আস্থা হারিয়ে সঙ্কটে দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)শিক্ষার্থীদের হাতে নিম্নমানের বই দেওয়ায় আস্থা হারিয়েছে দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে, এবছর বেশিরভাগ পাঠ্য বই মুদ্রণের কাজ দেওয়া হচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির অভিযোগ, বিদেশিদের কাজ দেওয়ায় দেশের মুদ্রণশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পায় দেশের ২২টি প্রতিষ্ঠান। নিম্নমানের বই ছাপা এবং তা সময়মতো সরবরাহ না করায় সবক’টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অংকে মোট ৫২ লাখ ৩৬ হাজার ৭১৮  টাকা জরিমানা করা হয়।
এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গুণগতমানের শর্ত ভঙ্গ করা এবং সময়মতো বই পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওই জরিমানা করা হয়।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেতে দেশের ২২টি প্রতিষ্ঠান নিজেরা জোট বেঁধে অস্বাভাবিক কম দরে কাজ নিয়েছিল। ফলে ওই বছরের বইগুলো ছিল নিম্নমানের। এবছর সিন্ডিকেট তৈরি হতে দেয়নি এনসিটিবি। ফলে এবারের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ও শিক্ষক নির্দেশিকা বই ছাপার ৮২ শতাংশ কাজই পাচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান।

২০১৭ সালের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ৩৬ কোটি ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৯ কপি বই ছাপানো হবে। মোট বইয়ের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই ১ কোটি ৫ লাখ ৫ হাজার ৮৩২ কপি, প্রাথমিকের ১০ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার ৩২৭ কপি, মাধ্যমিকের ২৩ কোটি ৪৪ লাখ ৮২ হাজার ৩০ কপি, প্রাথমিক শিক্ষক গাইড ৬০ লাখ ১ হাজার ৭২৪ কপি, এবং মাধ্যমিকের শিক্ষক গাইড ৪০ লাখ ৩২ হাজার ও ব্রেইল বই ৯ হাজার ৬৬ কপি। অন্যদিকে, কারিগরি ও প্রাইমারি টিচার্স গাইডসহ ৩৩ থেকে ৩৫ কোটি  টাকার বই ছাপানো হবে।

এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের ১১ কোটি ৫৭ লাখ বইয়ের জন্য ৯৮টি লটে ভাগ করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে সরকার। ৯৮টি লটের মধ্যে ৬৩টিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বাকি মাত্র ৩৫টি লটে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক টেন্ডারে এবার সর্বনিম্ন দরদাতাদের মধ্যে রয়েছে ভারত, কোরিয়া, চীন। প্রাথমিকের ৯৮ লট বইয়ের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ পাওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছে ভারতের পরমেশ্বর মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ও পিতামব্রা বুকস প্রাইভেট লিমিটেডের। এর মধ্যে ৪৮ টি কাজই পেতে পারে পিতামব্রা। তবে পিতামব্রা সনদ জালিয়াতি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে ক্ষেত্রে তারা আবার কাজ নাও পেতে পারে।৮ টিতে চীন ও ২০ টি লটে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। এছাড়া, বিদেশের আরও কয়েকটি ছাপাখানাসহ মোট ৮১ লট বই ছাপানোর কাজ পেতে পারে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে, দেশীয় মেসার্স এপেক্স প্রিন্টিং অ্যান্ড কালার, মেসার্স মৌসুমী অফসেট প্রেস, মেসার্স ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস, মেসার্স বুকম্যান প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশার্স, এসআর পাবলিশার্সসহ আরও কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান মিলে পাচ্ছে মাত্র ১৭ লটের কাজ।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের ৪০ লাখ ৩২ হাজার শিক্ষক নির্দেশিকা বই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ছাপানো হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিও হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির এক কর্মকর্তা।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,আমরা আবেদনকারীদের একটি তালিকা করে বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে সুপারিশ এলেই কারা কাজ পাবে, কারা পাবে না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এখনও সুর্নিদিষ্টভাবে কাউকে কাজ দেওয়া হয়নি।

ভারতের পিতামব্রা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানটির নামে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সনদ যাচাই বাছাই কমিটি আছে। তারা এমন একটি প্রমাণ পেয়েছে বলে আমিও শুনেছি। তবে সব তথ্যই বিশ্বব্যাংকের কাছে দেওয়া হয়েছে।

দেশের বই ছাপানোর কাজ বেশিরভাগ বিদেশি প্রতিষ্ঠান পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বই ছাপার কাজ করে আসছি। এটার একটা ঐতিহ্যও রয়েছে। যে মানের বই দেওয়ার কথা সে মানেরই বই দেওয়া হয়েছে। তারপরও এনসিটিবি প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ দিয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। তারাও কম দরে কাজ পেয়েছে। সুতরাং তারাও ভালো মানের বই দিতে পারবে না।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাতও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে তাদের মধ্যে ভারতের পিতামব্রা বেশি কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সনদ জালিয়াতির কারণে তারা কাজ নাও পেতে পারে।

 তিনি আরও বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগই আমাদের চেয়ে কম দামে বই দিতে চেয়েছে। তারাও ভালো মানের বই দিতে পারবে না। সর্বশেষ দেখা যাবে আমরাই প্রায় ৯৫ ভাগ বইয়ের কাজ পাবো।

কাজ পেলে উন্নত মানের বই সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি।  বলেন, গতবছর আসলেই আমরা ভালোমানের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারিনি। কিন্তু এবার আমরা আর সে ভুল করবো না। আমরা এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যদি কাজ পাই তাহলে গুণগত মান ঠিক রেখেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেবো।

আরও পড়তে পারেন: পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


আরও পড়তে পারেন: সাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় পাইলট রাতুল

/আরএআর/ এমএসএম  /