ঢাকার কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা হিসেবে খ্যাত তাজ মঞ্জিলের মালিকের স্ত্রী মমতাজ পারভীন জঙ্গিদের ফ্ল্যাটে পুলিশের প্রবেশে বাধা দিয়েছিলেন। কোনওভাবেই ওই ফ্ল্যাটে তিনি পুলিশকে প্রবেশ করতে দিতে চাননি। মমতাজ পারভীন জঙ্গিদের ‘ভদ্র ছেলে’ বলে অভিহিত করেছিলেন পুলিশের কাছে।
কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা নিয়ে তদন্তকারী সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এই অপরাধে প্রথমে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় এবং পরবর্তীতে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দুই দফায় তাকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। বর্তমানে মমতাজ পারভীন কারাগারে রয়েছেন। তবে এই মামলার তদন্ত শেষ হতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাজ্জাদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম দফায় বাড়িওয়ালার স্ত্রী মমতাজ পারভীনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করেছিলাম। এরপর পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মামলার তদন্ত শেষ করতে আরও সময় লাগবে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো যাবে।’
শুক্রবার দুপুরে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ যখন রাত পৌনে ১২টার দিকে ওই বাড়িটিতে অভিযান চালানোর জন্য প্রবেশ করতে চায়, বাড়িওয়ালার স্ত্রী মমতাজ প্রথমে তাতে বাধা দেন। তার অনুমতি নিয়েই বাড়িটিতে পুলিশ প্রবেশ করে। তবে প্রথম থেকেই তিনি বাড়িতে পুলিশের প্রবেশে অনীহা প্রকাশ করে আসছিলেন। বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে পুলিশ প্রবেশ করে যখন প্রতিটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি করছিল, তখন মমতাজ পারভীন পুলিশের সঙ্গেই ছিলেন। যখন পুলিশ বাড়িটির পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে চায়, তখন তিনি রিঅ্যাক্ট করেন। সেখানে এতো রাতে পুলিশকে প্রবেশে করতে দিতে চাননি। পারভীন ওই ফ্ল্যাটে থাকা জঙ্গিদের ‘ভালো ছেলে’ বলে মূল্যায়ন করেছিলেন। ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশে বারবার তিনি বাধা দিয়েছিলেন। এতে পুলিশের আরও সন্দেহ হয়েছিল। এরপর তার বাধার মুখেই পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায়।’
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘জঙ্গিরা আগস্টেই কল্যাণপুরের ওই আস্তানা ছেড়ে অন্য বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এজন্য তারা কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বাসাও খুঁজছিল। এর আগেই তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘আমিও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তবে জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি কোনও সংশ্লিষ্টতা এখনও পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে পুলিশকে সহযোগিতা না করে বাধা দেওয়ার অপরাধ পাওয়া গেছে। এর নেপথ্যে আর কোনও কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
২৬ জুলাই রাজধানীর মিরপুর থানার কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের ‘জাহাজ বিল্ডিং’ নামে পরিচিত তাজ মঞ্জিলে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে বাড়িটির পঞ্চম তলায় থাকা ৯ জঙ্গি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। হাসান নামে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পালিয়ে যায় আরও একজন।
ঘটনার পর বাড়িওয়ালার স্ত্রী মমতাজ পারভীন, তার ছেলে মাজহারুল ইসলাম, মাহফুজুল আনসার, মমিন উদ্দিন ও কেয়ারটেকার জাকির হোসেনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পরবর্তীতে ২ আগস্ট মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বজলুর রহমান পুলিশের কাজে বাধা ও তথ্য গোপনের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছেন মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাজ্জাদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘বাড়িওয়ালা অভিযানের সময় পুলিশের কাজে সহযোগিতা না করে বাধা দিয়েছেন। এছাড়া ডিএমপির পক্ষ থেকে দেওয়া ভাড়াটেদের তথ্য ফরম জঙ্গিরা পূরণ করেনি এবং এ নিয়ে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এসব বলা যাচ্ছে না।’
তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জঙ্গিদের সঙ্গে বাড়িওয়ালার পূর্ববর্তী কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনও তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।’
গুলশান হামলার সময় জঙ্গিদের একটি দল কল্যাণপুরের ওই বাসাতে বসে এর ‘মনিটরিং’ করেছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা। জেএমবির মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী কল্যাণপুরের আস্তানায় যাওয়া-আসা করতো বলেও তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, কল্যাণপুরের এই আস্তানা থেকে আরও বড় ধরনের নাশকতা বা হামলার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। পুলিশ তা প্রতিরোধ করেছে।
মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাজ্জাদুর রহমান জানান, কল্যাণপুরের বাড়িটিতে এখন ২৪ ঘণ্টার প্রহরায় রয়েছে পুলিশ। নতুন করে ভাড়াটে আসতে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও বাধা নেই।
/এসটি/এইচকে/
আরও পড়ুন