‘আমরা শঙ্কিত’


সুলতানা কামাল ও ড. মিজানুর রহমানহঠাৎ বেড়ে যাওয়া ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ চিহ্নিত সন্ত্রাসী এমনকি রিমান্ডের আসামি নিহত হওয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, যাদের ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে,তারা অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে তাদের কোনও মানবাধিকার থাকবে না-এই বোধ কোন আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সুশাসনসম্পন্ন রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়।
গত তিন মাসে চাপাতির কোপে নিহত হওয়ার ঘটনায় সংবেদনশীল মামলাগুলোর যে একটা দু’টিতে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে তাদের ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনাকেও স্বাভাবিকভাবে দেখতে চান না তারা।
গতবছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ বা ‘ক্রসফায়ারে’ মোট ১৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক মাসেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কয়েক ডজন।
এ ধরনের ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, কেবল জানুয়ারি থেকে এপ্রিল-এই চার মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা ৪৫। যার মধ্যে  কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২৯, হেফাজতে ৫জন ।
এদিকে, বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর গত ১৩ দিনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৭ জনকে জঙ্গি বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাকিরা ডাকাত সদস্য ও বিভিন্ন হত্যা এবং অস্ত্র মামলার আসামি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নূর খান বলেন, ‘ক্রসফায়ার’, ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধ’ যেটাই বলি না কেন, এটা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এর বিরোধিতা করছি। কোনও সভ্য, গণতান্ত্রিক দেশে এ ঘটনা ঘটতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, গত জানুয়ারি থেকে আমাদের তথ্যমতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৭৬ জন, যেখানে এ মাসেই হত্যা করা হয়েছে ২২ জনকে। তিনি আরও বলেন, জঙ্গিরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করতে চায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও একই কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করে জঙ্গিদের এমনভাবে শায়েস্তা করবো যাতে তারা ভীত হয়ে যায়।কিন্তু দু’পক্ষের এই অবস্থানে সাধারণ মানুষ শঙ্কার মধ্যে পড়ে গেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন,সাধারণভাবে মনে করা হয় যাদের ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে, তারা অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। অতএব তাদের  কোনও মানবাধিকার নেই। এই যে একটা বোধ সমাজে চলে আসে, যেনতেনভাবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে—এটা কোনও আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সুশাসনসম্পন্ন রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। তিনি আরও বলেন,সুশাসনের অভাবে একপর্যায়ে সমাজে হতাশা তৈরি হয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন,এধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হয়। তিনি বলেন, এভাবে কারোর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।

তিনি আরও বলেন,সাদা পোশাকে যেন কাউকে গ্রেফতার করা না হয়। যদি করতে হয়, সেক্ষেত্রে স্থানীয় কোনও প্রতিনিধি বা দু’জন মানুষকে সাক্ষী রাখতে হবে। এর কোনওটাই না মানা সভ্য সমাজের কাজ না।’

গত কয়েকদিনের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতদের প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্মকমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ তার সরকারি অস্ত্র ব্যবহার করে। তখন প্রাণহানি ঘটে। বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে আগে থাকতেই কিছু বলা যায় না। অভিযানে গিয়ে পুলিশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।’

/ইউআই/এমএসএম/

আরও পড়ুন: 
আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ‘ক্রসফায়ারে’র মূল গল্প

রবিনের রিমান্ড শেষ, এখনও অনিশ্চয়তায় পুলিশ

অভিজিৎ হত্যায় সন্দেহভাজন শরীফ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

জিডি করে তদন্ত: এত অস্ত্র কোথা থেকে এলো?