পুলিশের দাবি সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র, জামায়াত বলছে আমির নির্বাচনি সভা

মেরুল বাড্ডার সেই স্কুল, যেখান থেকে জামায়াত রুকনদের আটক করে পুলিশশুক্রবার ভোরে মেরুল বাড্ডার ইসলামি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ থেকে আটককৃত জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলদের সবাই দলটির রুকন। তারা চলমান দলের ২০১৭-১৯ সেশনের আমির নির্বাচনের ভোট প্রদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন।  এদিকে পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করছিল।
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম এ জলিল জানিয়েছেন, স্কুলটির অধ্যক্ষ শামসুন্নাহার নিজামী। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী এবং জামায়াতের নারী বিভাগের সেক্রেটারি। অভিযানের সময় তাকে স্কুলে পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটির দুটি শাখা রয়েছে। একটি গুলশানে, অন্যটি মেরুল বাড্ডায়, যেখানে অভিযান চালানো হয়। দুটি শাখার প্রিন্সিপালই নিজামীর স্ত্রী। গুলশান শাখাটিতে অভিযান চালায়নি পুলিশ।

যদিও পুলিশ দাবি করছে, আটককৃতরা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বৈঠকের কথা তারা স্বীকারও করেছে। এ নিয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর প্রচার বিভাগ থেকে কোনও বিবৃতি আসেনি। বরাবর এসব বিষয়ে দ্রুততম সময়ে প্রচার বিভাগের বিবৃতি এলেও এবারই এর ব্যতিক্রম ঘটলো।

পুলিশের তথ্যমতে, আটকৃতদের মধ্যে রয়েছেন, বাড্ডা থানা জামায়াতের আমির ফখরুদ্দিন মো. কেফায়েতুল্লাহ, মেরুল বাড্ডার এই স্কুলটির ভাইস প্রিন্সিপাল, দক্ষিণ বাড্ডার সভাপতি, উত্তর বাড্ডার ইউনিটের জামায়াতের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। উত্তর বাড্ডার মাদ্রাসার একজন শিক্ষকসহ বাড্ডার স্থানীয় জামায়াত নেতা।

জামায়াতসূত্র জানান, তাদের প্রত্যেকেই দলের রুকন।

ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক এক প্রচার সেক্রেটারি শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যতদূর মনে হচ্ছে, সবাই দায়িত্বশীল। হয়তো চলমান আমির নির্বাচনের ভোট দিচ্ছিলেন।’

পল্টন থানার একজন কর্মী জানান, শুক্রবার ভোরে আটক হলেও, মূলত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকেই ওই স্কুলে তারা অবস্থান করছিলেন।  তারা ঢাকার ওই অঞ্চলের রুকনদের ভোট গণনার দায়িত্বশীল হয়ে থাকতে পারেন।

তবে আটককৃতদের কাছ থেকে আমির নির্বাচনের ব্যালট পেপার বা সাংগঠনিক কোনও আলামত পেয়েছে কি না, এ নিয়ে কোনও তথ্য দেয়নি পুলিশ।

একাধিক সূত্রের ধারণা, আটককৃতদের জামিনের চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াতের আইনজীবীরা। সাংগঠনিক কাগজপত্র উদ্ধার করতেও তৎপরতা চালানো হতে পারে। আমির নির্বাচনের ব্যালট পেপার উদ্ধারেও সচেষ্ট হতে পারে জামায়াত।

উল্লেখ্য, গত বুধবার কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে জামায়াতের আমির নির্বাচন শুরু হয়। এই নির্বাচনে দলটির প্রায় ৩৭ হাজার, মতান্তরে ৪২ হাজার রুকন ভোট দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউন আগেই জানিয়েছিল, নির্বাচনে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আদর্শিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যানবাহনও ব্যবহার করবে জামায়াত। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর গ্রেফতার এড়াতেই এই কৌশল নিয়েছে দলটি, এমনটি জানান দলটির একাধিক সক্রিয় সদস্য।

শুক্রবার সকাল ৮ টা থেকে সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টের ৮ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর বাসায় অভিযান চালায় বাড্ডা থানা পুলিশ। এসময় পাঁচ নারী ও জামায়াতের ১৮ নেতাকর্মীসহ ২৩ জনকে আটক করা হয়। এরপর বিকাল নাগাদ পাঁচ নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক রাখা হয় বাকি ১৮ জনকে।

বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম এ জলিল বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ছয়তলা বাড়িটির প্রধান ফটকেই ইসলামি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বড় সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। অভিযানের পর পুলিশ বাড়িটির মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

প্রতিবেশীরা জানান, বাড়িটির মালিক বেলাল হোসেন (৬০) একসময় চাকরি করতেন। পরবর্তীতে রড-সিমেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। কয়েকমাস আগে তিনি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর এখন আর ব্যবসা করছেন না। বাসাতেই থাকছেন। তার দুই মেয়ে, দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িটির তৃতীয় তলায় থাকেন। চারতলায় চলে স্কুল-কার্যক্রম।  ছয়তলার ওপর একটি চিলেকোঠায় থাকেন ভাইস প্রিন্সিপাল ও তার পরিবার। স্কুলটিতে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।

স্থানীয় চয়েজ অটো ড্রাই ক্লিনার অ্যান্ড লন্ড্রির মালিক জাহাঙ্গীর আলম দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সকালে দোকান খোলার পর দেখি তিনটা গাড়ি বাড়িটার সামনে এসে থামে। তিন গাড়িতেই পুলিশ। পুলিশের বেশির ভাগ সদস্য বাড়ির ভেতরে ঢোকেন। বাকিরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। পুলিশ দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা বাড়ির ভেতরে ছিল। সকাল সাড়ে ১০টা বা পৌনে ১১ টার দিকে বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকজন নারী ও পুরুষকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। কি জন্য তাদের ধরে নিয়ে গেছে, তা বলতে পারব না।

স্কুলটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। তবে তিন বছরের কম হবে না।

মামলায় নিজামীর স্ত্রীকে আসামি করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি এখনও দেখছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ষড়যন্ত্রের সংশ্লিষ্টতা যার বিরুদ্ধে পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই মামলা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোশতাক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলা এখনও ড্রাফট হয়নি, প্রক্রিয়াধীন।তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হবে।’

এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে নিজামী স্ত্রী জড়িত কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, ‘আমরা তদন্ত করছি। দেখি কারা এর সঙ্গে জড়িত।’

তাকে মামলায় আসামি করা হবে কিনা, এ প্রশ্নের উত্তরে মোশতাক আহমেদ বলেন, ‘এধরনের ঘটনায় যারা স্পটে থাকে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়। এরপর তদন্তে যদি তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে তাকেও আসামি করা হবে।’

/এআরআর/এসটিএস/এইচকে/এপিএইচ/

পড়ুন: মানবতাবিরোধী অপরাধে নয়, পাঁচ ত্রুটিতে নিজামীর প্লট বাতিল