জঙ্গিকাণ্ডে ইমেজ সংকটে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে অংশ নেওয়ার প্রচলিত ধারণা এখন ভিন্ন খাতে মোড় নিতে শুরু করেছে। জঙ্গি তৎপরতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ইমেজ সংকটে পড়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জঙ্গি হওয়ার শিক্ষা দেয়না। জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার পেছনে রয়েছে দেশি ও বিদেশি রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব। এছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা,সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় বেশি প্রভাবিত করে শিক্ষার্থীদের।

জানা যায়, ১ জুলাই (২০১৬) শুক্রবার গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের জিম্মি ঘটনায় সেনা কমান্ডোদের হাতে নিহত পাঁচ জঙ্গির মধ্যে একজন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী, একজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও একজন বগুড়ার একটি মাদ্রাসার সাবেক ও কলেজ শিক্ষার্থী।


এদিকে, গত বৃহস্পতিবার (০৭ জুলাই, ২০১৬) ঈদের জামায়াতের আগে শোলাকিয়ায় ঈদগাহের পাশে পুলিশের ওপর হামলা করে জঙ্গিরা। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলাএ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিহত হন। আর পুলিশের গুলিতে হামলাকারী জঙ্গি আবির রহমান নিহত হয়।আবির রহমান নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। আটমাস ধরে সে নিখোঁজ ছিল।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেফতার বাংলাদেশি তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস দেশে থাকাকালীন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতো।
এছাড়া ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির পাঁচ শিক্ষার্থী।

নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি সূত্রে জানা যায়,জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এখনও পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে পাঁচজন শিক্ষক ও ১৪ জন শিক্ষার্থী।

গুলশানের হোলি আর্টিজানের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হওয়া আবুল হাসনাত রেজা করিমও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির বিজনেস ফ্যাকাল্টির সাবেক শিক্ষক।সে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। জানা গেছে, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় ২০১২ সালে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

গুলশান হামলার পর এর প্রশংসা করে এক ভিডিওবার্তায় আরও হামলার হুমকি দেয় বাংলাদেশের তিন তরুণ। তাদের মধ্যে একজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। অন্যজন একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র শিক্ষার্থী। বাকি একজনকে চেনা যায়নি।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছর সাত শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয়।

এর আগে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই।

অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে খরচ বেশি হলেও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চান তারা।কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা যে বিপথে যাচ্ছে, তা অভিভাবকেরাও বুঝতে পারছেন না।

তারা প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি এসব প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়ানো বন্ধ করে দেবেন তারা?

অন্যদিকে, প্রশাসন বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদ বেশি। এখান থেকেই প্রতিনিয়ত জঙ্গি বের হচ্ছে। তাই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন,বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। অনেকে আইএসে যোগদান করছেন। যারা মূল ধারার বাইরে, তারাই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তাদের নজরদারিতে আনা হচ্ছে।

অন্যদিকে, শিক্ষাবিদরা বলছেন,সন্তানকে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ানো ক্ষতির কিছু না। তবে তাদের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করালেই চলবে না, তারা কখন কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, তার খোঁজখবরও নিতে হবে।তা না হলে সন্তান বিপথে যাচ্ছে কি না তা অভিভাবকরাও বুঝতে পারবেন না।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাবা ফয়সল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার সন্তানকে ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি কোনও অসৎ সঙ্গে মিশে খারাপ হয়ে যায়, তাহলে তো বিপদ। এখন তো দেখছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াই বন্ধ করে দিতে হবে। না হলে বাঁচার উপায় কী!

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই যে জঙ্গি উৎপাদন হচ্ছে, তা কিন্তু নয়! বিশ্ববিদ্যালয় তো আর জঙ্গি তৈরি করে না। ধর্মের অপব্যবহার, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবারে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরিসহ নানান কারণে সন্তানরা বিপথে যাচ্ছে। তবে মাত্র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একের পর এক জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, সেখানে অবশ্যই জঙ্গিদের ঘাঁটি আছে। সেটা সমূলে উৎপাটন করতে হবে। আর এটা প্রশাসনের কাজ।

শিক্ষাবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, জঙ্গি উৎপাদনে মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অথবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জঙ্গি হওয়ার শিক্ষা দেয় না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমটাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, মাদ্রাসা থেকে যারা বের হয়, তারা এক মানসিকতার; আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য মানসিকতার।

তিনি বলেন, ইসলামিক স্টেটের (আইএস ) সঙ্গে যাদের জড়িত হতে দেখা যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর কারণ, তারা অনলাইন জগতে বেশি থাকে এবং উচ্চপর্যায়ের চিন্তা করে। তাদের পরিবারই তাদের নিয়ন্ত্রণ করে।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরে আনু মুহাম্মাদ বলেন, বাংলাদেশও এই সমাজের বাস্তবতা, রাজনীতি, ধর্মীয়জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা ও পর্যালোচনা করতে দেয় না। অভিভাবকরা ভাবেন, সন্তান রাজনীতিসহ অন্যান্য জ্ঞান নিলে হয়ত বিপথে যাবে। তারা চান, তাদের সন্তানরা শুধু বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকবে অথবা কম্পিউটার আছে, সেটা ব্যবহার করবে। কিন্তু এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বাস্তবতা না বোঝার ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সন্তানদের মধ্যে আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে থাকে। এই সুযোগে সুযোগসন্ধানীরা তাদের কব্জা করে ফেলে। কখন যে তারা ভুল পথে পা দিচ্ছে, তা পরিবারও বুঝতে পারে না।

শিক্ষার্থীরা যাতে বিপথগামী না হয়, তার জন্য কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা আসলে পুরো জাতির দায়িত্ব। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে। আর তা করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। দেশের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে, তা দূর করতে হবে। যেমন, কাউকে অপরাধী মনে করলেই তাকে ক্রসফায়ার দেওয়া হচ্ছে। তার মানে আমাদের মধ্যে এই নীতি ঢুকে যাচ্ছে, কাউকে অপরাধী মনে হলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে।

তিনি বলেন, তাহলে তরুণরা তো এ কাজ করবেই! তার কাছে কাউকে শত্রু মনে হলেই তাকে সে মেরে ফেলতে দ্বিধা করবে না।

আনু মুহাম্মাদ বলেন, এই সমস্যা থেকে বাঁচতে হলে সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক মা-বাবার উচিত তার সন্তানটি কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেদিকে নজর রাখা। যেসব বন্ধু ও ভার্সিটির বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিশছে, তারা তাকে বিপথগামী করছে কি না, তা প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিতে হবে।

/আরএ আর/এবি/

আরও পড়ুন:

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

শর্ত ভঙ্গ করে বাংলাদেশে অনুষ্ঠান বানিয়ে রফতানি করেছে পিস টিভি

ভারতে না ফিরে আফ্রিকার পথে জাকির নায়েক!

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

জঙ্গিকাণ্ডে ইমেজ সংকটে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান