চাপে আছেন তথ্যমন্ত্রী

 

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুঘরে বাইরে চাপে আছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। গত কয়েক মাস ধরে তার দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে নিজের দলের ভেতরে তো বটেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদেরও তোপের মুখে আছেন তিনি। সর্বশেষ রবিবার সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে বেফাঁস মন্তব্য করে আজ সোমবার তাকে প্রথমে মন্ত্রিসভায় লিখিতভাবে ও পরে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে নিজ দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের জাতীয় কাউন্সিল এবং দলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিভেদ প্রকাশ্যে চাপে ফেলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে। দলীয় সেই চাপ এখনও সামলে উঠতে পারেননি তথ্যমন্ত্রী। দল ছেড়ে চলে গেছেন চারজন এমপিসহ ত্যাগী ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা। হাসানুল হক ইনুকে ছেড়ে যাওয়া নেতারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, তাদের নিজের পক্ষে রাখার সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
পরবর্তীতে জুন মাসে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) দায়ী করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য দ্বিতীয় দফায় চাপে ফেলে তথ্যমন্ত্রীকে। ওই সময় সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য সারাদেশে প্রচণ্ডভাবে আলোচিত হয়। আর সমালোচিত হন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সেই চাপ সামলে উঠতে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা লেগেছে। এ জন্য তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য জাসদকে দায়ী করে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

এবার তৃতীয় দফায় চাপে পড়লেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। রবিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরস্থ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের সম্মেলন কক্ষে ‘চতুর্থ বাংলাদেশ সামিট-টেকসই উন্নয়ন ২০১৬’ সম্মেলন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আমি তো এমপি, আমি জানি, টিআর কীভাবে চুরি হয়! সরকার ৩০০ টন দেয়। এর মধ্যে এমপি সাহেব দেড়শ টন চুরি করে নেন’।

এই বক্তব্যের জন্য সোমবার মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠকে প্রচণ্ডভাবে সমালোচিত হন তিনি। এর জন্য তথ্যমন্ত্রী লিখিতভাবে ক্ষমা না চাইলেও তিনি এর জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। এর জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ মাধ্যমে তথ্য বিবরণী পাঠিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা প্রায় একযোগে তাকে এর জন্য জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন তারা। এ ঘটনার জন্য সোমবার রাতেই জাতীয় সংসদে ক্ষমা চেয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং এ দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কটাক্ষ করে নানা ধরনের উক্তি ও মন্তব্য করায় দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।সব কিছু মিলিয়ে তিনি এখন অনেকটাই চাপে আছেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১১-১২ মার্চ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক পদে শ্রমিক নেত্রী শিরিন আখতারকে মনোনয়ন দিয়ে দলের মধ্যে সমালোচিত হন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা পঞ্চগড়- ২ আসন থেকে জাসদের দলীয় প্রতীক মশাল মার্কা নিয়ে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধানকে সমর্থন করলেও তিনি শিরিন আখতারকে সাধারণ সম্পাদক করার ক্ষেত্রে ছিলেন অবিচল এবং অটল।

মাঠ পর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীরা এ বিষয়টি ভোটে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি তা মানেননি। তিনি শিরিন আখতারকেই দলের সাধারণ সম্পাদক করেছেন। এ বিষয়টি দলের নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নেননি। এ ছাড়া অন্য ইস্যু তো ছিলই। এ ঘটনায় জাসদের ছয়জন এমপির মধ্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও শিরিন আখতার ছাড়া বাকি চারজন এমপি মঈনুদ্দিন খান বাদল, নাজমুল হক প্রধান, রেজাউল হক তানসেন ও কর্নেল তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহেরসহ শরীফ নুরুল আম্বিয়া, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মোশতাক আহমেদ, নব্বইয়ের স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. মোহসীনসহ অনেক নেতারাই তাকে ছেড়ে গেছেন। গড়ে তুলছেন পৃথক জাসদ।

অপরদিকে, গত ১৩ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ছাত্রলীগের এক সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বলেছেন,জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারক-বাহকদের শতভাগ ভণ্ড। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য সরকারের শরিক জাসদ দায়ী।

তিনি বলেন, তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেছে। তারা একশভাগ ভণ্ড। জাসদ তৎকালীন ছাত্রলীগের অনেক প্রতিভাবান নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারক-বাহকরা গঠন করলো জাসদ।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিবেশ সৃষ্টির জন্যও জাসদকে অভিযুক্ত করেন সৈয়দ আশরাফ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘ষড়যন্ত্র করে একটা সফল মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার সমস্ত পরিবেশ সৃষ্টি না করতো, তাহলে আজকের বাংলাদেশ ভিন্ন বাংলাদেশ হতো। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে দেশটা অনেক আগেই আরও অনেকদূর অগ্রসর হতো। কিন্তু জাসদের হঠকারিতার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি।’

মুক্তিযুদ্ধের পরপর বঙ্গবন্ধু সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জাসদ সরাসরি অবস্থান নিলেও বর্তমান মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু থাকায় ভবিষ্যতে এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হতে পারে, এমন শঙ্কাও প্রকাশ করেন সৈয়দ আশরাফ।

তিনি বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীরা এখন আমাদের লেজুড়বৃত্তি করছে। একজনকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কোনও সিদ্ধান্তে যদি ভুল থাকে তার প্রায়শ্চিত্ত কিন্তু সারাজীবনই করতে হয়!’

/এসআই/এবি/

 আরও পড়ুন:

এমপিদের দাবির মুখে সংসদে ক্ষমা চাইলেন ইনু

‘ইনু আমাদের চোর বানিয়েছেন’

কী ছিল তথ্যমন্ত্রীর খামে?

লিখিত ক্ষমা চাইলেন তথ্যমন্ত্রী