রাজধানীর অধিকাংশ খালেরই এখন মরণ দশা। এসব খালের অবৈধভাবে বাড়িঘর থেকে শুরু করে স্টিলের সেতু পর্যন্ত নির্মাণ করেছেন প্রভাবশালীরা। এসব স্থাপনার কারণে বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বারবার অভিযান চালিয়েও এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সফল হতে পারছে না ওয়াসা। এদিকে, ওয়াসা দাবি করছে খালগুলো দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পুলিশ না পাওয়ায় উচ্ছেদ অভিযানও সময়মতো চালানো সম্ভব হয় না।
প্রায় মৃত খাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর খাল। এখন আর চেনার উপায় নেই। খাল পরিণত হয়েছে ময়লা ও বর্জ্যের ভাগাড়ে। খালটি চেনার জন্য ঢাকা ওয়াসা কাটাসুরের নামাপাড়ায় একটি সাইনবোর্ড টাঙ্গালেও সুফল আসেনি। দখল-দূষণে অকার্যকর হয়ে পড়ছে খালটি।
যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা ও ধলপুরের মাঝখান দিয়ে এক সময় প্রবাহিত স্বচ্ছ পানির দেবধোলাই খালেরও মরণদশা হয়েছে। ওয়াসার সাইনবোর্ড থাকলেও সবার সামনে ভরাট হয়ে গেছে খালের বিরাট অংশ। খালের ওপর বাজারও চলছে বহাল তবিয়তে।
শুধু মোহাম্মদপুরের কাটাসুর কিংবা কাজলার দেবধোলাই খালই নয়, ২৬টির মধ্যে অধিকাংশ খালের অবস্থা ভালো নেই। এ বিষয়ে খোদ খোদ ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, যথাযথ নজরদারির অভাবে সতর্কবাণী বা সাইনবোর্ড দিয়েও খালের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় কয়েকটি খালে কঠিন বর্জ্য এমনভাবে জমেছে যে, শক্তিশালী যন্ত্র দিয়েও সরানো যাচ্ছে না। খালের ওপর অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে আরসিসি এবং স্টিলের সেতু। কখনও কখনও খাল খনন কিংবা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও ভরাট কিংবা বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
ওয়াসা জানিয়েছে, ইব্রাহিমপুর খাল, দিয়াবাড়ী খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, সেগুনবাগিচা খাল ও খিলগাও-বাসাবো খালে অবৈধ স্থাপনা ও বাড়িঘর উঠেছে। বর্ষা এগিয়ে এলেও খালগুলোকে দখলমুক্ত করতে পারেনি ওয়াসা।
১.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেগুনবাগিচা খালে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে গেছে। খালের ওপর অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে আরসিসি ও স্টিলের সেতুর। সম্প্রতি ১৮টি সেতু উচ্ছেদ করা হলেও প্রভাবশালীরা আবারও নির্মাণ করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। আবর্জনায় ভরে আছে মাণ্ডা খালও।
খিলগাও-বাসাবো খাল (দৈর্ঘ্য ১.৫০ কিলোমিটার), মহাখালী খাল (.৩০ কিমি) এবং দেবধোলাই খাল (.৬০ কিমি) কঠিন বর্জ্যে ভরে গেছে। মিরপুরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় বাউনিয়া খালের বিরাট একটা অংশ বেদখল হয়ে আছে। সম্প্রতি ওয়াসা এখানে খাল উদ্ধার ও ৮০০ মিটার অংশ খনন করলেও ফের বেদখল হতে চলে খালটি।
কল্যাণপুর প্রধান খাল ও কল্যাণপুর ‘ঙ’ খাল আবর্জনায় ভরা। সম্প্রতি এখানেও ওয়াসা পরিষ্কার ও খনন কাজ করেছে। কিন্তু স্থানীয়দের কারণে আবারও বেহাল দশা হয়েছে খালটির।
নির্গমণ পথ না থাকায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে মিরপুর বেনারশী পল্লীর বাইশটেকি খাল (আংশিক)। বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে খালের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ওয়াসা বলেছে, খালটির জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
কল্যাণপুর ‘ক’ খালের ভাটিতে খাল উধাও হয়ে গেছে। খালের পানি এখন প্রবাহিত হচ্ছে খালেক সিটির ভেতরে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ দিয়ে। মিরপুর সাংবাদিক কলোনি খালের ভাটি অংশের প্রশস্ততা মাত্র তিন ফুট। খাল দু’টির জন্য জমি অধিগ্রহণের কথা বহু বছর ধরে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওয়াসা কিছুই করতে পারেনি।
মুসলিম বাজার খাল, কল্যাণপুর ‘চ’ খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল (বেড়িবাধের ভেতর), কাটাসুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, কল্যাণপুর ‘খ’ খাল, কালুনগর খাল, ওয়াসা সম্প্রতি পরিষ্কার করার দাবি করলেও বাস্তবে আবারও আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে।
হাজারীবাগের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সাদেক ফিলিং স্টেশন পযন্ত পাইপ লাইন দিয়ে হাজারীবাগ খালের একাংশের পানি প্রবাহিত হয়। ওয়াসা বহুদিন ধরে বলে আসছে এই পাইপ লাইন অপসারণ করে খাল খনন করা দরকার। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ কাজ শুরুই করতে পারেনি। এর ফলে আসন্ন বর্ষায়ও হাজারীবাগের বাসিন্দাদের জলাবদ্ধাতায় পড়তে হতে পারে।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কারণে ভরাট হয়ে গেছে রূপনগর প্রধান খালের ভাটির অংশ। এ কারণে খালের পানি নিষ্কাশন করা হয় পাইপ লাইনের মাধ্যমে। বর্ষায় একটু বেশি বৃষ্টি হলে এই পাইপ লাইন দিয়ে দ্রুত পানি সরতে পারে না। ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ওয়াসা এই পাইপ লাইন অপসারণ করে খাল খননের কথা বললেও আসন্ন বর্ষায় নগরবাসী খুব একটা সুফল পাবে না।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর খালগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং ওয়াসার তৎপরতা বর্ণনা করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবরে ওয়াসার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদ হোসেন এক পত্র দিয়েছেন। ১৮ মে (বুধবার) স্বাক্ষরিত ওই পত্রে তিনি বলেন, এলাকাবাসী সচেতন না হলে শিগগিরই কল্যাণপুর প্রধান খালটির আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাইশটেকি ও কল্যাণপুর ‘ক’ খালের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তবে কবে নাগাদ জমি অধিগ্রহণ হবে সে সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি।
পাইন ড্রেন সম্পর্কে তিনি বলেন, পাইপ ড্রেনে কঠিন বর্জ্য জমেছে। এই বর্জ্য নির্মাণ সামগ্রী ও পাইলিং থেকে আসা। পাইন ড্রেন রক্ষার স্বার্থে এগুলো দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেন, ওয়াসার আওতাধীন অধিকাংশ খাল পরিষ্কার করা হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় পুলিশ পাওয়া যায়নি বলে রামচন্দ্রপুরসহ কয়েকটি খালে উচ্ছেদ কাযক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, রাজধানীর ভেতরের পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রতিটি এলাকায় রয়েছে পাইপ লাইন। বৃষ্টির পানি এই পাইপ লাইন হয়ে সরকারি খালগুলোতে পড়ে। এ কারণে পানি নিষ্কাশনের প্রধান অবলম্বনই হলো এসব খাল। খালের পানি গিয়ে পড়ে নদীতে। দেখা গেছে, পানি নিষ্কাশনের প্রধান দু’টি মাধ্যম পাইপ লাইন ও খালের অবস্থা ভালো নেই। সমন্বয়হীনভাবে পাইপ লাইন স্থাপন হওয়ায় পাড়া-মহল্লার পানি খালে যেতে পারে না। আবার বেশি বৃষ্টি হলে খালের পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারে না। ফলে প্রতি বছরই নগরবাসীকে অসহনীয় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
গত বছর নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হলে খালগুলোর ওপর জরিপ পরিচালনা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। জরিপ শেষে জলাবদ্ধতার কারণ চিহ্নিত করে গত নভেম্বরে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সংস্থাটি। ডিএনসিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৬টির মধ্যে ১৩টি খালের দুরবস্থাই জলাবদ্ধতার কারণ। এসব খালের মধ্যে রয়েছে, মিরপুরের বাইশটেকি খাল, বাউনিয়া খাল, রূপনগর খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, কালশী খাল, কল্যাণপুর খাল, পাগলার পুল খাল, দ্বিগুণখাল, ইব্রাহিমপুর খাল, হাজারীবাগ খাল, কাঁটাসুর খাল ও রামচন্দ্রপুর খাল।
আরও পড়ুন: সেলিম ওসমানের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব সরকারের
/এমএনএইচ/