন: আইনি প্রক্রিয়া শেষেই নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
মুসল্লিদের কেউ কেউ বলছেন, জঙ্গিবাদ রোধে সরকারের তৎপরতা নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও নামাজের সময় গোয়েন্দা তৎপরতা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি রাজশাহীতে দরগামাড়িয়া জামে মসজিদের ইমাম রায়হান আলী (৩২) খাজাপাড়া গ্রামের মাদরাসার শিক্ষক মুনসুর রহমানকে (৪৮) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই দুই ইমাম দুর্বৃত্তের হাতে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর গ্রামের বাড়ির পাশের মসজিদ ও মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। এসব ঘটনাও মুসল্লিদের মনে আতঙ্ক ছড়ায়।
সেগুনবাগিচায় একটি মসজিদের জুমার নামাজের শেষে কথা হয় ওই এলাকার অধিবাসী ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জুমার নামাজের দিন মসজিদে প্রবেশের সময়ই পুলিশ থাকে। কখনও কখনও মুসল্লি সেজে গোয়েন্দারাও অবস্থান করেন। এটা তো একটু বিব্রতকর।’
তার মতে, প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে পারলে ভালো। কিন্তু জঙ্গিরা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাহলে মুসল্লিদের কেন হয়রানি করা হবে।
ফোনে কথা হয় বাড্ডা নতুনবাজার এলাকার এজিএম মুসতাঈন বিল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার মসজিদে প্রবেশের সময় তল্লাশি না থাকলেও নজরদারি ছিল। ওয়াকিটকি হাতে মসজিদের আশেপাশে গোয়েন্দারাও ছিলেন।’
উত্তরা এক নম্বর সেক্টর জামে মসজিদের খতিব মুফতি লুৎফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ ও মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে ইসলামের যে কঠোর অবস্থান, তা বরাবরই আমরা মুসল্লিদের জানাই। এখানে জঙ্গিরা আসবে না। কারণ তারা তো ইসলামের পক্ষে না। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হয়ে তারা কাজ করে। ফলে সরকারের উচিৎ হবে প্রকৃত অপরাধীদের বের করা। এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে সাধারণ মুসল্লিরা হয়রানিতে পড়েন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব প্রবীণ আলেম মাওলানা ফরীদউদ্দিন মাসঊদ বলেন, ‘মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর। শান্তির জায়গা। মুসল্লিদের সমস্যা হয়, এমন কিছু করা সেখানে ঠিক নয়। এরপরও রাষ্ট্র যদি জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে থাকে, তাহলে বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নামাজ পড়তে এসে মুসল্লি তো হয়রানির শিকার হতে চাইবেন না।’
আরও পড়তে পারেন: সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ব্যাপারে কড়াকড়ি
/এজে/ আপ- এমও