আপনার কৃত্রিম হাতটি নেই কেন এ প্রশ্নের জবাবে শিল্পী বলেন, আমার ওজন ৩৫ কেজি, হাতের ওজন ৫ কেজি। সেটা বহন করে ঘুরে বেড়ানো কী করে সম্ভব? শিল্পীর পাল্টা প্রশ্নের জের ধরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রানাপ্লাজা ধসে অঙ্গ হারানো যারা কৃত্রিম হাত পা পেয়েছিলেন, তাদের সেই হাত-পা বহনের অভিজ্ঞতা।
শিল্পীর কাছে তার ৫ কেজি ওজনের হাতটা দেখতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাততো সিলেটে বাড়িতে রেখে এসেছি।’ হাত রয়েছে বাড়িতে আর শিল্পী সাভারে! ‘এই হাত আমার কাছে বোঝা। যারা দিয়েছেন তারা হয়তো ঠিক ভালোর জন্যই দিয়েছিলেন কিন্তু আমার তাতে লাভ হয়নি।এখন একহাতে সাবলীলভাবে চলতে শিখে গেছি।’
হাতটা সিলেট থেকে আনানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানালে বাড়িতে রেখে আসা হাতটি একদিন সকালের বাসে করে আসে সাভারে।বিছানার ওপর রাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে শিল্পী হাসেন আর বলেন, ‘এ জিনিস আপনাদের জন্য সিলেট থেকে আনিয়েছি। একটু ওজনে কম হলে আমার পক্ষে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব হতো। আমি নিজেই নড়তে পারি না, এটার ওজন বহন করবো কী করে?’
প্রথম দিন লাগানোর সময় বুঝতে পারেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিনেই ওই হাত স্বংয়ক্রিয়ভাবে নাড়াচাড়া করার কৌশল রপ্ত হয়নি। কিন্তু আশা জেগেছিল মনে। শরীরের একটা অঙ্গ ছিলো এখন নেই, এই অনুভূতি নিয়ে টিকে থাকা কিন্তু খুব কঠিন।’
২৪ এপ্রিল ২০১৩ রানাপ্লাজা ভবন ধসের ঘটনায় শিল্পী ধংসযজ্ঞের ভেতরে ছিলেন চারদিন। তার বর্ণনা মতে, চোখের সামনে ২০ জন মারা গেছেন ওই চারদিনে। লাশের ওপর কিভাবে যে শুয়ে থেকেছেন তা আজও তাড়া করে ফিরে শিল্পীকে। তিনি বলেন, ‘কারখানার প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা করে কাজ করেছি। এর বিনিময়ে স্বপ্ন ছিল ধীরে ধীরে বড় জায়গায় যাওয়ার। শ্রমিকের ঘামের আলাদা টান আছে। সেই আমরা কেমন যেন দয়া-দাক্ষিণ্যের জীবন পেলাম। হাতের ওপর প্রথমে একটা ভারী মেশিন এসে পড়ে। এরপর ধসে পড়া দেয়ালের একটা অংশ পড়ে ।’
এই ঘটনায় যারা হাত পা হারিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ১২ জনকে ১২ নভেম্বর ২০১৩ সালে কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়া হয়। অসহায় মুখগুলো নতুন করে আবার স্বপ্ন দেখার পথ খুঁজে পেয়েছিলেন সেদিন। কৃত্রিম অঙ্গগুলোর সংযোজনের ফলে প্রাথমিক কাজ করতে পারবেন অঙ্গহানি হওয়া এসব পোশাক শ্রমিকেরা।কিন্তু মাত্র তিনবছরে তারা বুঝে গেছেন তাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এটা বোঝা। অন্তত ওজন যদি কম হতো তাও মানিয়ে চলতে পারতেন।
মোহাম্মদপুরে ব্র্যাকের লিম্ব অ্যান্ড ব্রেইস সেন্টার (বিএলবিসি) কৃত্রিম হাত ও পা সংযোজন করে থাকে।ভিকটিমদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অনুদানও দেওয়া হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় এ অঙ্গ সংযোজন হয়।অনুদানের অর্থও দিয়েছে ব্র্যাক।কৃত্রিম অঙ্গগুলো আনা হয়েছে যুক্তরাজ্য থেকে।
এই সুযোগ পেয়েছিলেন রানা প্লাজায় দুই পা হারানো পাবনার আতাইকুলার রেহানা আক্তার (২০)। তার দুই পায়ের হাঁটু থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। যশোরের ২২ বছর বয়সী রেহানাও ডান পা হারান রানা প্লাজায়।
কৃত্রিম হাত-পায়ের ওজন কমানো সম্ভব ছিল কিনা প্রশ্নে উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান ডা. শাকিল আফসার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এমন কয়েকটা কেস-এর কথা আমিও শুনেছি। কৃত্রিম অঙ্গের ওজন বা অন্যান্য অনেক কারণে কেউ কেউ তা ব্যবহার করছেন না। তবে বিশেষ করে একজনের ঘটনা আমি জানি। অন্য কারণে তার চিকিৎসা করতে হয়েছিল আমাকে। অভিজ্ঞতার আলোকে ডা. শাকিল বলেন, যার হাত বা পা কাটা পড়েছে নানা কারণে তিনি কৃত্রিম অঙ্গ নিতে রিজেক্ট করতে পারেন। সেটাও আমাদের মাথায় রাখা উচিত। তিনি আরও বলেন, যারা ব্যবহার করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে আরও ভাল কোয়ালিটির উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারতো। ডা.শাকিল বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না থাকলে স্যুট নাও করতে পারে। তার মানে কৃত্রিম হাত-পায়ের ক্ষেত্রে প্রোডাক্টের কোয়ালিটিও একটা বিষয় হতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটাতো বটেই। তবে সেটাই শেষ কথা না। নির্দিষ্ট কেস ধরে এসব বিষয়ে মন্তব্য করা ভাল। ডা. শাকিল শুরু থেকেই রানাপ্লাজা ভিকটিমদের চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছেন। তিনি ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণের ক্লেইমস রিঅ্যাসেসমেন্টের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম।
আরও পড়ুন-
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় আগের পদ্ধতি বহাল
টিসিবি অকার্যকর, বাজারে কোনও প্রভাব নেই
/এপিএইচ/