বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন। কিন্তু, আবারও শত্রুরা মাথাচাড়া দিচ্ছে, নজর দিচ্ছে এই দেশের দিকে। তারা এখন জঙ্গি হয়ে, সন্ত্রাসী হয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করছে। কিন্তু, তাদের সে চেষ্টা সফল হবে না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করবো। স্বাধীন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনও স্থান নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত জঙ্গিবিরোধী মানববন্ধনে এসব কথা বলেছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী সারাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সোমবার বেলা ১১ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানীসহ দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ-ও মাদ্রাসার ৪০ থেকে ৫০ লাখ শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারী এই মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন।
রাজধানীতে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইডেন মহিলা কলেজ, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজসহ অন্য স্কুল -কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতে। এই মানববন্ধনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অংশ নিয়েছে।
শহীদ মিনারের মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুনুর রশিদ প্রমুখ। এসময় কয়েক হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনতাও উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জঙ্গি তৎপরতা পেলেই আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাবো। আইন না মানলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবো।
মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বলেন, বর্তমানে দেশটি একটি সঙ্কটময় অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই যেভাবেই হোক এ সংকটজনক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে। আর এ জন্য দেশের যারা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থনে রয়েছেন তারাসহ রাজনীতিবিদদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন ইস্যুতে দেখা যায়, তারা একে অপরকে দোষারোপ করেন। কিন্তু এমন ঠেলাঠেলি না করে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে তাদেরকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। না হলে দেশকে রক্ষা করা যাবে না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মানববন্ধনে বলেন, লেখাপড়া শেখার জন্য বাবা-মা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে, আমরা তাদের মুখ উজ্জ্বল করবো দেশের মুখ উজ্জ্বল করবো। কিন্তু আমাদের মতোই মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতে এসেও বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। আজ তারা যখন দেশের হাল ধরবে তখন তারা অকালে জীবন দিচ্ছেন। আমরা সেই বিপথগামী ভাইদের ফেরাতে চাই। দেশে আর যেন একটাও হত্যাকাণ্ড না ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বলেন, আমরাও মুসলমান, আমরাও ইবাদত করি। কিন্তু কোরানের কোথাও লেখা নেই ইসলাম প্রতিষ্ঠায় মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করতে হবে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। যারা মানুষ হত্যা করে ইসলাম প্রচার চায় তারা ইসলাম সম্পর্কে ভুল জানে। তাছাড়া আমাদের দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ একটি দেশ, আমাদের মতো দেশ খুব কমই অছে যেখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলে মিশে বসবাস করে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েক হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
এদিকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ফাহিম বলেন, আমরা ছাত্র-শিক্ষক এক যোগে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছি। এই বাংলায় জঙ্গিদের ঠাঁই নেই।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) সামনে মানববন্ধনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা। এদিকে রাজধানীর পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একইসময়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জঙ্গিবাদ রুখতে ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। জাতীয় সঙ্কটে এক হয়ে কাজ করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, সাংস্কৃতিক জাগরণই রুখতে পারে জঙ্গিবাদ। এজন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বিপথগামী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি বলেন, স্বাধীন দেশে জঙ্গিবাদের কোনও ঠাঁই নেই।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম জঙ্গিবাদ থেকে শিক্ষার্থীদেরকে ফেরাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সে সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, জঙ্গিবাদ দমন করতে হলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার। সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এ সমাজ সঠিক পথে ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড.কাজী আনিস আহমেদ মানববন্ধনে বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী, আমাদের পুলিশ যেমন আমাদের শক্তি ঠিক তেমনি আমাদের যত পাবলিক ইউনিভার্সিটি, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রয়েছে এবং অন্যান্য স্কুল কলেজের যতো শিক্ষার্থী রয়েছেন তারাও আমাদের শক্তি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ যতো আন্দোলন হয়েছে সব আন্দোলনে অন্যতম শক্তি ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ, আর তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান’।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, সত্যটা কী জানার চেষ্টা করো, ইতিহাস জানার চেষ্টা করো। অনলাইনে যা দেখবে তার সব সত্যি ধরে নেবে না।
অন্যদিকে বনানীর সড়কে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম খান। মানববন্ধনে তিনি বলেন, দেশের যুব সমাজকে রক্ষা করতে আজকে আমাদের এই মানববন্ধন। এছাড়া কুচক্রিদের দেখানো পথ থেকে আমাদের যুব সমাজকে রক্ষা করতে হবে।
অন্যদিকে ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় জঙ্গিদের ঠাঁই হতে দেবো না। তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ করেন।
/আরএআর/টিএন/