উত্তরার একটি অভিজাত বিউটি পার্লারে গ্রাহকের অজান্তেই সিসি ক্যামরায় রেকর্ড করা হচ্ছে সেবা গ্রহণের ব্যক্তিগত দৃশ্য। কমন এরিয়াসহ বিভিন্ন কক্ষে লাগানো ক্যামেরাগুলোকে কর্তৃপক্ষ ‘স্পট লাইট’ বলে দাবি করলেও পরে ‘ক্যামেরা’ বলে স্বীকার করে বলেছে, ‘ওগুলো ইনঅ্যাকটিভ’। পরে প্রশ্নের মুখে বলেছে, ‘এসব ক্যামেরার ফুটেজ মেয়েদের কাছেই থাকে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’
রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত ওই অভিজাত পার্লারের নাম ‘স্টুডিও ২০০০’। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নাম সুমনা হাসান।
বিভিন্ন গ্রাহকের অভিযোগের পর পার্লার কর্তৃপক্ষ তাদের ফেসবুক পেজে সিসি ক্যামরা নিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। ১৫ জুন এক ফেসবুক পোস্টে তারা বলেছে, সেবা নিশ্চিত করতে ও গ্রাহকের মূল্যবান জিনিসপত্র রক্ষা করতে পার্লারের কমন এরিয়াতে কিছু ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। তবে গ্রাহকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করার দুরভিসন্ধি আমাদের নেই। আমাদের কোনও গোপন বা লুকানো ক্যামেরা নেই। এক শ্রেণির মানুষ আমাদের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে গ্রাহকের অভিযোগের পর সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পার্লারের এমন সব কক্ষে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে যেখানে নারীরা একান্তই ব্যক্তিগত সেবা নিয়ে থাকেন এবং সেখানে কোথাও লেখা নেই পার্লারটি সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
পার্লার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গত বুধবার এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কথা বললে, শুরুতে তারা জানান, বিশেষ কক্ষগুলোতে সিসি ক্যামেরা নেই।
শুক্রবারে পার্লারটিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তারা জানান, ওগুলো স্পট লাইট। পরে স্বীকার করে বলা হয়, ক্যামেরাগুলোতে কানেকশন নেই, ওগুলো ইনঅ্যাকটিভ। এরপর প্রশ্নের মুখে জানান, পার্লারের বিশেষ কক্ষগুলোতে সিসি ক্যামেরা থাকার কথা সবাই জানেন।
গত ১৩ জুন ‘স্টুডিও ২০০০’ এ সৌন্দর্য চর্চার জন্য যান সূচনা তাহসীন। সেখানে তিনি পার্লারের ভেতরে সিসি ক্যামেরা দেখতে পেয়ে পার্লার প্রধানের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, এগুলো সিসি ক্যামেরা নয়, স্পট লাইট। পরে তিনিই নিজের অবস্থান থেকে সরে বলেন, ক্যামেরাগুলো অ্যাকটিভ না।
অভিযোগকারী সূচনা তাহসীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাত প্রায় আটটার দিকে আমি সেদিন পার্লারে যাই ফেসিয়ালসহ আরও কিছু কাজের জন্য। ফেসিয়াল রুমে ঢুকে পোশাক বদলের সময় খেয়াল করি পাশের একটি কর্ণারে সিসি ক্যাম এবং সেই সিসি ক্যামেরা ফেসিয়ালের জন্য নির্ধারিত বিছানা কাভার করবে, এমনকি মেনিকিওর পেডিকিওর এবং শাওয়ার বেডেও সিসি ক্যামেরা দেখতে পাই। তখন সেবাদানকারী মেয়েটিকে রুমে ক্যামেরা কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ক্যামেরাটি ইনঅ্যাকটিভ। কিন্তু কোনওভাবেই ওখানে ক্যামেরা থাকার কথা নয় জানালে তখন তিনি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের একজনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনও ক্যামেরা নেই, সবই স্পট লাইট।
এ বিষয়ে জানতে ‘স্টুডিও ২০০০’- এ যোগাযোগ করা হলে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার লিজা জানান, পার্লারের যেসব জায়গায় নিরাপত্তা দরকার সেসব জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। বিশেষ কক্ষগুলোতে কোনও ক্যামেরা নেই।
কিন্তু পার্লার ঘুরে আসার কথা তাকে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘ওসব ক্যামেরা ইনঅ্যাকটিভ।’
সিসি ক্যামেরা থাকলে তা গ্রাহকদের জানাতে হয়, লিখে রাখতে হয়- এ প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘সিসি ক্যামেরা আছে তা লিখে দিতে হবে এমন কোনও কথা নেই।’
সিসি ক্যামেরা থাকলে সেখানে লিখে না রাখলে এটা তো অপরাধ- বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘লিখে রাখতে হবে না, এটা কোনও ক্রাইম না।’ বলেই ফোন কেটে দেন।
গ্রাহকদের সঙ্গে আসা গৃহপরিচারিকাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের অভিযোগও আছে পার্লারটির বিরুদ্ধে। সরেজমিন প্রত্যক্ষ করার সময়ই দেখা যায়, সেবা নিতে আসা এক নারীর গৃহপরিচারিকার সঙ্গে অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করা হলো। পার্লারের এক কর্মকর্তা ধমক দিয়ে ওই গৃহপরিচারিকাকে বাইরে গিয়ে বসার নির্দেশ দিলেন।
একটি স্বনামধন্য পার্লার কর্তৃপক্ষের ব্যবহার এতো অসৌজন্যমূলক কেন- জানতে চাইলে পার্লারের এক কর্মী বলেন, ‘ওনাদের ব্যবহার এমনই। আমাদের সঙ্গেও খুব খারাপ আচরণ করেন।’
এজে/