লাশ দেখে উদ্ধারকারীরা: ‘বর্বর, বীভৎস’

লাশ নিয়ে হাসপাতালে যাত্রাশুক্রবার সন্ধ্যায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ইফতারের পরবর্তী সময়ে চা কফি খেতে গিয়ে ২০ জন বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। কেবল প্রাণ হারিয়েছেন তা না, জিম্মিদের বাঁচাতে নানা কৌশল করে রেস্টুরেন্টে কমান্ডো প্রবেশের আগেই সেই শরীরগুলো হয়েছিল ক্ষতবিক্ষত। আঘাতের চিহ্ন এমনই প্রবল তাকানো যায় না বলে মন্তব্য করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তারা বলছেন, কারোর সঙ্গে শত্রুতা থাকার পরও এতো বিভৎসভাবে হত্যা করা সম্ভব না। এ লাশ শনাক্ত করতেও কষ্ট হবে।

এ বীভৎসতা কখনও ভাবতে পারেনি বাংলাদেশ। গণমাধ্যমকর্মীসহ পুলিশ, র‌্যাব সেনা সদস্যরা যারা ঘটনাস্থলে প্রায় ২৪ ঘন্টা এক সঙ্গে অতিবাহিত করেছেন তাদের স্মৃতিচারণায় বারবারই ঘুরেফিরে আসছে বিডিআর বিদ্রোহের নামে ঘটানো হত্যাকাণ্ডের কথা।

গুলশান হামলায় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সারি

বাংলাদেশ ভাবেনি ক্রাইম সিনে কাজ করা দায়িত্বশীল কোনও ব্যক্তির চোখ ছলছল করে উঠবে। রেস্টুরেন্ট থেকে দেড়টার দিকে বেরিয়ে এসে তাদের একজন শক্ত মুখে দাঁড়ালেন, কিন্তু চোখজোড়া বলে দেয় ভেতরে কী দেখে এসেছেন তিনি। কিন্তু তাদের তো দুর্বল হতে নেই। এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের ভিড় থেকে একটু সরে গিয়ে সহকর্মীর কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে যেন একটু সাহস নিলেন তিনি। আস্তে বললেন, ‘কী যে হয়েছে ভেতরে!’

সকাল এগারোটা নাগাদ র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয় টিমের একজন সদস্য বেরিয়ে এসে তার জন্য নির্ধারিত গাড়ির ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন। একবার গাড়ি থেকে নামেন আরেকবার ওঠেন। মিনিট ‍দুয়েক এই চলল। কেন যেন চিৎকার চেঁচামেচি মেজাজ খারাপ করার চেষ্টা করলেন। এরপর তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে আস্তে করে বললেন, ‘আপনাদের (মরদেহ) দেখাবে নিশ্চয়ই।’

‘আমাদের দেখাবে আপনি নিশ্চিত?’ এ প্রশ্ন করতে তিনি বললেন, ‘আগামী পাঁচদিন গলা দিয়ে কিছু নামবে না। এ জিনিস দেখা যায় না। তিনি এতোক্ষণ একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন, খেয়ালই নেই যেন। নিজের মতো করে অস্ফুট স্বরে বলেন, পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন লাশের বিবরণ। ছড়ানো ছিটানো। এদের কষ্ট দেওয়া হয়েছে। এটা কেবল হত্যাকাণ্ড বলবেন কী করে? গলাকাটা লাশের এতো বর্বর ছবি আমার চোখ থেকে কোনোদিন সরবে না। এরা বর্বর, এরা বীভৎস।’

তার বুকের ব্যাজের দিকে তাকাতে দেখলাম সেটা খুলে রাখা।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হঠাৎ করে ঢুকেই এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে হামলাকারীরা। সাত থেকে আট জন এই হামলা চালায়। রেস্টুরেন্টে উপস্থিত কাস্টমার ও স্টাফদের মধ্যে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিন তলা রেস্টুরেন্টের ছাদে উঠে লাফিয়ে ও দেয়াল টপকে স্টাফদের কয়েকজন পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু নিহত হন সবমিলিয়ে ২২ জন নাগরিক। যার কুড়িজনই বিদেশি। কেউ গরমের ছুটিতে দেশে এসেছেন, কেউ ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন, আরও নানারকম গল্প। কিন্তু তাদের লাশগুলোর যারা প্রথম দেখেছেন তাদের মধ্যে অস্থিরতা প্রবল।

ভেতরের পরিস্থিতি কী, জানতে চাইলে পুলিশের এডিসি মশিউর রহমান জিহ্বা কেটে বলেন, ‘বীভৎস। এ দৃশ্য দেখা যায় না।’ আরও জানালেন, একজন শিশুও আছে নিহতদের মধ্যে। ধারণা করা হচ্ছে সকালে যে মা ও তার এক সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, এই শিশুটি সে মায়েরই।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হলি আর্টিজানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের এই রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনায় ডিবির সহকারী (এসি) রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশসহ অর্ধশত লোক আহত হয়েছেন।

/এপিএইচ/এইচকে/

/আপ-এএ/