বনশ্রীর মায়ের মতই আচরণ করছেন বাসাবোর মা

বামে-হুমাইরা,-সর্বডানে-মাশরাফিরাজধানীতে মাত্র ছয়মাসের ব্যবধানে পৃথক দুই পরিবারের সঙ্গে থেকে চারশিশু খুন হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে এসব হত্যার সঙ্গে তাদের মায়েদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইতিমধ্যে রামপুরার বনশ্রীতে এক মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দিয়েছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে বাসাবোর দুই শিশুখুনের সঙ্গে ইতিমধ্যে মায়ের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।দুই মায়ের বিষয়েই তাদের পরিবারের অভিযোগ, তারা মনোরোগে ভুগছেন। এমনকি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও দু’জনের একই ধরনের অসংলগ্ন আচরণেরও মিল রয়েছে। তারা দু’জনেই পুলিশের কাছে সরল স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। এমন ভয়াবহ ঘটনায় তারা অনুতপ্ত পর্যন্ত হচ্ছেন না।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২ নম্বর ছয়তলা ভবনের চিলেকোঠায় দুই ভাই-বোনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত দুই শিশু হলো- হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়া (৬) ও মাশরাফি ইবনে মাহবুব আবরার (৭)। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন মা তানজিনা রহমান। ওই দিন ভোররাতেই বাসাবোর মসজিদগলি থেকে পুলিশ মাকে আটক করেন। ভোরে মাকে একমাত্র আসামি করে শিশুদের বাবা মাহবুবুর রহমান সবুজবাগ থানায় একটি মামলা করেন। শনিবার পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড চাইলে আদালত তার পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তিনি পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।

সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কুদ্দুস ফকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস। আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছি। কোনও আবেগ দিয়ে তদন্ত হয় না।’

এদিকে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। প্রথমে ছেলেটিকে পরে মেয়েটিকে হত্যা করেন বলে জানিয়েছেন। এই ঘটনায় তার ভেতরে কোনও অনুতাপ দেখছি না। তিনি বারবারই বলেছেন, আমিতো মেরেই ফেলেছি, এখন আর কি করবেন?’

ঠিক একই ধরনের আচরণ করেছিল এ বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি রামপুরার বনশ্রীতে খুন হওয়া দুই শিশু নুসরাত আমান ও আলভী আমানের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। তিনি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা আড়াল করতে বিষক্রিয়ার কথা বলেছিলেন। তবে তার সেই দাবি ময়নাতদন্তে টিকেনি। এরপর র‌্যাব তাকে আটক করলে ৩ মার্চ বাবা আমানুল্লাহ রামপুরা থানায় মামলা করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সব স্বীকার করেছেন। মামলার তদন্ত শেষে ইতিমধ্যে আদালতে জেসমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) খিলগাঁও জোনের সহকারি কমিশনার (এসি) ইকবাল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমরা মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। আদালতে তার বিচার চলছে।’

তিনি জানান, ‘জেসমিন মালেক ঘটনার সবকিছুই তার বর্ণনায়  দিয়ে গেছেন। আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি।’

ঘটনার পর জেসমিন মালেক পুলিশকে জানান, ‘সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। সন্তানদের ভবিষ্যত কি হবে তা নিয়েও তিনি চিন্তিত ছিলেন।’ যদিও তার সন্তানরা নামী স্কুলে পড়তেন।

ঠিক একই ধরনের কথা বলছেন বাসাবোতে দুই শিশু খুনের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত মা তানজিন রহমান। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন,‘জ্বিনের নির্দেশে তার দুই শিশুকে হত্যা করেছেন।’

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও তার কথায় অনেক অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সবুজবাগ থানার পুলিশ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ‘ঘটনার পর থেকেই নিহত শিশুদের মা নিখোঁজ ছিলেন। আমরা তাকে খুঁজছিলাম। রাত সাড়ে ৪টা বা ৫টার দিকে সবুজবাগের মসজিদ গলিতে তিনি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এ সময় আমাদের টহল পুলিশ তাকে জেরা করে। তিনি কোথায় যাবেন? জানতে চাইলে, তানজিনা বলেন, ‘বাসাবোর সাততলা (চিলেকোঠাসহ) ভবন খুঁজতেছি।’এসময় পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে পুলিশও তাকে বলে, আমরাও সাততলার মানুষ খুঁজতেছি। এরপর তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

শনিবার সকালে তাকে পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে। এসময় তানজিনা প্রাথমিকভাবে হত্যার বিষয় স্বীকার করে পুলিশকে বারবার দুই হাত দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই দুইহাত দিয়ে হত্যা করেছি।’ এসময় তার আচরণ অসঙ্গিত ছিল।

তবে সবুজবাগ থানার অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, সকাল থেকে তানজিনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছিলেন। তার ভেতরে কোনও অনুতাপ নেই। সন্তানদের মৃত্যুর বিষয়ে তার কাছে পুলিশ বারবার জানতে চাইলে তিনি জ্বিন, গায়েবি নির্দেশনা এসব কথা বলছিলেন। এখন কেউ তাকে কিছু করতে পারবে না বলেও পুলিশকে জানান তিনি।

ওসি কুদ্দুস ফকির বলেন, তদন্তাধীন বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বলা যাবে।

শিশুদের বাবা মাহবুব রহমান মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘আমার স্ত্রী তানজিনা ১২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সোয়া ৯টার যে কোনও এক সময়ে চাপাতি দিয়ে গলাকেটে আমার দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এ বিষয়ে আইনগত গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’

এদিকে, বাড়িওয়ালা আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের কখনও মনে হয়নি এধরনের ঘটনা তানজিনা ঘটাতে পারেন। তাকে দেখলে এরকম মনে হয় না। কেউ বিশ্বাসও করবেন না।’

নিহত শিশুদের ফুফু লাইলা নূর বলেন, ২০০৮ সালে তাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই আমরা তার (শিশুদের মা) মানসিক সমস্যা বুঝতে পারি। এরপর ফার্মগেটের গ্রিন রোডের ডক্টরস চেম্বারে ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আমরা দেখাই। ডাক্তার তার চিকিৎসা করে সব সময় ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। শিশুদের মা সবসময় নামাজ রোজা করতেন, কোরআন তেলওয়াত করতেন। তিনি সাধারণত চুপচাপ থাকতেন। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতেন না। সন্তান বা স্বামীর প্রতি কোনও খেয়াল রাখতেন না। তবে যখন ওষুধ দেওয়া হতো, তখন তিনি ভালো থাকতেন। আর যখন ভালো থাকতেন, তখন সমস্যা জানতে চাইলে বলতেন, তিনি (শিশুদের মা) স্বপ্নে তার দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছেন বা তার বাবা-মা (শিশুদের নানা-নানি) তাকে মেরে ফেলেছে অথবা তিনি তার স্বামীকে মেরে ফেলেছেন। এসব স্বপ্ন দেখে তিনি দুঃশ্চিন্তা করতেন।

প্রতিবেশী আরিফুর রহমান বলেন, আমরা পাশাপাশি থাকি। কখনও তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে হয়নি। কেন যে এমন করলেন, বুঝতে পারছি না!

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

/এআরআর/এমএসএম/আপ-এআর/