দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে ৭০ শতাংশ

নিরাপদ মাতৃত্ববাংলাদেশে গত ২৫ বছরে (১৯৯০ থেকে ২০১৫) মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। যদিও বৈশ্বিকভাবে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে ৪৪ শতাংশ। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায়, সন্তান জন্মদানের সময় এবং সন্তান জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে মায়ের মৃত্যু হলে সেটা ‘মাতৃমৃত্যু’ হিসেবে গণ্য হবে।

জাতিসংঘের গবেষণায়, ১৯৯০ সালে বিশ্বে বছরে ৫ লাখ ৩২ হাজার মা মারা যেতেন। এর মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় প্রতি এক লাখে গড়ে ৩৮৫ জন মা মারা যেতেন। আর বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে মারা যেতেন ৫৬৯ জন মা। তবে ২০১৫ সালে বিশ্বে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার। এখন প্রতি লাখে ২১৬ জন মা মারা যান। আর বাংলাদেশে প্রতিলাখে মারা যাচ্ছেন ১৭৬ জন মা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ করে মাতৃমৃত্যু হার কমেছে। আর গত ২৫ বছরে এ হার কমেছে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ।

সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।‘ট্রেন্ডস ইন মেটার্নাল মর্টালিটি: ১৯৯০ থেকে ২০১৫’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল, জাতিসংঘ জনসংখ্যা বিভাগ এবং বিশ্বব্যাংক।

মাতৃমৃত্যুর হার কমানো অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাতৃমৃত্যুর হার অন্তত ৭৫ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা ছিল। তবে এমডিজি পূরণ না হলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসামূলক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের নয়টি দেশ এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটান ৯০ শতাংশ এবং মালদ্বীপ ৮৪ শতাংশ করে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়েছে। অন্য দেশগুলো হচ্ছে- কম্বোডিয়া, ইরান, কেপ-ভার্দে, লাওস, মঙ্গোলিয়া, রুয়ান্ডা ও তিমুর লেসতে।

এ সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশ ভারতে মাতৃমৃত্যু কমেছে ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ। আর এ অঞ্চলে ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে পাকিস্তান। ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কায় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৭৫ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে।

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সারা বিশ্বে গর্ভধারণকালে বা সন্তান জন্মদানের ছয় সপ্তাহের বেশি সময় পর প্রায় তিন লাখ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয়েছে। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৩২ হাজার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কর্মকর্তারা বলেন, এ ফল ‘অসাধারণ অগ্রগতির’ প্রমাণ দিচ্ছে।যদিও মাত্র নয়টি দেশ এ বিষয়ে জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আর ৩৯টি দেশ ‘উল্লেখ করার মতো’ উন্নতি করেছে।নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস

ডব্লিউএইচও’র জন্মদানকালীন স্বাস্থ্য ও গবেষণা বিভাগের সমন্বয়ক ডা. লালে সে বলেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে বিশ্বে মাতৃমৃত্যু হার প্রায় ৪৪ শতাংশ কমে গেছে। তবে এ অগ্রগতির পথ এখনও মসৃণ নয়।

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। সেখানে প্রতি এক লাখ শিশু জন্মদানের ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে।

২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর হারের অনুপাত প্রতি লাখে ৭০ এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে গর্ভধারণ ও জন্মদানজনিত জটিলতায় নারী মৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

এ বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, মাতৃমৃত্যু হার কমাতে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ নজর দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমছে। গত কয়েক দশকে এ হার কমার পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নেও অগ্রগতি হয়েছে।

সারাবিশ্বে মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়,১৯৯০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে ৪৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গত বছর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি এক লাখে ১৭০ জন মায়ের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৫০। মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ যে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে, তা প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন- 

নিশ্চিত হয়নি কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্টফিডিং কর্নার

/জেএ/এসএনএইচ/এমএসএম/