মায়ের দুধ পানে নবজাতক মৃত্যু হার কমবে ৩১ ভাগ

ব্রেস্টফিডিংবিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল ল্যানসেট-এ দুই কিস্তিতে প্রকাশিত মাতৃদুগ্ধ বিষয়ক এক গবেষণা প্রবন্ধে সম্প্রতি বলা হয়েছে, অন্তত ৮ লাখ শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করতে পারে মায়ের বুকের দুধ।ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যথাযথ সরকারি নীতির অভাব, গোষ্ঠীগত সামাজিক সহায়তার অভাব এবং সর্বোপরি গুড়ো দুধের আগ্রাসী বাণিজ্যের কারণেই শিশুদের স্তন্যপান ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশু বেশি দিন মাতৃদুগ্ধ পান করে তাদের বুদ্ধিমত্তা বেশি হয়, সংক্রামক রোগে ভোগার সম্ভাবনা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও কম থাকে। এ ছাড়াও পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিস ও ওবেসিটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। অন্যদিকে মায়ের সন্তান জন্মদানের জন্য স্থান সঙ্কুলান হওয়া, স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার, টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোসহ নানা স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে স্তন্যদানে।
বিবিএফ (বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন)সূত্র জানায়,বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক সুপারিশে বলা হয়েছে- ৫ বছরের কম বয়েসের শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পান করলে, বছরে দু’লাখ ২০ হাজার শিশু মৃত্যুঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গুঁড়ো দুধ বা প্রক্রিয়াজাত যেকোনও শিশুখাদ্য শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন- মায়েরা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে সন্তানকে গুঁড়ো দুধ খাওয়াচ্ছেন। আর এতে  করে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে নবজাতকরা। বিবিএফ সূত্রে জানা যায়, গুঁড়ো দুধ ও প্রক্রিয়াজাত শিশুখাদ্য সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত নয়, কারণ এতে ‘এন্টারোব্যাকটর সাকাজ্যাকি’ (Enterobacter sakazakii) এবং ‘সাল-মোনেলা’ নামক ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব খাওয়ালে ভবিষ্যতে শিশুদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্থূলতা হওয়ার আশঙ্কা এবং শৈশবকালীন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া বোতল, চুষনি ও বোঁটায় ‘বিসফেনল এ’ (Bisphenol A) থাকে, যা শিশুর ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। গুঁড়ো দুধ বা প্রক্রিয়াজাত যেকোনও খাদ্যের ‘ডিএইচএ’ (DHA) শিশুর বুদ্ধি বিকাশে কাজ করে না।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ড. এসকে রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশু জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে যদি তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো যায়, তাহলে দেশে ৩১ ভাগ নবজাতক মৃত্যুহার কমে যাবে। বর্তমান সময়ে গুঁড়োদুধ খাওয়ানোর প্রবণতা অনেক বেশি। তাই এসব গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপন বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নবজাতক মৃত্যুহারের তিনভাগের একভাগ রোধ করা যায়, মায়ের দুধ পান করানোর মাধ্যমে।

তিনি বলেন, গুড়ো দুধ খেলে শিশুদের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি এবং লবন জমা হয়। এতে করে শিশুরা ‘ফ্যাটি’  হয়ে গেলেও শরীর বিকশিত হয় না। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না। মায়ের দুধ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বুদ্ধি বাড়ায়। মায়ের দুধে ভিটামিন ‘এ’ থাকে বলে  পরবর্তী সময়ে শিশুর রাতকানা রোগ হবার সম্ভাবনা থেকে দূরে থাকে। 

ল্যানসেটে বলা হয়েছে,এ সকল প্রমাণিত তথ্য জানা সত্ত্বেও স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৩৭ শতাংশ মায়ের দুধের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। এর কারণ হিসেবে মায়েদের প্রতি পর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তার অভাবকেই দায়ী করা হয়েছে ওই প্রবন্ধে। সেখানে আরও বলা হয়,বিশ্বজুড়ে বছরে অন্তত ৮ লাখ ২৩ হাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।  স্তন ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে অন্তত ২২ হাজার মৃত্যুও ঠেকানো যেতো, যদি শিশুদের স্তন্যপান করানোর চর্চা বাড়ানো যেত।

ল্যানসেট -এর প্রবন্ধে আরও দাবি করা হয়, যেসব দেশে সরকার স্তন্যদানকে অনুপ্রাণিত করে, সেসব দেশেও গুড়ো দুধের বাণিজ্যের কারণে স্তন্যদান ব্যাহত হয়। গুড়ো দুধের ব্যবসা ২০১৯ সাল নাগাদ ৭০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বিনামূল্যে নমুনা বিতরণ, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরিবেশ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষতি করেও গুড়ো দুধের ব্যবসা বেড়েই চলেছে।

 

আরও পড়তে পারেন: প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শ উপেক্ষিত, কর্মক্ষেত্রে গড়ে উঠছে না ব্রেস্টফিডিং কর্নার

আরও পড়ুন: আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে দ্রুত বেহেস্তে যাওয়ার ফর্মুলা!

এপিএইচ/আপ-এমএসএম/